
নিজস্ব প্রতিবেদক: কারাগারে থাকা বন্দিরা এখন থেকে ভিডিও কলের মাধ্যমে স্বজনদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার পাশাপাশি তাদের দেখতে পারবেন। মুন্সীগঞ্জ জেলা কারাগারে ইতোমধ্যে পাইলট প্রকল্প হিসেবে এই সুবিধা চালু হয়েছে। শিগগিরই দেশের সব কারাগারে এ ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা হবে।
নতুন নিয়মে একজন বন্দি সপ্তাহে এক দিন পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ১০ মিনিট ভিডিও কলে কথা বলার সুযোগ পাবেন। এ সময় যোগাযোগের গোপনীয়তা ও ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে।
ঢাকার কারাগারের লজিস্টিকস অ্যান্ড মিডিয়া শাখার জেল সুপারিনটেনডেন্ট মো. মাসুদ হাসান জুয়েল জানান, মুন্সীগঞ্জ জেলা কারাগারে পরীক্ষামূলকভাবে ভিডিও কল চালু করা হয়েছে। শিগগিরই দেশের অন্যান্য কারাগারেও এই সুবিধা চালু করা হবে।
কারাগার ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি বন্দিদের সংশোধন ও পুনর্বাসনে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে কারাগারগুলোতে খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, ধর্মীয় শিক্ষা, কাউন্সেলিং এবং মানসিক বিকাশে সহায়ক বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
বন্দিদের কারাগারে থাকা সময়কে কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য প্রস্তুত করতে উৎপাদনমুখী কাজের প্রশিক্ষণও দেওয়া হচ্ছে। কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-২-এ সাবান উৎপাদন কার্যক্রম চলছে। উৎপাদিত সাবান বন্দি ও কারা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ব্যবহারের জন্য সরবরাহ করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে এ কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
বন্দিদের চিকিৎসাসেবা উন্নত করতেও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারে মানসম্মত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কারা সদর দপ্তরে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চিকিৎসা পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য একটি প্যাথলজি ল্যাব স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে। এ ছাড়া ৫৫ জন ডিপ্লোমা নার্সের পদায়নের জন্য সুপারিশ পাওয়া গেছে। তাদের পদায়ন হলে কারাগারের চিকিৎসাসেবার সক্ষমতা আরও বাড়বে।
কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-২-এ মিনারেল ড্রিংকিং ওয়াটার প্ল্যান্টের কাজও শেষ হয়েছে। সেখান থেকে বর্তমানে পানি সরবরাহ করা হচ্ছে।
আধুনিক কারা ব্যবস্থাপনার জন্য প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা গড়ে তোলার পাশাপাশি দক্ষ ও প্রশিক্ষিত জনবল প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে কারারক্ষী, প্রধান কারারক্ষী, সার্জেন্ট ইনস্ট্রাক্টর, ডেপুটি জেলার, জেলার ও জেল সুপারিনটেনডেন্টদের প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপারিনটেনডেন্ট ফারুক আহমেদ জানান, কারাগারে রুটি উৎপাদন আধুনিকায়নে চীন থেকে একটি ব্রেড মেকার মেশিন আনা হয়েছে। এটি স্থাপনের ফলে কম সময়ে বিপুলসংখ্যক বন্দির জন্য একই মানের স্বাস্থ্যসম্মত রুটি তৈরি করা সম্ভব হবে। এতে প্রচলিত পদ্ধতির ওপর নির্ভরশীলতাও কমবে।
বিশেষ দিনগুলোতে বন্দিদের খাবারের জন্য বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন কারাগারে খাবার প্রস্তুত ও পরিবেশনের ব্যবস্থাও আধুনিক করা হচ্ছে, যাতে খাবারের মান আরও উন্নত করা যায়।
কারাগারে বন্দিদের পোশাক, জুতা-স্যান্ডেল এবং বেকারি পণ্য তৈরির প্রশিক্ষণও দেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন দিবস ও বিশেষ উপলক্ষে খেলাধুলা, ধর্মীয় প্রশিক্ষণ এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হচ্ছে।
অবসরপ্রাপ্ত কারারক্ষীদের কল্যাণেও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকার নীতিগতভাবে অবসরপ্রাপ্ত কারারক্ষীদের জন্য আজীবন রেশন দেওয়ার সিদ্ধান্ত অনুমোদন করেছে। বর্তমানে সেটি বাস্তবায়নের কার্যক্রম চলছে।
কারাগারের নিরাপত্তা জোরদার, বন্দিদের পালিয়ে যাওয়া ঠেকানো, অনিয়ম প্রতিরোধ, দুর্যোগ মোকাবিলা এবং মানবিক সেবা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। দায়িত্ব পালনে অসাধারণ অবদান রাখা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পদক, প্রশংসাপত্র ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়ার কার্যক্রম আরও জোরদার করার উদ্যোগ রয়েছে।
কারাগারে মাদক প্রবেশ এবং মাদকসংক্রান্ত কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি নেওয়া হয়েছে। এ জন্য কারা সদর দপ্তরে ড্রাগ টেস্টিং মেশিনও সংগ্রহ করা হয়েছে।
কারাগারগুলোকে পরিবেশবান্ধব করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে সিলেট-১, কিশোরগঞ্জ-১ ও খুলনা নিউ জেলে তিনটি কারাগার মিলিয়ে মোট প্রায় ১৮ হাজার গাছ লাগানো হয়েছে।
কারা ব্যবস্থাপনায় মেধার ভিত্তিতে পদোন্নতি, আধুনিক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা ব্যবস্থা, বন্দিদের সংশোধন ও পুনর্বাসন, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কল্যাণ এবং পরিবেশবান্ধব কারা ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সামগ্রিকভাবে কারাগারকে শুধু বন্দি রাখার স্থান হিসেবে না দেখে সংশোধন ও পুনর্বাসনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলাই এসব উদ্যোগের লক্ষ্য। একই সঙ্গে কারা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দক্ষ ও মর্যাদাপূর্ণ পেশাজীবী হিসেবে গড়ে তোলা, কারা ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর মাধ্যমে কারাগার সম্পর্কে মানুষের প্রচলিত ধারণায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে চায় কর্তৃপক্ষ।