
বিশেষ প্রতিবেদক:
লাগাতার অনিয়ম অপ্রতিরোধ্য দুর্নীতি আর লুটপাটের দুর্ভেদ্য অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর (ডিপিএইচই)। দেশে গণঅভ্যুত্থানে স্বৈরাচারের পতন পূর্বক রাজনৈতিক পট পরিবর্তন হলেও জনগুরুত্বপূর্ণ এই প্রতিষ্ঠানটির ভাগ্যাকাশে কোনো সুবাতাস আসেনি। বরং ফ্যাসিবাদের দোসরদের হাত ধরে দুর্নীতির অব্যাহত ঝর্ণাধারা এখন আরো বেশী বেগবান। ছাত্রলীগ নেতা পরিচয়ে আ’লীগ আমলে যারা অত্যন্ত প্রভাবশালী বা ক্ষমতাবান ছিলেন, লাগামহীন অপকর্মে ডুবে ছিলেন, এমন কর্মকর্তারাই বর্তমান সরকরের আমলে অধিদপ্তরে নতুন করে সিন্ডিকেট তৈরি করে দুর্নীতির পুরনো ধারা বহমান রেখেছেন। যা নিয়ে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে দেখা দিয়েছে ব্যাপক ক্ষোভ ও অসন্তোষ। এই চরম দুর্নীতি আর লুটেরা সিন্ডিকেটের মাস্টারমাইন্ড হলেন- অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. আবদুল আউয়াল। জ্যেষ্ঠতার সকল নিয়ম ভেঙে, নজিরবিহীন রকেট গতিতে পদোন্নতি পেয়ে তিনি এখন অধিদপ্তরের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। লুটপাটের মহানায়ক।
প্রকৌশলী আবদুল আউয়ালের মূল পদ হলো নির্বাহী প্রকৌশলী। কিন্তু তিনি নিজ পদের অতিরিক্ত হিসেবে একে একে বাগিয়ে নিয়েছেন অধিদপ্তরের আরও শীর্ষ তিনটি পদ। সাবেক ছাত্রলীগ নেতা, এই প্রভাব খাটিয়ে আ’লীগ আমলে অন্যদের ডিঙিয়ে চলতি দায়িত্বে বাগিয়ে নেন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর পদ। এরপরে অন্তর্র্বতী সরকারের শেষের দিকে একই সঙ্গে বাগিয়ে নেন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (পূর্ত) এর চলতি দায়িত্ব এবং প্রধান প্রকৌশলীর রুটিন দায়িত্ব, যা অত্যন্ত বিরল। মূলতঃ যোগ্য ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের ডিঙিয়ে ‘আলাদিনের চেরাগ’ হাতে পাওয়া এই কর্মকর্তার উচ্চ পদে পদায়নের নেপথ্যে কাজ করছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। আর তাতে হয়েছে ৩৫ কোটি টাকার অবৈধ লেনদেন। এখন শীর্ষ দুর্নীতিবাজ এই কর্মকর্তা সেই অর্থ তুলতে অত্যন্ত মরিয়া হয়ে উঠেছেন। অধিদপ্তরের সকল কর্মকান্ডে লাগামহীন দুর্নীতি আর লুটপাট চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, অন্তর্র্বতী সরকারের আমলে তাকে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী এবং প্রধান প্রকৌশলী পদের দায়িত্ব দেওয়ার সময়ে গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনকে কোন তোয়াক্কা করা হয়নি। তখনকার দুর্নীতিবাজ উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ও সচিব রেজাউল মাকছুদ জাহেদী সম্পূর্ণ অবৈধভাবে তাকে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী এবং প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব পাইয়ে দেন।
সাবেক ছাত্রলীগ নেতা যেভাবে অধিদপ্তরের শীর্ষ পদে:
প্রকৌশলী আবদুল আউয়ালের রাজনৈতিক ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, তিনি কুয়েটে (KUET) অধ্যায়নকালে ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। ছাত্রলীগের সাবেক নেতা হওয়ার সুবাধে কর্মজীবনে নিজেকে অ’ালীগের একনিষ্ঠ সমর্থক হিসেবে পরিচয় দিয়ে অধিদপ্তরের অন্যান্য কর্মকর্তাদেরও বিভিন্ন কায়দায় নাজেহাল করতেন। অধিদপ্তরের বিভিন্ন পর্যায়ে ছড়ি ঘুরিয়েছেন তিনি। এভাবে আ’লীগ সরকারের টানা ১৬ বছরের শাসনামলে তিনি ছিলেন অত্যন্ত প্রভাবশালী একজন স্বৈরাচার কর্মকর্তা। কোন নিয়ম-নীতিরই তোয়াক্কা করতেন না তিনি। বিশেষ করে ময়মনসিংহের আ’লীগের সাবেক দুই সংসদ সদস্য মাহমুদ হাসান এবং আব্দুস সাত্তারের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে তিনি জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে নিজের প্রভাব বিস্তার করেছেন।
৫ আগস্ট, ২০২৪ ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের পতনের পরে আউয়াল রাতারাতি নিজের ‘লেবাস’ পাল্টিয়ে ফেলেন। ৫ আগস্টের পর যেখানে ফ্যাসিবাদের সহযোগীদের বিচারের আওতায় আনার কথা, সেখানে আউয়াল সিন্ডিকেট অন্তর্র্বতীকালীন সরকারের স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব রেজাউল মাকছুদ জাহেদী এবং উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজিব ভূঁইয়া’র আশীর্বাদে আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠেন। অত্যাচার নির্যাতনের স্টিমরোলার চালান সহকর্মীদের ওপরে।
উপদেষ্টা ও সচিবের প্রভাবে অনিয়ম-দুর্নীতিতে হয়ে উঠেন অপ্রতিরোধ্য। যেন কাউকে তোয়াক্কা করার সময় নেই তার। ফ্যসিস্টের দোসর আউয়াল ক্ষমতার প্রভাবকে সিড়ি হিসাবে ব্যবহার করে মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে একজন নির্বাহী প্রকৌশলী (গ্রেড-৫) থেকে অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর (রুটিন দায়িত্ব) মতো শীর্ষ পদে আসীন হওয়ার ঘটনাটি দেশের প্রশাসনিক ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ও অবাক করার মতো উদাহরণ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে, বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
আউয়ালের চাকরি জীবন: আবদুল আউয়াল ১৯৯৮ সালের ৫ মার্চ একটি প্রকল্পে (জিওবি-ডানিডা) যোগদান করেন। ২০০৬ সালে তিনি রাজস্ব খাতে আসেন এবং ২০১৩ সালে চাকরিতে নিয়মিত হন। অথচ অধিদপ্তরে এমন অনেক কর্মকর্তা কর্মরত আছেন যারা আউয়ালের চেয়ে জ্যেষ্ঠ এবং যাদের চাকরির রেকর্ড অত্যন্ত স্বচ্ছ। কিন্তু তাদের কাউকে পদোন্নতি না দিয়ে এবং সব নিয়ম-নীতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে গত ১৭ নভেম্বর ২০২৫ তাকে প্রধান প্রকৌশলীর (রুটিন দায়িত্ব) মতো শীর্ষ পদ দেওয়া হয়। এখানেই শেষ নয়, পরে গত ৪ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর (পূর্ত) পদে দায়িত্ব পাবার আবেদন করেন তিনি এবং অজ্ঞাত প্রক্রিয়ায় রকেটের বেগে ফাইল অনুমোদন হয়ে ১১ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে প্রজ্ঞাপন জারি হয়। মাত্র ২ মাসেরও কম সময়ে একজন নির্বাহী প্রকৌশলীর প্রধান প্রকৌশলীর রুটন দায়িত্ব, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর চলতি দায়িত্ব পাবার ও একইসাথে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদে চলতি দায়িত্বে থাকার উদাহরণ বিরল। কর্মকর্তাদের মতে, এটি কেবল পদোন্নতি নয়, এটি একটি পরিকল্পিত ‘প্রশাসনিক ক্যু’।
অভিযোগ রয়েছে, এই শীর্ষ পদটি বাগিয়ে নিতে তিনি প্রায় ৩৫ কোটি টাকার এক বিশাল লেনদেন করেছেন। এর মধ্যে ৫ কোটি টাকা সরাসরি তৎকালীন স্থানীয় সরকারের সচিব রেজাউল মাকছুদ জাহেদীর কাছে পৌঁছেছে বলে বিভিন্ন সূত্রে দাবি করা হয়েছে। বাকিটা সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াকে দেয়া হয়। জাহেদী এবং আউয়াল- উভয়ের বাড়ি ময়মনসিংহে হওয়ায় এই ‘আঞ্চলিক সিন্ডিকেট’ আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে তখন। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, প্রধান প্রকৌশলী পদে নিয়োগের আগে ২০২৫-এর মে মাসে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই) থেকে ৫ জন কর্মকর্তার মূল্যায়ন প্রতিবেদন চাওয়া হয়েছিল। আউয়ালের প্রতিবেদনে তার বিরুদ্ধে ভয়াবহ দুর্নীতির তথ্য থাকলেও রহস্যজনকভাবে সেই প্রতিবেদন ধামাচাঁপা দিয়ে তাকে প্রধান প্রকৌশলী পদে রুটিন দায়িত্ব দেওয়া হয়।
স্বৈরাচার আমলে আউয়ালের যত অপকর্ম
প্রকৌশলী আউয়ালের বিরুদ্ধে বেতন জালিয়াতির এক অকাট্য প্রমাণ পাওয়া গেছে। তিনি ১৯৯৮ সালে প্রকল্পে যোগদান করলেও ২০০৬ সালে প্রকল্প থেকে রাজস্ব খাতে আসেন। অথচ ২০০২ সালে সিলেকশন গ্রেড নিয়ে ৭ম গ্রেডে ২০০৮ সালে ৬ষ্ঠ গ্রেড এবং ২০১৮ সালে ৫ম গ্রেডে বেতন উত্তোলন করতে থাকেন। দীর্ঘদিন যাবৎ অগ্রিম বেতন তুলে সরকারের বিপুল অংকের টাকা গোপনে পকেটস্থ করেছেন আবদুল আউয়াল যা প্রতারণা, জালিয়াতি ও আর্থিক অপরাধ। রুটিন দায়িত্ব পাওয়ার পর দ্রুত সময়ে তার খরচের টাকা ওঠানোর জন্য আবদুল আউয়াল তৎপর হয়ে উঠেন। বর্তমানে বিভিন্ন জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী এমনকি প্রকল্প পরিচালকদের কাউকে কাউকে সরিয়ে দেবার জন্য তিনি পরোক্ষভাবে হুমকি প্রদান করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সুষ্ঠু তদন্ত করলে এই অভিযোগেই তার জেল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
নরসিংদীসহ বিভিন্ন জেলায় আব্দুল আউয়ালের লুটপাটের ক্ষত: অনুসন্ধানে আরো জানা গেছে, আবদুল আউয়াল যখন নরসিংদীতে নির্বাহী প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) হিসেবে কর্মরত ছিলেন, ওই সময় এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) অর্থায়িত সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট নির্মাণে চরম অনিয়মের আশ্রয় নেন। যে কারণে তাকে বার বার নরসিংদী থেকে সরিয়ে দেবার পদক্ষেপ নেয়া হলেও মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে সেখানে থেকে যান।
জানা যায়, তিনি নির্ধারিত সময়ে নরসিংদী পৌরসভায় সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট চালু করতে পারেননি। প্রকল্প শেষ হলেও বিশেষ টিম গঠন করে গুরুত্বপূর্ণ এই স্থাপনার অসম্পূর্ণ কাজ শেষ করে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর। উক্ত প্রকল্পের কাজের সাথে জড়িত এক ঠিকাদার জানান, মো. আবদুল আউয়াল ঠিকাদারদের জিম্মি করে টাকা আদায় করতেন। তাঁর চাহিদা অনুযায়ী টাকা না দিলে বিল থেকে বড় একটা অংশ কর্তন করতেন, যার ফলে ঠিকাদার আর্থিকভাবে ক্ষতির শিকার হন। তবে চাহিদা অনুযায়ী টাকা দিলে যেনতেন ভাবে কাজ করলেও বিলে কোন সমস্যা হতো না। নরসিংদীতে নির্বাহী প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) হিসেবে থাকাকালীন নরসিংদীর বিভিন্ন পৌরসভা ও পল্লী অঞ্চলের উন্নয়ন প্রকল্পে জনস্বাস্থ্যের অসংখ্য কাজে এই উদাহরণ পাওয়া যায়।
প্রকৌশলী আবদুল আউয়ালের অপকর্মের কারণে অধিদপ্তরের অনেক কর্মকর্তা বিপদেও পড়েছেন। নরসিংদী থেকে আবদুল আউয়াল নিজ জেলা ময়মনসিংহে নির্বাহী প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) হিসেবে পদায়ন নেন এবং ফেব্রুয়ারি, ২০১৭-এ কিশোরগঞ্জ জেলায় নির্বাহী প্রকৌশলীর অতিরিক্ত দায়িত্ব লাভ করেন। এই দুই জেলায় থাকা অবস্থায় মো. আবদুল আউয়ালের বিরুদ্ধে কাগজ ম্যানিপুলেশন ও টেম্পারিং এর মাধ্যমে ক্রয় প্রক্রিয়ায় সরাসরি হস্তক্ষেপের অভিযোগ রয়েছে। উল্লেখ্য, কিশোরগঞ্জ ও নরসিংদীতে টেন্ডার জালিয়াতির মাধ্যমে তিনি সরকারের যে ক্ষতি করেছেন, তা অডিট রিপোর্টে ‘গুরুতর অনিষ্পত্তিযোগ্য আপত্তি’ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে এবং অডিটের ত্রিপক্ষীয় সভায় আলোচিত হয়েছে।
আবদুল আউয়াল ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ অধিদপ্তরের সিলেট সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর (চলতি দায়িত্ব) দায়িত্ব পান। এ দায়িত্ব পালনকালে “কুলাউড়া ও গোলাপগঞ্জ পৌরসভার পানি সরবরাহ ও এনভায়রনমেন্টাল স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নতিকরণ প্রকল্প” প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব পান। তবে তার অযোগ্যতা ও অদূরদর্শিতায় জানুয়ারি, ২০২০- ডিসেম্বর, ২০২২ মেয়াদের এ প্রকল্পের কার্যক্রম শুরুর আগেই প্রকল্পটি মুখ থুবড়ে পড়ে। প্রকল্পের পরামর্শক নিয়োগে তিনি বিপুল অর্থ নিজের পকেটস্থ করেন। এতো অপকর্মের পরও কোন কিছুর দায়িত্ব না নিয়ে তিনি বিশেষ মহলকে খুশি করে নিজ জেলা ময়মনসিংহ সার্কেলে বদলি হন।
নিজ জেলায় দাায়িত্ব নিয়ে ব্যাপক দুর্নীতি: ময়মনসিংহ জেলায় থাকাকালে তার বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। আ’লীগের ময়মনসিংহ-৮ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মাহমুদ হাসানের আস্থাভাজন সাবেক ছাত্রলীগ হওয়ায় ২০২১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে নিজ জেলায় যোগদান করেন। নিজ জেলায় সরকারি কর্মকর্তাদের পদায়ন সাধারণত নিষিদ্ধ। কিন্তু জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের তখনকার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবদুল আউয়ালের ক্ষেত্রে এটি কার্যকর হয়নি। নিয়ম-কানুনের তোয়াক্কা না করে তিনি দীর্ঘদিন নিজের জেলা ময়মনসিংহে নির্বাহী ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদে যোগদানের পর থেকেই আবদুল আউয়াল দুর্নীতিতে বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। সাবেক ছাত্রলীগ নেতা এবং আ’লীগের এমপির সাথে আনঅফিসিয়ালি ব্যবসায়িক সম্পর্ক থাকায় সব অপকর্মে পার পেয়ে যান। নিজ জেলায় চাকরির প্রভাব খাটিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীরদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ, স্বেচ্ছাচারিতা, স্বজনপ্রীতিসহ নানা অনিয়ম-দুর্নীতি করেছেন তিনি।
নিলামের নামে হরিলুট: ভয়াবহ অনিয়মের মাধ্যমে নোয়াখালী জেলায় ডানিডার অর্থায়নে সংরক্ষিত প্রায় ৫ কোটি ৫৫ লাখ টাকার পাইপ ও নির্মাণসামগ্রী মাত্র ১৮ লাখ ৮৫ হাজার টাকায় নিলামে বিক্রি করা হয়। অত্যন্ত গোপনীয়ভাবে এই নিলাম প্রক্রিয়া আবদুল আউয়ালের সরাসরি নির্দেশনায় সম্পন্ন হয়েছে। ঠিকাদারদের অভিযোগ, ডানিডার অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন একটি প্রকল্পের আওতায় প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি টাকার বিভিন্ন ধরনের পাইপ ও নির্মাণসামগ্রী নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের একটি গুদামে সংরক্ষিত ছিল। এসব মালামাল অত্যন্ত গোপনীয়ভাবে কথিত গোপণ দরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে নামমাত্র একটি পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে নিলামে তোলা হয়। এতে অধিকাংশ ঠিকাদার বিষয়টি জানতে না পারায় দরপত্র প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারেননি। এ সুযোগে নির্বাহী প্রকৌশলী সাইফুল ইসলাম ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মেসার্স শাহনাজ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রায় ৬ কোটি টাকার মালামাল মাত্র ১৮ লাখ ৮৫ হাজার টাকায় বিক্রি করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
জানা গেছে, ২০২৪ সালের ২০ অক্টোবর এ নিলাম অনুষ্ঠিত হয়। গণমাধ্যমকে নির্বাহী প্রকৌশলী সাইফুল ইসলাম মুঠোফোনে বলেন, “আমি কোনো নিলাম দিইনি। নিলাম প্রক্রিয়া ঢাকা থেকে পরিচালিত হয়েছে।” এর সত্যতা প্রমাণিত হয় কিছু গোপণ তথ্যের ভিত্তিতে। অভিযোগ রয়েছে, গত ১৫ জানুয়ারি নোয়াখালীর নির্বাহী প্রকৌশলী সাইফুল ইসলাম ঢাকায় এসে মহাখালীর একটি ব্যাংকের সামনে থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা আউয়ালের প্রতিনিধির হাতে তুলে দেন। এই নিলামের পুরো টাকাটাই প্রধান প্রকৌশলী আউয়ালের পকেটে গেছে বলে ঠিকাদাররা অভিযোগ করছেন।
আউয়ালের দুর্নীতির হাত থেকে রেহাই পাননি অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারীরাও
আউয়ালের দুর্নীতির হাত থেকে রেহাই পাননি অধিদপ্তরের অবসরপ্রাপ্ত সাধারণ কর্মচারীরাও। এনএসআই-এর প্রতিবেদনে উরেøখ করা হয়েছে, পেনশন এবং পিআরএল (চজখ) ফাইল অনুমোদনের জন্য আবদুল আউয়াল প্রত্যেকের কাছ থেকে ১ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ নিতেন। যারা টাকা দিতে পারতেন না, তাদের ফাইল মাসের পর মাস আটকে রাখা হতো। নিজ জেলা ময়মনসিংহে থাকাকালীন তিনি সাধারণ মেকানিক ও কর্মচারীদের বদলির ভয় দেখিয়ে নিয়মিত মাসোহারা আদায় করতেন। সরকারি কর্মকান্ডে আবদুল আউয়ালের অদূরদর্শিতার বলি হয়েছে সাধারণ মানুষ। ময়মনসিংহের ফুলপুর ও গৌরীপুর পৌরসভায় প্রায় ৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত পানি সরবরাহ প্রকল্পগুলো আজ পুরোপুরি অকেজো। গৌরীপুর পৌরসভার পাম্পচালকদের বেতন বাবদ বছরে ১০ লাখ টাকা খরচ করা হলেও শহরবাসী এক ফোঁটা পানিও পান না। নকশা অনুযায়ী কাজ না হওয়া এবং প্রকল্পের টাকা লুটপাট হওয়ার কারণে কোটি টাকার সরকারি সম্পদ আজ জলে গেছে।
সচিবের নিজ এলাকার বদৌলতে প্রধান প্রকৌশলী পদে আব্দুল আউয়ালঃ স্থানীয় সরকার বিভাগের সাবেক সচিব রেজাউল মাকছুদ জাহেদীর গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহের ফুলপুর উপজেলায় হওয়ায় সচিবের আশীর্বাদে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনেও আবদুল আউয়াল লেবাস পরিবর্তন করে আবার ক্ষমতাবান হয়ে উঠেন। পুরনো সিন্ডিকেট আবার নতুন করে গড়েন। তখনকার উপদেষ্টাকে ম্যানেজ করে প্রকৌশলী তবিবুর রহমান তালুকদার হতে চেয়েছিলেন প্রধান প্রকৌশলী। কিন্তু ঘটনা আগাম ফাঁস হয়ে যাওয়ায় সেই প্রক্রিয়া ভেস্তে যায়। উপদেষ্টা স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা সজীব ভূঁইয়াও তাতে বেকায়দায় পড়েন। এই সুযোগটিই নেন সচিব রেজাউল মাকছুদ জাহেদী। নিজের এলাকার লোক- এর কথা বলে উপদেষ্টাকে রাজি করিয়ে ফ্যাসিস্ট দোসর ও সাবেক ছাত্রলীগ নেতা আবদুল আউয়ালকে প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব দেয়ার ব্যবস্থা করেন রেজাউল মাকছুদ জাহেদী। তবে ‘এলাকার লোক’ বলা হলেও এর নেপথ্যে ছিল বড় অংকের অর্থের লেনদেন, যা ইতিমধ্যেই উল্লেখ করা হয়েছে।
বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলার জন্য এই প্রতিবেদক প্রকৌশলী আউয়ালের দপ্তরে স্বশরীরে এবং মোবাইলে কয়েক দফা যোগাযোগ করে না পাওয়ায় প্রতিক্রিয়া জানা সম্ভব হয়নি।
এছাড়াও প্রকৌশলী আউয়ালের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম দুর্নীতি ও দেশ-বিদেশে প্রমোদ ভ্রমনের বিভিন্ন তথ্য প্রমাণাদি পাওয়া গেছে। যা পর্যায়ক্রমে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন আকারে ‘বাঙালি সংবাদ’ এ প্রকাশিত হতে থাকবে।