ঢাকা | বঙ্গাব্দ

প্রধান প্রকৌশলী হওয়ার চেষ্টায় ফ্যাসিষ্ট দোসর গণপূর্তের আবুল খায়ের!

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Sep 8, 2026 ইং
প্রধান প্রকৌশলী হওয়ার চেষ্টায় ফ্যাসিষ্ট দোসর গণপূর্তের আবুল খায়ের! ছবির ক্যাপশন: চাকুরীর বয়স শেষ তবুও প্রধান প্রকৌশলী হতে মরিয়া গণপূর্তের আবুল খায়ের!
ad728
জয়নাল আবেদীন যশোরী ও আসাদ মাহমুদ:
 চাকুরীর বয়স আছে এক মাস থেকেও কম। অথচ অধিদপ্তরের অস্থিরতাকে পুঁজি করে সময়-সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ঝোপ বুঁঝে কোপ মেরে প্রধান প্রকৌশলী হতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন গণপূর্তের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো: আবুল খায়ের। এজন্য তিনি আদাজল খেয়ে আটঘাট বেঁধে মাঠে নেমেছেন। কাড়ি কাড়ি টাকার ব্রিফকেস নিয়ে ঘুরছেন মন্ত্রী ও আমলাদের দোরগোড়ায়। এমনকি বর্তমানে চলতি দায়িত্বে নিয়োজিত প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরীকে ল্যাং মেরে ফেলে দিয়ে নিজে এই পদটি দখলে নিতে বাকা পথে চেষ্টা ও তদবীর চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। এরই ধারাবাহিকতায় মোটা অংকের টাকা ব্যয় করে খালেকুজ্জামান চৌধুরীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় নিউজ ছাপিয়ে সেটাকে অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করে ষড়যন্ত্রের বাস্তবায়নে মরিয়া হয়ে তৎপরতা চালাচ্ছেন প্রকৌশলী খায়ের। ‘বাঙালি সংবাদ’ এর আনুসন্ধানী টিমের তথ্যানুসন্ধানে এমন তথ্য বেড়িয়ে এসেছে।
অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আবুল খায়ের বর্তমানে আছেন গণপূর্তর ঢাকা জোনের দায়িত্বে। অক্টোবরের ১ তারিখে তার পিআরএল। অনুসন্ধানে জানা গেছে, তিনি সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প ও গণপূর্তর বড় বড় প্রজেক্ট থেকে কমিশন বা নগদে ঘুষ নেওয়াকে অলিখিত নিয়মে পরিণত করেছেন। সংশ্লিষ্ট দপ্তরে তিনি পরিচিত ‘মিস্টার ৫%’ নামে। গোপালগঞ্জ থেকে শুরু করে চট্টগ্রাম, রংপুর, কুমিল্লা হয়ে ঢাকা-চাকরিজীবনের যেখানেই তার পোস্টিং হয়েছে, সেখানেই জড়িয়েছেন নজিরবিহীন জালিয়াতি বিরামহীন দুর্নীতি ও ব্যাপক অনিয়মে। ঠিকাদারদের ওপর উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আধিপত্য বিস্তার, টেন্ডার সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে নিজের নামে-বেনামে গড়ে তুলেছেন শত কোটি টাকার সহায়-সম্পদ। 

ছাত্রলীগ কোটা ও গোপালগঞ্জ কানেকশন: অনুসন্ধানে জানা যায়, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে চাকরিজীবনের শুরু থেকেই দাপট দেখিয়েছেন ধুরন্ধর প্রকৌশলী আবুল খায়ের। স্বৈরাচার আ’লীগের সচিব শহীদুল্লাহ খন্দকারের বিশেষ সুপারিশে ছাত্রলীগ কর্মী পরিচয় তিনি গোপালগঞ্জ জোনে পোস্টিং বাগিয়ে নেন। সেখানে থাকাকালীন ক্ষমতাচ্যুত ফ্যাসিস্ট সরকারের প্রভাবশালী নেতা শেখ সেলিম এবং তার পরিবারের সদস্যদের সাথে তার গভীর ‘দহরম মহরম’ সম্পর্ক গড়ে ওঠে এই প্রকৌশলীর।  আওয়ামী রাজনৈতিক ছত্রছায়াকে পুঁজি করে পরবর্তীতে তিনি অন্য ঊধর্বতন কর্মকর্তাদের তোয়াক্কা না করে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেন গোটা গণপূর্ত অধিদপ্তরে। 
২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে গোপালগঞ্জে মুজিব কর্ণার ও মুজিব গ্যালরি উদ্বোধন করেন প্রকৌশলী আবুল খায়ের

গোপালগঞ্জ গণপূর্তে ‘মুজিব কর্ণার’ও ‘বঙ্গবন্ধু গ্যালারি’ নির্মাণ করেন এই প্রকৌশলী:
ফ্যাসিবাদের গুণকীর্তন স্বরুপ ২০২০ এর ৪ ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে গোপালগঞ্জ গণপূর্ত বিভাগে বেলা সাড়ে ১১টায় ফিতা কেটে ‘মুজিব কর্ণার’ও ‘বঙ্গবন্ধু গ্যালারি’র উদ্বোধন করেন প্রকৌশলী আবুল খায়ের। ওই সময়ে তিনি বলেন, ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শকে ধারণ করে সৎ ও নিষ্ঠার সাথে গণপূর্ত অধিদপ্তর বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ করতে চায়। একই সাথে বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উন্নয়ন অগ্রযাত্রায়ও অংশীদার হতে চায় গণপূর্ত অধিদপ্তর। সেই লক্ষ্য নিয়ে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য গণপূর্ত অধিদপ্তর ইতিমধ্যে কাজ শুরু করেছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘গোপালগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলা থেকে আসা গণপূর্তের ঠিকাদার ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বঙ্গবন্ধু কর্ণারে রক্ষিত বই পড়ে বঙ্গবন্ধু ও তার চিন্তা-চেতনা সম্পর্কে জানতে পারবেন।’
পরে বঙ্গবন্ধু ও ১৫ আগস্টে শহীদ পরিবারের সদস্যদের রূহের মাগফেরাত কামনা করে দোয়া ও মোনাজাত করা হয়।
টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ: চট্টগ্রাম জোনে ৩% পিসি: চট্টগ্রাম জোনে থাকাকালীন প্রকৌশলী আবুল খায়েরের দুর্নীতি আর লুটপাটে ভিন্ন মাত্রা পায়। তিনি সেখানে উন্নয়ন প্রকল্পের প্রতিটি কাজে ৩% করে নগদ কমিশন বা উৎকোচ নেওয়া বাধ্যতামূলক করেন। সে সময় প্রচলিত পিসি টেন্ডার’ (পার্সেন্টেজ শেয়ারিং টেন্ডার) ব্যবস্থা সম্পূর্ণ নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে তিনি একাই কামিয়েছেন অর্ধ শতাধিক কোটি টাকা। কোনো ঠিকাদার কমিশন দিতে অস্বীকৃতি জানালে তার বিল আটকে দেওয়া বা ব্ল্যাকলিস্ট করার হুমকি দেওয়া হতো জোন অফিস থেকে। এমনকি নির্বাহী প্রকৌশলী এসডিই এসইসহ বড় বড় নির্মাতা প্রতিষ্ঠান, সাধারণ ঠিকাদার ও সাধারণ কর্মকর্তাদের সর্বদা নিজস্ব ক্ষমতার দাপটে দাবিয়ে রাখতেন তিনি।
চট্টগ্রামে আবাসন প্রকল্পে আবুল খায়েরের নেতৃত্বে সিন্ডিকেট লুটপাট

চট্টগ্রামে আবাসন প্রকল্পে লুটপাট: চট্টগ্রাম মহানগরীর আগ্রাবাদ সিজিএস কলোনিতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারিদের বসবাসের জন্য ৯টি ২০তলা ভবন নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়ন কাজে প্রকৌশলী আবুল খায়েরের নেতৃত্বে ব্যাপক লুটপাট চালানো হয়। প্রায় ৪শ’ কোটি টাকা ব্যায়ে ভবনগুলো নির্মাণে লীগপন্থি তিন ঠিকাদারকে কারসাজির মাধ্যমে কার্যাদেশ পাইয়ে দেওয়ার অন্যতম নেপথ্য নায়ক ছিলেন এই প্রকৌশলী। ওইা সময়ে অধীনস্থ তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আসিফ ইমরোজ নির্বাহী প্রকৌশলী জহির উদ্দিনের মাধ্যমে মাধ্যমে কমিশন বাণিজ্য চালিয়ে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন তিনি। এতে করে ভবনগুলো নির্মাণে সিডিউল বহির্ভূতভাবে নিম্নমাণের নির্মাণ উপকরণ ব্যবহার করা হয়েছে। ডিজাইন স্পেসিফিকেশন পাল্টানো হয়েছে ব্হুবার। এ নিয়ে দুদকে অভিযোগ গেলে প্রাথমিক অনুসন্ধানে দুর্নীতি লুটপাটের প্রমাণ পায় দূর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
মূলত ঠিকাদার ও প্রকৌশলীরা মিলে এই প্রকল্পটির অর্থ লোপাট করেছেন। প্রকল্পের কাজ করা তিনজন ঠিকাদারই আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনের বিভিন্ন দায়িত্বে ছিলেন। ভবন নির্মাণে প্রতি বর্গফুটে যে ব্যয় দেখানো হয়েছে তা অনেক বেশি। বেসরকারি আবাসন কো¤পানি জমিসহ ফ্ল্যাট বিক্রিতে যে দাম ধরে জমির মূল্য ছাড়াই ফ্ল্যাট নির্মাণে তার চেয়ে বেশি ব্যয় করেছে গণপূর্ত বিভাগ।
রংপুর জোনে দুর্নীতি ও ৭১ টিভিতে লাইভ সাক্ষাৎকার:  রংপুর জোনে বদলি হওয়ার পরও আবুল খায়েরের দুর্নীতির চাকা থামেনি। সেখানে তার বেপরোয়া ঘুষ বাণিজ্যে অতিষ্ঠ হয়ে স্থানীয় বেশ কয়েকজন ঠিকাদার সরাসরি গণমাধ্যমের মুখোমুখি হন। দেশের শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি টেলিভিশন ‘৭১ টিভি’-তে ভূক্তভোগী ঠিকাদাররা তার বিরুদ্ধে সরাসরি লাইভ সাক্ষাৎকার দেন।
রংপুরে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আবুল খায়েরের স্ত্রীর আগমন উপলক্ষে সরকারের ২০ লক্ষ টাকা খরচ করে সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা

রংপুর গণপূর্ত্রে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আবুল খায়েরের স্ত্রী আসবেন বলে ২০ লাখ টাকা খরচ: ২০২৪ সালের ২ জুন গণপূর্ত অধিদফতরের রংপুর জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আবুল খায়েরের স্ত্রী'র রংপুর আগমন উপলক্ষে গণপূর্ত পারিবারিক মিলনমেলা ও সঙ্গীত সন্ধ্যার আয়োজন করা হয়। ওই অনুষ্ঠান উৎযাপন করা হয় শহরের গ্রান্ড প্যালেস হোটেলে। বর্ণাঢ্য এই অনুষ্ঠান শুরু হয় সন্ধ্যা ৭টার দিকে তা মধ্যরাত পর্যন্ত চলে। এ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রংপুর গণপূর্ত জোনের অধিকাংশ কর্মকর্তা ও কর্মচারী। এ অনুষ্ঠানে প্রায় ২০ লাখ টাকা খরচ করা হয়। 
আবুল খায়ের গণপূর্ত অধিদপ্তরের ওই সময়ের প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ শামীম আকতারের অন্যতম একজন আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত ছিলেন। 
জানা গেছে, ওই জোনের কর্তাব্যক্তি ও স্থানীয় ঠিকাদারদের আর্থিক সহযোগিতায় অনুষ্ঠানের খরচ যোগাড় করা হয়। উল্লেখ্য বিষয়টি গণপূর্ত ইতিহাসের একটি বিরল ঘটনা। কি উদ্দেশ্যে, কাকে খুশি করতে ওই বর্ণাঢ্য আয়োজন তা নিয়ে সে সময়ে প্রশ্ন তোলেন স্থানীয় সুধীজনেরা। 
সীমাহীন ঘুষ বাণিজ্যের কারণে কুমিল্লার সাবেক এমপি বাহারের তোপের মুখে অপসারণ: 
চট্টগ্রামে দায়িত্ব পডালনের পূর্বে প্রকৌশলী আবুল খায়ের ছিলেন কুমিল্লা সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী। সে সময়ে কুমিল্লায় নিজের আধিপত্য বিস্তার করতে গিয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের প্রতিরোধের মুখে পড়েন তিনি। কুমিল্লার তৎকালীন প্রভাবশালী সংসদ সদস্য আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহারের সাথে টেন্ডার ও কমিশন বাণিজ্য নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হলে এক পর্যায়ে এমপি বাহারের তীব্র আপত্তির মুখে তাকে কুমিল্লা সার্কেল থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
হাউজিং কর্তৃপক্ষে ৫০ কোটির কেলেঙ্কারি: জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ বা ন্যাশনাল হাউজিং অথরিটিতে (এনএইচএ) থাকাকালীনও তার বিরুদ্ধে বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। সেখানে সরকারি প্লট ও ফ্ল্যাট বরাদ্দ, নকশা অনুমোদন এবং বিভিন্ন উন্নঢন প্রকল্পের টেন্ডার প্রক্রিয়ায় জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে তিনি প্রায় ৫০ কোটি টাকার দুর্নীতি করেছেন বলে সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছে।
ঢাকা জোনে ‘মিস্টার ৫% এবং ২৪ ফ্ল্যাটের মালিকানা: বর্তমানে ঢাকা জোনে কর্মরত থাকাবস্থায় তার নাম হয়ে গেছে ‘মিস্টার ৫% পারসেন্টা। প্রজেক্ট অনুমোদন কিংবা ঠিকাদারদের বিল পাসের জন্য ৫% কমিশন দেওয়া এখন ওপেন সিক্রেট। এই দুর্নীতির টাকা দিয়ে রাজধানী ঢাকা এবং এর আশেপাশে তিনি গড়ে তুলেছেন নামে-বেনামে অবৈধ সহায়-সম্পদের সা¤্রাজ্য।
আবুল খায়েরের স্থাবর-অস্ত্রাবর সম্পদের খতিয়ান:
বেনামী ফ্ল্যাট: ঢাকার বিভিন্ন অভিজাত এলাকায় আবুল খায়েরের নিজ ও স্বজনদের বেনামে অন্তত ২৪টি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট রয়েছে। ন্যাশনাল হাউজিং ও পূর্বাচলে জমি, মোহাম্মাদপুরে ন্যাশনাল হাউজিংয়ের বিশাল ফ্ল্যাটসহ ঢাকার পূর্বাচলে রয়েছে একাধিক কোটি টাকার প্লট ও জমি।
ময়মনসিংহে বিঘায় বিঘায় জমি: ঢাকার বাইরে ময়মনসিংহের গ্রামীণ ও শহরতলী এলাকায় নামে-বেনামে বিঘায় বিঘায় কৃষিজমি ও খামারবাড়ি কিনে রেখেছেন এই দুর্নীতিবাজ লুটেরা প্রকৌশলী। 
এ বিষয়ে আবুল খায়েরের মন্তব্য জানতে তার সাথে ফোনে কয়েকদফা যোগাযোগ করা হলেও কোন রেসপনআস করেনি। এমনকি হোয়াটস্অ্যাপে খুদে বার্তা পাঠিয়েও কোন সাড়া পাওয়া যায়নি।   (ক্রমশঃ)



শেয়ার করুন:
কমেন্ট বক্স
ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ

ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ