গ্রামের কারিগরদের তৈরি শীতলপাটি, মৃৎশিল্প, তাঁত, কামার-কুমারের পণ্য ও রুপার গয়নাসহ বিভিন্ন পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে নেওয়ার উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এসব পণ্যকে আলিবাবা, অ্যামাজন ও ইবের মতো আন্তর্জাতিক অনলাইন বিপণন প্ল্যাটফর্মে নেওয়ার উপযোগী করে তুলতে উন্নত কাঁচামাল, নকশা, ব্র্যান্ডিং ও বিপণন সহায়তা দেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
বুধবার (১২ আগস্ট) রাজধানীর চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে তিন দিনব্যাপী ‘ন্যাশনাল কনফারেন্স অন ফাইভ ইয়ার স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড এসডিজি’র সমাপনী দিনে মিডিয়া ব্রিফিংয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু এসব কথা বলেন।
একই অনুষ্ঠানে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ মুহাম্মদ আব্দুর রহিম সাকীও সরকারের পাঁচ বছরের উন্নয়ন কৌশল ও এসডিজি বাস্তবায়নের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।
আমির খসরু বলেন, ‘শুধু কারিগরদের আর্থিক সহায়তা দিলেই হবে না। তাদের পণ্যের মান বাড়াতে উন্নত কাঁচামাল, নকশা, ব্র্যান্ডিং ও বিপণন সহায়তা দিতে হবে।গ্রামাঞ্চলের অনেক মানুষ প্রজন্মের পর প্রজন্ম একই ধরনের কাজ করে আসছে। কিন্তু তাদের তৈরি পণ্যের যথাযথ মূল্য তারা পাচ্ছে না।’
বরিশালের শীতলপাটি কারিগরদের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, একজন কারিগর ৭০০ থেকে ৮০০ টাকায় একটি শীতলপাটি বিক্রি করেন। অথচ ভালো নকশা ও মানোন্নয়নের মাধ্যমে সেটি ২ হাজার টাকায় বিক্রি করা সম্ভব হতে পারে। একইভাবে ১০ টাকার কোনো পণ্যে মূল্য সংযোজন করে ৩০ টাকায় বিক্রির উপযোগী করা যেতে পারে। এতে কারিগরদের আয় বাড়বে, উৎপাদন বাড়বে এবং নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে।
গ্রামীণ পণ্যকে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনার কথা জানিয়ে আমির খসরু বলেন, শুধু দেশের বাজারে নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের গ্রামীণ পণ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। আলিবাবা, অ্যামাজন ও ইবের মতো আন্তর্জাতিক বিপণন প্ল্যাটফর্মে এসব পণ্য বিক্রির উপযোগী করে তোলা হবে।
থাইল্যান্ডের ‘এক গ্রাম, এক পণ্য’ উদ্যোগের উদাহরণ দিয়ে আমির খসরু বলেন, থাইল্যান্ডে গ্রাম পর্যায়ের মানুষকে দক্ষতা উন্নয়ন, কাঁচামাল, নকশা ও বাজারজাতকরণে সহায়তা দেওয়া হয়েছে। পরে গ্রামের তৈরি পণ্য সংগ্রহ করে আন্তর্জাতিক বাজারে পাঠানো হয়েছে। বাংলাদেশেও এ ধরনের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায় সরকার। তবে এ কাজ সরকার একা করতে পারবে না জানিয়ে তিনি বলেন, প্রত্যন্ত অঞ্চলের কারিগরদের কাছে নকশা, কাঁচামাল, ঋণ ও বাজারসংযোগ পৌঁছে দিতে বেসরকারি খাত ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোকে অংশীদার করা হচ্ছে। সৃজনশীল অর্থনীতির আওতায় শুধু গ্রামীণ কারিগর নয়, থিয়েটার, সংগীত ও খেলাধুলার সঙ্গে যুক্ত মানুষদেরও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার পরিকল্পনার কথা জানান আমির খসরু। এসব ক্ষেত্রকে অর্থনৈতিকভাবে কার্যকর করা গেলে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে বলে জানান তিনি।
অন্যদিকে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ মুহাম্মদ আব্দুর রহিম সাকী বলেন, ‘এসডিজি বাস্তবায়নকে শুধু আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা কিংবা প্রতিবেদন তৈরির বিষয় হিসেবে দেখছে না সরকার। মানুষের জীবনে সত্যিকারের উন্নতি ঘটানোই সরকারের মূল লক্ষ্য।’
তিনি বলেন, ‘২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ নতুন সম্ভাবনার দুয়ারে পৌঁছেছে। জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে গঠিত বর্তমান সরকার নির্বাচনী ইশতেহারের আলোকে আগামী পাঁচ বছরের উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রার কৌশলপত্র তৈরি করছে। এসডিজির ১৭টি লক্ষ্য সরকারের বৃহত্তর উন্নয়ন পরিকল্পনার একটি অংশ।’
সাকী জানান, বিচ্ছিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের পরিবর্তে কর্মসূচিভিত্তিক গুচ্ছ প্রকল্পে যাওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রথমে পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়ন করে সফল হলে তা জাতীয় পর্যায়ে সম্প্রসারণ করা হবে। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি নিয়েও পরিকল্পনার কথা জানান তিনি। বর্তমানে ৯০টির বেশি কর্মসূচি থাকলেও এগুলো কমিয়ে ১০টির নিচে আনার চেষ্টা চলছে। ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডসহ বিভিন্ন কর্মসূচিকে সর্বজনীন করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বাসস্থানে বিনিয়োগকে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক বিনিয়োগ হিসেবে উল্লেখ করে সাকী বলেন, জ্বালানি, আর্থিক খাত সংস্কার, ব্যবসা-বাণিজ্যে নিয়ন্ত্রণ কমানো, তথ্য-প্রযুক্তি ও পরিবেশ রক্ষাকে উৎপাদনমুখী কর্মসংস্থান সৃষ্টির গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী।