
আসাদ মাহমুদ ও আলমগীর হোসেন:
গণপূর্ত অধিদপ্তরের ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল (ই/এম) বিভাগ-১১-এ মেরামত ও সংরক্ষণ খাতে প্রায় ১০ কোটি টাকার সরকারি অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে ভয়াবহ অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। এই বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শরিফুল ইসলামের বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম দুর্নীতি কমিশন বাণিজ্য ফাইল আটকে রাখা ভুয়া কাজ দেখিয়ে অর্থ উত্তোলন এবং টেন্ডার প্রক্রিয়ায় ডিজিটাল কারসাজির মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। তার এই অনৈতিক কর্মকান্ডের কারণে ভুক্তভোগী সাধারণ ঠিকাদাররা যেমন আর্থিক সংকটে পড়ছেন, তেমনি ব্যাহত হচ্ছে সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ প্রকল্প।
নির্ভরযোগ্য সূত্রের মতে, ই/এম বিভাগ-১১-এর দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই নির্বাহী প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম প্রতিটি প্রকল্পের রানিং ও ফাইনাল বিল অনুমোদনের ক্ষেত্রে মোট বরাদ্দের একটি নির্দিষ্ট অংশ কমিশন হিসেবে দাবি করেন। এটি এখন বিভাগটিতে একটি অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে।
ভুক্তভোগী অসংখ্য সাধারণ ঠিকাদারের অভিযোগ, দাবিকৃত অনৈতিক অর্থ প্রদান না করলে সংশ্লিষ্ট বিলের ফাইল মাসের পর মাস আটকে রাখা হয়। কোনো ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান এই অনৈতিক দাবির প্রতিবাদ করলে তাদের ফাইলে অযৌক্তিক প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি করা হয়। কখনো অতিরিক্ত ব্যাখ্যার অজুহাতে আবার কখনো কৃত্রিম কাগজপত্রের ঘাটতি দেখিয়ে বিলের অনুমোদন প্রক্রিয়া ঝুলিয়ে রাখেন তিনি। এর ফলে শতভাগ কাজ সম্পন্ন করার পরও মাসের পর মাস বিলের টাকা পাচ্ছেন না ঠিকাদাররা।
বিশেষ করে গণপূর্ত অধিদপ্তরের পরিচালন বাজেটে মেরামত ও সংরক্ষণ খাতের অর্থ বরাদ্দে এক ভয়বহ অনিয়মের চিত্র সামনে এসেছে। সরকারি অর্থ বরাদ্দের অফিশিয়াল নথি ও মাঠপর্যায়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ঢাকা মেট্রোপলিটন জোনের অধীন ‘গণপূর্ত ই/এম বিভাগ-১১, ঢাকা’-এর অনুকূলে কয়েক কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও এর বেশীরভাগই কাগজে-কলমে ভূয়া কাজ দেখিয়ে লোপাট করা হয়েছে। সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে মেরামত ও সংরক্ষণ খাতের অধীন ‘৩২৫৮১০৬-আবাসিক ভবন’ কোডে গণপূর্ত ই/এম বিভাগ-১১, ঢাকা-এর অনুকূলে ৭৩টি কাজের বিপরীতে মোট সাত কোটি তেইশ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। এর মধ্যে ১ম ও ২য় কিস্তিতে ৩ কোটি ৬৫ লাখ টাকা এবং ৩য় ও ৪র্থ কিস্তিতে ৩ কোটি ৫৮ লাখ টাকা ছাড় করা হয়।
অন্যদিকে, ‘৩২৫৮১০৭-অনাবাসিক ভবন’ কোডে ৩৮টি কাজের বিপরীতে মোট এক কোটি উনিশ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। যার মধ্যে ১ম ও ২য় কিস্তিতে ৬০ লাখ টাকা এবং ৩য় ও ৪র্থ কিস্তিতে ৫৯ লাখ টাকা বরাদ্দ পায় বিভাগটি। অর্থ্যাৎ, আবাসিক ও অনাবাসিক খাত মিলিয়ে মোট ১১১টি সুনির্দিষ্ট কাজের অনুকূলে এই বিভাগকে সর্বমোট আট কোটি বিয়াল্লিশ লাখ টাকার তহবিল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই বিপুল বরাদ্দের অধিকাংশ অর্থই কোনো বাস্তব কাজ না করে বা অত্যন্ত নিম্নমাণের কাজ দেখিয়ে সিন্ডিকেঁভূক্ত ঠিকাদার ও প্রকৌশলীর মধ্যে নির্দিষ্ট অনুপাতে ভাগ-বাটোয়ারা করা হয়েছে। এই পদ্ধতিকে খোদ সরকারি কর্মকর্তারাও ‘হরিলুটের মহোৎসব’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। গণপূর্ত ই/এম বিভাগ-১১ এর বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শরিফুল ইসলামের বিরুদ্ধে শুধু এই বরাদ্দের অর্থ লোপাটই নয়, ক্ষমতার অপব্যবহার, লাইসেন্সবিহীন বেনামি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেওয়া, ভূয়া মাস্টাররোলে কয়েক কোটি টাকা উত্তোলন এবং টেন্ডার প্রক্রিয়ায় নজিরবিহীন জালিয়াতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগও রয়েছে।
অর্থ বিভাগের কঠোর নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও এই বিভাগটি কোড বহির্ভূত কাজে অর্থ ব্যয় করেছে এবং সরকারি বিধি লঙ্ঘন করে পূর্ববর্তী বছরের ভুয়া বকেয়া পরিশোধ দেখিয়ে নির্দিষ্ট পাসের্নন্টেজের বিনিময়ে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে । যা গৃহায়ন ও গণপূর্ত অধিদপ্তরের জারিকৃত পরিপত্রের পরিপন্থী। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গণপূর্ত অধিদপ্তরের হিসাব শাখার এক কর্মকর্তা জানান, ৩২৫৮১০৬ ও ৩২৫৮১০৭ কোডের অর্থ খরচের প্রধান শর্তই ছিল কাজ শুরুর পূর্বে সুবিধাভোগী সংস্থা বা বাসিন্দাদের প্রাক্কলনপত্রের মাধ্যমে জানানো এবং কাজ শেষে তাদের লিখিত প্রত্যয়নপত্র গ্রহণ করা। কিন্তু গণপূর্ত ই/এম বিভাগ-১১ এর নির্বাহী প্রকৌশলী অধিকাংশ ক্ষেত্রে কোনো ধরণের প্রত্যয়নপত্র ছাড়াই বিল পাস করে টাকা তুলে নিয়েছেন। আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট উপবিভাগীয় প্রকৌশলী (্এসডিই) ও উপসহকারী প্রকৌশলী মিলে ভূয়া বা জাল প্রত্যয়নপত্র তৈরী করে ডান ও বাম হাতে স্বাক্ষর করা সুবিধাভোগীর সিগনেচার দেখিয়ে বিল প্রদান করেছেনন বলে বহু অভিযোগ আছে। বিশেষ করে বঙ্গভবন ই/এম সাবডিভিশনের এসডিই আনোয়ারুল ইসলাম মজুমদারের বিরুদ্ধে এই ধরণের জালিয়াতির অভিযোগ বেশী। এছাড়াও তার বিরুদ্ধে এডভান্স কাজের নামে মোটা অংকের পার্সেন্টেজের বিনিময়ে নির্দিষ্ট সিন্ডিকেট পরিচালনার অভিযোগ বহু পুরনো। বছরের পর বছর এমনকি যুগ যুগ ধরে এখানে ৩/৪টি প্রতিষ্ঠান ঘুরেফিরে কাজ করছে। এ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে উর্দ্ধতন মহলে অভিযোগ করা হলেও দুর্নীতিবাজ প্রকৌশলীদের খোড়া অজুহাতের কারণে ওই সিন্ডিকেট আর ভাঙ্গা যায়নি কোন সরকারের আমলেই। এ বিষয়ে বিস্তারিত থাকছে পরবর্তীতে।

বঙ্গভবন ও মুন্সিগঞ্জ ই/এম এসডিই আনোয়ারুল ইসলাম মজুমদার ও আমিরুল ইসলাম
অনেক সরকারি কোয়ার্টারের বাসিন্দা ও অনাবাসিক ভবনের কর্মকর্তারা লিখিতভাবে জানিয়েছেন তাদের ভবনগুলোতে গত এক বছরে কোনো ধরণের বৈদ্যুতিক তার পরিবর্তন, পাম্প মেরামত বা জেনারেটরের কাজ করা হয়নি। অথচ নথিপত্রে কয়েক কোটি টাকার কাজ শতভাগ বাস্তাবয়ন দেখিয়ে ভুয়া ভাউচার তৈরি করা হয়েছে। এই দুর্নীতির তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বরাবর একজন প্রথম শ্রেণীর ঠিকাদার একটি আনুষ্ঠানিক লিখিত অভিযোগ করেছেন। ওই অভিযোগের বরাত দিয়ে জানা গেছে, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় নজিরবিহীন কারচুপি ও জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে গণপূর্তের কোনো বৈধ লাইসেন্স ও পূর্ব-অভিজ্ঞতা নেই এমন অসংখ্য বেনামি ও ছদ্মবেশী প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। যার নেপথ্যে স্বয়ং নির্বাহী প্রকৌশলী জড়িত।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে গণপূর্ত ই/এম বিভাগ-১১, ঢাকা-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শরিফুল ইসলামকে একাধিকবার ফোন দেওয়া হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। তাছাড়া গত সপ্তাহে বহুবার তার অফিসে সরাসরি গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি।
তবে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী কার্যালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, গণপূর্ত ই/এম বিভাগ-১১ এর নির্বাহী প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের সুনির্দিষ্ট বেশ কয়েকটি লিখিত অভিযোগ আমাদের দপ্তরে জমা পড়েছে। আমরা বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখছি এবং তদন্তে জালিয়াতি প্রমাণিত হলে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। (ক্রমশঃ)