
নিজস্ব প্রতিবেদক:
সর্বগ্রাসী লুটপাটের কবলে পড়েছে বরিশাল গণপূর্ত বিভাগ। হরিলুটের কার্যকমে নেতৃত্ব দিচ্ছেন আওয়ামী এমপি আমির হোসেন আমুর পালিত পুত্র হিসেবে ব্যাপক পেিরচিত নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়সাল আলম। তিনি ডিভিশনটিতে এলটিএম জালিয়াতি, ওটিএম এর রেটকোড ফাঁস ও টেন্ডারের আগেই কাজ শেষ করাসহ বিভিন্ন ধরণের অনিয়মের আশ্রয় নিয়ে ডিভিশনটির উন্নয়নমূলক কর্মকান্ড নিয়ে হ-য-ব-র-ল অবস্থার সৃষ্টি করেছেন। ফলে অল্প কিছুদিন পর পর শোষিত বাঞ্চিত ঠিকাদারদের হাতে লাঞ্ছিত হয়ে সংবাদ শিরোনাম হচ্ছেন প্রতিনিয়ত। তথ্য সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্রের।
বরিশাল গণপূর্ত কার্যালয়ে লটারিতে পাওয়া কাজ অন্যকে হস্তার, কৌশলে নিজস্ব সিন্ডিকেটকে কাজ পাইয়ে দেওয়া এবং ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পরও বিগত আ’লীগ মতাদর্শের প্রকৌশলী ও ঠিকাদারদের একচ্ছত্র আধিপত্যের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। গণঅভ্যুত্থানের পর সারাদেশে পরিবর্তন এলেও বরিশাল গণপূর্তে সাবেক মন্ত্রী ও প্রভাবশালী নেতাদের প্রভাববলয় এখনও সক্রিয় রয়েছে বলে দাবি সাধারণ ঠিকাদারদের।
লটারির কাজ ছিনতাই ও ভূয়া ওয়ার্ক অর্ডার
বরিশাল জেলা যুবদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও ‘মেসার্স মুস্তাকিম বিল্ডার্স’-এর মালিক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম মাহফুজ জানান, শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ (শেবাচিম) হাসপাতালের ১৫ লাখ টাকার একটি কাজের (আইডি নম্বর: ১২৫৭৬৪০) লটারিতে তার প্রতিষ্ঠান বিজয়ী হয়। তবে প্রকৌশলী ফয়সাল আলম তা মুস্তাকিম বিল্ডার্সকে ওয়ার্ক অর্ডার না দিয়ে পূর্ব মনোনীত এবং কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ইনানের ঘনিষ্ঠজন সিফাতকে দিয়ে আংশিক কাজ করিয়ে রাখেন। পরবর্তীতে সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ারের (এসও) সহায়তায় সিফাতকে কাজ সম্পাদনের সন্তোষজনক সার্টিফিকেটও (ইনভেনন্টরি) দিয়ে দেওয়া হয়।
অপরদিকে ২০২৫ সালের মে মাসের আরেকটি টেন্ডারে (আইডি নম্বর: ১১০৫২০৩) শেবাচিম হাসপাতালের মেরামতের কাজ লটারিতে পায় ‘জেড আর এন্টারপ্রাইজ’। কিন্তু কৌশল খাটিয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে ডিসকোয়ালিফাই করিয়ে কাজটি ‘এম এস খান এন্টারপ্রাইজ’কে পাইয়ে দেওয়া হয়।
পাসওয়ার্ড নিয়ন্ত্রণ ও ‘কাসি মিজান’ সিন্ডিকেট
সাধারণ ঠিকাদার রিপন, কয়েস এবং সরকারি বরিশাল কলেজের সাবেক ভিপি শাহীন জানান, সম্প্রতি পাঁচটি মডেল মসজিদ, নভোথিয়েটার, দুদক ভবন, আনসার অফিস, উজিরপুর থানা ভবন ও বিটাকসহ বড় অংকের সব কাজ নির্দিষ্ট সিন্ডিকেটের হাতে তুলে দিয়েছেন ফাঁপরবাজ প্রকৌশলী ফয়সাল আলম। বিনিময়ে নগদ ৫% হিসাবে তিনি পেয়েছেন মোটা অংকের অর্থ। এ কাজে সহায়ক ভূমিকায় ছিলেন সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার (সেকশন কর্মকর্তা বা এসও) জাকারিয়া। অভিযোগ রয়েছে, নির্বাহী প্রকৌশলীর পাসওয়ার্ড থাকে ওই জাকারিয়ার কাছে। তিনি লাইসেন্স নিয়ন্ত্রণ করেন, ঠিকমতো ইভ্যালুয়েশন না করে নিজেই এস্টিমেট প্রস্তুত করেন এবং দরপত্র মূল্যায়নের হার (রেট কোড) মিলিয়ে দেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
আ’লীগ আমলে ঝালকাঠি থেকে ক্ষমতা চর্চা করা এই প্রকৌশলী বর্তমানে বরিশালে এসে কাশি মিজান, ঝালকাঠির খান বিল্ডার্স-এর নাসির খান এবং বরিশালের ছোট মাহফুজের মাধ্যমে ডিভিশনটির সব ধরণের নির্মাণ কাজ নিয়ন্ত্রণ করছেন। সিন্ডিকেটের মূল নায়ক মিজান ওরফে ‘কাশি মিজান’ বিতর্কিত ঠিকাদার জিকে শামীমের লোক হিসেবে পরিচিত। প্রকৌশলী ফয়সাল আলমের সহায়তায় তার কাছে অন্তত ছয়টি লাইসেন্সের পাসওয়ার্ড থাকে।
জুলাই হত্যা মামলার আসামি হয়েও বহালতবিয়তে
২০২৪ সালে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন চলাকালে ছাত্র-জনতার ওপর পরোক্ষ হামলার অভিযোগে দায়ের করা হত্যা মামলার আসামি নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়সাল আলম। তার বিরুদ্ধে আ’লীগকে আর্থিকভাবে পূণঃ বাসন করা এবং গণপূর্ত অফিসকে দলীয় আখড়ায় পরিণত করার অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি মুজিব কোট ও নৌকার ব্যাজ পরিহিত তার একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে নতুন করে বিতর্ক তৈরী হয়।
মামলার বাদী জুলাই যোদ্ধা মোঃ জহিরুল ইসলাম অভিযোগ করেন, আসামিরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ালেও পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করছে না। এ বিষয়ে বরিশাল কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আল মামুন উল ইসলাম জানান, তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে এবং ঘটনার সাথে কার কার সংশ্লিষ্টতা আছে তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
অপরদিকে, রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পরও বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের কিছু স্থানীয় নেতার ছত্রছায়ায় এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে ফয়সাল আলম স্বপদে বহাল আছেন।
সংশ্লিষ্টদের প্রতিক্রিয়া
নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়সাল আলম তার বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করে গণমাধ্যমকে বলেন, “মুজিব কোট পরা ছবিগুলো এডিট করা। আর রেট কোডের গোপনীয়তা কোনো এক অফিস থেকে ফাঁস হওয়া অসম্ভব কিছু নয়। কিন্তু আমি তা দেইনি।”
এসও জাকারিয়া এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি জানান, নির্বাহী প্রকৌশলীর অনুমতি ছাড়া তার কথা বলার নিয়ম নেই।
খান বিল্ডার্স-এর নাসির খান: সিন্ডিকেটের কথা অস্বীকার করে বলেন, “আমরা সর্বনিম্ন দরদাতা (Lowest) হিসেবে এবং পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকেই কাজ পাই।
বরিশাল সদর আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এডভোকেট মজিবর রহমান সরোয়ার: বলেন, “আ’লীগের লোকজন এখনও বিভিন্ন দপ্তরে ছড়িয়ে থেকে তাবেদারি করছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। বিষয়টি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক: টেন্ডার পদ্ধতিতে সংস্কারের দাবি জানিয়ে বলেন, “গত ১৭ বছর বিরোধী মতের ঠিকাদাররা ঘরেই ঘুমাতে পারেননি, অভিজ্ঞতা অর্জন করবেন কীভাবে? ফলে সিস্টেমে পরিবর্তন আনা জরুরি।”
তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোক্তার দেওয়ান (গোপালগঞ্জ ও অতিরিক্ত দায়িত্ব বরিশাল সার্কেল) জানান, “ফোনে বিষয়টি পুরোপুরি পরিষ্কার হওয়া কঠিন।অভিযোগ সত্য হলে বরিশাল কার্যালয়ে সশরীরে উপস্থিত হয়ে খতিয়ে দেখা হবে এবং উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। (ক্রমশ:)