প্রিন্ট এর তারিখঃ Apr 27, 2026 ইং || প্রকাশের তারিখঃ Apr 27, 2026 ইং
সিরাজগঞ্জ গণপূর্তে ফ্যাসিবাদি লুটপাট!

আসাদ মাহমুদ:
স্বৈরাচারের প্রেতাত্মা ও ফ্যাসিবাদ ভর করেছে সিরাজগঞ্জ গণপূর্তে। নির্বাহী প্রকৌশলী মাহমুদুল হাসান ফ্যাসিবাদকে ভালোবেসে স্বৈরাচারের রীতি-নীতি হৃদয়ে লালন-পালন করে পর্যায়ক্রমে আ’লীগের ঠিকাদারদের পূণ:বাসন করছেন ডিভিশনটিতে। এতে করে তিনি আর্থিকভাবে লাভান হওয়ার পাশাপাশি ফ্যাসিবাদকে মোটাতাজা করার অলিখিত দায়িত্ব নিয়েছেন বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় দু’জন ঠিকাদার জানিয়েছেন।
ডিভিশনটির টেন্ডার আইডি নম্বর ১১৭৩৮৫০। সিরাজগঞ্জ জেলা কারগারে ডিপ টিউবওয়েল বসানোর কাজ। সংশ্লিষ্ট কাজে অভিজ্ঞতা না থাকলেও মোটা অংকের পার্সেন্টেজ নিয়ে স্বৈরাচার সরকারের সাবেক মন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাকের ভাইয়ের প্রতিষ্ঠান বীথি কনস্ট্রাকশনকে টাঙ্গাইল থেকে ডেকে এনে কাজটি পাইয়ে দেন নির্বাহী প্রকৌশলী মাহমুদুল হাসান। কাজ পাওয়া প্রতিষ্ঠানটির সিমিলার ন্যাচার কাজের এক্সপেরিয়েন্স সহ দরপত্র মূল্যায়নের সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র চেয়ে তথ্যাধিকার আইনে আবেদন করা হয় গত জানুয়ারী মাসে। আবেদনের পরবর্তী সপ্তাহে সংশ্লিষ্ট সম্পাদককে ফোন করে নির্বাহী প্রকৌশলী কাগজপত্র পাঠাবেন বলে আশ^স্থ করেন। এ জন্য তিনি আরো এক সপ্তাহ সময় চেয়ে নেন। কিন্তু পরবর্তীতে এই নির্বাহী প্রকৌশলীর সাথে যোগাযোগ করলে আর কোন রেসপন্স পাওয়া যায়নি। তাই পত্রিকাটির পক্ষ থেকে পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। একইসাথে বর্তমান অর্থবছরে লুটপাটের উদ্দেশে ছোট ছোট কাজে বিভক্ত করে প্রায় সোয়া কোটি টাকা বরাদ্দে ৩৭টি আরএফকিউ’র সংস্থান রেখেছেন ডিভিশনের এপিপির সামগ্রীক বরাদ্দে মধ্যে। এ সকল কাজের বেশকিছু আরএফকিউ টেন্ডার কোটেশন কল করে ইতোমধ্যে কাজের বাস্তবায়ন দেখানো হয়েছে। এগুলো নিয়ে ব্যাপক অনিয়ম দুর্নীতির আভিযোগ বেশীরভাগ স্থানীয় ঠিকাদারদের মুখে মুখে।
শুধু তাই নয়, প্রকৌশলী মাহমুদুল হাসান ছাত্রলীগের সাবেক নেতা ও গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া নিবাসী দীন মোহাম্মাদের প্রতিষ্ঠান এসএ এন্টারপ্রাইজকে গত দুই অর্থবছরে লাভজনক অসংখ্য কাজ পাইয়ে দেন। চলতি অর্থবছরেও এ যাবৎ প্রায় সোয়া কোটি টাকার কাজ পাইয়ে দেওয়া হয়েছে অভিযুক্ত এই প্রতিষ্ঠানটিকে। এগুলোর মধ্যে টেন্ডার আইডি নং ১১৫১১৪৩ এর মাধ্যমে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৫০০ শয্যাবিশিষ্ট শহীদ মনসুর আলী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সাবষ্টেশন ভবন নির্মাণসহ ২৫০ কেভিএ সাবষ্টেশন যন্ত্রপাতি সরবরাহ স্থাপণ কাজটি এসএ এন্টারপ্রাইজকে পাইয়ে দেওয়া হয়। এর চুক্তিমূল্য হচ্ছে ৬৪ লক্ষ ৭শ’ ২৪ টাকা। টেন্ডার আইডি নং ১২১৩২৬১ এর মাধ্যমে সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসকের দপ্তরে এ-ব্লকে নীচতলা থেকে ৩য় তলা পর্যন্ত বারান্দায় ফেøার টাইলস স্থাপণ সিড়ির রেলিং পরিবর্তনসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় সিভিল স্যানিটারি মেরামত কাজটিও একই প্রক্রিয়ায় এসএ এন্টারপ্রাইজকে পাইয়ে দেওয়া হয়। এ কাজটির চুক্তিমূল্য হচ্ছে-১১ লক্ষ ৬১ হাজার ৮শ’ ১০ টাকা। ১২১৩২৭২ নং টেন্ডার আইডি’র মাধ্যমে ৯ লক্ষ ৮৪ হাজার ১শ’ ৮০ টাকা চুক্তিমূল্যে একই দপ্তরের বি-ব্লকে নীচতলা থেকে ২য় তলায় সিড়িতে টাইলস স্থাপনসহ সিড়ির রেইলিং পরিবর্তন ছাদের আংশিক প্যাটেন্টস্টোন করন কাজ; ১২১৩২৪৭ নং টেন্ডার আইডি’র মাধ্যমে ১৯ লক্ষ ৬১ হাজার ৫শ’ ২০ টাকা বরাদ্দে জেলা প্রশাসকের দপ্তরের সি-ব্লকে নীচতলা থেকে ২য় তলার সিড়ির টাইলস স্থাপন সিড়ির রেইলং পরিবর্তনসহ ছাদের প্যাটেন্টস্টোন করন এবং ১১৭৩৭৮৮নং টেন্ডার আইডি’র মাধ্যমে ১৩ লক্ষ ৬ হাজার ৩শ ২৯ টাকা চুক্তিমূল্যে সিরাজগঞ্জ জেলা কারাগারের ৬০০ বর্গফুট বিশিষ্ট আবাসিক ভবনের মেরামত ও নবায়ন কাজগুলো একই প্রক্রিয়ায় নিসিদ্ধ সংগঠন স্বৈরাচার ছাত্রলীগের নেতা দীন ইসলামের মালিকানাধীন এসএ এন্টারপ্রাইজকে পাইয়ে দেওয়া হয়। তবে কাজগুলো এসএ এন্টারপ্রাইজের নামে নির্বাহী প্রকৌশলী মাহমুদুল হাসান নিজেই দেখছেন বলে নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়। তিনি ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-১ এর স্টাফ অফিসার থাকতে টেন্ডার জালিয়াতির মাধ্যমে এসএস এন্টারপ্রাইজকে বিগত লীগ সরকারের আমলে শতাধিক কাজ পাইয়ে দিয়েছেন মোটা অংকের পার্সেন্টেজ নিয়ে। এ ধরণের টেন্ডার জালিয়াতি ও অনিয়ম দুর্নীতির কারণে এই প্রকৌশলীর পদোন্নতি দীর্ঘদিন স্থগিত থাকে বলে জানা গেছে। আওয়ামী সরকারের সাবেক পূর্তমন্ত্রী শরিফকে ম্যানেজ করে পদোন্নতি বাগিয়ে নিয়ে ২০২৩ এর নভেম্বরে সিরাজগঞ্জ ডিভিশনে পোষ্টিং নিয়ে দুর্নীতি আর লুটপাটের হোলিখেলায় মেতে উঠেন এই প্রকৌশলী। এর পর ২০২৪ ও ২০২৫ এর জুন ক্লোজিংয়ে ভূয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে প্রায় ৩কোটি টাকা এই প্রকৌশলী লোপাট করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়াও ১১৩৫৭২০ নং টেন্ডার আইডি’র মাধ্যমে বর্তমান অর্থবছরে আওয়ামী ঠিকাদার হিসেবে পরিচিত বাবর এসোসিয়েটস্ নামক ঢাকার ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে জেলা আনাসার ও ভিডিপি দপ্তরের অস্ত্রাগার ভবনের ৩য় তলা নির্মাণ কাজটি একই প্রক্রিয়ায় পাইয়ে দেওয়া হয়। এর চুক্তিমূল্য হচ্ছে হচ্ছে ৬৫ লক্ষ ২০ হাজার ৯শ’ ৭৮ দশমিক ছয় সাত আট টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদপ্তরের আওতায় সিরাজগঞ্জে ডিআইজি বিল্ডীং নির্মাণ প্রকল্পে ৫৯ লক্ষ ৩৭ হাজার ৭শ’ টাকা চুক্তিমূল্যে ডিপটিউবওয়েল স্থাপণ কাজ; একই অর্থবছরে ৮৭ লক্ষ ৯৮ হাজার ১শ’ ৭৪ টাকা চুক্তিমূল্যে ১১৩৩৫২৫নং টেন্ডার আইডি’র মাধ্যমে একই দপ্তরে সাবষ্টেশন ও জেনারেটর সরবরাহ ও স্থাপণ কাজটি এইচবি ট্রেডার্স লিঃ নামক প্রতিষ্ঠানকে পাইয়ে দেওয়া হয়: ১২৪৭০০০নং টেন্ডার আইডি’র মাধ্যমে ৫৭ লক্ষ ৪৫ হাজার ১শ’ ৭৬ টাকা চুক্তিমূল্যে সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসকের অফিসের রেকর্ডরুমের মেরামত কাজটি ঢাকার প্রতিষ্ঠান প্যাসিফিক ইঞ্জিনিয়ারস্ এন্ড সাপ্লায়ার্সকে পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ করেছেন স্থানীয় ঠিকাদাররা। একই অর্থবছরের ১২০৬৭৭৪ নং টেন্ডার আইডি’র মাধ্যমে ২ কোটি ৪২ লক্ষ ২৬ হাজার ৬শ’৩২ টাকা বরাদ্দে সিরাজগঞ্জ জেলার রাজগঞ্জ পুলিশ সার্কেল কাম রেসিডেন্স ভবন অবশিষ্ট নির্মাণ কাজটি মেসার্স পূর্বাঞ্চল ট্রেড নামক ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে পাইয়ে দেওয়া হয়। এ সকল কাজের টেন্ডার নিয়ে যেমনি ব্যাপক জাল-জালিয়াতির অভিযোগ আছে তেমনি কাজের গুণগত মান নিয়ে প্রত্যাশী সংস্থাগুলো বিভিন্ন ধরণের প্রশ্ন উত্থাপণ করেছে। তার এই বেপরোয়া লুটপাটে সহযোগীতা করছেন উপবিভাগীয় প্রকৌশলী (এসডিই) স্বৈরাচারের ভূত কল্যান কুমার কুন্ডু ও এসডিই ই/এম মিজানুর রহমান আকন। এ নিয়ে আমাদের বিস্তারিত অনুসন্ধান অব্যাহত আছে।
বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলার জন্য অভিযুক্ত নির্বাহী প্রকৌশলী মাহমুদুল হাসানের ব্যবহৃত মোবাইলে একাধিকবার ফোন দিলেও তিনি না ধরায় মতামত নেওয়া সম্ভব হয়নি। (ক্রমশঃ)
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ বাঙালি সংবাদ