আলমগীর হোসেন আসাদ মাহমুদ:
জাতীয় সংসদ ভবনে সাউন্ড সিষ্টেম বা হেডফোন কেলেঙ্কারীর খলনায়ক সাবেক কুয়েট (খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়) ছাত্রলীগ নেতা প্রকৌশলী আসিফ রহমান নাহিদ এখনো বহাল থাকায় অনেকেই বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। চাকরির শুরু থেকে এই ই/এম প্রকৌশলী ফ্যাসিবাদের জোড়ে ঘুরেফিরে রয়ে গেছেন ঢাকায়। সংসদ এলাকাতেই আছেন প্রায় ৭বছর যাবৎ। তার ছোট ভাই মোহাম্মদ শাওন ছিলো স্বৈরাচারের এমপি সাইফুজ্জামান শেখরের এপিএস। ছোট ভাইয়ের মাধ্যমে ওই আওয়ামী এমপির আশীর্বাদে তিনি প্রথমে গণগূর্ত ই/এম কারখানা বিভাগের ১নং সাবডিভিশন পরবর্তীতে উপবিভাগীয় প্রকৌশলী (এসডিই) ফরহাদুজ্জামান আজাদের সাথে ই/এম উপবিভাগ-১৩’তে পারস্পারিক (ভাইসভারসা) পোষ্টিং নিয়ে সংসদ এলাকাতেই লুটপাটের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখেন। তথ্য সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্রের।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৩ সাল থেকে এই আওয়ামী দুর্বৃত্ত গণপূর্ত ইএম ডিভিশন-৭-এর আওতাধীন ইএম উপ-বিভাগ-১৩-এর সংসদ ভবন এলাকায় এসডিই পদে যোগদান করেন। ফ্যাসিবাদের খুঁটির জোড়ে তখন থেকেই প্রকৌশলী আসিফ রহমান নাহিদ ই/এম বিভাগটির নি¤œমাণের কাজ করানো বেনামে ঠিকাদারী ব্যবসা, নিজেই কাজ উঠনো দায়িত্ব নেওয়া, গোপণ টেন্ডারসহ সকল অপকর্মের হর্তকর্তায় পরিণত হন। গডফাদার সাইফুজ্জামান শিখর পাওয়ারফুল এমপি থাকায় তার নির্দেশে সংশ্লিষ্ট নির্বাহী প্রকৌশলীকে পাশ কাটিয়ে বিভিন্ন কাজের নামে কয়েক কোটি টাকা ভূয়া বিল-ভাউচারে হাতিয়ে নিয়েছেন এই আসিফ রহমান নাহিদ। সে টাকার কিছু অংশ ইতোমধ্যে ছোট ভাইয়ের মাধ্যমে বিদেশে পাঁচার করেছেন। ঢাকায় মোহাম্মদপুর তাজমহল রোডসহ আশেপাশের এলকায় একাধিক বিলাশবহুল স্টুডিও এপার্টমেন্ট কিনেছেন। দেশের বাড়ি মাগুরায় ফিলিং স্টেশনসহ অনেক জমি-জমা ক্রয়ের পাশাপশি নামে-বেনামে বিভিন্ন সহায়-সম্পদ করেছেন। দু’টি নতুন গাড়িও কিনেছেন। প্রশ্ন হলোঃ তিনি কত টাকা বেতন পান? আর স্বৈরাচারের দোসর হয়েও কিভাবে আজ প্রায় ৮বছর যাবৎ ঘুরেফিরে সংসদ ভবনের মত স্পর্শকাতর জায়গায় বহাল থাকেন?

জুলাই বিপ্লবে এসডিই’র অফিস থেকে নগদ দেড়কোটি টাকা খোয়া যায় ও মালামাল চুরির নাটক: ই/এম সাবডিভিশন-১৩ থেকে (সংসদ ভবনের মূল ভবনে এই অফিস) ২০২৪ এর জুলাই বিপ্লবে শেখ হাসিনার পতনের দিনে নগদ দেড় কোটি টাকা খোয়া যায় এসডিই আসিফ রহমান নাহিদের। এই টাকার পুরোটাই ঠিকাদারদের কাছ থেকে আদায় করা কাজ উঠিয়ে দেয়ার নাম করে। সংসদ এলাকায় ইএম অঙ্গে যতো কাজ হয় তার সাব-ঠিকাদার এই প্রকৌশলী নিজেই। একই প্রক্রিয়ায় ই/এম কারখানা উপবিভাগ-১ এ থাকতেও লোপাট করেছেন কয়েক কোটি টাকা। ওই টাকা রিকোভারি দেখানোর জন্য এমএমপি রুমের মূল্যবান কয়েক কোটি টাকার মালামাল রাতের আঁধারে সরিয়ে চুরির নাটক সাজিয়ে উপসহকারী হেলালকে ফাঁসানো হয়। কিন্তু হেলাল ওই সেকশনের দায়িত্বে আসার পূর্বেই মালামালগুলো সরিয়ে ফেলা হয় বলে নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়।
সংসদ ভবনের সাউন্ড সিস্টেম বা ‘হেডফোন কেলেঙ্কারির নায়ক তিনি:
জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা জাতীয় সংসদ ভবনের সাউন্ড সিস্টেম বা ‘হেডফোন কেলেঙ্কারি’ ঘিরে তোলপাড় সৃষ্টি হলেও এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছেন অন্যতম প্রধান অভিযুক্ত এসডিই আসিফ রহমান নাহিদ। গণপূর্ত ইএম ডিভিশন-৭-এর আওতাধীন ইএম উপ-বিভাগ-১৩-এর এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ থাকলেও এক ধরনের ‘অদৃশ্য শক্তির’ প্রভাবে তিনি এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
গত ৫ এপ্রিল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের অষ্টম দিনেও শুরু থেকেই সাউন্ড সিস্টেমে সমস্যা দেখা দেয়। স্পিকার ও সংসদ সদস্যরা একে অপরের বক্তব্য স্পষ্টভাবে শুনতে না পারায় অধিবেশন পরিচালনায় বিঘœ ঘটে। বিকেল সাড়ে ৩টায় স্পিকারের সভাপতিত্বে অধিবেশন শুরু হলেও মাইকে ত্রুটি দেখা দিলে চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি বিষয়টি স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। পরবর্তীতে পরিস্থিতি বিবেচনায় অধিবেশন সাময়িকভাবে স্থগিত ঘোষণা করা হয়।
অনুসন্ধানে আরো জানা গেছে, গত ১২ মার্চ সংসদ ভবনের সাউন্ড সিস্টেম নিয়ে বড় ধরনের কেলেঙ্কারি প্রকাশ পাওয়ার পর নির্বাহী প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেনকে বদলি করা হয়। তবে সংশ্লিষ্টদের দাবি, মাঠ পর্যায়ের কাজের মূল তদারকি ও কারিগরি দায়িত্বে থাকা সত্ত্বেও আসিফ রহমান নাহিদের বিরুদ্ধে কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা এখনও নেওয়া হয়নি, যা অনেকের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ বলে মনে হচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, বিগত সরকারের আমলে এক প্রভাবশালী রাজনৈতিক বলয়ের ছত্রছায়ায় আসিফ রহমান নাহিদ গণপূর্ত বিভাগে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ ও কমিশন বাণিজ্যের মাধ্যমে চাকরির সল্প সময়ে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সহায়-সম্পদ অর্জনের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
এদিকে, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের পরও তার প্রভাব কমেনি বলে অভিযোগ উঠেছে। বরং বর্তমান প্রশাসনের কিছু অসাধু ব্যক্তির সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলে তিনি নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো আড়াল করে রাখছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সংসদ সচিবালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, “সংসদ ভবনের মতো স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার সাউন্ড সিস্টেমে অনিয়মকারীরা কীভাবে এখনো বহাল থাকেন, তা উদ্বেগজনক। এতে জাতীয় নিরাপত্তাও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।”
গণপূর্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাঝেও এ নিয়ে ক্ষোভ বিরাজ করছে। তাদের প্রশ্ন কোন সেই অদৃশ্য শক্তি, যার কারণে এসডিই আসিফ রহমান নাহিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না?
সংশ্লিষ্টদের মতে, সাউন্ড সিস্টেমের ত্রুটিপূর্ণ ক্রয় ও রক্ষণাবেক্ষণের নামে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত হলে প্রকৃত চিত্র বেড়িয়ে আসবে।
এ ঘটনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি উঠেছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও গণপূর্ত অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের কেলেঙ্কারির আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। (ক্রমশঃ)