ঢাকা | বঙ্গাব্দ

সীমান্তের ওপার থেকে টাকা আসছে, দেশে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছে একটি পক্ষ: প্রধানমন্ত্রী

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Oct 20, 2026 ইং
সীমান্তের ওপার থেকে টাকা আসছে, দেশে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছে একটি পক্ষ: প্রধানমন্ত্রী ছবির ক্যাপশন:
ad728
নিজস্ব প্রতিবেদক:
পালিয়ে যাওয়া স্বৈরাচার সীমান্তের ওপার থেকে অর্থ সরবরাহ করছে এবং দেশের ভেতরে একটি পক্ষ সেই অর্থ ব্যবহার করে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ করেছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) বিকেলে রাজশাহীর ঐতিহাসিক মাদ্রাসা মাঠে আয়োজিত জনসভায় তিনি এ অভিযোগ করেন। একই সঙ্গে পদ্মা ও তিস্তা নদীতে ব্যারাজ নির্মাণ, কৃষক কার্ড চালু, খাল খনন, বন্ধ কলকারখানা চালু এবং স্বাস্থ্যসেবার পরিধি বাড়ানোর পরিকল্পনা তুলে ধরেন তিনি।

তারেক রহমান বলেন, দেশের কয়েকটি কলকারখানায় শ্রমিক অসন্তোষ তৈরির চেষ্টা করা হয়েছে বলে গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে। তাঁর দাবি, সীমান্তের ওপার থেকে অর্থ সরবরাহ করে দেশের ভেতরে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা চলছে। এ বিষয়ে দেশবাসীকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, নির্বাচনের আগে কিছু রাজনৈতিক দল বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছে। তাঁর অভিযোগ, এসব দলের সঙ্গে পালিয়ে যাওয়া স্বৈরাচারের যোগসাজশ তৈরি হয়েছে। দেশের অর্থনীতি ও উন্নয়নের অগ্রযাত্রা বাধাগ্রস্ত করার যেকোনো প্রচেষ্টা সম্পর্কে জনগণকে সচেতন থাকার আহ্বান জানান তিনি।

তিনি বলেন, জনগণ শুধু রাজনৈতিক অধিকার নয়, অর্থনৈতিক অধিকার, কর্মসংস্থান ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশও চায়। বিএনপি সরকার দেশে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা, নিরাপত্তা বাড়ানো এবং বেকারত্ব কমাতে কাজ করছে। বন্ধ কলকারখানা চালু, দেশীয় উদ্যোক্তাদের উৎসাহ দেওয়া এবং শ্রমিকদের দক্ষতা বাড়িয়ে দেশে-বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তারেক রহমানের ভাষ্য, কিছু রাজনৈতিক দল অন্যদের সঙ্গে নিয়ে রাজপথে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে এসব উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করছে। এতে ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

ফ্যামিলি কার্ড নিয়ে নির্বাচনের আগে সমালোচনার প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তখন কেউ কেউ বলেছিলেন, ফ্যামিলি কার্ড বন্ধ হলে মা-বোনেরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে, ফ্যামিলি কার্ড, খাল খনন এবং কৃষকদের জন্য কৃষক কার্ড চালু করা হবে কি না।

তিনি বলেন, ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে নারীদের আর্থিক সহায়তা দিয়ে পরিবারকে স্বাবলম্বী করার পরিকল্পনা রয়েছে। পরিবারের মায়েরা যাতে সংসারের অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন, সেই লক্ষ্যেও এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

কৃষকদের সহায়তায় ‘ফার্মার্স কার্ড’ বা কৃষক কার্ড চালুর পরিকল্পনা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, ক্ষুদ্র, মাঝারি, প্রান্তিক, ভূমিহীন ও বড় কৃষকদের তালিকা তৈরির কাজ চলছে। এ বছর সারা দেশে ৪০ লাখ ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকের কাছে কার্ড পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

তিনি বলেন, কৃষক কার্ডের মাধ্যমে কৃষকেরা অন্তত একটি ফসলের জন্য সার, বীজ ও কীটনাশক সহায়তা পাবেন। পাশাপাশি ফসলের বিমা, ব্যাংকঋণ এবং আবহাওয়াসংক্রান্ত তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রেও এ কার্ড সহায়ক হবে। উৎপাদন খরচের চাপ কমিয়ে কৃষকদের সুবিধা দেওয়াই এ উদ্যোগের লক্ষ্য।

কৃষিঋণ মওকুফের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার গঠনের সাত দিনের মধ্যে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এতে সারা দেশের প্রায় ১৩ লাখ কৃষক উপকৃত হয়েছেন বলে জানান তিনি।

আখচাষিদের সহায়তায় রাজশাহী অঞ্চলের ৩৮ হাজার ৯৭০ জন কৃষকের মধ্যে মোট ১২ কোটি টাকা প্রণোদনা বিতরণের কথা তুলে ধরেন তারেক রহমান। জনসভায় মঞ্চ থেকে ল্যাপটপের বোতাম চেপে কৃষকদের ব্যাংক হিসাবে অর্থ পাঠানোর কার্যক্রম উদ্বোধন করেন তিনি। এ সময় ১৫টি সুগার মিল জোনের ১৫ জন কৃষকের হাতে প্রতীকী চেক তুলে দেওয়া হয়।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, কৃষকের কষ্ট কমাতে এবং পরবর্তী মৌসুমে তাঁদের সহায়তা দিতে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে। কৃষক বাঁচলে কৃষিও বাঁচবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

দেশজুড়ে খাল খনন ও নদী সংস্কার কর্মসূচি অব্যাহত রাখার কথা জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, আগামী পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে গত আট মাসে প্রায় ৮০০ কিলোমিটার খননের কাজ শেষ হয়েছে বলে জানান তিনি।

এ কর্মসূচির মাধ্যমে কৃষকেরা সেচের পানি পাবেন এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর বাড়াতে সহায়তা হবে বলে আশা প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী। রাজশাহী অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়ায় যে সংকট তৈরি হয়েছে, খাল খনন ও নদী সংস্কারের মাধ্যমে তা মোকাবিলার চেষ্টা করা হবে বলেও জানান তিনি।

রাজশাহী অঞ্চলের পানিসংকটের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পদ্মা নদীর পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় এ অঞ্চলের মানুষ সমস্যায় পড়ছেন। ভূগর্ভস্থ পানির স্তরও অনেক নিচে নেমে গেছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় পদ্মা ও তিস্তা নদীতে ব্যারাজ নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

তিনি বলেন, ব্যারাজ নির্মাণের কাজ শুরু করে শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। পানিসংকট সমাধানে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। বাংলাদেশের মানুষের পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়েও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, পদ্মা ব্যারাজ নির্মিত হলে রাজশাহীসহ আশপাশের অঞ্চল এবং প্রায় ১৪টি জেলার মানুষ উপকৃত হবেন। নদীর পানির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে কৃষি ও স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

বন্ধ কলকারখানা চালু করে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর পরিকল্পনার কথাও জানান তারেক রহমান। তিনি বলেন, ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে আরও প্রায় ৪৬টি বন্ধ কারখানা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।

এ জন্য দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের উৎসাহিত করা হবে। কারখানাগুলো পুনরায় চালু করা গেলে উৎপাদন বাড়ার পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে বলে জানান তিনি। শ্রমিকদের দক্ষতা বাড়িয়ে দেশে ও বিদেশে কাজের সুযোগ সম্প্রসারণের উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।

স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শয্যাসংখ্যা ১ হাজার ৩০০ থেকে বাড়িয়ে ২ হাজার ৫০০ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
এ ছাড়া আগামী পাঁচ বছরে দেশের প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের শয্যাসংখ্যা ৫০ থেকে বাড়িয়ে ১৫০ করার পরিকল্পনার কথা জানান তিনি। সেখানে নারী ও শিশুদের জন্য পৃথক শয্যা এবং ডায়ালাইসিসের সুবিধা সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে গ্রামের মানুষকে সাধারণ রোগের চিকিৎসার জন্য দূরের জেলা সদর হাসপাতালে যেতে কম ভোগান্তি পোহাতে হবে। জনগণের স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি, কর্মসংস্থান ও পানিসংকট সমাধানে সরকার কাজ করতে চায় বলেও জানান তিনি।

২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নিহত ব্যক্তিদের স্মরণে ঢাকায় স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের কথা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, বিএনপি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ও চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানকে ধারণ করে। জুলাইয়ের শহীদ পরিবারের সদস্যদের কর্মসংস্থান এবং আহত জুলাই যোদ্ধাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, স্মৃতিস্তম্ভ উদ্বোধনের অনুষ্ঠানে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে ধারণ করার কথা বলা রাজনৈতিক দলগুলোকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তাঁর অভিযোগ, সেসব দলের কোনো প্রতিনিধি অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন না। মুখে এক কথা বললেও কাজে তার প্রতিফলন দেখা যায়নি বলে মন্তব্য করেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, একাত্তরের মতো চব্বিশের ঘটনাতেও কিছু রাজনৈতিক দল জনগণকে বিভ্রান্ত করেছে বলে তিনি মনে করেন। এসব দলের বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।
তারেক রহমান বলেন, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, খাল খনন এবং অন্যান্য উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হলে সরকারের ধারাবাহিকতা প্রয়োজন। এসব উদ্যোগ এগিয়ে নিতে আগামী পাঁচ বছরও বিএনপির প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান তিনি।

জনসভায় সরকারের বিভিন্ন পরিকল্পনা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের মানুষের অর্থনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কৃষির উন্নয়ন এবং শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে সরকার কাজ করছে। এসব লক্ষ্য অর্জনে জনগণের সহযোগিতা প্রয়োজন।

রাজশাহীর ঐতিহাসিক মাদ্রাসা মাঠে আয়োজিত জনসভায় সভাপতিত্ব করেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটন।

জনসভায় বক্তব্য দেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু, বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, সংসদ সদস্য আবু সাঈদ চাঁদ, অধ্যাপক নজরুল ইসলাম মণ্ডল ও শফিকুল হক মিলন এবং ঢাকা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নিপুন রায় চৌধুরী।

এ ছাড়া বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) শরীফ উদ্দিন, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহ আলম, ডাক ও টেলিযোগাযোগ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ, বিএনপির শিল্পবিষয়ক সম্পাদক ও সংসদ সদস্য আবুল কালাম, সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য মাহমুদা হাবিবা এবং কৃষক দলের সভাপতি কৃষিবিদ হাসান জাফির তুহিনসহ দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।



শেয়ার করুন:
কমেন্ট বক্স
ছয় মাসে গণমাধ্যমে ৬৮১টি ভুল তথ্য শনাক্ত, কে করল কতটি

ছয় মাসে গণমাধ্যমে ৬৮১টি ভুল তথ্য শনাক্ত, কে করল কতটি