প্রিন্ট এর তারিখঃ May 1, 2026 ইং || প্রকাশের তারিখঃ Mar 2, 2026 ইং
গণপূর্ত’র প্রধান প্রকৌশলী কে? বদরুল না খালেকুজ্জামান!

জয়নাল আাবেদীন যশোরী ও আসাদ মাহমুদ॥ গণপূর্ত অধিদপ্তরে একজন জুনিয়র প্রকৌশলী চলতি দায়িত্বে প্রধান প্রকৌশলী করায় ভেঙ্গে পড়েছে চেইন অব কমান্ড। এই অবস্থাকে পুঁজি করে ত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা পর্দার আড়ালে গত নভেম্বর মাস থেকে দপ্তরটির সকল কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে আসছেন । অভিযুক্ত গুণধর ওই কর্মকর্তা হচ্ছেন অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ বদরুল আলম খান। অলিখিত দ্বৈত শাসনের কারণে ভূক্তভোগীরা প্রশ্ন তুলেছেন-অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী কে? প্রকৌশলী বদরুল না খালেকুজ্জামান। তথ্য সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্রের।
পাঁচজনকে ডিঙ্গিয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী পদে চলতি দায়িত্ব পেয়েছিলেন খালেকুজ্জামান চৌধুরী। সবার আশা ছিল অস্ট্রেলিয়ায় পড়াশোনা করা খালেকুজ্জামানের হাত ধরেই নিজেদের হারানো গৌরব উদ্ধার করতে পারবে গণপূর্ত অধিদপ্তর। কিন্তু তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী সাভার গণপূর্ত সার্কেলের সাবেক ও বর্তমানে ঢাকা ১নং সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ বদরুল আলম খানের অব্যাহত ‘বদ কর্মকান্ডে’ ডুবতে বসেছেন তিনিসহ গোটা গণপূর্ত অধিদপ্তর। বদরুলের এই বদকর্মে প্রশ্রয় রয়েছে বর্তমান সচিব নজরুল ইসলামেরও।
২০২৪ এর ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার দেশ ছেড়ে যাওয়ার আগে ফ্যাসিবাদ সরকারের ঘনিষ্টভাজন হিসেবে গণপূর্ত অধিদপ্তরে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছিলেন মোহাম্মদ বদরুল আলম খান। বাগিয়ে নিয়েছেন লোভনীয় সুযোগ-সুবিধা। তৎকালীন গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী ওবায়দুল মোকতাদির চৌধুরীর বাড়ির লোক হিসেবে পরিচিতি ছিল বদরুলের। একই এলাকায় বাড়ি হওয়ায় সে সময়ে নিয়োগ, বদলি নিয়ে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করতো। এর আগে ভোলার নির্বাহী প্রকৌশলী থাকার সুবাদে সাবেক মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদের সঙ্গেও দহরম-মহরম ছিল তার। এখনও ঘনিষ্টতা রয়েছে ভোলার ঠিকাদারদে সঙ্গে। তাদেরকে নিয়েই একটি লুটেরা সিন্ডিকেট করে ব্যবসা করার অভিযোগ রয়েছে বদেও স¤্রাট বদরুলের বিরুদ্ধে।
গত ২৮ অক্টোবর/২০২৫ গণপূর্ত অধিদপ্তরের চলতি দায়িত্বের প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মাদ শামীম আখতারকে সরিয়ে প্রধান প্রকৌশলীর রুটিন দায়িত্ব দেয়া হয় গণপূর্ত মেট্টো জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরীকে। এর একদিন পরে একই পদে চলতি দায়িত্ব দেয়া হয় তাকে। পাঁচজনকে ডিঙ্গিয়ে (সুপারসিড) প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব দেয়ায় গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রকৌশলী ও কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষোভ ও বিতর্কের সৃষ্টি হলেও দায়িত্ব নিয়ে খালেকুজ্জামান চৌধুরীর সাময়িক ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে সবার মধ্যে আস্থা তৈরী হয়েছিল। সেই আস্থায় গুড়েবালি দিচ্ছে তত্ত্ববধায়ক প্রকৌশলী বদরুলের একের পর এক বদ কর্মকান্ড। নিয়োগ বদলির ক্ষেত্রে বদরুলের একক নিয়ন্ত্রণ ঠেকাতে পারছেন না খালেকুজ্জামান নিজেই। সচিবের আস্কারা পেয়ে আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠেন বদরুল আলম। ফলে বদরুলের কাছে একেবারে অসহায় অবস্থায় পড়েছেন চলতি দায়িত্বে প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরী। বদলী পদোন্নতি নিয়োগ টেন্ডার ফান্ড ডিসবারসমেন্টসহ গণপূর্তে সকল কাজে বদরুলের কথা বা নির্দেশই অলিখিত সংবিধান হয়ে দাড়িয়েছে।
২৪ এর জুলাই আন্দোলনে পট পরিবর্তনের পর একেবারেই খোলস বদলে ফেলেন মোহাম্মদ বদরুল আলম খান। নিজেকে বিএনপি জামাতের ঘনিষ্ঠ হিসেবে প্রমাণ করতে একের পর এক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। মো. নজরুল ইসলাম সচিব হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে ‘বৃহত্তর কুমিল্লা’র লোক হিসেবে সচিবের অত্যন্ত কাছে পৌঁছে যান তিনি। সচিবের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্কের সূত্র ধরেই গণপূর্তের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেন বদরুল। পাঁচজনকে ডিঙ্গিয়ে প্রধান প্রকৌশলী পদে খালেকুজ্জামান চৌধুরী দায়িত্বে আসার পর থেকে তাকেও নিজ নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেন বদরুল। তার পরিকল্পনাতেই সকল বদলি ও পদোন্নতির কাজ অনেকটা পুতুলের মতোই করে যাচ্ছেন খালেকুজ্জামান। এ নিয়ে গণপূর্তের সকল স্তরের প্রকৌশলী ও কর্মকর্তার মধ্যে বিরাজ করছে চাপা ক্ষোভ অসন্তোষ বা উত্তেজনা। এর সূত্র ধরে প্রকৌশলী বদরুল আলমের বিরুদ্ধে ঝাড়– বা মশাল মিছিলের ন্যায় আন্দোলনের আশঙ্কা করছেন ভুক্তভোগীরা।
মোহাম্মদ বদরুল আলম খান গত বছরের পাঁচ আগস্ট থেকে একটি সিন্ডিকেট তৈরি করে গণপূর্তে ঠিকাদারি কাজ নিয়ন্ত্রণ করে আসছেন। গণপূর্তের প্রকৌশলীদের মধ্যে ঠিকাদারী করার ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন এই বদরুল। তিনি ভোলা, চট্টগ্রাম, ব্রাম্মণবাড়িয়াসহ বিভিন্ন এলাকার ঠিকাদারদের একটি শক্তিশালী গ্রুপ তৈরি করেছেন। যাতে ঢাকার স্থানীয় বিএনপি-জামাতের কথিত নেতারাও রয়েছে। ঢাকার বিভিন্ন ডিভিশন ছাড়াও চট্টগ্রাম, সিলেট ও কুমিল্লার প্রকৌশলীদের ভয় দেখিযে এই সিন্ডিকেটকে কাজ দিতে পর্দার আড়ালে থেকে পর্দার আড়ালে থেকে লাগাতার চাপ সৃষ্টি করছেন তিনি। গত ডিসেম্বরে কুমিল্লার ইএম-এর একটি টেন্ডারে ভুয়া সার্টিফিকেটধারী এক ঠিকাদারকে কাজ দিতে কুমিল্লার প্রকৌশলী এবং ঢাকার এমআইএস সেলের প্রকৌশলীকে অনৈতিক চাপ সৃষ্টি করেন। পরে এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এছাড়া মিরপুরে জনৈক আসিফ নামে এক নামধারী ঠিকাদারকে কাজ দিতে বিভিন্ন ডিভিশনে ফোন করে প্রকৌশলীদের বাধ্য করছেন এই বদের বাদশাহ বদরুল। ওই আসিফ ইতিমধ্যে পুলিশের বিভিন্ন থানার ভবন ও অন্যান্য সরকারি প্রকল্পে কাজ বাগিয়ে নিয়েছেন বদরুলের ক্ষমতা ও প্রভাব ব্যবহার করে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ‘ক’ ও ‘জ’ অদ্যক্ষরের দুই ঠিকাদার জানান, বদরুল আলম ও আসিফের মধ্যে ব্যবসায়িক সম্পর্ক রয়েছে। বদরুল আলম ফোনে বিভিন্ন নির্বাহী প্রকৌশলীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন এবং তাদেরকে চাপ দেন আসিফকে কাজ দিতে। মিরপুর পাইকপাড়া আবাসিক ভবন নির্মাণ প্রকল্পের আরবরিকালচার কাজ নিয়েও অভিযোগ আছে। ল্যান্ডস্কেপিং ও গাছ লাগানোর কাজ আরবরিকালচার বিভাগের দায়িত্বে থাকা সত্ত্বেও বদরুল আলম ওই কাজ মিরপুর বিভাগের মাধ্যমে টেন্ডার করান। যা সম্পূর্ণ অবৈধ। পুলিশের ১০৭ থানা নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় মিরপুর গণপূর্ত বিভাগের নিয়ন্ত্রণাধীন ভাষানটেক থানার কাজের টেন্ডারও তাঁর পছন্দের ঠিকাদারকে দিতে বাধ্য করেছেন। এছাড়াও বদরুল আলম ভাইদের দিয়ে ডেভেলপার ব্যাবসা করছেন প্রায় ২০বছর ধরে। একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে তার পেশাবহির্ভুত বদ কাজগুলো তদন্ত করলেই বদরুলের থলের কালো বেড়াল বেড়িয়ে আসবে।
ত্রয়োদশ নির্বাচনের পূর্বে বদরুলের বিতর্কিত কর্মকান্ডঃ সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ নির্বাচনের পুর্বে গত ৩ ফেব্রুয়ারী গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন শাখা -৭ থেকে জারিকৃত এক প্রঞ্জাপনে প্রকৌশলী বদরুপ বদরুলকে সাভার সার্কেল থেকে ঢাকা গণপূর্ত-১ নং সার্কেলে বদলী করা হয়। কিন্তু এই সার্কেলে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (কুমিল্লা) ওসমান গনিকে সুপারিশ করেছিলেন সচিব নজরুল ইসলাম। বিষয়টি গোপণে মাধ্যমে জানতে পেরে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর সৈয়দ আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ তাহেরকে প্রায় অর্ধকোটি টাকা ঘুষ দিয়ে তাকে দিয়ে গৃহায়ন ও গণপূর্ত উপদেষ্টাকে ম্যানেজ করে সচিবকে ফোন করান বদরুল। এ নিয়ে তোলপাড় হয় গোটা গণপূর্ত অধিদপ্তর। কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম থেকে নির্বাচন করা মুহাম্মদ তাহেরকে নির্বাচনী খরচ বাবদ গত ১০ ফেব্রুয়ারী রাতে গাড়ি ভর্তি করে ১কোটি টাকা পাঠান প্রকৌশলী বদরুƒল। পূর্ত ভবন থেকে সাভার সার্কেলের লাল গাড়িতে করে ওই দিন সন্ধার পরে টাকা পাঠিয়ে দেওয়া হয় তাহেরের বাসায়। প্রকৌশলী বদরুল মনে করেছিলেন জামায়াত নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করবে। কিন্তু ১২ ফেব্রুয়ারী নির্বাচনের পরে পরিস্থিতি পাল্টে গেলে প্রকৌশলী বদরুল আলম মির্জা আব্বাসের বাসায় গিয়ে দেখা করেন তিনি (আব্বাস) পূর্ত মন্ত্রী হচ্ছেন এমন ভেবে। এখন তিনি নিজ সিন্ডিকেটের লোকজন নিয়ে বর্তমান পূর্ত মন্ত্রীকে ম্যানেজ করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছেন।
এ ব্যাপারে মোহাম্মদ বদরুল আলম খানের মোবাইলে একাধিকবার যোগাযোগ করেও কান রেসপন্স না পাওয়ায় তার মতামত নেওয়া সম্ভব হয়নি।
আরো পড়ুন
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ বাঙালি সংবাদ