
আলমগীর হোসেন ও জয়নাল আবেদীন যশোরী:
ভ্যালুয়েশন বাণিজ্য করে কোটিপতিতে পরিণত হয়েছেন শরিয়তপুর গণপূর্ত বিভাগের কতিপয় প্রকৌশলী। ডিভিশনটির এ ধরণের কর্মকর্তাদের মধ্যে নির্বাহী প্রকৌশলী শারমীন আখতার, উপবিভাগীয় প্রকৌশলী (এসডিই) শফিকুল ইসলাম, উপসহকারী প্রকৌশলী ওবায়দুর রহমান ও তিমির কুমার মন্ডল (বর্তমানে মহাখালী ডিভিশন) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। শরিয়তপুর-চাঁদপুর ও শরিয়তপুর-পদ্মা সংযোগ সড়ক প্রকল্পে অধিগৃহনকৃত জমির ওপরে নির্মিত বিভিন্ন স্থাপণার মূল্য নির্ধারণে দ্বিগুণ/তিনগুণ বাড়িয়ে দিয়ে ১০% অর্থ নগদ হাতিয়ে নিয়ে তারা প্রত্যেকেই কোটিপতিতে রুপান্তরিত হয়েছেন এবং আরো হচ্ছেন। প্রকৌশলীদের মৌখিক নির্দেশ মতো এই টাকা উঠানোর দায়িত্বে ছিলেন ডিভিশনটির পিওন জুলহাস প্যাদা। অধিগ্রহণকৃত জমিতে স্থাপনার মূল্য দ্বিগুণ বাড়িয়ে দেয়ার বিষয়ে তাকে নিয়ে সুনিদিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে লিখিত অভিযোগ দাখিল হলে সতর্ক হয়ে যায় দুর্নীতিবাজ ঘুষখোড় গণপূর্ত কর্মকর্তারা। কথিত তদন্ত কমিটির নামে ঘুষ বাণিজ্যে/ভ্যালুয়েশন বাণিজ্যে নেতৃত্ব দেওয়া কর্মকর্তা উপবিভাগীয় প্রকৌশলী শফিকুল ইসলামকেই তদন্ত কমিটির প্রধান হিসাবে নিয়োগ দিয়ে কথিত তদন্তের নামে তাকে মাদারীপুরে বদলী করিয়ে দেওয়া হয়। এতে করে দোষী দুর্নীতিবাজ পার্সেন্টেজখোড় প্রকৌশলীরা রয়ে যান ধরাছোয়ার বাইরে। দৃশ্যপটে পিওন জুলহাস প্যাদাকে বলির পাঠা বানিয়ে নাটক মঞ্চায়ন করা হলেও ঘুৃষ বাণিজ্যের নেপথ্য নায়ক এসডিই শফিকুল ইসলামসহ সিন্ডিকেট সদস্যরা আড়ালেই থেকে গেছেন। তথ্য সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্রের।

অনুসন্ধানে জানা যায়, শরীয়তপুর-চাঁদপুর আঞ্চলিক মহাসড়ককে চারলেনে উন্নীত করার লক্ষ্যে সরকার জমি অধিগ্রহণ শুরু করে স্বৈরাচার লীগ সরকারের শেষ টার্মে। লীগ সরকারের মেয়াদকালেই ৭ ধারার নোটিশ হয় অধিকাংশ স্থাপনার। মহাসড়কের ভেদরগঞ্জের চরগাজিপুর অংশে গণপূর্ত বিভাগের পিয়ন জুলহাস প্যাদাকে ১০% ঘুস দিলেই বিল হবে দ্বিগুণ এমনটাই প্রচলিত ছিলো সে সময়ে। তাজির সরদার নামে একজন ওই সময়ে উল্লেখ করেন, তাকে স্থাপনার বিল দ্বিগুণ করে আট লাখ টাকা বাড়িয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে প্রথমবার ১০% কমিশনের ৬০ হাজার টাকা ঘুস নেন জুলহাস প্যাদা। পরে তিন মাসের মধ্য ৮ ধারার নোটিশ পাইয়ে দেওয়ার কথা ছিল। তবে ৯ মাস পেরুলেও ৮ ধারার নোটিশ করাতে পারেননি জুলহাস। তবে ৮ ধারার নোটিশ করাতে না পরলেও তিনি আরও ২০ হাজার টাকা দাবি করছেন। বিষয়গুলো নিয়ে আগস্ট/২০২৫ এ একটি প্রভাবশালী দৈনিকে জুলহাসকে নিয়ে তথ্যবহুল সংবাদ প্রকাশিত হয়।
অনুসন্ধানে জানা যায়, জুলহাস প্যাদা ওই এলাকা থেকে বিভিন্নজনের কাছ থেকে স্থাপনার বিল দ্বিগুণ কোন কোন ক্ষেত্রে তিনগুণ বাড়িয়ে দেওয়ার কথা বলে প্রায় কোটি টাকা ঘুষ আদায় করে উল্লেখিত প্রকৌশলীদের কাছে পৌছে দিয়ে দ্বিগুণ তিনগুণ এমনকি খালি জায়গায় স্থাপনা দেখিয়ে ভ্যালুয়েশন করিয়ে নিয়েছেন।
সদর উপজেলার চরকাশাভোগ এলাকা থেকে সড়কটি শুরু হয়েছে। অতিরিক্ত ক্ষতিপূরণ পাওয়ার আশায় এখানে নিজের জমিতে দুটি টিনশেডের ঘর নির্মাণ করেছিলেন শাহিদা বেগম। এলএ শাখা স্থাপনা দুটিকে জনস্বার্থবিরোধী তালিকাভূক্ত করে ক্ষতিপূরণের তালিকা থেকে বাদ দেয়। কয়েক লক্ষ টাকার বিনিময়ে গণপূর্ত’র মাধ্যমে ভ্যালুয়েশন করিয়ে এ নিয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে আপত্তি দাখিল করেন শাহিদা। জেলা প্রশাসকের পক্ষে শুনানির পর তাঁকে ক্ষতিপূরণ বাবদ ৪৫ লাখ ৮১ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। এভাবে আইনের তোয়াক্কা না করে ভ্যালুয়েশন রি-ভ্যালুয়েশনের জোড়ে এলএ শাখা সড়কটির ১৯টি এলএ কেসের অন্তত ১২০টি আপত্তি নিজেরাই নিষ্পত্তি করেছে বলে জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে।
ইতোপূর্বে চরকাশাভোগ এলাকায় গিয়ে ৪৫ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ নেওয়া শাহিদার ঘর দুটিকে দেখতে পাওয়া যায়নি। তিনিও বাড়িতে ছিলেন না। শাহিদার ছেলে শফিকুল ইসলাম গনমাধ্যমকে বলেন, সড়কটি নির্মাণের খবর পেয়ে তাঁর বাবা ঘর দুটি নির্মাণ করেছিলেন। ক্ষতিপূরণের টাকা পাওয়ার পর সরকারের কাছ থেকে ঘরগুলো কিনে নিয়ে তাঁরা ভেঙে ফেলেন। একইভাবে সদর উপজেলার দক্ষিণ মধ্যপাড়া এলাকার চান শরিফ মোল্যার জমিতে একটি দোতলা ভবনের ওপর আংশিকভাবে তৃতীয় তলা নির্মাণ করা ছিল। সেই স্থাপনার বিপরীতে ভ্যালয়েশনের জোড়ে জেলা প্রশাসন তাঁকে ক্ষতিপূরণ বাবদ ১ কোটি ৮৬ লাখ টাকা দিয়েছে। সরেজমিন সেই স্থাপনাটি আর খুঁজে পায়নি গণমাধ্যম কর্মীরা।
ওই এলাকায় মোস্তফা সরদার নামের এক ব্যক্তির অধিগ্রহণ করা জমিতে পাকা ভবনসহ ছয়টি অবকাঠামো ছিল। এলএ শাখা তাঁকে ক্ষতিপূরণ বাবদ ৪৪ লাখ টাকা দিয়েছে। বর্তমানে সেখানে কোনো স্থাপনা নেই। এখন অধিগ্রহণ করা জমিতে অনুমতি না নিয়ে এলপিজি পাম্প বসিয়েছেন মোস্তফা সরদার। তিনি বলেন, ‘ক্ষতিপূরণের টাকা পাওয়ার পর সরকারি অফিসের লোকজন স্থাপনাগুলো বিক্রি করে দিচ্ছিল। তাই আমরা কিনে নিয়েছি। সেই স্থাপনা সরিয়ে নিয়ে পাম্প চালু করেছি।’
একইভাবে শরীয়তপুরের জাজিরার নাওডোবা প্রান্ত থেকে জেলা শহর পর্যন্ত ২৭ কিলোমিটার এলাকায় পদ্মা সেতু অ্যাপ্রোচ সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের জমি ও স্থাপনা অধিগ্রহণে ডিভিশনটির সাবেক উপসহকারী প্রকৌশলী তিমির কুমার মন্ডল তিনগুণ/চারগুণ ভ্যালুয়েশন করে ১০% কোন কোন ক্ষেত্রে ১৫% হারে কয়েক কোটি টাকা ঘুষ বাণিজ্য করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সে টাকার কিছু অংশ বিনিয়োগ করে তিনি লোভনীয় পোষ্টিং নিয়ে বর্তমানে মহখালী ডিভিশনে কর্মরত আছেন। সড়কটির কিছু অংশের ভ্যালুয়েশন গত বছরে হয়েছে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে।
‘ভূতুড়ে’ স্থাপনার বিপরীতে ক্ষতিপূরণের অভিযোগ
ভূমি অধিগ্রহণকে ঘিরে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে তথাকথিত ‘ভূতুড়ে বিল’ নিয়ে। অভিযোগ অনুযায়ী, জেলা প্রশাসনের ভূমি অধিগ্রহণ (এলএ) শাখার ভিডিও জরিপের আগে ও পরে স্থানীয় একটি চক্র ফাঁকা জমিতে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ করে। পরে সেসব স্থাপনাকে গণপূর্তর মাধ্যমে ভ্যালুয়েশন করিয়ে বৈধ দেখিয়ে ক্ষতিপূরণ পাইয়ে দেওয়া হয়।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ভিডিও জরিপে না থাকা কিংবা প্রকল্প নকশার বাইরে থাকা স্থাপনাগুলোর বিপরীতেও বিল প্রস্তুুত করা হয়েছে।
ভিডিওতে একতলা বিলে দুইতলা
ভেদরগঞ্জ উপজেলার চরতারবুনিয়া মৌজায় শফিকুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তির জমিতে ভিডিও জরিপে একতলা ভবন দেখা গেলেও ক্ষতিপূরণ নির্ধারণের সময় গণপূর্ত প্রকৌশলীদের ক্যারিশমায় সেখানে দ্বিতীয় তলায় আধাপাকা টিনশেড ঘর দেখানো হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে অতিরিক্ত প্রায় ২০ লাখ টাকার বিল তৈরি করা হয়েছে বলে দাবি স্থানীয় সূত্রের।
অপরদিকে, ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে পালিয়ে যাওয়া হাসিনা পরিবারের বউমা হিসাবে পরিচিত ডিভিশনটির নির্বাহী প্রকৌশলী শারমিন আকতারের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরেই কোটি কোটি টাকা লুটপাটের অভিযোগ রয়েছে। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে মানিকগঞ্জ গণপূর্ত বিভাগে যোগদানের পরপরই শারমিন আকতার বিভাগটিকে দুর্নীতি ও অনিয়মের আখড়ায় পরিণত করেন। আন্দোলনের পর ১৩ আগস্ট তাকে ওএসডি করা হলেও অদৃশ্য শক্তির ইশারায় ১৫ দিনের মধ্যেই উত্তরা অ্যাপার্টমেন্ট নির্মাণ প্রকল্পে বদলি করা হয়। এর প্রায় ২ মাসের মাথায় ৩ অক্টোবর তাকে গাজীপুর গণপূর্ত বিভাগে পদায়ন করা হলে স্থানীয়দের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও অন্তোষ সৃষ্টি হয়। অভিযোগ রয়েছে, শারমিন আকতারের স্বামী প্রকৌশলী মোহাম্মদ জুয়েল ও অধিনস্থ এসডিইকে নিয়ে একটি লুটেরা সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন সেখানে। তার স্বামী ইঞ্জিনিয়ার জুয়েল মেসার্স বাবর এসোসিয়েটস ও এসএ এন্টারপ্রাইজ নামের দুটি লাইসেন্স ব্যবহার করে নিজেই ঠিকাদারি ব্যবসায় নেমে পড়েন। প্রকৃতপক্ষে সে সময়ে ওই বিভাগের অধিকাংশ কাজই তাদের পরিবার ও সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। পিপিআরের নিয়ম ভঙ্গ করে অসংখ্য টেন্ডার মাত্র কয়েক ঘণ্টার জন্য খোলা রাখা হয় শুধু পছন্দের ঠিকাদারকে সুবিধা পাইয়ে দিতে। উদাহরণস্বরূপ, টেন্ডার আইডি নং ১৯৮৪৬৪, ১৯৮৪৬০ ও ১৯৮৪৫৬ মাত্র ৪ ঘণ্টার জন্য খোলা রাখা হয় এবং সেদিন রাতেই নিষ্পত্তি করে দেওয়া হয়। এমনকি ব্যাংকিং আওয়ারের বাইরেও টেন্ডার নিষ্পত্তির নজির গড়েছেন এই নারী প্রকৌশলী।
মানিকগঞ্জ সমন্বিত অফিস ভবন নির্মাণ প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার এক মাস আগেও ফার্নিচার কেনার নামে টেন্ডার করা হয়। অথচ পরে দেখা যায়, কোনো ফার্নিচার কেনাই হয়নি। টেন্ডারের অর্থ সরাসরি ভাগাভাগি করে আত্মসাৎ করা হয়।
২০২৪ সালের জানুয়ারিতে মানিকগঞ্জ পৌরসভার কাউন্সিলর কবির হোসেন লিখিতভাবে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, সচিব ও প্রধান প্রকৌশলীর কাছে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ দাখিল করেন। কিন্তু ‘গোপালী সচিব’-এর ইশারায় সব অভিযোগ ওই সময়ে ধামাচাপা পড়ে যায়। স্থানীয় ঠিকাদারদের প্রতিবাদ দমাতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাই শেখ সেলিমের প্রভাব খাটিয়ে গুন্ডাবাহিনী ব্যবহার করা হয়। ফলে ঠিকাদাররা ভয়ে মুখ খুলতে সাহস পাননি সে সময়ে।
একই প্রক্রিয়ায় বর্তমানে শরিয়তপুরেও এই প্রকৌশলী স্বামীকে দিয়ে ব্যবসা করিয়ে আসছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রকৌশলী জুয়েল স্থানীয় শেখ এন্টারপ্রাইজ ও কান্তা ট্রেডার্স, গোপালগঞ্জের সৌরভ ট্রেডার্স পিরোজপুরের সৌরভ কনস্ট্রাকশন রাজবাড়ীর বিসমিল্লাহ কনস্ট্রাকশন ও মাদারীপুরের সৈয়দ রেজাউল করিমের নামে ডিভিশনটির লাভজনক কাজগুলোর বাস্তাবায়ন দেখিয়ে প্রায় কোটি টাকা লোপাটের ব্যবস্থা করেছেন। এ বিষয়ে পরবর্তীতে থাকছে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন।
বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলার জন্য নির্বাহী প্রকৌশলী শারমিন আকতার ও এসডিই শফিকুল ইসলামের সাথে মুঠোফোনে কয়েকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি। (ক্রমশঃ)