বৃহত্তর খুলনা ঘুরে এসে বিশেষ প্রতিবেদক:
খুলনা গণপূর্ত জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী সাইফুর রহমান। ফ্যাসিবাদের প্রেতাত্মা হয়েও রয়ে গেছেন ধরাছোয়ার বাইরে। স্বৈরাচার লীগ সরকারের পুরো সময়ে ছিলেন বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে। ফ্যাসিবাদের মন্ত্রী ড আব্দুর রাজ্জাক, সাবেক গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী শরিফ উদ্দিন আহমেদ, জামালপুরের সাবেক সংসদ সদস্য ও হুইফ মির্জা আজমের প্রভাবে সে সময়ে সহকর্মী প্রকৌশলীদের ওপরে ছড়ি ঘুরিয়েছেন তিনি। ডিপার্টমেন্টের নিয়োগ পোস্টিং পদোন্নতি নিয়ন্ত্রণ করেও সে সময়ে কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে এই প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে। অথচ চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী পদে চলতি দায়িত্বে খুলনার পোস্টিং বাগিয়ে নিয়ে চাকরির শেষ পর্যায়ে এসে ঘুষ পার্সেন্টেজ বাণিজ্যে হয়ে উঠছেন অপ্রতিরোধ্য। তথ্য সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্রের।
বিসিএস ১৮ তম ব্যাচের এই গণপূর্ত প্রকৌশলী ২০২৭ এর এপ্রিলে যাচ্ছেন পিআরএল-এ। সে হিসাবে সাড়ে ৭ মাসেরও কম আছে তার চাকরির সময়। এই পিআরএলকে সামনে রেখে খুলনা জোনের ২টি সার্কেল ১১টি ডিভিশনের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর টেন্ডার ও সিএস অনুমোদন, ভ্যারিয়েশন পাশসহ বিভিন্ন কাজে নির্ধারিত অংকের চেয়েও বেশী অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন ঠিকাদার ও প্রকৌশলীদের কাছ থেকে। সাধারণ ইস্টিমেটগুলো পাশ করতেও এই প্রকৌশলীকে বরাদ্দের ৩%অগ্রীম দিতে হয় ঠিকাদারকে। বর্তমানে এনডিইসহ বড় বড় ঠিকাদারের কেটে দেওয়া বিমান টিকেটে ঢাকা থেকে যশোর হয়ে বিমানে কওে যাতায়াত করার খবর পাওয়া গেছে এই প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে। এ নিয়ে ‘বাঙালি সংবাদ’ এর অনুসন্ধান অব্যাহত আছে। বিস্তারিত থাকছে পরবর্তী যে কোন প্রতিবেদনে।

জোনের অধীনে যশোর ডিভিশনের আওতায় যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে ২৫০ থেকে ৫শ’ শয্যায় উন্নীতকরণ, যশোরে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান অধিদপ্তরের ডিআইজি অফিস নির্মাণ, শার্শা ট্র্যানজিট সেল্টার নির্মাণ, বিটাক অফিস, আনসার ও ভিডিপির অস্ত্রাগার, যশোর সদর থানা বিল্ডিং; খুলনা ১নং গণপূর্ত বিভাগের অধীনে খুলনা জেলা হাসপাতালের অবশিষ্ট নির্মাণ কাজ, জেলা হাসপাতালে ৮ম ও ৯ম তলার এক্সটেনশন, খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারী ইউনিট স্থাপণ, মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ক্যান্সার ইউনিট স্থাপণ ও রুপসা থানা ভবন নির্মাণ: খুলনা ২নং গণপূর্ত বিভাগের অধীনে খূলনা মেট্রোপলিটন সদর থানা ভবন, বয়রা পুলিশ লাইন্স সাবস্টেশন ভবনসহ সাবস্টেশন নির্মাণ, খুলনা আয়কর ভবন ও কেএমপি’র খানজাহান আলী থানা ভবন নির্মাণ কাজ; বাগেরহাট গণপূর্ত বিভাগের অধীনে জেলা মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক সেন্টার নির্মাণ, তথ্য কমপ্লেক্স নির্মাণ, চিতলমারি ও সদর উপজেলা মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কুতিক কেন্দ্র নির্মাণ; সাতক্ষীরা গণপূর্ত বিভাগের আওতায় কালিগঞ্জ ও পাটকেলঘাটা থানা ভবন নির্মাণ, এসপি অফিসের ২য় তলা থেকে ৪র্থ তলা নির্মাণ, তালা ও শ্যামনগর মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নির্মাণ; ঝিনাইদহ গণপূর্ত বিভাগের আওতায় এনএসআই ভবন, জেলা আনসার ও ভিডিপি কমপ্লেক্স নির্মাণ, মহেসপুর টিটিসি নির্মাণ; মাগুরা গণপূর্ত বিভাগের আওতায় জেলা তথ্য কমপ্লেক্স, শালিখা মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও মোহাম্মদপুর থানা ভবন নির্মাণ; নড়াইল গণপূর্ত বিভাগের আওতায় নড়াইল সদর হাসপাতালকে ১০০ শয্যা থেকে ২৫০ শয্যায় উন্নীতকরণ প্রকল্পের বিভিন্ন নির্মাণ কাজ, নতুন সার্কিট হাউজ নির্মাণ কাজ, তোলারামপুর হাইওয়ে থানা ভবন নির্মাণ; কুস্টিয়া গণপূর্ত বিভাগের আওতায় কুস্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বিভিন্ন ধরণের অবশিষ্ট নির্মাণ কাজ, পুলিশ প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ফায়ারিং বেল্ট নির্মাণ, জুলাই শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ; মেহেরপুরে পুলিশ লাইনে ৬তলা ফাউন্ডেশনে ৩তলা অফিসার্স মেস ভবন নির্মাণ, এনএসআই ভবন ও সদর থানা ভবন নির্মাণ এবং চুয়াডাঙ্গা গণপূর্ত বিভাগের আওতায় জুলাই শহীস্মৃতি স্তম্ভ ও দর্শনা থানা ভবন নির্মাণ কাজগুলোতে এই প্রকৌশলীর নেতৃত্বে ব্যাপক অনিয়ম সিডিউল বহির্ভূত নি¤œমাণের নির্মাণ উপকরণ ব্যবহার কাজ না হওয়া সত্ত্বেও অগ্রীম বিলের জন্য সুপারিশ করা, ম্যাজারমেন্ট জালিয়াতিসহ প্রকৌশলগত বিভিন্ন ধরণের জাল-জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়ার তথ্য ও প্রমাণাদি পাওয়া গেছে। বিশেষ করে যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জাারী ইউনিট এবং ক্যান্সার ও কিডনি ডায়ালাইসিস ইউনিট নির্মাণ কাজে ব্যাপক অনিয়ম দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। এ সকল বেশীরভাগ কাজেই আ’লীগের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়া হয়েছে প্রকৌশলী সাইফুর রহমানের নির্দেশে। এ রকম তথ্য জানিয়েছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন নির্বাহী প্রকৌশলী। পাশাপাশি অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তরের যাবতীয় কাজে ব্যাপক অনিয়ম ও রিক্যনতুন কৌশলে হয়রানি করার অভিযোগ রয়েছে।
আরও পড়তে পারেন: অবৈধ সম্পদের পাহাড়ে গণপূর্ত প্রকৌশলী সাইফুর রহমান!
জিকে শামীম কিংবা গোল্ডেন মনিরের মতো কুখ্যাত মাফিয়াদের সাথে পেছনের দরজায় পিরিতি জমানো এই প্রকৌশলীর ঝুলিতে আছে ২৪-এর রক্তাক্ত ছাত্র আন্দোলনে রক্তের হোলি খেলায় অর্থ জুগিয়ে পর্দার আড়াল থেকে কলকাঠি নাড়ার কালো ইতিহাসও। বগুড়ায় বসে সে সময়ে স্থানীয় ছাত্র/যুবলীগকে মোটা অংকের অর্থায়ন করে আন্দোলন দমাতে নেপথ্যে কাজ করেছেন ভদ্রতার লেবাসধারী এই প্রকৌশলী।
আজিমপুরে তৈরি করা তাঁর সেই কুখ্যাত ‘সিন্ডিকেট প্রথা’ আর মাসোহারা ছাড়া ফাইল না ছোঁয়ার বদভ্যাস খুলনাতেও ছড়িয়ে পড়েছে সংক্রামক ব্যাধির মতো; যেখানে উপঢৌকনের মিষ্টি না পৌঁছালে ফাইলের লাল ফিতা আর খোলে না। লুটপাটের এই অন্তহীন মহাযজ্ঞে উপচে পড়েছে তাঁর ভোগের পেয়ালা! ঢাকার প্রাণকেন্দ্র্র মোহাম্মদপুর আর মিরপুরে দাঁড়িয়ে থাকা অট্টালিকা, পূর্বাচলের সোনার হরিণ সমতুল্য প্লট কিংবা ঘাটাইলের রাজকীয় ডুপ্লেক্স প্রাসাদ- সবই এই দুর্নীতিবাজ লুটেরা প্রকৌশলীর রাস্ট্রীয় অর্থ-সম্পদ লুটপাটের ফল।
সালাউদ্দিন সেনানিবাস মোড়ে পেট্রোল পাম্প ভেঙে সোনারতরী পার্ক বানানো কিংবা কাঠবাদাম রেস্টুরেন্টের খোলসে কোটি কোটি টাকার জমি গিলে খাওয়া সাইফুরের নজর দেশ ছাড়িয়ে এখন সুদূর আমেরিকাতেও। স্বজনদের নামে ভাইয়ের মার্কেটে ছায়া ফেলা কিংবা মার্কিন মুলুকে মেয়ের জন্য বিলাসী আবাসন গড়ে তোলার পেছনে যে শতকোটি টাকার রক্তচোষা অর্থ, তার সুতা ঝুলছে এই খুলনা গণপূর্তের টেবিল থেকেই।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে বারবার যোগাযোগ করা হলেও অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. সাইফুর রহমান ফোন রিসিভ না করে কৌশলে এড়িয়ে গেছেন, কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে ইতোপূর্বে হোয়াটস্আ্যাপ ম্যাসেজে তিনি লিখেছেন, ঘাটাইলের সম্পদগুলো পারিবারিক সম্পত্তি ও অন্যান্য বিষয়গুলো মিথ্যা। (ক্রমশ:)