
জয়নাল আবেদীন যশোরী ও আসাদ মাহমুদ:
গণপূর্ত ই/এম বিভাগ-৫ এর ইজিপি ও আইবাস আইডি নিয়ন্ত্রণ করছে একজন বহিরাগত। নির্বাহী প্রকৌশলীর এই আইডি ব্যবহার করে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ ও বিল-ভাউচার এন্ট্রি দিয়ে চেক পাশ করানোর অভিযোগ করেছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কতিপয় শোষিত বঞ্চিত ঠিকাদার।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ডিভিশনটির নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ তামজীদ হোসেন। তিনি নিজেই প্রকৌশলী আবার নিজেই ঠিকাদার। নিজের ঠিকাদারী ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের জন্য এই প্রকৌশলী নিজের সাথে সাথে চট্টগ্রাম থেকে বদলী করিয়ে নিয়ে এসেছেন ভাউচারের কর্মচারী মিঠু ও তাঁর বিজনেস পার্টনার কথিত ঠিকাদার দেলোয়ার হোসেন ভুট্টোকে। নির্বাহী প্রকৌশলীর ইজিপি ও আইবাস আইডির পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে কম্পিউটার অপারেটরের দায়িত্বে নিয়োজিত মিঠু অফিসে বসে টেন্ডার কন্ট্রোল ওয়ার্কঅর্ডার আপলোড বিল এন্ট্রির মতো যাবতীয় গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো ইচ্ছেমতো নিয়ন্ত্রণ করে নির্বাহী প্রকৌশলীর লুটপাটে সহযোগীতা করে নিজেকে ধন্য মনে করছে। ডিভিশনের আর্থিক বিষয়াদি নিয়ন্ত্রণের কাজে ব্যবহৃত আইবাস আইডিটি থাকার কথা হিসাব সেকশনের বিভাগীয় হিসাবরক্ষক ও ক্যাশিয়ারের কাছে। কিন্তু নির্বাহী প্রকৌশলী তাদেরকে বসিয়ে আর্থিক বিষয়টি পুরোপুরি নিজের নিয়ন্ত্রনে রাখার জন্য আইডটসোর্সিংয়ের কর্মচারী মিঠুকে দিয়ে কাজ করিয়ে নিচ্ছেন। এই মিঠু নির্বাহী প্রকৌশলীর ক্যাডার হিসাবে গণপূর্ত অধিদপ্তরে পরিচিত। প্রকৌশলী তামজীদ চট্টগ্রামে থাকতে একইভাবে কাজে লাগিয়েছেন মিঠুকে। সে সুবাদে ঢাকায় আসার সাথে সাথে প্রকৌশলী তামজীদ তাকে সাথে নিয়ে এসেছেন।

প্রকৌশলী তামজীদ নিজেই ঠিকাদার: প্রকৌশলী তামজীদের নামের পূর্বে সৈয়দ থাকলেও কাজে-কর্মে পুেেরাপুরি উল্টো। সরকারি বরাদ্দে সুষ্ঠু ব্যবহার কল্পে ‘সৈয়্যেদানা’ বা মুন্সিয়ানা দেখানোর পরিবর্তে তিনি লুটেরা বর্গির ভূমিকার নিজেকে পুরোপুরি ন্যাস্ত করেছেন। তিনি ডিভিশনটির আয়ন-ব্যয়ন কর্মকর্তা হওয়া সত্ত্বেও লুটপাটের নেশায় নিজেই নেমেছেন ঠিকাদারী ব্যবসায়। এজন্য নিজের সাহায্যকারি (গেটিস) হিসেবে চট্টগ্রাম থেকে হায়ার করে এনেছেন কথিত ঠিকাদার দেলোয়ার হোসেন ভুট্টোকে। ভূট্টো বিভিন্ন ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের নামে ডিভিশনের লাভজনক কাজগুলো প্রকৌশলী তামজীদের সহায়তায় বাস্তবায়ন করে আসছে। কোন ঠিকাদারের কাজে এসি লিফট সাবস্টেশন বা বৈদ্যুতিক মালামাল লাগলে তা নির্বাহী প্রকৌশলীর হুকুম তামিলকারী ভুট্ট্রোর নির্দেশিত বা প্রেসক্রাইব করা দোকান বা কোম্পানী থেকে ঠিকাদারকে কিনতে বাধ্য করা হয়। ঠিকাদার বেশী দামে মালামাল কিনলেও মোটা অংকের কমিশন চলে যায় নির্বাহী প্রকৌশলীর পকেটে। সাধারণ ঠিকাদারদের বেশীরভাগ বিল বকেয়া থাকলেও ভুট্টোর কোন বিল বকেয়া নেই। এই ভুট্টো ও তার সিন্ডিকেটের লোকদের প্রায় সাড়ে ৪কোটি টাকার বিল নির্বাহী প্রকৌশলী চলতি ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের প্রথম টার্মে পরিশোধ করেছেন বলে জানা গেছে। এর ফলে বেশীরভাগ ঠিকাদার কাজ করেও বিল না পেয়ে কায়ক্লেশে দিনাতিপাত করছে। এই লুটেরা দুর্নীতিবাজ প্রকৌশলী ডিভিশনটিতে এসে নিজের সিন্ডিকেটের ঠিকাদার দিয়ে এতো পরিমাণ কাজ করিয়েছেন যে, গত অর্থবছরের কাজগুলো এই অর্থবছরের এপিপিতে (বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনা) ঢুকাতে বাধ্য হয়েছে। গত ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরের প্রায় ৫ কোটি টাকার কাজ এই অর্থবছর (২০২৫-২০২৬) এর এপিপিতে তালিকাভূক্ত করা হয়েছে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়।
লুটপাটের সিন্ডিকেট: ডিভিশনটিতে লুটপাটের নেতৃত্বে আছেন নির্বাহী প্রকৌশলী তামজীদ হোসেন। আরো আছেন এই প্রকৌশলীর নিজস্ব লোক বা সাহায্যকারী গেটিস হিসাবে পরিচিত ভাউচার কর্মচারী মিঠু ও কথিত ঠিকাদার দেলোয়ার হোসেন ভুট্টো। নির্বাহী প্রকৌশলীর কথায় কথায় জি স্যার! বলা উপবিভাগীয় প্রকৌশলী (এসডিই) রাজিয়া সূলতানা। নির্বাহী প্রকৌশলীর প্রশ্রয়ে এই উপবিভাগীয় প্রকৌশলী সাবডিভিশনটিকে নিজের ঘুষ বাণিজ্য আর লুটপাটের সালতানাত মনে করছেন। অভিযুক্ত এই এসডিইকে নিয়ে বহু বিতর্ক চাউর হয়ে উঠেছে গণপূর্ত ঠিকাদার ও প্রকৌশলী মহলে। আরেক এসডিই সবুজ কুমার স্যানালও নির্বাহী প্রকৌশলীর কথার নড়চর করেন না। ঠিকাদারদের সাথে যাবতীয় অবৈধ লেনদেন এই দুই এসডিই করে থাকেন নির্বাহী প্রকৌশলীর হয়ে। তবে এগিয়ে আছেন এসডিই রাজিয়া সুলতানা। তার অবৈধ চাহিদা ও পার্সেন্টেজ বাণিজ্যের কাছে অসহায় হয়ে উঠেছেন সাধারণ ঠিকাদারগণ।
দুদক ও সাংবাদিক ম্যানেজের নামে চাঁদাবাজি: নিজের চুরিডিকশনে আওতায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও এনএসআই অফিস পড়ার কারণে তিনি নিজেকে সর্বসেবা মনে করেন। সহকর্মী প্রকৌশলীদের ভয় দেখিয়ে বা উখাপিত অভিযোগ/মামলা নিস্পতি করানোর আশ^াস দিয়েও কোটি টাকা চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে প্রকৌশলী তামজীদের বিরুদ্ধে। একইভাবে সাংবাদিক ম্যানেজ করার কথা বলেও লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেয়ার তথ্য প্রমাণাদি পাওয়া গেছে। প্রকৌশলী তামজীদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি জাল-জালিয়াতির অভিযোগগুলো ধামাচাঁপা দেয়ার বা ম্যানেজ করার কথা বলে টলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে একটি স্যাটেলাইট টিভি’র সাংবাদিক পরিচয়ে ‘ব’ ও ‘জ’ অদ্যক্ষরের দুই সাংবাদিক ১০ লক্ষ টাকা নেয় প্রকৌশলী তামজীদের কাছ থেকে। এই ধরণের অভিযোগ করেছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কতিপয় ঠিকাদার।
স্বৈরাচার পলাতক ঠিকাদারদের বিল পরিশোধ: ১৫% ক্ষেত্রবিশেষ ২০% নগদ উৎকোচ নিয়ে পলাতক ছাত্রলীগ য়ুবলীগ ঠিকাদারদের বকেয়া কয়েক কোটি টাকার বিল পরিশোধ করেছেন এই প্রকৌশলী। এখাতে তিনি হাতিয়ে নিয়েছেন প্রায় কোটি টাকা। এ নিয়ে বিস্তারিত অনুসন্ধান অব্যাহত আছে।
নির্বাহী প্রকৌশলীর পছন্দের ঠিকাদার: প্রকৌশলী তামজিদ একচেটিয়া কাজ পাইয়ে দিচ্ছেন নিজের পছন্দের ঠিকাদারদের। তার অতি পছন্দের এরকম কয়েকটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান হচ্ছে- মেসার্স একটিভ ইন্টারন্যাশনাল, আতিফ ট্রেডার্স, নাসিম এন্ড কোম্পানী এবং এমএস শুভ্রা ট্রেডার্সসহ এরকম আরো দুই/একটি প্রতিষ্ঠান। ঘুরেফিরে এই প্রতিষ্ঠানগুলোই ডিভিশনের প্রায় ৮০% কাজের বাস্তাবয়ন করে আসছে।
অনুসন্ধানে আরো জানা যায়, স্বৈরাচার লীগ সরকারের সময়ে চট্টগ্রামে থাকতে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমনে পৈশাচিক কায়দায় উস্কানী প্রদান ও অর্থ যোগানদাতা হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছিল তিনি। আওয়ামী/ছাত্রলীগ ক্যাডার পরিচয়ে বিগত সরকারের শাসনামলে বিশেষ সুবিধা গ্রহণ, নিজস্ব ঠিকাদারদের সমন্বয়ে সিন্ডিকেট গঠন, কাজ না করে ভূয়া বিল ভাউচার করে বিল উত্তোলন, বহিরাগত লোক দিয়ে অফিসে কাজ করানো, অনিয়ম দুর্নীতির মাধ্যমে অঢেল সম্পদ অর্জনসহ নানা অভিযোগ উঠে সে সময়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরে প্রকৌশলী তামজীদ হোসেনের বিরুদ্ধে। লাগাতার দুর্নীতির অভিযোগ থাকলেও আইনকে থোরাই কেয়ার করে রয়েছেন বহালতবিয়তে।
বিশ্বস্থ সূত্রে জানা গেছে, ৫অগাস্ট/২০২৪ আওয়ামী সরকারের পতনের শেষেরদিকে নির্বাহী প্রকৌশলী তামজীদ হোসেন চট্টগ্রামে কর্মরত ছিলেন। ওই সময় বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন পৈশাচিক কায়দায় দমনে উস্কানী প্রদান ও অর্থায়ন করার অভিযোগ ছিল তামজীদের বিরুদ্ধে। সরকার পতনের পর জনগণের রোষাণলে পড়ে তাঁর চট্টগ্রামে থাকা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। অবস্থা বেগতিক দেখে বিপুল অর্থযোগে তদবির করে গণপূর্ত অধিদপ্তরের ই/এম সার্কেল-২ এর অধিনে ই/এম বিভাগ-৫ এ বদলি হয়ে আসেন। তামজীদের ঢাকায় বদলি হওয়ার ক্ষেত্রে গণপূর্ত অধিদপ্তরের একজন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সহযোগিতা করেছেন বলে একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র দাবি করেছে। নানা দুর্নীতির অভিযোগ থাকা ওই তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী চট্টগ্রামে থাকাকালীন তামজীদ তাঁর অধীনে কর্মরত ছিলেন। ওই সখ্যতার মাধ্যমে একান্ত অনুগত হয়ে ওঠা শিষ্যকে নিজের সার্কেলের অধীনে এনে সিন্ডিকেটটি শক্তিশালী করে গড়ে তোলেন তিনি। তামজিদ একা ঢাকায় বদলি হয়ে আসেননি। তাঁর সঙ্গে চট্টগ্রামের একাধিক আস্থাভাজন ঠিকাদারদেরও নিয়ে এসেছেন। গড়ে তুলেছেন নিজস্ব বলয়। দুর্নীতিবাজ ঠিকাদার সিন্ডিকেট। বিশেষ করে তাঁর ক্যাডার খ্যাত মিঠুকে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় নিয়ে আসেন। বিদ্যমান আইনের বিধি লঙ্ঘন করে মিঠুকে অফিসে বসিয়ে কাজ করাচ্ছেন। মিঠু অফিসে রুম বরাদ্দ দিয়ে কাজ করানোর কারণে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ডিভিশনটির বেশীরভাগ কর্মচারী।
এদিকে ওই ঘটনার জেরে গত ১৯ ডিসেম্বর/২০২৪ইং ই/এম বিভাগ-৫ এর সংক্ষুব্ধ ১০ জন কর্মচারী নির্বাহী প্রকৌশলী বরাবর লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। আবেদনে তারা মিঠুকে অফিস থেকে বের করে দিয়ে কাজের সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানান। আবেদন করার পর কর্মচারীদের উপর ক্ষিপ্ত হয়ে উল্টো মিঠুনকে অফিসে বহাল রেখেছেন তিনি। অভিযোগকারীদের উপর চড়াও হওয়ায় তামজীদ এর স্বেচ্ছাচারিতা দৃশ্যমান হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মচারী বলেন, আমরা অভিযোগ করার কারণে মিঠুন ও তামজিদ হোসেন আমাদের বদলি, বরখাস্ত করাসহ নানাবিধ হয়রানির হুমকি দিয়ে আসছিল। এ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার জন্যে গণপূর্ত উপদেষ্টা, সচিব ও প্রধান প্রকৌশলীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন ই/এম বিভাগ ৫ এর সংক্ষুব্ধ কর্মচারিগণ। তামজীদ হোসেন আওয়ামী পৃষ্ঠপোষকতায় ২০১৩ সালে গণপূর্ত অধিদপ্তরে যোগদান করেন। একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করেছেন। চাকরির শুরু থেকে আওয়ামী রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থেকে অগাধ সুযোগ-সুবিধা বাগিয়ে নিয়েছেন তিনি। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর ভোল পাল্টে সুযোগ-সুবিধা নেয়ার চেষ্টা করছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র দাবি করছে। তামজিদ হোসেন প্রায় এক যুগ চাকুরি জীবনে অনিয়ম দুর্নীতির মাধ্যমে প্লট, ফ্ল্যাট, গাড়িসহ অঢেল বিত্ত বৈভবের মালিক হয়েছেন বলে একটি সূূত্র দাবি করছেন। তার অর্জিত সম্পদ জ্ঞাত আয়ের সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ। তামজীদ হোসেন ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের জাতীয় পরিচয়পত্রের বিপরীতে দুর্নীতি দমন কমিশন অনুসন্ধান করলে জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদের সন্ধান পাওয়া যাবে বলে সংশ্লিষ্ট মহল দাবি করছেন।
বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলার জন্য তার দপ্তরে গেলে তিনি গতানুগুতিকভাবে সবকিছু অস্বীকার করে নিজেকে একজন অতি সাধারণ কর্মকর্তা হিসাবে উপস্থাপন করেন। (ক্রমশ:)