
নিজস্ব প্রতিবেদক:
বরিশাল বিভাগের প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক (ডিডি) নিলুফার ইয়াসমিনের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার অপব্যবহার, আর্থিক অনিয়ম, বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও কিন্ডারগার্টেন অনুমোদন, শিক্ষকদের পিটিআই বিএড এমএড প্রশিক্ষণের অনুমোদন, সরকারি সম্পদের ব্যক্তিগত ব্যবহার, ঘুষ গ্রহণ, বদলি বাণিজ্য, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পিআরএল/ল্যাম্পগ্র্যান্ট অনুমোদন, কর্মকর্তা ও প্রধান শিক্ষকদের জিপিএফ থেকে ঋণ অনুমোদন, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের স্থায়ী বা নিয়মিতকরণ কাজে মোটা অংকের ঘুষ আদায়, অভিযুক্ত শিক্ষ কর্মকর্তা-কর্মচারিদেরকে ডেকে পাঠিয়ে টাকা আদায় এবং প্রশাসনিক বিধি লঙ্ঘনের মতো বহু গুরুতর অনিয়ম দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এসব অভিযোগের পরও তিনি বহালতবিয়তে থেকে শিক্ষক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপরে নীপিড়ন শোষণ অত্যাচার নির্যাতনের ষ্টিমরোলার চালিয়ে আসছেন। এমনকি অতীতে এই দস্যুরানীর বদলির আদেশ কার্যকর না হওয়ায় অত্যাচার নির্যাতনের মাত্রা বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছেন। তথ্য সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্রের।
শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের একাংশের অভিযোগ, বিষয়গুলো নিয়ে বিভিন্ন সময়ে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে বরিশোল বিভাগের প্রাথমিক শিক্ষক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে এক ধরণের ভীতি ও অনিশ্চয়তার পরিবেশ তৈরি হয়েছে বলে তারা দাবি করছেন।
ফ্যাসিস্ট স্বৈরাচার শেখ হাসিনা সরকারের আমলের উপজেলা চেয়ারম্যান স্বামীর ক্ষমতা দেখিয়ে নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বেচ্চাচারিতা এবং ক্ষমতার অপব্যাবহার করেও পার পেয়ে গেছেন এই ডিডি নিলুফার ইয়াসমিন। ফ্যাসিষ্ট আমলে উপজেলা চেয়ারম্যান স্বামীর ক্ষমতার অবৈধ ব্যবহার আর পাঁচ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর এক অদৃশ্য শক্তির রহস্যজনক দাপটে একইভাবে অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বেচ্চাচারিতা করে যাচ্ছেন তিনি। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর কিংবা প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনাকেও তিনি থোরাই কেয়ার করছেন। মহা ক্ষমতাধর এই কর্মকর্তা হলেন প্রাথমিক শিক্ষার বরিশাল বিভাগের উপ-পরিচালক ঘুষের রানী দস্যুরানী নিলুফার ইয়সামিন।
জানা গেছে, স্বৈরাচার হাসিনার আমলে ২০১৯ সাল থেকে ২০২৪ সালের জুন মাস পর্যন্ত মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলা চেয়ারম্যান ও আ’লীগ নেতা আবু আব্দুল্লাহেল কাফীর স্ত্রী নিলুফার ইয়সামিন। উপজেলা চেয়ারম্যান ও আ’লীগ নেতা স্বামীর প্রভাবে দুর্নীতি-অপকর্ম ও অনিয়ম করা যেন নিয়মে পরিণত করেছিলেন তিনি। স্বামীর প্রভাব কাজে লাগিয়ে ২০২২ সালের ৩১ আগস্ট বরিশাল বিভাগের বিভাগীয় ডিডি পদে পোষ্টিং বাগিয়ে নেন।
বদলির আদেশ জারি হলেও কার্যকর হয়নি:
৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকার দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেলে শিক্ষক-কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের পক্ষ থেকে একাধিক অভিযোগ পরে তার বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগ আমলে নিয়ে গত ২ অক্টোবর ২০২৪ প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় নিলুফার ইয়াসমিনকে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে বদলি করে প্রজ্ঞাপণ জারি করে। এই প্রজ্ঞাপণ অবিলম্বে কার্যকর হবে বলে উল্লেখ করা হলেও মন্ত্রণালয়ের ওই আদেশের প্রতি কর্ণপাত না করে প্রাথমিকের বরিশাল বিভাগীয় অফিসেই কর্মরত থাকেন তিনি। মন্ত্রণালয়ের আদেশ অমান্য করে কর্মস্থল থেকে অবমুক্ত না হওয়ায় গত ৯ অক্টোবর ২০২৪ তাকে বরিশাল বিভাগীয় অফিস থেকে কর্মবিমুক্ত (রিলিজ) করে অফিস আদেশ জারি করে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর।
জানা গেছে, মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপণ ও প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের আদেশ অমান্য করে এক অদৃশ্য শক্তির প্রভাবে বর্তমান কর্মস্থল থেকেই তিনি মন্ত্রণালয়ের ২ অক্টোবর ২০২৪ তার বদলির আদেশ বাতিল করিয়ে প্রজ্ঞাপণ জারি করান। শত অভিযোগ থাকা এই কর্মকর্তার বদলিতে বরিশাল বিভাগের প্রাথমিক শিক্ষক-কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরে আসলেও বদলি বাতিল হওয়ায় চরম হতাশ হন তারা।
যত অপকর্ম: নিলুফার ইয়াসমিন বিভাগীয় প্রাথমিক শিক্ষা অফিস ভবনের ৩য় তলায় অবস্থিত গেস্ট হাউজে পরিবার নিয়ে ১ বছরের অধিক সময় ধরে বসবাস করে আসছেন। সেখানে মিটিং রুম থেকে ২টি এসি খুলে সেট করেছেন। এর জন্য প্রতিমাসে প্রচুর বিদ্যুত বিল সরকারিভাবে পরিশোধও করা হচ্ছে। তিনি গেস্ট হাউস ব্যবহারের ফলে ঢাকা থেকে আসা অতিথি এবং বিভাগের বিভিন্ন জেলা, উপজেলা থেকে প্রশিক্ষণে বা সভায় অংশগ্রহণের জন্য আসা কর্মকর্তাগণ নিজস্ব গেস্ট হাউজে অবস্থান করতে না পেরে বাধ্য হয়ে বাইরের হোটেলে বা অন্য কোন দপ্তরের গেস্ট হাউজে অবস্থান করতে বাধ্য হন। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সিনিয়র সিস্টেম এনালিস্ট অনুজ কুমার, সহকারি পরিচালক কবির উদ্দিন, এনামুল হক, ইঞ্জিনিয়ার সাইদুর রহমান সম্প্রতি ধান গবেষণার রেস্ট হাউজে এবং নিরঞ্জন রায় পাবলিক হেলথ এর রেস্ট হাউজে অধিদপ্তরের কাজে গিয়ে থাকতে বাধ্য হয়েছেন। তিনি পুরো পরিবার নিয়ে কোয়ার্টারের মতো বসবাস করলেও অদ্যাবধি কোন ভাড়া পরিশোধ করেননি।
সরকারি অফিস সময় না মানার অভিযোগ:
পবিত্র রমজান মাস বাদে সরকারি অফিস টাইম সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা হলেও নিলুফার ইয়াসামিন রেস্ট হাউজ থেকে অফিস কক্ষে নামেন দুপুর ১২ টায় এবং আবার রেস্ট হাউজে ফিরে যান দুপুর ১টায়। এর পর বিকেল চার টায় অফিসে এসে রাত ৭ টা থেকে ৮ টা পর্যন্ত অফিস করেন তিনি।
অফিসে আসা কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা জানান, ‘আমি বিভাগীয় অফিসে এসে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকতে হয়। তিনি যখন রেস্ট হাউজ থেকে অফিসে আসেন তখন স্বাক্ষাৎ পাওয়া যায় না। নামলে সাক্ষাৎ না করেই ফিরে যেতে হয়।’ এদিকে একজন মহিলা কর্মকর্তার সঙ্গে রাত ৮টা পর্যন্ত অফিস সময়ের পরে অফিস কক্ষে অবস্থান করা সকল কর্মকর্তা/কর্মচারীর জন্য বিব্রতকর ও বিরক্তিকর হলেও তার ভয়ে কেউ কিছু বলতে পারেন না। অনেকেই কাঙ্খিত সেবা থেকে বঞ্চিত হন। তিনি সময় মতো অফিসে থাকেন না বিধায় উপস্থিত কর্মকর্তা-কর্মচারিদেরকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়।
আর্থিক যত অনিয়ম:
২০২২-২৩ অর্থবছরের অফিস আনুষাঙ্গিক ও অন্যান্য বরাদ্দ বাবদ অফিসের কোন মালামাল ক্রয় করা না হলেও ভূয়া বিল-ভাউচার করে সব টাকা উত্তোলন করে আত্মসাৎ করেছেন তিনি। একই অর্থ বছরে অফিসের রুটিন মেইনটেনেন্সের জন্য বরাদ্দকৃত ৫০ হাজার টাকার কোন কাজ না করে ভূয়া বিল-ভাউচার করে সব টাকা উত্তোলন করে আত্মসাত করেছেন।
২০২২ সালে তিনি যোগদানের পর থেকে যত প্রশিক্ষণ হয়েছে তাতে যে ভেন্যু ভাড়া বাবদ বরাদ্দ ছিল তা তিনি পরিশোধ না করে সমুদয় টাকা আত্মসাৎ করেছেন । ২০২২ সাল থেকে সকল প্রশিক্ষণ পিটিআইতে অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে কোন ভাড়া পরিশোধ করা হয়নি। এডুকেশন ইন ইমার্জেন্সি প্রোগ্রামে স্বয়ং প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক উপস্থিত ছিলেন। প্রোগ্রামটি পিটিআইয়ের একটি সাধারণ কক্ষে অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত প্রোগ্রামটির ৩০ হাজার টাকা ভেন্যু ভাড়া ছিল। এর পুরোটাই তিনি খরচ না করে আত্মসাৎ করছেন। প্রোগ্রামটিতে প্রশাসনিক ব্যয় ৩৫০০ টাকা বরাদ্দ থাকলেও তিনি ৮০০০ টাকা ব্যয় দেখিয়ে এসওই দাখিল করেছেন । এখানে ৫০০০ টাকা আত্মসাৎ করেছেন। প্রোগ্রামটিতে ডিপিইও’কে সভাপতি এবং ডিডি অফিসের শিক্ষা অফিসারকে কোর্স সমন্বয়ক করার নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও তিনি তা না করে নিজে সভাপতি এবং ডিপিইওকে কোর্স সমন্বয়ক করে সম্মানী বিতরণ করেছেন। তিনি শিক্ষা অফিসারকে কোন সম্মানী প্রদান করেননি।
ঘুষ ছাড়া ফাইল নড়ে না এমন বহু গুরুতর অভিযোগ:
৫ আগস্ট শেখ হাসিনা পালানোর পরে ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবসের কোন অনুষ্ঠান করা না হলেও বরাদ্দের সব টাকা আত্মসাত করেছেন তিনি। শিক্ষা পদক সংক্রান্ত বিভাগীয় বাছাই সম্পন্ন করে অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সনদ ও পুরস্কার বিতরণের নির্দেশনা থাকলেও তিনি তা না করে বরাদ্দকৃত টাকা আত্মসাত করেছেন। ২০২২ ও ২০২৩ সালে কম্পিউটার থেকে সনদপত্র প্রিন্ট করে প্রদান করেছেন। কোন অনুষ্ঠান করেননি। প্রথম স্থান অধিকারীদের কেউ কেউ অফিসে এসে অথবা সংশ্লিষ্ট জেলা বা উপজেলা অফিস থেকে সনদ সংগ্রহ করেছেন। অনুষ্ঠান না করেও বিল করে করেছেন অর্থ আত্মসাৎ।
২০২২ ও ২০২৩ সালে জাতীয় পর্যায়ে ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় ঢাকায় উপস্থিত না থেকেও ঢাকা ভ্রমণের জন্য টিএ বিল উত্তোলন করেন। ২০২২ সালে ১৫ দিন শ্রান্তি বিনোদন ছুটির সাথে অবৈধভাবে আরো প্রায় ১৫ দিন অফিস করেননি। এক মাস অফিসের গাড়ীটি না চললেও ওই মাসে জ্বালানী বাবদ সমুদয় অর্থ উত্তোলন করে আত্মসাৎ করেন তিনি।
সরকারি অফিসকে পারিবারিক সম্পত্তি রুপে ব্যবহার :
অফিসের গাড়িটি তিনি তার ছেলে-মেয়েদের স্কুল ও কোচিংয়ে আনা নেওয়ার কাজে ব্যবহার করেন। প্রতিদিন কমপক্ষে ৬ থেকে ৮ বার তার ছেলে-মেয়েকে স্কুলে ও কোচিংয়ে আনা নেওয়া করা হয়। সরকারি অফিসের এই গাড়ির চালককে এসব কাজে বাধ্য করেন তিনি। কোন জেলা বা উপজেলায় পরিদর্শনে গেলে পিটিআই বা ডিপিইও অফিসের গাড়ি ব্যবহার করেন এই গুণধর দস্যুরানী। অথচ জ্বালানী তেল পুরাটাই উত্তোলন করে খরচ দেখান। গত ২০২৪ সালের ১৫ নভেম্বর নেছারাবাদ উপজেলা পরিদর্শনের জন্য ওই শিক্ষা অফিসারকে দিয়ে গাড়ি ভাড়া করিয়েছেন।
তিনি অফিসের ২ জন অফিস সহায়ক, নৈশ প্রহরী, পরিচ্ছন্ন কর্মী, চালক এবং অফিস সহকারি কাম কম্পিউটার অপারেটর শাহ আলমকে তার ছেলে মেয়েদের স্কুল ও কোচিংয়ে আনা নেওয়া এবং ব্যক্তিগত বিভিন্ন কাজে সারাক্ষণ ব্যস্ত রাখেন। সে কারণে অফিসের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয় । তার ব্যক্তিগত হীনস্বার্থ হাসিলের জন্য দরিদ্র পরিচ্ছন্ন কর্মী আকলিমা বেগম এর বেতন আটকিয়ে রেখে তাকে মোবাইল ফোন কিনতে বাধ্য করেছেন। কারণ তিনি ডাকামাত্র তার ডাকে সাড়া দিতে পারেন। আকলিমাকে দিয়ে ব্যক্তিগত যাবতীয় গৃহস্থলির কাজ করান তিনি। সকাল ৮/৯ টা থেকে রাত ৯/১০ টা পর্যন্ত তাকে দিয়ে ব্যক্তিগত কাজ করান বিধায় আকলিমা বেগম অফিসের নিয়মিত পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন কাজ করার সময় পায় না।
বরিশাল সদরের কিশোর মজলিশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মো: আল মামুনকে স্কুল চলাকালীন সময়ে অফিসের গেস্টহাউজে এসে তার ছেলেকে প্রাইভেট পড়াতে বাধ্য করেন তিনি। ওই বিদ্যালয়ের শিক্ষক জায়েদাসহ অন্যদের প্রবল আপত্তির জন্য বর্তমানে স্কুল সময়ে আসা বন্ধ হয়েছে। আপত্তির কারণে জায়েদা চরম রোষাণলে পড়েছেন। তাকে দেখে নেয়ার হুমকি প্রদান করা হয়েছে।
ঘুষ নেই সেবা নেই:
প্রাথমিক শিক্ষক-কর্মচারীদের পাসপোর্ট তৈরি ও নবায়নে এনওসি প্রদান, শিক্ষা ছুটি মঞ্জুর, উচ্চতর স্কেল প্রদানসহ যে সকল কাজ বিভাগীয় অফিস থেকে করতে হয় তার প্রত্যেকটি কাজে অর্থ না দিলে কোনো ফাইল তিনি ছাড়েন না এই দুর্নীতিবাজ ঘুষখোড় ডিডি। টাকা ছাড়া ফাইল স্বাক্ষর হয়না বিভাগীয় এই অফিসে।
এ বিষয়ে সম্প্রতি অর্ধগড় বেতনে এবং বিনা বিতনে ছুটি পাওয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, পারিবারিক প্রয়োজনে এক মাসের ছুটির আবেদন করি। তবে ছুটি না পাওয়ায় প্রথমে উপজেলা শিক্ষা অফিসে যোগাযোগ করলে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আমাকে বিভাগীয় অফিসে কথা বলতে বলেন। অফিসে কথা বলে বুঝতে পারি টাকা ছাড়া এখানে কিছু করা সম্ভব নয়। পরে বাধ্য হয়ে পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে আমি ছুটি মঞ্জুর করি।
অনিয়মের বিরুদ্ধে কথা বললেই চলে শোকজ, বিভাগীয় মামলার ভয় এবং এসিআর খারাপ দেওয়ার হুমকি: ডিডি নিলুফার ইয়াসমিন অতি সাধারণ বিষয়েও কর্মকর্তা/কর্মচারীদের শোকজ করার এবং বিভাগীয় মামলার ভয় দেখিয়ে ধমক দেন। ভবিষ্যতে এসিআর খারাপ দেয়ার ভয় দেখান। শোকজ এবং বিভাগীয় মামলা ও এসিআর খারাপের ভয়ে কেউ মুখ খুলতে সাহস করে না।
অফিসের যাবতীয় নথি শিক্ষা অফিসারের মাধ্যমে উপাস্থাপন করার বিধান থাকলেও তিনি তা মানেন না। তিনি খেয়াল খুশি মতো নথি ছাড়াই অনেক প্রশাসনিক ও আর্থিক কাজ করে থাকেন। কোন কোন ক্ষেত্রে শিক্ষা অফিসার বাইরে আছেন লিখিয়ে নথি উপস্থাপণ করতে বলেন। অফিস সহকারি শাহ আলমকে শিক্ষা অফিসারকে বাদ দিয়ে সরাসরি ফাইল উপস্থাপণ করতে বলেন। ডিডির নির্দেশমতো গ্রহভৃত্যের ন্যায় শাহ আলম তাই করে থাকে।
বদলির ভয় দেখিয়ে ঘুষ বাণিজ্য :
ডিডি নিলুফা ইয়সামিন তার অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর শাহ আলমের মাধ্যমে বিভিন্ন সময়ে উৎকোচ ও উপঢৌকন গ্রহণ করেন। শাহ আলম জেলা ও উপজেলা অফিসে ফোন করে জানান যে, তাকে ছাড়া ম্যাডাম অন্য কাউকে বিশ্বাস করেন না। তাই সকলকে তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। কর্মচারীদের কর্মকাল সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করে তা শাহ আলমের নিকট দিয়েছেন। শাহ আলম ওই তালিকা দেখে বেশিদিন কর্মকাল হয়েছে এমন কর্মচারীদের ফোন করে বদলীর ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করেন ডিডি নিলুফা। শাহ আলমের কার্যক্রম সম্পর্কে তাকে অবহিত করলে তিনি কোন কর্ণপাত করেন না। ২০২২-২৩ অর্থবছরে অন্য কর্মকর্তা কর্মচারিদের বঞ্চিত করে শাহ আলমকে ১৪ হাজার ৫০৬ টাকার টিএ বিল দিয়েছেন। তার প্রশ্রয়ের কারণে শাহ আলম সবাইকে হুমকী দিয়ে কথা বলেন।
কর্মচারী বদলির ক্ষেত্রে কোন নিয়মনীতির তোয়ক্কা করেন না। প্রশাসনিক কারণে আবুল কালামকে দশমিনা থেকে রাজাপুর বদলী করে আবার ৪ মাস পর শাহ আলমের মাধ্যমে অবৈধ সুবিধা নিয়ে তাকে বাউফল উপজেলায় বদলী করা হয়। সম্প্রতি ৪ জন টেকনিক্যাল ক্যাটাগরি সহ ৬ জনকে জনস্বার্থে বদলি করা হয়। এর মধ্যে একই দপ্তরের ২ জনকে একত্রে অন্যত্র বদলি করা হয়। যদিও তাদের বিরুদ্ধে কোন লিখিত বা মৌখিক অভিযোগ ছিলনা। এতে ওই দপ্তরে কার্যক্রমে জটিলতা তৈরি হয়েছে। সমন্বিত বদলি নির্দেশিকা ২০২৩ এ মহাপরিচালকের অনুমোদন গ্রহণের বিধান থাকলেও তা করা হয়নি। এমনকি কোন ফাইল নোটও দেয়া হয়নি।
সাটলিপিকার মো: আরিফ হোসেন বিগত ৪/৫ মাস পূর্বে অবসর গ্রহণ করলেও তার কাজ অফিসের অন্য কাউকে বুঝিয়ে দেয়া হয়নি। তিনি বিভাগীয় মামলাসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ নথি এখনও তার দখলে রেখেছেন। তার মাধ্যমে অবৈধ সুবিধা আদায় সহজ হয় বলে এখনো তাকে দিয়ে অফিসের গুরুত্বপূর্ণ কাজ করানো হয়। শাহ আলমের মাধ্যমে আর্থিক সুবিধা আদায় নিশ্চিত হলে তাকে ফোন করে অফিসে আনা হয়। সে নথি তৈরি করে দিলে শাহ আলমের মাধ্যমে উপস্থাপণ করে তা নিষ্পত্তি করা হয়।
একাধিক কর্মকর্তা কর্মচারী এবং শিক্ষকদের সাথে কথা বললে তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, আমরা প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগীয় অফিসে জিম্মি। যখন নিলুফা ইয়াসমিনের বদলির আদেশ হলো তখন আমরা ভেবেছিলাম এই জিম্মিদশা থেকে মুক্তি পেলাম। পরবর্তীতে দেখলাম সেই আদেশ বাতিল হয়েছে। ছাত্র-জনতার আন্দোলনে সরকারের পতন হলে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলাম। এই কালো টাকার সিস্টেম বদলাবে। কিন্তু আমাদের ভাগ্যের আর বদল হলো না। বিভাগীয় অফিসেই আমদেরকে জিম্মি হয়ে থাকতে হচ্ছে।
প্রাথমিক শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্যে উৎসাহ দেওয়া:
সম্প্রীতি বিভিন্ন অনলাইল নিউজ পোর্টাল ও স্থানীয় দৈনিকে বরিশাল সদর উপজেলার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্যের সংবাদ প্রকাশ হলে, তিনি প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের নামে একটি চিঠি যাহার স্মারক নং-৩৮.০১.১০০০.০০০.২৭.০১.২০২৬.৩৮৯ প্রত্যেক স্কুলের প্রধান শিক্ষকদের লিখিতভাবে জানান, কোচিং করানো যাবে তবে স্কুল সময়ের পরে। অথচ শিক্ষামন্ত্রী বলছে স্কুল শিক্ষকদের বাহিরে বাণিজ্যিক কোচিং চলবে না। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনাতে কর্ণপাত না করে তিনি অর্থ আদায়ের মাধ্যমে নিজস্ব ক্ষমতা বলে চালিয়ে যাচ্ছেন এ সকল অপকর্ম।
ডেপুটেশন বাণিজ্য:
মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে বরিশাল বিভাগীয় ডিডি নিলুফার ইয়াসমিন ও জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো: মোস্তফা কামাল শিক্ষকদের সুবিধামতো ডেপুটেশনের মাধ্যমে বদলী করা হয়। গত ২৪/০৬/২০২৬ইং তারিখে ৮ জন শিক্ষকের ডেপুটেশন বদলীর চিঠি যাহার স্মারক নং-জেপ্রাশিঅ/বরি/১০৭০ প্রেরণ করা হয়েছে। তাদের এসব কাজে সহায়তা করেন উপজেলা সহকারী শিক্ষা অফিসার জাবের ও শিক্ষক নেতা ভাটিখানা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক তারিকুল ইসলাম পলিন্স, ১৯১নং কিশোর মজলিস সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ইলিয়াস আলী খান, মো: আনোয়ার হোসেন।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে প্রাথমিক ও গণ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিবকে একাধিকবার কল করলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। এ বিষয়ে বরিশাল বিভাগীয় অফিসের ডিডি নিলুফার ইয়সামিনকে কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেন নি। (ক্রমশঃ)