নিজস্ব প্রতিবেদক:
সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা (এআরও) ওয়াসেক বিল্লাহ। বর্তমানে ঢাকা কাস্টম হাউসে কর্মরত। চাকরিজীবনের শুরু থেকেই তাঁর বিরুদ্ধে নজিরবিহীন দুর্নীতি, সন্ত্রাসী কর্মকান্ড, মিথ্যা ঘোষণা, চোরাচালান, রাজস্ব ফাঁকিতে সাহায্য করা, ইয়াবা/মাদক ব্যবসা, নারী কেলেঙ্কারি, ক্ষমতার অপব্যবহার, উর্দ্ধতনদের সাথে খারাপ ব্যবহার করাসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকান্ডে জড়িত থাকার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এই শিক্ষার্থী ২০১৮ সালে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা হিসেবে চাকরিতে যোগদান করেন। এর পর থেকেই তিনি ধীরে ধীরে চোরাচালান দুর্নীতি জালিয়াতির একটি শক্তিশালী বলয় গড়ে তুলেন। হয়ে উঠেন কাস্টমস দস্যু। অনুসন্ধানে জানা যায়, ওয়াসেক বিল্লাহর গ্রামের বাড়ি নওগাঁয়। তিনি দিনাজপুরের হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের একজন সহযোগী অধ্যাপককে নাম পরিচয় গোপণ রেখে বিয়ে করেছেন। এই কাস্টমস/রাজস্ব দসু্যু ব্যক্তিগত পরিচয়ের চেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে তাঁর কথিত রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা এবং অবৈধ উপায়ে বিপুল সম্পদ অর্জনের ক্যারিসমাটিক কুট-কৌশলের কারণে। পতিত আ’লীগ সরকারের আমলে ওয়াসেক বিল্লাহ নিজেকে তৎকালীন প্রভাবশালী নেতা সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের আত্মীয় হিসেবে পরিচয় দিয়ে গর্ব বোধ করতেন। এই রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে ২০২০-২১ সালে তিনি ঢাকাএভ-এর সাংগঠনিক সম্পাদকের পদ প্যানেল থেকে বাগিয়ে নেন। পরবর্তীতে দাবড়িয়ে বেড়ান কাস্টমসের নিষিদ্ধ অলি-গলি। তার ভয়ে তটস্থ থাকতো কাস্টমস কর্মকর্তা-কর্মচারীগণ। এমনকি ওয়াসেক বিল্লাহ নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম মন্নু হাজরাকে ‘গুরু’ বলে সম্বোধন করতেন। গুরুর চরণে বিভিন্ন ধরণের বিলাশি মাদক ও সুন্দরী সরবরাহ করে নিজেকে ধন্য মনে করতেন তিনি।
আরও অভিযোগ রয়েছে, ছাত্র-জনতার জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আন্দোলন দমনে নজরুল ইসলাম মন্নু হাজরাকে ওয়াসেক বিল্লাহ মোটা অংকের অর্থের জোগান দিয়েছিলেন। তৎকালীন রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রভাব কাজে লাগিয়ে ওয়াসেক বিল্লাহ উত্তরার বিতর্কিত ‘কিংফিশার বার’-এর লাইসেন্স ও প্রয়োজনীয় অনুমোদন করিয়ে নেন। বর্তমানে গুলশান উত্তরাসহ এর তিনটি শাখা রয়েছে। বারটি তাঁর এক বন্ধুর নামে পরিচালিত হলেও কাস্টমস অঙ্গনে এর প্রকৃত মালিকানা ওয়াসেক বিল্লাহর এমন দাবি ‘ওপেন সিক্রেট’ হিসেবে প্রচলিত রয়েছে। তিনি এই বারকে ঘুষের টাকা লেনদেন, মাতলামি, কাস্টমস এর এক শ্রেণীর উর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের মনোরঞ্জন, নারী কেলেঙ্কারিসহ বিভিন্ন ধরণের অসামাজিক/অপকর্মের ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করে আসছেন।
ওয়াসেক বিরøাহর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের সূত্রপাত চট্টগ্রাম ভ্যাটে থাকতে। চট্টগ্রাম ভ্যাটের অধীন বান্দরবান সাব-ডিভিশনে কর্মরত থাকার সময়ে তার ঘুষ ও বিভিন্ন ধরণের কেলেঙ্কারিগুলো ব্যাপক আকারে আলোচনায় আসতে থাকে। সেখানে তিনি সহযোগী মানিক দত্তকে সঙ্গে নিয়ে স্থানীয় পর্যটন ব্যবসায়ীদের জন্য আতঙ্কের কারণ হয়ে উঠেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ব্যবসায়ীদেও ভয় দেখিয়ে সে সময়ে বিভিন্ন হোটেলে সুন্দরী কলগার্ল নিয়ে রাত কাটানো ও কারণে অকারণে মাতলামি করাসহ বিভিন্ন ধরণের কেলেঙ্কারীতে জড়িয়ে পড়েন তিনি। অভিযোগ অনুযায়ী, ব্যবসায়ীদের সাথে অনৈতিক লেনদেনে বনিবনা না হলেই তাঁরা নিয়ম বহির্ভূতভাবে বিভিন্ন হোটেল ও রিসোর্টে অভিযান চালাতেন। হোটেল রিসোর্টের গেস্ট রেজিস্টার ও গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র তছনছ করতেন। পর্যটকদের কক্ষে বিনা অনুমতিতে প্রবেশ করে হয়রানি করতেন। এসব অভিযানের উদ্দেশ্য ছিল ব্যবসায়ীদের জিম্মি করে মোটা অঙ্কের ঘুষ আদায় করা-এমন অভিযোগও রয়েছে। ঘুষ দিতে অস্বীকৃতি জানালে ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে মামলা ও প্রশাসনিক হয়রানির ভয় দেখানো হতো। এর প্রেক্ষিতে ২০২২ সালের ৫ এপ্রিল বান্দরবান হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন তৎকালীন জেলা প্রশাসক ইয়াছমিন পারভীন তিবরীজির কাছে ওয়াসেক বিল্লাহর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক স্মারকলিপি দিতে বাধ্য হয়েছিল বলে জানা যায়। বান্দরবানে বিতর্কিত ভূমিকার পর ওয়াসেক বিল্লাহ আরও উচ্চাভিলাষী হয়ে ওঠেন। তৎকালীন বিতর্কিত সংসদ সদস্য ও ‘ইয়াবা স¤্রাট’ হিসেবে পরিচিত আব্দুর রহমান বদির সঙ্গে অবৈধ ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বদির রাজনৈতিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে তিনি কৌশলগতভাবে টেকনাফ শুল্ক স্টেশনে পদায়ন লাভ করেন। আর সেখান থেকেই কাস্টমস ডন ওয়াসেকের কথিত অপরাধমূলক কর্মকান্ড আরও বিস্তৃৃত হয় বলে দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, টেকনাফে কর্মত থাকতে তিনি সরাসরি ইয়াবা চোরাচালান সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। কাঠের গুঁড়ি ও আচারের প্যাকেটের ভেতরে করে ইয়াবা পাঁচারের কাজে তিনি অন্যতম হোতা হিসেবে ভূমিকা পালন করতেন। বাহক হিসেবে ব্যবহার করতেন অল্প বয়সী অশিক্তিত অর্ধ শিক্ষিত সুন্দরী নারীদের-এমন গুরুতর অভিযোগও রয়েছে কথিত এই কাস্টমস দস্যুর বিরুদ্ধে। এই মাদক কারবারের মাধ্যমেই তিনি কাড়ি কাড়ি অবৈধ অর্থের মালিক হয়ে ওঠেনে তিনি। গড়ে ওঠে ওয়াসেক বিল্লাহর অবৈধ সম্পদের পাহাড়। আরও অভিযোগ করা হয়েছে, ওয়াসেক বিল্লাহ বর্তমানে ‘মিথ্যা ঘোষণা’র আড়ালে বিপুল পরিমাণ মদ, মাদক এবং নিষিদ্ধ পণ্য ‘ভিআইপি মর্যাদায়’ অবৈধভাবে খালাস করে দিচ্ছেন। এসব পণ্য তাঁর কথিত নিজস্ব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ‘কিংফিশার বারে’ সরবরাহ করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। এই কথিত সিন্ডিকেটে সহযোগী হিসেবে আরেক সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মোয়াজ্জেম হোসেনের নামও উল্লেখ রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, সাধারণ ও বৈধ ব্যবসায়ীদের কাছে ওয়াসেক বিল্লাহ একটি মূর্তিমান আতঙ্কের নাম। প্রতিটি ফাইলে স্বাক্ষরের জন্য তিনি ১ লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ দাবি করেন এবং ঘুষ ছাড়া কোনো কাজ করেন না। দুর্নীতি দমন কমিশন দুদকে ভিউ ব্রিড বাংলাদেশ লিমিটেডের সিইও মহসিন হোসেনের দেওয়া একটি লিখিত অভিযোগের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, গত ছয় মাসে ওয়াসেক বিল্লাহ রাজস্ব ফাঁকি ও ঘুষের মাধ্যমে প্রায় অর্ধশত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়েছে, ঢাকা কাস্টমস হাউসের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ওয়াসেক বিল্লাহ কোনো ধরনের যথাযথ ঘোষণা ও আমদানি শর্ত প্রতিপালন না করেই মিথ্যা ঘোষণায় বিভিন্ন পণ্য ‘ভিআইপি মর্যাদায়’ খালাস করে দিচ্ছেন। এর ফলে সরকার প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে। এসব অবৈধ ও আমদানি নিষিদ্ধ পণ্যে বাজার সয়লাব হয়ে যাচ্ছে। মহসিন হোসেনের অভিযোগ অনুযায়ী, এ ধরনের কর্মকান্ডের কারণে বৈধ ব্যবসায়ীরা অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়ছেন। এতে অনেক ব্যবসায়ী মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে পথে বসার উপক্রম হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, রাজস্ব ফাঁকির মাধ্যমে যে অর্থের ক্ষতি হচ্ছে, তা অসাধু কাস্টমস কর্মকর্তা ও চোরাচালান সিন্ডিকেট সদস্যদের পকেটে যাচ্ছে।

ওয়াসেক বিল্লাহর মালিকানীন কিং ফিসার বার ও রেস্টুরেন্ট
আরো জানা যায়, ঢাকা কাস্টমস হাউসের এই সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা বর্তমানে বাংলাদেশ কাস্টমসের নিয়মকানুন ও আইনের তোয়াক্কা করছেন না। তার মাধ্যমে বা তার স্বাক্ষরে আমদানি নিষিদ্ধ, আমদানি শর্তযুক্ত এবং উচ্চ শুল্কের বিভিন্ন পণ্য চোরাচালানের মাধ্যমে নিয়মিত খালাস করে দেওয়ার ফলে রাষ্ট্রের বিপুল আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। একই সঙ্গে বৈধ ব্যবসায়ীরাও ক্ষতির শিকার হচ্ছেন । ওয়াসেক বিল্লাহর কথিত বিপুল অবৈধ সম্পদের একটি অংশের তথ্য রাজধানীর মিরপুরের বাউনিয়া মৌজায় পাওয়া গেছে। সেখানে ৩৬৪৯৭ নম্বর খতিয়ানে তাঁর নামে ৩৩ শতাংশ জমি কেনা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকা কাস্টম হাউসের একাধিক কর্মকর্তা জানান, সাধারণ ব্যবসায়ীদের জিম্মি করে ওয়াসেক বিল্লাহ যে কথিত অপরাধের সা¤্রাজ্য গড়ে তুলেছেন, তা বন্ধ করা এখন সময়ের দাবি। তাঁদের মতে, কথিত চোরাচালান সিন্ডিকেট ধ্বংস করার পাশাপাশি এর সঙ্গে জড়িত প্রত্যেককে আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সাধারণ ব্যবসায়ীরা যাতে বৈধভাবে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারেন, সে জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ঊর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষ এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পক্ষ থেকে পৃথকভাবে তদন্ত করা উচিত বলেও তাঁরা মত দিয়েছেন।
উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ওয়াসেক বিল্লাহর মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরবর্তীতে খুদে বার্তার মাধ্যমে প্রশ্ন করা হলেও তিনি কোনো উত্তর দেননি। (ক্রমশ:)