
বিশেষ প্রতিবেদক:
নারী কেলেঙ্কারীতে গত মে মাসে ভাইরাল হন কুমিল্লা স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী আবুল খায়ের। তার বিরুদ্ধে বেনামে ঠিকাদারী ব্যবসা, ভূয়া বিল-ভাউচার, পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়া, নি¤œমাণের কাজ করানোসহ বিবিধ প্রক্রিয়ায় সরকারি বরাদ্দ লোপাটের অভিযোগ উঠেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, এই প্রকৌশলী ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে ডিভিশনটিতে ৭০ এর অধিক আরএফকিউ করে নিজের পছন্দের ঠিকাদারদের দিয়ে নামকাওয়াস্তে কাজ করিয়ে প্রায় ২ কোটি টাকা লুটপাট ভাগ-বাটোয়ারা করেছেন। তার পছন্দের ওই ভাগ্যবান ঠিকাদারগণ হচ্ছে-টিএআরএস ইঞ্জিনিয়ারিং, ইলেকট্রিক পাওয়ার সলিউশন, মেসার্স রিতু এন্টারপ্রাইজ, জহির এন্টারপ্রাইজ, মেসার্স জসিম এন্টারপ্রাইজ, মেসার্স চৌধুরী করপোরেশন, মাস্টার এন্টারপ্রাইজ ও অক্টাগন পাওয়ার ইঞ্জিানয়ারিং। প্রতিষ্ঠানগুলো ওই আরএফকিউ এর ৪/৫টি করে কেউ কেউ এর চেয়েও বেশী সংখ্যক কাজ বাগিয়ে নিয়েছেন প্রকৌশলী আবুল খায়েরকে মোটা অংকের পার্সেন্টেজ দিয়ে। উল্লেখিত এলটিএম ওটিএম পদ্ধতির টেন্ডারেও অসংখ্য কাজ বাগিয়ে নিয়েছে বলে জানা গেছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত থাকছে পরবর্তীতে।
প্রকৌশলী আবুল খায়েরের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়ন, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ তুলেন তারই সহকর্মী কুমিল্লা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উচ্চমান সহকারী তাজমিনা আক্তার। গত ২৪ মে গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে তিনি অভিযোগ তুলেন দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্নভাবে তাকে কুপ্রস্তাব দিয়ে আসছেন তারই ঊর্ধ্বতন নির্বাহী প্রকৌশলী আবুল খায়ের। তবে ওই সময়ে অভিযোগ অস্বীকার করেন প্রকৌশলী আবুল খায়ের। এ বিষয়টি দ্রুতই নেট দুনিয়ায় ভাইরাল হয়ে যায়। এতে ওই উচ্চমান সহকারী তাজমিনা আক্তারকে বলতে শোনা যায়, নির্বাহী প্রকৌশলী আবুল খায়ের দীর্ঘদিন ধরে তাকে ব্যক্তিগতভাবে হয়রানি করে আসছিলেন। অফিসের কাজের অজুহাতে ছুটির দিনেও তাকে অফিসে ডাকতেন এবং বিভিন্নভাবে অনৈতিক প্রস্তাব দিতেন। এসব প্রস্তাবে সাড়া না দেওয়ায় তার প্রতি ক্ষুব্ধ ছিলেন নির্বাহী প্রকৌশলী। পাশাপাশি তিনি অফিসে নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও অপকর্মের সঙ্গেও জড়িত বলে অভিযোগ করেন তাজমিনা।
তিনি অফিস ভবনের তৃতীয় ও চতুর্থ তলা বাসার মতো ব্যবহার করেন, যদিও সরকারি অফিসে এভাবে বসবাসের নিয়ম নেই। ওই নারী আরও অভিযোগ করেন, ঠিকাদারি কাজের লটারির বিষয়ে প্রতিবাদ করায় গত ২১ মে তাকে নির্বাহী প্রকৌশলীর কক্ষে ডাকা হয়। সেখানে অফিসের বিভিন্ন স্তরের আরও সাতজন কর্মকর্তা-কর্মচারী ছিলেন। ওই সময় তাকে প্রকাশ্যে অপমান ও হেনস্তা করা হয়। একপর্যায়ে নির্বাহী প্রকৌশলী এক স্টাফকে তাকে ধরে রাখতে নির্দেশ দেন। পরে ওই স্টাফ তার দুই হাত চেপে ধরলে নির্বাহী প্রকৌশলী তার শরীরে হাত দেন এবং তাকে যৌন নির্যাতন করেন। তার দাবি, কোনো ধরনের বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই বিভিন্ন প্রকল্পের লটারি কার্যক্রম পরিচালনা করতেন।
ভুক্তভোগী ওই নারী আরো দাবি করেন, এ ঘটনার মাত্র ছয় ঘণ্টার মধ্যে তাকে পটুয়াখালী বদলি করা হয়, যা মূলত তাকে চুপ করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবি করেও ভূক্তভোগী কোন বিচার পাননি।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে নির্বাহী প্রকৌশলী আবুল খায়ের ওই সময়ে সাংবাদিকদের বলেন, 'ওই নারী আমাকে আমার কক্ষেই আটকে রেখেছিলেন। আমি নিজের নিরাপত্তার জন্য পুলিশ ডেকেছি। আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা।' প্রকৌশলী খায়েরের বিরুদ্ধে ইতোপূর্বে গাজীপুরে থাকতেও বিভিন্ন ধরণের অসামাজিক কর্মকান্ডের ঘটনা চাউর হয়ে উঠেছিলো। কিন্তু প্রতিবারই তিনি অবৈধ অর্থ ও রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে পার পেয়ে দুর্নীতি আর লুটপাটে ক্রমেসই অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠছেন।
প্রকৌশলী আবুল খায়েরের গাজীপুরে অঢেল সম্পদ
নির্বাহী প্রকৌশলী আবুল খায়েরের গাজীপুরে নামে-বেনামে অঢেল সম্পদের খবর পাওয়া গেছে। জমি, প্লট ও একাধিক ফ্ল্যাট থাকার কথা স্বীকার করে তার আয়কর নথিতে ওই সম্পদের বিবরণ দেওয়া আছে বলে তিনি সে সময়ে গণমাধ্যমে স্বীকার করেছেন। কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, স্বাস্থ্য বিভাগের একজন প্রকৌশলী তার মাসে বেতন-ভাতা কত? এ টাকায় তিনি গাজীপুর মহানগরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবাসিক এলাকায় তিনটি ফ্ল্যাট, উত্তর ছায়াবীথি এবং তেলীপায়ায় একাধিক প্লটসহ নামে-বেনামে তিনি অঢেল সম্পদের মালিক হলেন কিভাবে?
আবুল খায়ের প্রথমে তার জয়দেবপুর মৌজার লালমাটি এলাকার একটি নিজস্ব ফ্ল্যাটে পরিবার নিয়ে থাকার কথা স্বীকার করলেও উত্তর ও দক্ষিণ ছায়াবীথিতে তার কোনো ফ্ল্যাট নেই বলে অস্বীকার করেন।
পরবর্তীতে মহানগরের জয়দেবপুর মৌজার লালমাটিতে একটি প্লট ও জোরপুকুর-শ্মশান রোডের উত্তর ছায়াবীথি এবং দক্ষিণ ছায়াবীথি এলাকায় এনএন সার্ভিসেস অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডের নির্মাণাধীন পৃথক ভবনে দুটি ফ্ল্যাট বুকিং দেওয়ার বিষয়টি সচিত্র প্রমাণসহ জানতে চাইলে তিনি লালমাটির প্লট ও উত্তর ছায়াবীথির এনএন টাওয়ারে একটি প্লট বুকিং দিয়েছেন বলে স্বীকার করে বলেন, প্রতি মাসে এর জন্য তিনি ৫০ হাজার টাকা তার বেতন থেকে কিস্তি পরিশোধ করেন। কিন্তু একই কোম্পানির দক্ষিণ ছায়াবীথির অপর ভবনে ফ্ল্যাট বুকিংয়ের বিষয়টি তিনি অস্বীকার করেন। এছাড়াও উত্তরাতে তার বিলঅশবহুল এপার্টমেন্ট রয়েছে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়।
স্থানীয়রা জানান, আবুল খায়ের দুই বছর আগে শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসংলগ্ন কার্যালয়ে সহকারী স্বাস্থ্য প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি কুমিল্লায় বদলি হয়ে চলে গেলেও তার পরিবার রেখে যান গাজীপুরে। তিনি মাঝে মাঝে গাজীপুরে আসেন এবং তার চাকরির উপার্জনেই ওই পরিবার চলে। (ক্রমশ:)