
জয়নাল আবেদীন যশোরী:
দেশের অন্যতম বৃহত্তম উন্নয়ন সংস্থা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) যেন এখন দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির সুতিকাগারে পরিণত হয়েছে। ক্ষমতার অপব্যবহার করে অবৈধ অর্থ উপার্জনের এক গোপণ শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে দপ্তরটিতে। এর নেতৃত্বে রয়েছেন বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী মোঃ বেলাল হোসেন। অবৈধ অর্থে বিত্তশালী এই কর্মকর্তা নিজের লুটেরা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পদ-পদবি ও প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে সরকারি বিধিমালা ভেঙে বছরের পর বছর চালিয়ে যাচ্ছেন আউটসোর্সিং ব্যবসা।
শুধু তা-ই নয়, সরকারি কোষাগারের রাজস্ব ফাঁকি, পদোন্নতি ও বদলি বাণিজ্যে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে ‘বাঙালি সংবাদ’ এর সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে। এই সব অনিয়ম দুর্নীতি ও বদলি বাণিজ্যে হয়রানীর শিকার হয়ে এলজিইডির শোষিত বঞ্চিত কর্মকর্তা কর্মচারীরা যে কোনো মুহূর্তে ফুঁসে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞ মহল। এই দুর্নীতিবাজ প্রধান প্রকৌশলী অদৃশ্য শক্তির উপর ভর করে একের পর এক অঘটন ঘটিয়ে আবারও নতুন উদ্যোমে নতুন ধারায় বহালতবিয়তে লুটপাট শুরু করেছেন। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদকে) স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ও প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে অভিযোগ থাকা অবস্থায় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় কিভাবে তাকে এক বছরের জন্য প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব দিয়েছেন-তা নিয়েও অসংখ্য প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন মহলে।
কর্মচারী শৃঙ্খলা বিধিকে উপেক্ষা করে বেলাল হোসেনের নামে ইস্যুকৃত ঠিকাদারী লাইসেন্স
স্বার্থের সংঘাত ও 'আউটসোর্সিং' ব্যবসা:
অনুসন্ধানে জানা যায়, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (প্রশাসন) হিসেবে দায়িত্ব পালন কালেই মোঃ বেলাল হোসেন এলজিইডির সমবায় সমিতি 'এলকেএসএস হিউম্যান রিসোর্স সেন্টার'-এর মাধ্যমে বিভিন্ন প্রকল্পে জনবল সরবরাহের কাজ শুরু করেন। পরবর্তীতে এই প্রতিষ্ঠানটি ব্যক্তি মালিকানাধীন সংস্থায় রূপ নিলে ট্রেড লাইসেন্সের একক মালিক হিসেবে নাম আসে প্রকৌশলী বেলাল হোসেনের। তবে আগের ট্রেড লাইসেন্সের ঠিকানা দেওয়া হয় ৬২, পশ্চিম আগারগাঁও, শেরে বাংলা নগর, ঢাকা। কিন্তু এলকেএসএসকে যখন একক মালিকানায় রূপান্তর করা হয় তখন এর ঠিকানা দেখা যায়- হোল্ডিং ১ রোড নং ৬ সেকশন-১১. ব্লক-এ পোস্ট ১২১৬, থানা মিরপুর, জেলা-ঢাকা, ঠিকানায়। অর্থ্যাৎ, তিনি নিজেই দরপত্র আহ্বানকারী, নিজেই যাচাই-বাছাই কমিটির প্রধান এবং দিনশেষে নিজের ফার্মকেই পাইকারি দরে কার্যাদেশ প্রদানকারী।
সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে প্রায় ৩,৫০০ জনের আইনবহির্ভূত নিয়োগ এবং মোট ৬,৫০০ জনের বিশাল আউটসোর্সিং নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হয়েছে তাঁর একক নিয়ন্ত্রণে। এদিকে গত ০৭ মে ২০২৫ এলজিইডি’র প্রকল্পের জনবল রাজস্বখাতে স্থানান্তর এবং পদোন্নতি প্রদানের ক্ষেত্রে সংঘটিত অনিয়মের বিষয়ে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে দায়েরকৃত রিট পিটিশন নং ১৪১১৮/২০২৪ এর মহামান্য আদালতে একখানা তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। যার তদন্ত কমিটির প্রধান করা হয় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (বর্তমানে) সচিব যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সচিব মোঃ মাহবুব-উল-আলম ( ৫৭২৯)কে সভাপতি/আহবায়ক করে ০৬ ছয় সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করে সকল কাগজপত্রাদি ও সিগালাকৃত তদন্ত প্রতিবেদন ০৮(আট) পৃষ্ঠা সংযুক্তি ১৩টি (মোট ৪৭৫ পাতা প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। পরবর্তীতে এসব অনিয়ম দুর্নীতি ও নিয়োগ বাণিজ্যের বিরুদ্ধে আব্দুল খায়ের মিয়া নামক একব্যক্তি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অভিযোগ দায়ের করে। তার অভিযোগে বলা হয় এলজিইডি’র অনিয়ম দুর্নীতির মাধ্যমে উন্নয়ন প্রকল্প হতে রাজস্ব খাতে স্থানান্তরিত ২৫৭ জন প্রকৌশলীর মধ্যে ১৬১ জনকে উচ্চ আদালতের স্থিতাদেশ জন প্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তদন্ত প্রতিবেদন, অডিট আপত্তি এবং চলতি দায়িত্ব প্রদান সংক্রান্ত প্রচলিত নীতিমালা উপেক্ষা করে ৫ম গ্রেডের পদে চলতি দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে। এই মর্মে ২৮/৭/২০২৬ইং তারিখে মোঃ মাহমুদুল হাসান, এলডিসি এর ১০২ কক্ষে বেলা ১১ ঘটিকায় ভবন নং ৭-এ শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। এদিকে ২৯/০৪/২০২৫ইং যেসব নিয়োগ, প্রমোশন, বদলি ও রাজস্বখাতে জনবল রদবদল করা হয়েছে তা নিয়েও ব্যাপক অনিয়ম দুর্নীতি ও আদালত অবমাননা করা হয়েছে বলে তদন্ত কমিটির আপত্তি আছে মর্মে অভিযোগে উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
এখানেই গল্পের শেষ নয়, গত ১৭/৮ ২০২৬ তারিখ জাহিদুল ইসলাম স্বাক্ষরিত দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদকে) এই সব অনিয়ম, দুর্নীতি ও আউটসোর্সিং ব্যবসা উল্লেখ করে আরো একটি অভিযোগ পাওয়া যায় এলজিইডি’র প্রধান প্রকৌশলী বেলাল হোসেন এর বিরুদ্ধে। একই তারিখে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়েও অভিযোগ পাওয়া যায়। এর পর ১৮/৮/২০২৬ মোঃ জাহিদুল ইসলাম অভিযোগ করেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে।
কর ফাঁকি ও কর্মীদের তহবিল তছরুপ:
আইন অনুযায়ী, আউটসোর্সিং প্রক্রিয়ায় নিয়োজিত কর্মীদের বেতন থেকে আয়কর ও ভ্যাট কর্তন করে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া এবং কর্মীদের জন্য যৌথ ব্যাংক অ্যাকাউন্টে তহবিল গড়ে তোলার বিধান রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী:
কর্মীদের বেতন থেকে কর্তন করা প্রায় ২০ কোটি টাকার আয়কর ও ভ্যাট সরকারি কোষাগারে জমা না দিয়ে আত্মসাৎ করা হয়েছে।
কর্মীদের প্রভিডেন্ট ও জমানো এক মাসের সমপরিমাণ বেতনের মোট ৩০ কোটি টাকার বেশি এককালীন সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে।
আইন ভেঙে পদোন্নতি ও জ্যেষ্ঠতা বাণিজ্য:
বিভাগীয় পরীক্ষায় নিয়ম অনুযায়ী শুন্য পদের ৩০% কোটা পূরণের নিয়ম থাকলেও অতিরিক্ত পদ সৃষ্টি করে ১৩০ জনের বেশি প্রকৌশলীকে পদে বসিয়ে বিপুল অঙ্কের নগদ অর্থ আদায় করা হয়।
সার্ভেয়ার ও কার্যসহকারী পদ থেকে ৯৫০ জনের আবেদনের বিপরীতে সবাইকে উত্তীর্ণ দেখিয়ে ২০০টি শুন্য পদের বিপরীতে নতুন করে ১২ থেকে ১৫ কোটি টাকার দর কষাকষি চলছে।
সরকারি সম্পত্তি পানির দরে ভাড়া দিয়ে আবার এলজিইডির নিজের ব্যবহারের জন্য চড়া মূল্যে বেসরকারি ভবন ভাড়া নেওয়ার মতো দ্বিচারিতাও এই অনিয়মের তালিকায় যুক্ত রয়েছে। এলজিইডির প্রশাসনিক ও উন্নয়নমূলক সকল কাজই এখন এই সীমাহীন দুর্নীতির কারণে স্থবির হয়ে পড়েছে।
এ বিষয়ে জানতে প্রধান প্রকৌশলী মোঃ বেলাল হোসেনের মুঠোফোনে একাধিকবার চেষ্টা ও বার্তা পাঠানো হলেও তাঁর কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। (ক্রমশঃ)