প্রিন্ট এর তারিখঃ Aug 3, 2026 ইং || প্রকাশের তারিখঃ Aug 3, 2026 ইং
প্রকৌশলী আউয়ালের দুর্নীতিতে বিপর্যস্ত জনস্বাস্থ্য!

বিশেষ প্রতিনিধি:
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর রুটিন দায়িত্বে নিয়োজিত মো. আব্দুল আউয়ালের বিরুদ্ধে ঠিকাদারি ব্যবসায় পরোক্ষ সম্পৃক্ততা ও গোপণ টেন্ডার বাণিজ্যের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, তিনি নিজে সরাসরি ঠিকাদারি না করলেও কথিত এক ‘ভাতিজা’ ও ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের মাধ্যমে প্রকল্পের দরপত্র, কাজের অনুমোদন ও বিল উত্তোলনের পুরো প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করেন। এই অভিযোগের মধ্যেই গত বছরের ১৭ নভেম্বর জ্যেষ্ঠতা তালিকায় তার আগে থাকা অন্তত ২৬ জন কর্মকর্তাকে ডিঙ্গিয়ে তাকে টেনেতুলে শীর্ষপদে বসানো হয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঠিকাদারি সম্পৃক্ততার এই ধারা অব্যাহত থাকার পেছনে শীর্ষ পর্যায়ের প্রভাবই মূল কারণ। বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অনুসন্ধান শুরু করেছে। তথ্য সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্রের।
অধিদপ্তরের নথি অনুযায়ী প্রকৌশলী আব্দুল আউয়াল ১৯৯৮ সালের ৫ মার্চ জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের একটি প্রকল্পে যোগ দেন। ২০০৬ সালে রাজস্বখাতে আত্মীকৃত হয়ে ২০১৩ সালে তিনি চাকরিতে নিয়মিত হন।
অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, জ্যেষ্ঠতা ও যোগ্যতা উপেক্ষা করে শীর্ষে বসানো হলে পুরো প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম দুর্নীতির সিন্ডিকেট আরো শক্তিশালী হয়। তাদের দাবি, টেন্ডার অনুমোদন, বিল উত্তোলন, ফান্ড ডিজবারসমেন্ট ও পোষ্টিং পদোন্নতি এখন একটি নির্দিষ্ট সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। ওই প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ঠিকাদারি ব্যবসায় পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ।
নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি, কথিত এক ‘ভাতিজা’কে সামনে রেখে তিনি ব্যবসা পরিচালনা করছেন। হুমায়ুন কবীর নামে এক ব্যক্তি নূর ট্রেডার্সসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ময়মনসিংহের ফুলপুরসহ একাধিক উপজেলায় কাজ করছেন। নথিপত্রে ঠিকাদার অন্য কেউ হলেও দরপত্র তৈরি, কাজের অনুমোদন ও বিল উত্তোলনের পুরো প্রক্রিয়ায় আব্দুল আউয়ালের প্রভাব রয়েছে বলে অভিযোগকারীরা জানান। ময়মনসিংহে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালনকালে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলির ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায় এবং পেনশন ও পিআরএলের কাগজপত্র অনুমোদনে ১ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে প্রকৌশলী আউয়ালের বিরুদ্ধে। এই অভিযোগের জবাবে প্রধান প্রকৌশলী মো. আব্দুল আউয়ালের সাথে কয়েকদফা যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। এমনকি ফোনেও তাকে পিক করা সম্ভব হয়নি।
এই লুটেরা কর্মকর্তা নরসিংদীতে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে প্রায় ১ কোটি ২৭ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে তদন্ত কমিটি গঠনের কথা জানা যায়। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের অর্থায়নে নরসিংদী পৌরসভার সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট ও পাইপলাইন নির্মাণ প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম ও অদক্ষতার অভিযোগ ওঠে। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর বিশেষ টিম গঠন করে অসম্পূর্ণ কাজ শেষ করতে হয়। নরসিংদী ও কিশোরগঞ্জে দরপত্রের কাগজপত্রে কারসাজি ও ক্রয় প্রক্রিয়ায় সরাসরি হস্তক্ষেপের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এসব বিষয়ে অডিট আপত্তি উঠেছে বলে সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়।
ময়মনসিংহ সদর উপজেলার গ্রামীণ পানি সরবরাহ উন্নয়ন প্রকল্পে প্রায় শত কোটি টাকা ব্যয় হলেও কাজের গুণগতমান ও মাঠ পর্যায়ের বাস্তবায়ন নিয়ে বহু অভিযোগ রয়েছে। ত্রিশাল উপজেলার স্যানিটেশন সুবিধা সম্প্রসারণ প্রকল্পে প্রায় ১৮ কোটি টাকা ব্যয়ের বিপরীতে কাজের অগ্রগতি ও মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। গৌরীপুর পৌরসভায় পানি সরবরাহের দুটি প্রকল্পে প্রায় পাঁচ কোটি টাকা ব্যয় হলেও শহরবাসীর পানির সংকট কাটেনি। প্রথম ধাপে ২ কোটি ৭ লাখ ১৩ হাজার ৫৯০ টাকা এবং দ্বিতীয় ধাপে ২ কোটি ৮৬ লাখ ৭ হাজার ৯২০ টাকা ব্যয় করা হয় ওই প্রকল্পে। স্থানীয়রা বলছেন, এতো অর্থ ব্যয়ের পরও পানি সরবরাহ ব্যবস্থা কার্যকর হয়নি। সবচেয়ে আলোচিত হয়েছে নোয়াখালীর নিলাম কেলেঙ্কারি নিয়ে। ডানিডা অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন একটি প্রকল্পের প্রায় ৫ কোটি ৫৫ লাখ টাকা মূল্যের পাইপ ও নির্মাণসামগ্রী মাত্র ১৮ লাখ ৮৫ হাজার টাকায় গোপণ নিলামে বিক্রি করা হয় বলে অভিযোগ আছে। অধিকাংশ ঠিকাদার নিলামের খবর না জানায় প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের সুযোগ তৈরি হয়নি ওই নিলামে। পরে মেসার্স শাহনাজ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে এসব মালামাল পানির মূল্যে বিক্রি করা হয়। নোয়াখালীর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাইফুল ইসলাম গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, তিনি নিজে কোনো নিলাম দেননি এবং নিলাম প্রক্রিয়া ঢাকা থেকে পরিচালিত হয়েছে। এই বক্তব্যের পর নিলামের প্রকৃত নিয়ন্ত্রক কারা ছিলেন তা নিয়ে সর্বমহলে প্রশ্ন উঠেছে। একাধিক ঠিকাদার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ময়মনসিংহ ও আশপাশের এলাকায় কাজ পেতে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের মাধ্যমে যেতে হয়। এক ঠিকাদার বলেন, “কাগজে আমরা ঠিকাদার হলেও অনেক সময় দরপত্র ও বিল প্রক্রিয়ায় উচ্চ পর্যায়ের প্রভাব দেখা যায়। যারা ঘনিষ্ঠ তারা সহজে কাজ পান।” আরেক ঠিকাদার দাবি করেন, “আমি নিজে কোনো চাপের মুখে পড়িনি, তবে শুনেছি কিছু প্রতিষ্ঠানকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।” নূর ট্রেডার্সের সঙ্গে যুক্ত এক ব্যক্তি অবশ্য বলেন, “আমরা নিয়ম মেনেই কাজ করি। কোনো অনিয়মের সঙ্গে জড়িত নই।” অভিযোগ রয়েছে, কাড়ি কাড়ি টাকার বিনিময়ে পছন্দের জুনিয়র কর্মকর্তাদের নিয়মবহির্ভূতভাবে নির্বাহী প্রকৌশলী ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি দেওয়ার চেষ্টা চলছে। বেতন নির্ধারণ ও গ্রেড সংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগও উঠেছে। ১৯৯৮ সালে প্রকল্পে যোগদানের পর ২০০৬ সালে রাজস্ব খাতে আসার আগেই বিভিন্ন সময়ে উচ্চতর গ্রেডে বেতন উত্তোলনের বিষয়টি যাচাইয়ের দাবি উঠেছে।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর দেশের নিরাপদ পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার মূল দায়িত্বে নিয়োজিত। ঠিকাদারি সম্পৃক্ততা, টেন্ডার বাণিজ্য ও প্রকল্পে অনিয়ম অব্যাহত থাকলে জনগণের মৌলিক সেবা ক্ষতিগ্রস্থ হয়। দুদক ইতোমধ্যে এসব অভিযোগ অনুসন্ধান শুরু করেছে বলে জানা গেছে। অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে নোয়াখালীর নিলাম প্রক্রিয়া, ময়মনসিংহ ও নরসিংদীর প্রকল্প, টেন্ডার অনুমোদন ব্যবস্থা, জ্যেষ্ঠতা তালিকা এবং সাম্প্রতিক পদোন্নতি প্রক্রিয়া পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা না হলে এই দুর্নীতির চক্র আরও শক্তিশালী হবে বলে মনে করছেন তারা। (ক্রমশঃ)
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ বাঙালি সংবাদ