প্রিন্ট এর তারিখঃ May 2, 2026 ইং || প্রকাশের তারিখঃ May 2, 2026 ইং
সিরাজগঞ্জ গণপূর্ত: যিনি প্রকৌশলী তিনিই ঠিকাদার!

আলামগীর হোসেন ও আসাদ মাহমুদ:
সিরাজগঞ্জ গণপূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ মাহমুদুল হাসান। গোপালগঞ্জ নিবাসী এই প্রকৌশলী নিজেই ডিভিশনটির আয়ন-ব্যয়ন কর্মকর্তা আবার তিনিই ঠিকাদার। অর্থ্যাৎ তিনি নিজে কাজ করে নিজ স্বাক্ষরেই আবার বিল নিচ্ছেন নিজের ইচ্ছেমতো। তথ্য সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্রের।
অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রকৌশলী মাহমুদুল হাসান ২০২৩ এর নভেম্বরে ডিভিশনটির দায়িত্বে এসে অদ্যাবধি নামে-বেনামে পরোক্ষভাবে ঠিকাদারী করে হাতিয়ে নিয়েছেন কয়েক কোটি টাকা। এক্ষেত্রে তিনি ঢাকা ও খুলনার কয়েকটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করেছেন। এ নিয়ে স্থানীয় ঠিকাদারদের সাথে তার সম্পর্ক সাপ ও বেজির মতো। নির্বাহী প্রকৌশলীর চেয়ারে বসেই যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও তিনি নিজ উপজেলার এক ঠিকাদার (ভূয়া মুক্তিযেদ্ধা) এর প্রতিষ্ঠান ‘দ্যা মাদার বিল্ডার্স’ এর নামে একাধিক কাজ পাইয়ে দেন। ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে ৯৩২২৫৪ নং টেন্ডার আইডি’র মাধ্যমে ৪ লক্ষ ৪৮ হাজার ৮শ’৩৬ দশমিক ছয় দুই চার টাকা চুক্তিমূল্যে সিরাজগঞ্জ শহরের ২নং পুলিশ আউটপোষ্টে একটি ডিপটিউবওয়েল বসানোর কাজটি নির্বাহী প্রকৌশলী তাকে পাইয়ে দিয়েছেন। অথচ প্রতিষ্ঠানটি পূর্বে এ ধরণের কোন কাজ করেনি বলে জানিয়েছে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দু’জন ঠিকাদার। তার আরো জানায়, এ কাজটি না করেই বিলে উঠিয়ে বরাদ্দকৃত অর্থ লোপাট করা হয়েছে। একই প্রতিষ্ঠানকে একই অর্থবছরে ২ লক্ষ ৯৩ হাজার ৫শ’৮৪ দশমিক চার ছয় আট টাকা বরাদ্দে সিরাজগঞ্জ চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট আদলত ভবনের বিশেষ কক্ষে অনার বোর্ড ও ফ্লাগস্ট্যান্ড স্থাপণসহ গ্যারেজের কলাপসিবল গেইটের সম্প্রসারণ ছাদে বসার ব্যবস্থা করার পাশাপাশি আনুসাঙ্গিক কাজটি পাইয়ে দেওয়া হয়। এই কাজের নামে শুধুমাত্র ফ্লাগষ্ট্যান্ড ও অনার বোর্ড স্থাপন করে পুরো টাকা উঠিয়ে ভাগাভাগি করার অভিযোগ রয়েছে নির্বাহী প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে। একই অর্থবছরে ৯৭৫৫৯৩নং টিআইডি’র মাধ্যমে ১৩ লক্ষ ৪৯ হাজার ৭শ’২০ টাকা চুক্তিমূল্যে সিরাজগঞ্জ সার্কিট হাউজের ১ ও ২নং ভিআইপি রুমের আধুনিকায়ণ কাজটি একই প্রতিষ্ঠানকে পাইয়ে দেওয়া হয়। তবে প্রতিষ্ঠানটির এ ধররণের কাজে কোন অতীত অভিজ্ঞতা ছিলো না বলে ‘ম’ অদ্যক্ষরের স্থানীয় এক ঠিকাদার জানিয়েছে। ৯৬৫২২১নং টিআইডি’র মাধ্যমে ২ লক্ষ ৬৯ হাজার ১শ’১৯ টাকা চুক্তিমূল্যে একই অর্থবছরে সিরাজগঞ্জ নার্সিং ইনস্টিটিউটের নীচতলায় মেরামত ও রংকরণ কাজ ও ৯৬৫২১৩ নং টিআইডি’র মাধ্যমে ২ লক্ষ ৬৯ হাজার ২শ’ ৩২ টাকা চুক্তিমূল্যে সিরাজগঞ্জ শহরের আমলাপাড়ায় অবস্থিত গণপূর্ত উপবিভাগীয় প্রকৌশলীর দপ্তর কাম আবাসিক ভবনের রংকরণসহ বাউন্ডারীওয়ালের মেরামত কাজ দু’টি একই প্রক্রিয়ায় পাইয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার ভূয়া মুক্তিযোদ্ধা আলী আকবরের সাথে এই প্রকৌশলীর টাকাপয়সার লেনদেন নিয়ে বনিবনা না হওয়ায় পরবর্তীতে তাকে আর কাজ দেওয়া হয়নি।
অপরদিকে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া নিবাসী সাবেক ছাত্রলীগ নেতা দীন ইসলামের প্রতিষ্ঠান এসএ এন্টারপ্রাইজের নামে প্রকৌশলী মাহমুদুল হাসান নিজেই করছেন ঠিকাদরী ব্যবসা। ডিভিশনটিতে বসে তিনি একের পর এক লাভজনক কাজগুলোা পাইয়ে দেন এই প্রতিষ্ঠানের নামে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় টেক্সটাইল ভোকেশনাল ইনস্টিটিউটের ৬তলা ফাউন্ডেশনে ৪তলা ভবন নির্মাণ কাজটি এমসিএল ও এসএ এন্টারপ্রাইজ জেভি নামক প্রতিষ্ঠানকে পাইয়ে দেওয়া হয়। কাজ পাইয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে এই নির্বাহী প্রকৌশলী মোটা অংকের ঘুষ বাণিজ্য করেছেন বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রকৌশলী জানিয়েছেন। একই প্রতিষ্ঠানকে একই অর্থবছরে ৯০৯২২৭নং টেন্ডার আইডি’র মাধ্যমে ২৩ কোটিরও অধিক টাকার চুক্তিমূল্যে বলেকুচি উপজেলা মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক সেন্টার স্থাপন কাজটি একই জয়েন্ট ভেঞ্চার প্রতিষ্ঠানকে পাইয়ে দেওয়া হয়। ৯০৯৯৯০নং টেন্ডার আইডি’র মাধ্যমে ২ কোটি ২৬ লক্ষ ৬হাজার ৪শ;’ ৭৭ টাকা চুক্তিমূল্যে ২০১৮-২০১৮ অর্থবছরের রায়গঞ্জ উপজেলা মডেল মসজিদের আরসিসি বাউন্ডারিওয়ালের অবশিষ্ট কাজের বাস্তাবয়নসহ প্রবেশ গেইট নির্মাণ কাজটি ওই এসএ এন্টারপাইজকে পাইয়ে দেন তিনি। প্রায় দ্বিগুণ ওভারইস্টিমেটেড এই কাজটি প্রকৌশলী মাহমুদুল হাসান নিজেই করেছেন বলে নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়। ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে ১০৯২০৯৯নং টেন্ডার আইডি’র মাধ্যমে ১৪ লক্ষ ৩৮ হাজার ৩শ’২ টাকা চুক্তিমূল্যে সিরাজগঞ্জ ডিসি অফিসের নীচ তলায় হাজতী রুমকে ভেঙ্গে ডিআরও রুম ও কোর্ট পরিদর্শকের কার্যালয়ে রুপান্তরকরণ কাজটিও এসএ এন্টারপ্রাইজকে পাইয়ে দেওয়া হয়।
অপরদিকে চলতি অর্থবছরেও এ যাবৎ প্রায় সোয়া কোটি টাকার কাজ পাইয়ে দেওয়া হয়েছে অভিযুক্ত এই প্রতিষ্ঠানটিকে। এগুলোর মধ্যে টেন্ডার আইডি নং ১১৫১১৪৩ এর মাধ্যমে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৫০০ শয্যাবিশিষ্ট শহীদ মনসুর আলী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সাবষ্টেশন ভবন নির্মাণসহ ২৫০ কেভিএ সাবষ্টেশন যন্ত্রপাতি সরবরাহ স্থাপণ কাজটি এসএ এন্টারপ্রাইজকে পাইয়ে দেওয়া হয়। এর চুক্তিমূল্য হচ্ছে ৬৪ লক্ষ ৭শ’ ২৪ টাকা। টেন্ডার আইডি নং ১২১৩২৬১ এর মাধ্যমে সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসকের দপ্তরে এ-ব্লকে নীচতলা থেকে ৩য় তলা পর্যন্ত বারান্দায় ফেøার টাইলস স্থাপণ সিড়ির রেলিং পরিবর্তনসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় সিভিল স্যানিটারি মেরামত কাজটিও একই প্রক্রিয়ায় এসএ এন্টারপ্রাইজকে পাইয়ে দেওয়া হয়। এ কাজটির চুক্তিমূল্য হচ্ছে-১১ লক্ষ ৬১ হাজার ৮শ’ ১০ টাকা। ১২১৩২৭২ নং টেন্ডার আইডি’র মাধ্যমে ৯ লক্ষ ৮৪ হাজার ১শ’ ৮০ টাকা চুক্তিমূল্যে একই দপ্তরের বি-ব্লকে নীচতলা থেকে ২য় তলায় সিড়িতে টাইলস স্থাপনসহ সিড়ির রেইলিং পরিবর্তন ছাদের আংশিক প্যাটেন্টস্টোন করন কাজ; ১২১৩২৪৭ নং টেন্ডার আইডি’র মাধ্যমে ১৯ লক্ষ ৬১ হাজার ৫শ’ ২০ টাকা বরাদ্দে জেলা প্রশাসকের দপ্তরের সি-ব্লকে নীচতলা থেকে ২য় তলার সিড়ির টাইলস স্থাপন সিড়ির রেইলং পরিবর্তনসহ ছাদের প্যাটেন্টস্টোন করন এবং ১১৭৩৭৮৮নং টেন্ডার আইডি’র মাধ্যমে ১৩ লক্ষ ৬ হাজার ৩শ ২৯ টাকা চুক্তিমূল্যে সিরাজগঞ্জ জেলা কারাগারের ৬০০ বর্গফুট বিশিষ্ট আবাসিক ভবনের মেরামত ও নবায়ন কাজগুলো একই প্রক্রিয়ায় নিসিদ্ধ সংগঠন স্বৈরাচার ছাত্রলীগের নেতা দীন ইসলামের মালিকানাধীন এসএ এন্টারপ্রাইজকে পাইয়ে দেওয়া হয়। ২০২৪ এর জুলাই আন্দোলনের পরে ঠিকাদার দীন ইসলামের নামে বেশ কয়েকটি মামলা হওয়ার পরে জনসম্মুখে আসছে না এই স্বৈরাচার ঠিকাদার। এমনকি তার বন্ধু গোপালগঞ্জের অনেক ঠিকাদার তাকে খুঁজে পাচ্ছে না। এই অবস্থায় তার ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের নামে দুর্নীতিবাজ লুটেরা নির্বাহী প্রকৌশলী মাহমুদুল হাসান কাজ পাইয়ে দিয়ে তিনি নিজেই উল্লেখিত কাজগুলোর বাস্তবায়ন দেখিয়ে বড় অংকের বরাদ্দ লেপাট করার ব্যবস্থা করেছেন। এই লুটেরা স্বৈরাচার প্রকৌশলী ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-১ এর স্টাফ অফিসার থাকতে টেন্ডার জালিয়াতির মাধ্যমে এসএস এন্টারপ্রাইজকে বিগত লীগ সরকারের আমলে শতাধিক কাজ পাইয়ে দিয়েছেন মোটা অংকের পার্সেন্টেজ নিয়ে। নির্মাণ মেরামত রক্ষণাবেক্ষণ কাজ নিয়ে ব্যাপক জালিয়াতি ও অনিয়ম দুর্নীতির কারণে এই প্রকৌশলী শের-ই-বাংলা নগর এলাকার এসডিই থাকতে তাকে আবার নীচের পদে নামিয়ে দেওয়া হয়। দীর্ঘদিন স্থগিত থাকে তার পদোন্নতি। তার ব্যাচমেটরা এখন ডিপার্টমেন্টের সিনিয়র নির্বাহী প্রকৌশলী। অবশেষে আওয়ামী সরকারের সাবেক পূর্তমন্ত্রী শরিফকে ম্যানেজ করে পদোন্নতি বাগিয়ে নিয়ে ২০২৩ এর নভেম্বরে সিরাজগঞ্জ ডিভিশনে পোষ্টিং নিয়ে দুর্নীতি আর লুটপাটের হোলিখেলায় মেতে উঠেন এই প্রকৌশলী। এর পর ২০২৪ ও ২০২৫ এর জুন ক্লোজিংয়ে প্রায় আড়াই কোটি টাকার আএফকিউসহ ভূয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে প্রায় ৩কোটি টাকা এই প্রকৌশলী লোপাট করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ঢাকার ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান বাবর এসোসিয়েটস্ এর নামেও অসংখ্য কাজ নিজেই বাস্তবায়নের দায়িত্ব নিয়েছেন এই নির্বাহী প্রকৌশলী। এ নিয়ে বিস্তারিত অনুসন্ধান সাপেক্ষে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন থাছে পরবর্তীতে।
একইসাথে বর্তমান অর্থবছরে লুটপাটের উদ্দেশে ছোট ছোট কাজে বিভক্ত করে প্রায় সোয়া কোটি টাকা বরাদ্দে ৩৭টি আরএফকিউ’র সংস্থান রেখেছেন ডিভিশনের এপিপির সামগ্রীক বরাদ্দে মধ্যে। এ সকল কাজের বেশকিছু আরএফকিউ টেন্ডার কোটেশন কল করে ইতোমধ্যে কাজের বাস্তবায়ন দেখানো হয়েছে। এগুলো নিয়ে ব্যাপক অনিয়ম দুর্নীতির আভিযোগ বেশীরভাগ স্থানীয় ঠিকাদারদের মুখে মুখে।
তার এই বেপরোয়া লুটপাটে আরো জড়িত আছেন উপবিভাগীয় প্রকৌশলী (এসডিই) স্বৈরাচারের ভূত কল্যান কুমার কুন্ডু ও এসডিই ই/এম মিজানুর রহমান আকন।
বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলার জন্য অভিযুক্ত নির্বাহী প্রকৌশলী মাহমুদুল হাসানের ব্যবহৃত মোবাইলে একাধিকবার ফোন দিলেও তিনি না ধরায় মতামত নেওয়া সম্ভব হয়নি। (ক্রমশঃ)
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ বাঙালি সংবাদ