প্রিন্ট এর তারিখঃ Jun 4, 2026 ইং || প্রকাশের তারিখঃ Jun 4, 2026 ইং
আজিমপুর গণপূর্তে প্রকৌশলী ফ. হালিমের ফ্যাসিবাদী লুটপাট!

আসাদ মাহমুদ ও জয়নাল আবেদীন যশোরী:
প্রকৌশলী ফয়সাল হালিম। একজন কেতাদুরস্ত স্মার্ট দুর্নীতিবাজ। বর্তমানে নির্বাহী প্রকৌশলী পদে আছেন আজিমপুর গণপূর্ত বিভাগে। চাকরির মাত্র একযুগে পদ ও পদবীকে ব্যবহার করে তিনি এখন নামে বেনামে অর্ধ শতাধিক কোটি টাকার মালিক। স্বৈরাচার লীগ সরকারের সময়ে নিয়োগ পাওয়া এই গণপূর্ত প্রকৌশলী চাকরির পুরোটা সময় টার্গেট করে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ চেয়ারগুলোতে দায়িত্ব বাগিয়ে নিয়ে দুর্নীতি আর লুটপাটের হোলিখেলায় মেতে হাতিয়ে নিয়েছেন সরকারি বরাদ্দ। বর্তমানে তার লাগামহীন লুটপাটে আজিমপুরে জাতীয়তাবাদী সরকারের মিশন ও ভিশন ব্যর্থ হতে চলেছে। তথ্য সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্রের।
পাবনা সুজানগর উপজেলার সুজানগর ইউনিয়নের কালীমন্দির গ্রামের আব্দুল হালিম ও ইসমত আরা হালিমের ছেলে ফয়সাল হালিম। ২০১৪ সালে ৩৪তম বিসিএস ক্যাডার সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে গণপূর্ত অধিদপ্তরে যোগদান করেন। অভিযোগ আছে চাকরির শুরুতেই জড়িয়ে পড়েন নানা অনিয়ম দুর্নীতিতে। লুটপাটের সুবিধার্থে ঘনিষ্ঠতা/সখ্যতা তৈরি করেন বিগত আ’লীগ সরকারের একাধিক মন্ত্রী এমপি ও রাজনীতিবিদদের সঙ্গে। সেই সুবাদে স্বল্প সময়ে পেয়ে যান একের পর এক পদোন্নতি ও লোভনীয় পোষ্টিং। ২০১৬ সালে উপবিভাগীয় প্রকৌশলী (্এসডিই) ও ২০১৮ সালে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে পদোন্নতি পান ভদ্রব্যাশী লুটেরা এই গণপূর্ত কর্মকর্তা।
প্রকৌশলী ফয়সাল হালিম গণপূর্ত রক্ষণাবেক্ষণ উপবিভাগ-২ এর এসডিই থাকাবস্থায় তার বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম দুর্নীতির অভিযোগ ছিল। তার ঘুষ বাণিজ্য খামখেয়ালি ও অবহেলার কারণে সরকারের বহু পরিত্যক্ত বাড়ি হাতছাড়া হয়ে যায় সে সময়ে। বিষয়গুলো নিয়ে সে সময়ে একাধিক ঠিকাদার দুদকসহ বিভিন্ন পর্যায়ে লিখিত অভিযোগ দায়ের করলেও অবৈধ অর্থ ও আওয়ামী রাজনীতির প্রভাবে তাকে কোন শাস্তির আওতায় আনা যায়নি। উল্টো পেয়েছেন পদোন্নতি। ২০১৯ সালে জামালপুরে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত থাকাবস্থায় তার বিরুদ্ধে বেপরোয়া টেন্ডার বাণিজ্যসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ ছিল। সেখানে একজন নারী কর্মচারীকে নিয়ে চাউর হয়ে উঠে মুখরোচক আলোচনা। মান-ইজ্জত খুঁইয়ে তিনি ঢাকায় এসে পোষ্টিং নেন উত্তরা এপার্টমেন্ট প্রকল্পে। দুদকের তালিকায় ধরা পড়েন তিনি। এবারও তিনি অবৈধ অর্থ ও রাজনৈতিক প্রভাবে পার পেয়ে যান তিনি। পোষ্টিং নেন গুরুত্বপূর্ণ ইডেন গণপূর্ত বিভাগে। সেখানে জিকে বিল্ডার্সের (ওই সময়ে গ্রেফতার) রেখে যাওয়া ভবনের রি-ইভ্যালুয়েশন ও বিভিন্ন নির্মাণ উপকরণ লোপাট করে হাতিয়ে নেন প্রায় ২ কোটি টাকা। বিষয়গুলো নিয়ে অভিযোগ উঠলে তিনি এক পর্যায়ে কথিত শিক্ষা ছুটি নিয়ে বিদেশ পাড়ি জমান। দেশে ফেরৎ এসে মহামান্যের ছেলেকে ম্যানেজ করে গণপূর্তে বড় প্রকল্পের ডিভিশন আজিমপুরে পোষ্টিং বাগিয়ে নিয়ে সরকারি বরাদ্দ লুটে আরো বেপরোয়া হয়ে উঠেন তিনি। ২০২৪ সালে একজন ঠিকাদার দুদক চেয়ারম্যান ও প্রধান প্রকৌশলী বরাবর অর্থ আত্মসাৎ প্রকল্পে অনিয়ম ঘুষ ও কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগে একটি অভিযোগ দায়ের করেছিলেন। কিন্তু সেটাও অদৃশ্য কারণে আর আলোর মুখ দেখেনি।
২০২৪ সালের পাঁচই আগস্ট স্বৈরাচার লীগ সরকারের পতনের পর গণপূর্ত অধিদপ্তরের দুর্নীতিবাজ প্রকৌশলীদের শাস্তিমূলক বদলির তালিকায় ছিলেন ফয়সাল হালিম। কিন্তু মহামন্যেও ছেলের হস্তক্ষেপে আবার রেহাই পান লুটপাটে চ্যাম্পিয়ন হয়ে উঠা প্রকৌশলী ফয়সাল হালিম।
সম্প্রতি দুদক চেয়ারম্যান বরাবর একজন ঠিকাদার অর্থ আত্মসাৎ ঘুষ কমিশন বাণিজ্য সহ নানা অভিযোগ উল্লেখ করে একটি অভিযোগ দায়ের করেছেন। গণপূর্ত অধিদপ্তরের আজিমপুর প্রকল্পের বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়সাল হালিম ও সিলেটে কর্মরত সাবেক একজন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই সিন্ডিকেট পিপিআর-২০০৮ এবং এর সংশোধিত বিধিমালাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে প্রকল্পের সিংহভাগ বরাদ্দ হাতিয়ে নেওয়ার বিষয়ে অভিযোগ করা হয় ওই লিখিত আবেদনে । এই প্রকল্পের লিফট, জেনারেটর এবং ফায়ার ফাইটিং সিস্টেম আমদানির নামে প্রায় ১২০ কোটি টাকার একটি ফান্ড তৈরি ও এই ফান্ডের মাধ্যমে নির্দিষ্ট কিছু ব্র্যান্ডের মালামাল ক্রয়ের বাধ্যবাধকতা তৈরি করে বাজারদরের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ দাম সাজানোর অভিযোগ উঠেছে সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে। প্রকল্পের ৮৩৬টি ফ্ল্যাটের ফিনিশিং কাজের জন্য নিম্নমাণের টাইলস ও স্যানিটারি সামগ্রী ব্যবহার করে কয়েক কোটি টাকা সাশ্রয়ের মাধ্যমে সিন্ডিকেট সদস্যদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা করে আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায় ।
অপরদিকে আজিমপুর প্রকল্পে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট বিভিন্নভাবে ভূয়া বিল -ভাউচার করে প্রতিমাসে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। এই সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে আছেন প্রকৌশলী ফয়সাল হালিম। মাস্টাররোলে কর্মরত শ্রমিকদের ভুয়া তালিকা দেখিয়ে প্রতিমাসে কয়েক লাখ টাকা উত্তোলন করা হচ্ছে গত দুই বছর যাবৎ। কিন্তু এগুলোর কোন বাস্তব অস্তিত্ব নেই। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দু’জন উপ-সহকারী প্রকৌশলী বলেন এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কথা বলায় তাদেরকে প্রাণনাশের হুমকি ও তাদের টেবিল থেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ফাইলপত্র গায়েব করা হয়েছে।
শুধু তাই নয়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এপিপি বরাদ্দের ১১০টি দরপত্র নিয়ম অনুযায়ী এলটিএম পদ্ধতিতে আহবান করেছেন ফয়সাল হালিম। কিন্তু তিনি তার পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়ার জন্য প্রতিটি দরপত্রে সিন্ডিকেট করে তিন থেকে চারজনকে দরপত্রে অংশগ্রহণ করিয়েছেন অবৈধভাবে। ফয়সাল হালিম তাকে কমিশন দেওয়া ঠিকাদারের বাইরে অন্য ঠিকাদারদের দরপত্রে অংশগ্রহণ করার জন্য নিরুৎসাহিত করে তাদের ফাইলে স্বাক্ষর না করার ভয় দেখান বলে ভুক্তভোগীরা জানান। আজিমপুরের একজন সাবেক কমিশনারকে দিয়ে ভয়ভীতি দেখান নীরিহ ঠিকাদার ও সাংবাদিকদের। এমনকি নীরিহ ঠিকাদারের পেছনে সন্ত্রাসী লেলিয়ে দেওয়ার ঘটনা তৈরী করেছেন ভদ্রব্যাশী লুটেরা লম্পট হিসাবে পরিচিত প্রকৌশলী ফয়সাল হালিম।
আজিমপুর কলোনির নতুন ভবন নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় পুরাতন ভবনের নামকাওয়াস্তে সাজানো সার্ভে রিপোর্ট করানোর অভিযোগও সামনে এসেছে। এই সার্ভে রিপোর্টের মাধ্যমে সিন্ডিকেট করে সরকারি রাজস্বে নামমাত্র টাকা জমা দিয়ে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে প্রায় কোটি টাকার ঘুষ বাণিজ্য করে নিলাম করার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
অভিযোগকারী অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেন দুর্নীতি প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎসহ নানা অনিয়ম করে নামে-বেনামে ক্রয় করেছেন বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ। পরিবারের সদস্য ও বিভিন্ন আত্মীয়স্বজনের নামে-বেনামে ফয়সাল হালিম ও তার পরিবারের সদস্যদের ব্যাংক একাউন্ট ও সম্পদের তথ্য যাচাই করলে প্রচুর অবৈধ সম্পদ বেড়িয়ে আসবে বলে অভিযোগপত্র উল্লেখ করা হয়েছে।
বিষয়গুলো নিয়ে কথা কলার জন্য প্রকৌশলী ফয়সাল হালিমের মুঠো ফোনে কয়েকবার ফোন দিলেও কোন রেসপন্স পাওয়া যায়নি। (ক্রমশঃ)
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ বাঙালি সংবাদ