জয়নাল আবেদীন যশোরী ও আসাদ মাহমুদ:
গণপূর্ত ই/এম বিঃভাগ-৫ প্রকৌশলী তামজীদ ও রাজিয়া সুলতানা চক্র একের পর এক কান্ড ঘটিয়ে চলছেন। ওই সকল কান্ড নিয়ে ডিপার্টমেন্ট জুড়ে চলছে আলোচনা সমালোচনা ও বিভিন্ন ধরণের কানাঘুষা। গোটা অর্থবছর জুড়ে বরাদ্দ না থাকা সত্ত্বেও মোটা অংকের পার্সেন্টেজের বিনিময়ে অসংখ্য ইস্টিমেট বিক্রি করে তারা দু’জনেই হাতিয়ে নিয়েছেন বড় অংকের টাকা। এই দুর্নীতিবাজ দুষ্টচক্র গণপূর্ত প্রকৌশলী তামজী ও সুলতানার লুটপাটের বিষাক্ত ছোবল থেকে রক্ষা পায়নি আল্লাহর ঘর মসজিদও। সুলতানা নামক লুটেরা নাগিনীর লুটপাটের বিষাক্ত ছোবলে নীল হচ্ছে অসংখ্য সাধারণ ঠিকাদারের জীবন। সুপ্রীমকোর্ট মাজার মসজিদের ভবন নির্মাণ কাজ এখনও শেষ না হলেও ই/এম অঙ্গের কাজগুলো নিয়ে অনেক আগেই টেন্ডার দেখিয়ে পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দিয়ে চলতি ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের শেষে পুরো বিল পরিশোধ করেছেন বলে নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়। অথচ ভবন নির্মাণ কাজ এখনও (পাঁচতলা ভবনের ৫ম তলার কাজ চলমান) পুরো একতলা বাকি রয়েছে বলে সরেজমিনে দেখা গেছে।
আরও পড়তে পারেন: লিগ্যাল নোটিশেও নীরব গণপূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলী তামজিদ
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরের ওটিএম টেন্ডার আইডি নং ১০০২৬৪৬ এর মাধ্যমে সুপ্রীমকোর্ট মাজার মসজিদের নির্মাণাধীন পাঁচতলা ভবনের জন্য সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কাজসহ ১০০০ কেভিএ সাবস্টেশন স্থাপণ কাজের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়। ২টি করে সিডিউল বিক্রি জমা ও রেসপন্স দেখিয়ে এই টেন্ডারে কাজ পাইয়ে দেওয়া হয় মেসার্স মামুন এন্ড ব্রাদার্স নামক একটি প্রতিষ্ঠানকে। এর কাজের চুক্তিমূল্য হচ্ছে ১ কোটি ৯৮ লক্ষ ৩৪ হাজার ৫শ’ টাকা। কিন্তু এপিপির লিষ্ট অনুয়ায়ী এই কাজে বরাদ্দ ছিলো কোটি ৯৮ লক্ষ ১৫ হাজার টাকা। অর্থ্যাৎ ০.৯৮% ঊর্দ্ধদরে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে পাতানো টেন্ডারের কারণে। কিন্তু প্রতিযোগীতামূলক টেন্ডার হলে ১০% লেস দিলে সরকারের প্রায় ১৯/২০লক্ষ টাকা সাশ্রয় হতো। সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার ৮সেপ্টেম্বর ২০২৪ তারিখে এ কাজের কন্ট্রাক্ট সাইনিং করে। কাজটি শেষ করার সময় ছিলো ১০ জুন ২০২৫ইং তারিখ। অপরদেিক দেড়/দুই বছর পূর্বে সাবস্টেশনের মালামাল এনে গুদামজাত করলেও এতোদিন পরে ওই সকল ইলেকট্রিক মালামাল পূর্ণমাত্রায় কর্মক্ষম থাকে কি-না তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্ট মহল।
আরও পড়তে পারেন: তামজীদের গ্রাসে গণপূর্ত ই/এম-৫
আরও পড়তে পারেন: বহিরাগতের নিয়ন্ত্রণে গণপূর্ত ইএম-৫ এর ইজিপি ও আইবাস আইডি!
একই অর্থবছরে ১০৩৭৪১০নং টেন্ডার আইডি’র মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কাজসহ সুপ্রীমকোর্ট মাজার মসজিদের জন্য ২৫০ কেভিএ জেনারেটর সরবরাহ স্থাপনের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়। একই প্রক্রিয়ায় ২টি করে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান অংশগ্রহণ দেখিয়ে কাজটি পাইয়ে দেওয়া হয়। ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৫ইং তারিখে এই কাজের কন্ট্রাক্ট সাইন করা হয়। এর চুক্তি মূল্য হচ্ছে- কোটি ৫লক্ষ ৪৬ হাজার ৬শ’ তিন নয় এক টাকা। কাজটি শেষ করার চুড়ান্ত সময় ছিলো জুন ২০২৫ইং। এ কাজে প্রতিযোগীতামূলক দরপত্র না হওয়ার কারণে মাত্র ৬.৮৫% লেসে কাজটি পাইয়ে দেওয়া হয়েছে গেজ বাংলাদেশ নামক একটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে।
একইভাবে ১২২০২৫৭নং ওটিএম আইডি’র মাধ্যমে একই মসজিদের নামে ৬৩০ কেজি একটি প্যাসেঞ্জার লিফট সরবারাহ ও স্থাপনের টেন্ডার আহ্বান করে পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়া হয়। এ কাজে বরাদ্দ ছিলো ৬৩ লক্ষ ৬ হাজার টাকা। ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে ১১২৯৮৩৩নং টেন্ডার আইডির মাধ্যমে একই মসজিদের নামে ২ সেট স্কেলেটর সরবরাহ স্থাপণসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কাজের টেন্ডাডার করে পছন্দের ঠিকাদারকে একই প্রক্রিয়ায় কাজ পাইয়ে দেওয়া হয়েছে। এই কাজে বরাদ্দ ছিলো প্রায় ২ কোটি ১৮ লক্ষ টাকা। ১১৯০০১৪ টেন্ডার আইডির মাধ্যমে সুপ্রীমকোর্ট মাজার মসজিদের জন্য আরো একটি ৬৩০ কেজি প্যাসেঞ্জার লিফট সরবরাহ স্থাপণসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কাজের নামে টেন্ডার আহ্বান করে একই প্রক্রিয়ায় পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেয় দুর্নীতিবাজ প্রকৌশলী তামজীদ-সূলতানা চক্র। এই কাজে বরাদ্দ ছিলো ৮৩ লক্ষ ৪৯ হাজার টাকা। এই কাজগুলোর টেন্ডার প্রত্রিয়া নিয়ে সাধারণ ঠিকাদারদের অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে।
আরও পড়তে পারেন: গণপূর্ত ই/এম-৫ এর কর্মকর্তা/কর্মচারীরাও করেন ঠিকাদারী ব্যবসা!
এছাড়াও সুপ্রীমকোর্ট মাজার মসজিদের নামে তিন গ্রুপে ফায়ার এক্সটিনগুইসার সরবারাহ ও স্থাপণ (প্রতি গ্রুপে বরাদ্দ ৫ লক্ষ ২১ হাজার টাকা করে), ১টি ১০০০ কেজি ফায়ার কাম প্যাসেঞ্জার লিফট সরবারাহ ও স্থাপণ (বরাদ্দ ২ কোটি ৪৭ লক্ষ ৭০ হাজার টাকা), ফোর্স ভেন্টিলেশন সিষ্টেম (বরাদ্দ ১ কোটি ৯৯ লক্ষ ৯৪ হাজার টাকা), সোলার সিষ্টেম সার্জ প্রটেকশন সিস্টেম বিশেষ আলোকসজ্জাকরন ও কম্পাউন্ড সিকিউরিটি লাইট গার্ডেন লাইট ও পাম্প মোটর সেট (বরাদ্দ ১ কোটি ৬২ লক্ষ ৬০ হাজার টাকা), সাউন্ড সিস্টেম সিকিউরিটি সিস্টেম সিসিটিভি সিস্টেম পিএবিএক্স ইন্টারকম ও নেটওয়ার্কিং সিস্টেম সরবরাহ ও স্থাপণ (বরাদ্দ ৫৫ লক্ষ ৩৫ হাজার টাকা) এবং ৬ কোটি ৭৭ লক্ষ ৯১ হাজার ১শ’ ৭ টাকা বরাদ্দে ভিআরএফ ও স্পিলিট টাইপ এয়ারকুলার সিস্টেম সরবরাহ স্থাপণসহ অন্যান্য সংশ্লিষ্ট কাজের নামে ইতোমধ্যে পূর্ণ বরাদ্দ মোটা অংকের ঘুষ নিয়ে চেক দেওয়া হয়েছে। এতে প্রায় কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন প্রকৌশলী তামজীদ ও রাজিয়া সুলতানা। কিন্তু ওই সকল মালামাল কোথায় আছে কী-ভাবে পড়ে আছে বা আদৌ মালামাল সরবরাহ নেওয়া হয়েছে কী-না এ বিষয়ে কোন প্রকৌশলীই সদুত্তর দিতে পারেনি।
শুধু তাই নয়, প্রকৌশলী রাজিয়া সুলতানা পার্সেন্টেজ বাণিজ্য আর লুটপাটের সালতানাত খুলে বসেছেন তার সাবডিভিশনে। বেপরোয়া ও সর্বগ্রাসী ঘুষ বাণিজ্যের কারণে প্রকৌশলী রাজিয়া সুলতানাকে ‘তামজীদের সুলতানা’ বলে যাকেন ভূক্তভোগী ঠিকাদারগণ। এই সাবডিভিশনের আওতায় কাজপ্রাপ্ত বেশীর ঠিকাদারকেই ফিল্ডে গিয়ে কাজ করতে হয় না। কাজ বাবদ ৫০% বা এর চেয়ও বেশী টাকা আদায় করে থাকেন এই ‘কাল্ নাগিনী’ রূপধারী প্রকৌশলী রাজিয়া সুলতানা। তিনি ইতোপূর্বে রংপুর ডিভিশনে থাকতে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও নভো থিয়েটারসহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল কাজে সিডিউল বহির্ভূতভাবে নি¤œমানের কাজ করিয়ে এবং প্রকৌশলগত বিভিন্ন ফাঁক-ফোকরে অনিয়মের আশ্রয় নিয়ে কয়েক কোটি টাকা লোপাট করেন বলে নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়। এ নিয়ে বিস্তারিত থাকছে পরবর্তীতে।