অনলাইন ডেস্ক:
আলোচনার পর যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের মধ্যে বেসামরিক পারমাণবিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার এক দিনের মধ্যেই নতুন শর্ত জুড়ে দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, চুক্তি কার্যকর করতে হলে সৌদি আরবকে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার লক্ষ্যে গঠিত আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে যোগ দিতে হবে। একই সঙ্গে সৌদি আরবকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অনুমতি দেওয়া হবে না বলেও জানিয়েছেন তিনি। ফলে বহুদিনের আলোচিত চুক্তিটি নতুন করে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয় বুধবার ওয়াশিংটনে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সদর দপ্তরে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে। মঞ্চে ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের জাতীয় পতাকা। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকলেও সৌদি আরবের জ্বালানিমন্ত্রী রিয়াদ থেকে ভিডিও কনফারেন্সে যুক্ত হন।
দুই দেশের মধ্যে পারমাণবিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা চলছিল প্রায় দুই দশক ধরে। গত বছরের অক্টোবরে দুই দেশের জ্বালানিমন্ত্রীরা এ বিষয়ে প্রাথমিক সমঝোতায় পৌঁছানোর কথা জানিয়েছিলেন। তবে কংগ্রেসের অনুমোদন, ইরান যুদ্ধ নিয়ে উদ্বেগ এবং চুক্তির শর্ত নিয়ে মতবিরোধের কারণে চূড়ান্ত অনুমোদন পেতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়।
চুক্তি স্বাক্ষরের পরদিন বৃহস্পতিবার সকালে ট্রাম্প তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে নতুন শর্তের কথা জানান। তিনি বলেন, সৌদি আরবকে অবশ্যই আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে যোগ দিতে হবে। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে করা এই উদ্যোগের মাধ্যমে কয়েকটি আরব দেশ ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করেছিল।
চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ইস্যুও। সিএনএন জানিয়েছে, চুক্তির সম্ভাব্য শর্তে সৌদি আরবকে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে নিজ ভূখণ্ডে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি ছিল। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার অতিরিক্ত পরিদর্শন ব্যবস্থায় সৌদি আরবকে বাধ্যতামূলকভাবে যুক্ত না করার বিষয়টিও বিশেষজ্ঞদের উদ্বিগ্ন করেছিল।
পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধবিষয়ক বিশেষজ্ঞদের একাংশের আশঙ্কা, এ ধরনের সুযোগ ভবিষ্যতে সৌদি আরবের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা বাড়াতে পারে। তবে চুক্তির সমর্থকদের যুক্তি, সৌদি আরব যেকোনোভাবেই নিজস্ব পারমাণবিক কর্মসূচি গড়ে তুলতে চায়। যুক্তরাষ্ট্র এতে অংশীদার হলে দেশটির নিরাপত্তা ও পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর ওয়াশিংটনের কিছুটা প্রভাব থাকবে। অন্যথায় চীন বা রাশিয়া সেই সুযোগ নিতে পারে।
চুক্তি ঘোষণার পর ট্রাম্পের অবস্থান বদলের পেছনে হোয়াইট হাউস ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয়হীনতা বড় ভূমিকা রেখেছে বলে সিএনএনকে জানিয়েছে বিষয়টি সম্পর্কে অবগত সূত্রগুলো। তাদের দাবি, জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট ট্রাম্পকে না জানিয়েই চুক্তি ঘোষণার অনুষ্ঠান আয়োজন করেন। হোয়াইট হাউস চেয়েছিল, বুধবার চুক্তির ঘোষণা না দেওয়া হোক। কিন্তু সেই অনুরোধ উপেক্ষা করে অনুষ্ঠান চালিয়ে যায় জ্বালানি মন্ত্রণালয়।
ট্রাম্প প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তার মতে, প্রয়োজনীয় নথিপত্র কংগ্রেসে পাঠানো না হওয়ায় চুক্তিটি তখনো পুরোপুরি চূড়ান্ত হয়নি। ফলে আনুষ্ঠানিক ঘোষণার পর প্রেসিডেন্ট ও তাঁর জ্যেষ্ঠ সহযোগীরা ক্ষুব্ধ হন বলে সূত্রগুলোর দাবি।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র টেইলর রজার্স বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের মধ্যে যে বেসামরিক পারমাণবিক চুক্তি হচ্ছে, তা সৌদি আরবের আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে যোগ দেওয়ার ওপর নির্ভরশীল। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জ্বালানি দল এ ব্যাপারে পুরোপুরি একমত।”
তবে জ্বালানি মন্ত্রণালয় হোয়াইট হাউসের সঙ্গে সমন্বয়হীনতার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বেন ডিটারিখ বলেন, আলোচনা থেকে শুরু করে চুক্তি ঘোষণার প্রতিটি ধাপেই হোয়াইট হাউস ও পররাষ্ট্র দপ্তরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সমন্বয় করা হয়েছে। ভিন্ন কোনো দাবি সত্য নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
ট্রাম্পের অবস্থান বদলের সময়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে মার্কিন রক্ষণশীল সংবাদমাধ্যমগুলোর সমালোচনার কারণে। ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত ফক্স নিউজ এবং রক্ষণশীল দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের সম্পাদকীয়তে প্রশ্ন তোলা হয়, ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার কোনো শর্ত ছাড়াই সৌদি আরবকে কেন এমন সুবিধা দেওয়া হচ্ছে।
দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের সম্পাদকীয় বোর্ড লিখেছে, বাইডেন প্রশাসনও সৌদি আরবকে বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়েছিল। তবে তার বিনিময়ে রিয়াদকে আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে যোগ দেওয়ার শর্ত দেওয়া হয়েছিল। ফক্স নিউজের উপস্থাপক ব্রায়ান কিলমিডও একই প্রশ্ন তোলেন।
সিএনএনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সকালে ফক্স নিউজে এ নিয়ে আলোচনা হওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সৌদি আরবের জন্য আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে যোগ দেওয়ার শর্ত পুনর্ব্যক্ত করেন। বিষয়টি ট্রাম্পের সিদ্ধান্তে রক্ষণশীল গণমাধ্যমের প্রভাবের প্রশ্নও সামনে এনেছে।
এদিকে চুক্তিতে নতুন শর্ত যুক্ত করার পেছনে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। ইসরায়েলের দুটি সূত্র সিএনএনকে জানিয়েছে, নেতানিয়াহু চেয়েছিলেন সৌদি আরবের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তিতে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার শর্ত যুক্ত করা হোক।
তবে হোয়াইট হাউস এ বিষয়ে নেতানিয়াহুর হস্তক্ষেপের কথা অস্বীকার করেছে। প্রেস সচিব ক্যারোলিন লেভিট বলেছেন, ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মধ্যে এ বিষয়ে কোনো কথা হয়েছে বলে তিনি জানেন না। তাঁর দাবি, সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিষয়টি ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের অবস্থান।
চুক্তি নিয়ে বিতর্কের আরেকটি দিক হলো, ট্রাম্প সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে নতুন শর্ত ঘোষণার আগে বা পরে কথা বলেননি বলে হোয়াইট হাউস জানিয়েছে। তবে লেভিট বলেছেন, অতীতের বিভিন্ন বৈঠকে ট্রাম্প সৌদি নেতৃত্বের কাছে আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে যোগ দেওয়ার বিষয়টি সরাসরি তুলে ধরেছেন।
সব মিলিয়ে, বুধবারের জাঁকজমকপূর্ণ স্বাক্ষর অনুষ্ঠান থেকে বৃহস্পতিবারের নতুন শর্ত, হোয়াইট হাউস ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের পাল্টাপাল্টি বক্তব্য এবং রক্ষণশীল গণমাধ্যমের চাপ, সবকিছু মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের বহুপ্রতীক্ষিত পারমাণবিক চুক্তি এখন নতুন রাজনৈতিক দরকষাকষির মধ্যে ঢুকে পড়েছে। ট্রাম্পের নতুন শর্ত মেনে রিয়াদ কী অবস্থান নেয়, তার ওপরই চুক্তিটির ভবিষ্যৎ অনেকটা নির্ভর করছে।