প্রিন্ট এর তারিখঃ Apr 25, 2026 ইং || প্রকাশের তারিখঃ Apr 24, 2026 ইং
গণপূর্ত’র কতিপয় প্রকৌশলীর পলায়ন: ৪ মাস পর উদয় হলেন ১ জন!

আসাদ মাহমুদ॥ গণপূর্ত অধিদপ্তরের কতিপয় প্রকৌশলী হঠাৎ করে উধাও হয়ে গেছেন। এদের দেখাদেখি অধিপ্তরের অন্যান্য বিতর্কিত আলোচিত সমালোচিত কর্মকর্তা উৎসাহ পাচ্ছেন উধাও হওয়ার বা পালিয়ে যাওয়ার জন্য। তথ্য সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্রের।
দীর্ঘদিন পালিয়ে থাকা বা অফিস থেকে বিনা অনুমতিতে অনুপস্থিত থাকা কর্মকর্তাদের মধ্যে দু’জনের নাম পরিচয় পাওয়া গেছে। তারা হলেন-ঢাকা গণপূর্ত-২ ও সর্বশেষ বাগেরহাট গণপূর্ত বিভাগের সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী শাহ আলম ফারুক চৌধুরী ও ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-৩ এর স্টাফ অফিসার (সহকারী প্রকৌশলী আবু শামস্ কায়সার চৌধুরী। এ তালিকায় নাম না জানা আরো কয়েক জন আছেন। এর মধ্যে আবু শামস কায়সার চৌধুরী প্রায় ৪ মাস পরে হঠাৎ করে অফিসে ফিরে আসেন। চাকরিতে জয়েন করার চেষ্টা করেন।

অফিসের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ডিসেম্বর ২০২৫ইং থেকে নিজ কর্মস্থলে অনুপস্থিত অভিযুক্ত ওই স্টাফ অফিসার। কিন্তু গত ২০ এপ্রিল ২০২৬ইং তারিখে তিনি হঠাৎ করে অফিসে এসে চাকরিতে পুনরায় জয়েন করার চেষ্টা করেন। কিন্তু বেঁকে বসেন নির্বাহী প্রকৌশলী মইনুল ইসলাম। তিনি ঊর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ব্যতিত অফিসে হাজিরা নেওয়া যাবে না বলে সহকারী প্রকৌশলী আবু শামস কায়সার চৌধুরীকে জানিয়ে দেন। এ নিয়ে টানাপোড়েন চলছে ঢাকা গণপূর্ত ৩নং বিভাগে। তার এই আকস্মিক অনুপস্থিতির কারণে ডিভিশনটিতে টেন্ডারসহ বিভিন্ন দাপ্তরিক কর্মকান্ডে এক ধরণের জটিলতা ও অনিশ্চয়তার তৈরী হয়। নির্বাহী প্রকৌশলীকে নিজের দাপ্তরিক কর্মকান্ড ছাড়াও টেন্ডার বিষয়ক কাজে বাড়তি দায়িত্ব পালন করতে হয়।
গত ১৩ জানুয়ারী ২০২৬ইং তারিখে নির্বাহী প্রকৌশলী মইনুল ইসলাম স্বাক্ষরিত একটি চিঠি পাঠানো হয় ঢাকা গণপূর্ত সার্কেল-২ এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও ঢাকা গণপূর্ত মেট্রাপলিটন জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর কাছে। ২৫.৩৬.২৬০০.২৩০.০০.২৩২১ স্মারকমূলে পাঠানো সে চিঠিতে ডিভিশনটিতে কর্মরত আবু শামস কায়সার চৌধুরী, সহকারী প্রকৌশলী (স্টাফ অফিসার-১), পরিচিতি নং ২০২০১০০১০০২৮, গত ২৪ ডিসেম্বর ২০২৬ থেকে বিনা অনুমতিতে কর্মস্থলে অনুপস্থিত আছেন বলে উল্লেখ করা হয়। ওই চিঠিতে অপর স্টাফ অফিসার-২ অসুস্থ বলে উল্লেখ করে ডিভিশনের কাজ চালিয়ে নেওয়ার সুবিধার্থে একজন সহকারী প্রকৌশলী (স্টাফ অফিসার) পদায়নের জন্য অনুরোধ করা হয়। ওই দাপ্তরিক চিঠি এই প্রতিবেদকের কাছে সংরক্ষিত আছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, এই দীর্ঘ ৪ মাস তিনি অনুমোদন ব্যতিত কানাডায় অবস্থান করেছেন। সেখানে স্ত্রী-সন্তানকে রেখে এসেছেন। দেশের বাইরে যাওয়ার জন্য তিনি সরকারি না ব্যক্তিগত, কোন ধরণের পাসপোর্ট ব্যবহার করেছেন-তা প্রশ্ন সাপেক্ষ বিষয়। আবার ৪ মাস পরে তিনি কেনই বা ফিরে এলেন এ নিয়ে কানাঘুষা চলছে ডিভিশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে। তিনি ইতোপূর্বে ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-২ এর স্টাফ অফিসার হিসাবেও কর্মরত ছিলেন। সেখানে টেন্ডার নিয়ে বিভিন্ন ধরণের অনিয়ম দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।

অপরদিকে একই সময় ধরে দপ্তরে অনুপস্থিত নির্বাহী প্রকৌশলী শাহ আলম ফারুক চৌধুরী। তিনি সর্বশেষ বাগেরহাট গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী পদে কর্মরত ছিলেন। বিগত লীগ সরকারের সময়ে দোর্দন্ড প্রভাবশালী এই গণপূর্ত কর্মকর্তা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় গণভবন ধানমন্ডির ৩২নং ও সুদাসদনের দায়িত্বে নিয়োজিত ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-২, রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগ, রমনা গণপূর্ত উপবিভাগ-১ সহ ঘুরেফিরে ঢাকাতেই ছিলেন চাকরির প্রায় পুরোটা সময়ে। আওয়ামী সরকারের প্রভাব বিস্তার করে বেনামী ঠিকাদারী ব্যবসাসহ বিভিন্ন অনিয়ম দুর্নীতির মাধ্যমে হাতিয়ে নিয়েছেন শতাধিক কোটি টাকা। সর্বশেষ ধানসন্ডির সোবাহানবাগ মসজিদ নির্মাণে অনিয়ম দুর্নীতির আশ্রয় নেওয়ার অভিযোগে ২০২৪ এর মার্চে তাকে বাগেরহাটে বদলী করা হয়। কিন্তু ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকে তিনিও উধাও। তার কোন খোঁজ পাচ্ছেন না গণপূর্ত অধিদপ্তর। কোন ধরণের ছুটির আবেদন ছাড়াই তিনিও পালিয়ে গেছেন বলে সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়।
অফিস পালানোর ক্ষেত্রে উল্লেখিত দুই কর্মকর্তা সরকারি অফিসের দায়িত্বে অবহেলা শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও পলায়ন উভয় দন্ডে দন্ডিত হতে পারেন বলে জনপ্রশাসন সংশ্লিস্টরা জানিয়েছেন। ‘সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮’-এ বলা হয়েছে- ৬০ দিন বা এর চেয়ে বেশি সময় বিনা অনুমতিতে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকা বা বিনা অনুমতিতে দেশত্যাগ এবং ৩০দিন বা এর চেয়ে বেশি সময় বিদেশে অবস্থান করা ‘পলায়ন’ হিসেবে গণ্য হবে। পলায়ন’ এর ক্ষেত্রে তিরস্কার ছাড়া যে কোনো গুরুদন্ড দেওয়া যাবে। বিধিমালায় সরকারি কর্মকর্তার-কর্মচারীদের বিভিন্ন অপরাধের জন্য লঘু এবং গুরুদন্ড দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। তিরস্কার পদোন্নতি বা বেতন বৃদ্ধি স্থগিত রাখা, দায়িত্বে অবহেলার কারণে সরকারের আর্থিক ক্ষতির সম্পূর্ণ অংশ বা অংশবিশেষ আদায়, বেতন গ্রেডের নিম্নতর ধাপে অবনমিত করা হচ্ছে লঘুদন্ড। অন্যদিকে গুরুদন্ডের মধ্যে রয়েছে- নিম্নপদ বা নিম্ন বেতন গ্রেডে অবনমিত করা, বাধ্যতামূলক অবসর প্রদান, চাকরি থেকে অপসারণ ও চাকরি থেকে বরখাস্ত করা। কেউ পলায়ন করলে তিরস্কার ছাড়া বাকি শাস্তিগুলোর যে কোনো একটি দেওযা যাবে বলে বিধিমালা উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ধরণের অপরাধে শাস্তির দৃষ্টান্ত: অনুমতি ছাড়া ৬৫দিন অনুপস্থিত থাকায় গত বছরের অক্টোবরে আবাসন পরিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ ফারুকুল ইসলামকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
উল্লেখিত গণপূর্ত কর্মকর্তাদের পলায়নের বিষয়ে প্রধান প্রকৌশলী জনাব খালেকুজ্জামন চৌধুরীর মোবাইলে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। ডিপার্টমেন্টের সংস্থাপন শাখার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী জনাব সারোয়ার জাহানের মেবাইলে এরকাধিকবার কল করলেও তিনি না ধরায় সতাসত নেওয়া সম্ভব হয়নি।
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ বাঙালি সংবাদ