
আসাদ মাহমুদ ও জামাল হোসেন:
বহুরূপী চরিত্রের অধিকারী প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক ডিজি) মো. শাহজামান খান তুহিনের বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম দুর্নীতি আর রুটপাটের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ১৯তম বিসিএসের মাধ্যমে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরে যোগদান করা মো. শাহজামান খান (তুহিন) বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পশুপালন বিষয়ে ডিগ্রীধারী। সম্মিলিত গ্রেডেশন অনুযায়ী তার গ্রেডেশন নং-৯৩৬। চাকরি জীবনে বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে পদোন্নতি প্রাপ্তিতে বিলম্ব ঘটলেও মো. শাহজামান খান (তুহিন) কুমিল্লা জেলা কৃত্রিম প্রজনন কেন্দ্রের উপ-পরিচালক (ডিডি) হিসাবে কর্মরত থাকাকালে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তখনকার মন্ত্রী শ. ম. রেজাউল করিমের সাথে বিশেষ সখ্যতা গড়ে তোলেন। আ’লীগের সাবেক মন্ত্রী মির্জা আজমের নিকট আত্মীয় পরিচয় দিয়ে এবং তাঁর কাছ থেকে আধা সরকারি পত্রের (ডিও লেটার) মাধ্যমে পরিচালক পদে পদোন্নতি বাগিয়ে বিসিএস লাইভস্টক একাডেমির পরিচালক নিযুক্ত হন। সেই সময় থেকে আওয়ামী সরকারের পতনের আগ পর্যন্ত নিয়মিত মির্জা আজমের ঢাকার ধানমন্ডির বাসায় যাতায়াত করতেন মো. শাহজামান খান তুহিন। এরপর তাকে আর পিছনে তাকাতে হয়নি। ক্ষমতার পট পরিবর্তনের সাথে সাথে নিজের বোল পাল্টে মো. শাহজামান খান (তুহিন) বাগিয়ে নেন কৃত্রিম প্রজনন দপ্তরের পরিচালকের পদ। তখন বিএনপিপন্থি প্রায় শতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী তার পদায়নের আদেশ বাতিলের দাবিতে অধিদপ্তর চত্বরে তাৎক্ষণিক বিক্ষোভ মিছিল করেন।

অনুসন্ধানে আরো জানা যায়, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের বর্তমান মহাপরিচালক মো. শাহজামান খান (তুহিন) সাভারে কর্মরত থাকাকালে প্রশিক্ষণ এবং আনুষঙ্গিক খাতের ৪০ শতাংশ অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। আ’লীগ আমলের শেষদিকে সাবেক মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী শ. ম. রেজাউল করিমকে ব্যবহার করে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর হতে বিশেষ বরাদ্দ নেন। প্রাপ্যতার বাইরে একটি পাজেরো জীপ গাড়িও বাগিয়ে নেন তিনি। ওই সময় প্রতিদিন এই সরকারি গাড়িটি ব্যবহার করে ঢাকা থেকে সাভারে যাতায়াত করতেন এবং সরকারের অনুমতি ছাড়াই নিজের ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করতেন। এছাড়াও কুমিল্লায় ডিডি থাকাকালে মো. শাহজামান খান (তুহিন) কৃত্রিম প্রজনন সেবাকর্মীদের মালামাল বিতরণকে কেন্দ্র করে মাথাপিছু মাসিক হাদিয়া তুলতেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
গণঅভ্যুত্থানের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সামনে অনুষ্ঠিত আ’লীগের শান্তি মিছিলে নেতৃত্ব দিয়েছেন প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক মো. শাহজামান খান (তুহিন), এই ছবি তার জলজ্যান্ত প্রমাণ।
শাহজামান খান কৃত্রিম প্রজনন দপ্তরের পরিচালক থাকাকালে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের অধীনে আউটসোর্সিং পদ্ধতিতে প্রতিটি উপজেলায় ১ জন করে এআই টেকনিশিয়ান নিয়োগের লক্ষ্যে অর্থ মন্ত্রণালয় ৪৯৫টি পদের অনুমোদন দেয়। আর এটিকে কাজে লাগিয়ে তিনি বড় অংকের ঘুষ বাণিজ্য করেন। প্রকল্পের অধীনে ইতিপূর্বে ৫২৭২ জন এআই টেকনিশিয়ান কর্মরত ছিলেন। কিন্তু প্রকল্পটি শেষ হয়ে যাওয়ায় তারা বেকার হয়ে পড়েন। এদের চাকরি স্থায়ী করার কথা বলে তখন জনপ্রতি ৫ হাজার টাকা করে মোট ২ কোটি ৬৩ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেন। বর্তমানে অর্থ মন্ত্রণালয় ৪৯৫টি পদের অনুমোদন দেওয়ায় এটিকে পুঁজি করে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মো. শাহজামান খান জনপ্রতি ১ লাখ টাকা করে প্রায় ৫ কোটি টাকা আদায় করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ এআই টেকনিশিয়ান কল্যাণ সমিতির কেন্দ্রীয় সভাপতি মো. আজাদ হোসেন ও ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মো. আলী জিন্নাহর মাধ্যমে এই টাকা আদায় হয়। আজাদ এবং জিন্নাহ উভয়ে রাজধানীর মিরপুরে অবস্থিত শাহজামান খান তুহিনের বাসায় নগদ এই ৫ কোটি টাকা অগ্রিম ঘুষ হিসেবে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন বলে নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে। প্রক্সি হিসেবে এই অর্থ সরবরাহ করেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় অবস্থিত গবাদিপশুর ঔষধ প্রস্তুতকারী কোম্পানি রিকন ও রিডন ল্যাবরেটরীজ লি.। এ সময় আরও দু’জন এআই টেকনিশিয়ান নেতাও উপস্থিত ছিলেন। যার ফলে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে এআই টেকনিশিয়ান নিয়োগ না হওয়ার আশংকা তৈরি হয়েছে।

শান্তি মিছিলের এই ছবিই ডিজি শাহজামানের স্বৈরাচারের সাথে যোগসূত্রতার জলজ্যান্ত প্রমাণ
আরো জানা গেছে, মো. শাহজামান খান ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালে প্রথমে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে পরে ছাত্রদলের রাজনীতির সাথে সক্রিয় হন। কিন্তু বিগত ফ্যাসিস্ট আমলে তিনি বঙ্গবন্ধু পরিষদে যোগদান করেন। গণঅভ্যুত্থানের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সামনে অনুষ্ঠিত আ’লীগের শান্তি মিছিলে নেতৃত্ব দিয়েছেন, এ ধরনের জাজ্জ্বল্য প্রমাণও রয়েছে। অথচ ৫ আগস্ট স্বৈরাচার হাসিনা সরকারের পতনের সাথে সাথে নিজেকে সবচেয়ে বড় জাতীয়তাবাদী দাবি করে কয়েক কোটি টাকা বিনিয়োগের মাধ্যমে জ্যৈষ্ঠ কর্মকর্তাদের ডিঙিয়ে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের (ভারপ্রাপ্ত) পদটি বাগিয়ে নিয়েছেন।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা জানান, অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক মো. শাহজামান খান এখন হয়ে উঠেছেন অপ্রতিরোধ্য। বর্তমানে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সকল পর্যায়ে চলছে এক ধরনের অরাজকতা। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের ৬ষ্ঠ গ্রেড পর্যন্ত প্রতিটি বদলি-পদায়ন হচ্ছে টাকার বিনিময়ে। ৫ম গ্রেড হতে তদুর্দ্ধ পর্যায়ের বদলি-পদায়নের ক্ষমতা মন্ত্রণালয়ের হাতে। কিন্তু সেগুলোও অধিকাংশই হয়ে থাকে অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের (ভারপ্রাপ্ত) ইশারা অনুযায়ী। অভিযোগ রয়েছে, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের উর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের সাথে তাঁর আচরণ অত্যন্ত ঔদ্ধত্যপূর্ণ। সাম্প্রতিক সময়ে মন্ত্রণালয়কে ভুল বুঝিয়ে মো. শাহজামান খান ভেটেরিনারি কাউন্সিল নির্বাচন বন্ধ করে দিয়েছেন।
সর্বশেষ, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর হতে উপসচিব পুলের জন্য কর্মকর্তা মনোনয়ন ও নাম প্রেরণে ব্যাপক অনিয়ম, জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন এবং স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক মো. শাহজামান খান তুহিনের বিরুদ্ধে বিসিএস (প্রাণিসম্পদ) ক্যাডারের জ্যেষ্ঠ ও যোগ্য কর্মকর্তাদের বাদ দিয়ে তাঁর পছন্দের জুনিয়র কর্মকর্তাদের নাম প্রস্তাব করার অভিযোগ উঠেছে। জানা যায়, উপ-সচিব পদে পদোন্নতির জন্য প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের আগ্রহী কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে মেধা, দক্ষতা ও জ্যেষ্ঠতার ক্রমানুসারে উপসচিব পুলের জন্য নাম প্রেরণের স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। তবে অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে জ্যেষ্ঠদের বাদ দিয়ে নিজের পছন্দের জুনিয়র কর্মকর্তাদের নাম প্রেরণ করেছেন। এমনও ঘটনা ঘটেছে, ৩৩তম ব্যাচের জুনিয়র কর্মকর্তাদের অনৈতিক সুবিধা দিতে গিয়ে উপসচিব পদের যাবতীয় শর্তাবলী পূরণকারী ৩০ এবং ৩১তম বিসিএস ক্যাডারের পুরো ব্যাচকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক সুচতুর মো. শাহজামান খান (তুহিন) সব সময় সুবিধাজনক অবস্থানে থাকার চেষ্টা করেন। এ ব্যাপারে কোনো নীতি-নৈতিকতার ধার-ধারেন না তিনি। আ’লীগ সরকারের আমলে তিনি ‘তুখোড়’ ‘বঙ্গবন্ধুর সৈনিক’ পরিচয়ে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরে দাপট দেখিয়েছেন। আবার ছাত্র জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর বোল পাল্টে হয়েছেন বিএনপিপন্থি পেশাজীবী শক্তি। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা দাবি করেছেন, মো. শাহজামান খান (তুহিন) একজন সুচতুর আওয়ামী সুবিধাভোগী ও দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা। তিনি বিগত আওয়ামী সরকারের সময় সার্বক্ষণিকভাবে আওয়ামী পেশাজীবী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এছাড়াও গত ৩০ ডিসেম্বর সাবেক তিনবারের প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে সারাদেশে যখন শোকের মাতম চলছিল ঠিক সেই সময় মো. শাহজামান খানের নেতৃত্বে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরে আনন্দ ভোজের আয়োজন করা হয়। সে আনন্দ ভোজ অনুষ্ঠানে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা অংশগ্রহণ করেন বলে জানা যায়। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করলে এর সত্যতা নিশ্চিত হওয়া যাবে। আ’লীগের শান্তি মিছিলে নেতৃত্বদানকারী এই মো. শাহজামান খান তুহিনই আগামী ২৬ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে একই মঞ্চে প্রাণিসম্পদ সেবা সপ্তাহের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করবেন। এমন প্রস্ততি চলছে। প্রাণিসম্পদ খাতে এ নিয়ে ব্যাপক কানাঘুষা চলছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। (ক্রমশঃ)