জয়নাল আবেদীন যশোরী ও নাসির হোসেন:
সরকারি কর্মচারি শৃঙ্খলা বিধিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ঘুষের টাকায় চাকরির পাশপাশি ডেভলপার ব্যবসা (ভবন তৈরী করে এপার্টমেন্ট বা ফ্ল্যাট বিক্রি) করছেন গণপূর্ত অধিদপ্তরের কতিপয় ডিপ্লোমা প্রকৌশলী। গণপূর্ত সাভার ডিভিশনের উপসহকারী প্রকৌশলী আনোয়ার খান আনুসহ পাঁচজন ডিপ্লোমা প্রকৌশলী মিলে এ ব্যবসা পরিচালনা করার অভিযোগ রয়েছে। এছাড়াও তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরণের অনিয়ম দুর্নীতির তথ্য প্রমাণাদি পাওয়া গেছে।
সরকারি চাকরির পাশাপাশি ব্যবসা করা সংশ্লিষ্ট আইন বা বিধি অনুযায়ী সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯ অনুযায়ী, কোনো সরকারি কর্মচারী সরকাররে পূর্বানুমোদন ছাড়া সরাসরি কোনো ব্যবসায় বা বাণজ্যি চালাতে কিংবা কোনো প্রতিষ্ঠানে লাভজনক পদে কাজ করতে পারবেন না।
বিধিমালা অনুযায়ী ব্যবসার ক্ষেত্রে মূল নিয়মগুলো হলো:
মালিকানা ও পরিচালনা: কোনো সরকারি র্কমচারী নিজ নামে বা পরিবারের কোনো সদস্যের নামে সরাসরি কোনো ব্যবসা পরিচালনা করতে পারবেন না। এমনকি শেয়ারহোল্ডার হিসেবে ব্যাংক বা অন্য কোনো কোম্পানির ব্যবস্থাপনাতেও অংশ নেওয়া নিষিদ্ধ।
অনুমোদিত ক্ষেত্র: সরকার চাইলে জনস্বার্থে কোনো কর্মচারীকে বিশেষক্ষেত্রে অনুমোদন দিতে পারেন। তবে সাধারণত সমবায় সমিতি, সাহিত্য বা শিল্পর্কমে জড়িত থাকা বা খন্ডকালীন বই লেখা ইত্যাদি কাজের জন্য পূর্বানুমতির দরকার হয়।
শাস্তি: সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধির লঙ্ঘন গুরুতর অসদাচরণ হিসেবে গণ্য হয়। সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী, এই নিয়ম অমান্য করলে তিরস্কার, বেতন বৃদ্ধি স্থগিত, পদাবনতি, এমনকি চাকরি থেকে বরখাস্ত বা অপসারণের মতো শাস্তি হতে পারে।
এক অভিযোগে জানা যায়, সাভার গপূর্ত বিভাগের উপসহকারী প্রকৌশলী আনোয়ার খান আনু ও মিজানুর রহমান (বর্তমানে শেরেবাংলা নগর ১নং বিভাগে) মিলে ২০১৬ সালের দিকে সাভার ডিওএইচএস এলাকায় এই ব্যবসা শুরু করেন। পরবর্তীতে উপসহকারী প্রকৌশলী ই/এম আবুল বাশার (বর্তমানে সহকারী প্রকৌশলী গণপূর্ত ই/এম বিভাগ-৬), উপসহকারী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আব্দুর রউফ (বর্তমানে উপসহকারী প্রকৌশলী গণপূর্ত ঢাকা ই/এম জোন) ও সহকারী প্রকৌশলী (ঢাকা গণপূর্ত ই/এম সার্কেল-৩) গোল নাহার এই ব্যবসায় বড় অংকের টাকা বিনিয়োগ করে জড়িত হয়ে নিজেদেরকে বড় মাপের সরকারি কর্মকর্তা বা শিল্পপতি হিসাবে পরিচয় দিচ্ছেন। তারা কৌশলে কাজল নামক একজন ঠিকাদারকে সাথে নিয়ে তার প্রতিষ্ঠান ‘ডালাস ডেভলপারস এন্ড প্রোপর্টিজ লিমিটেড’ নামে সাভার ডিওএইচএস এলাকায় ভবন তৈরী করে ফ্ল্যাট/এপার্টমেন্ট আকারে বিক্রি করেছেন এবং করছেন। উপসহকারী প্রকৌশলী মিজানের ভাই জুয়েল ও আনোয়ার খান আনুর ভাই রাজু সার্বক্ষণিক সাইটে অবস্থান করে বর্তমানে কাজগুলোর দেখাশুনা করছেন। জুয়েল ও রাজু দু’জনেই ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার বলে জানা গেছে। মিজান ও আনু পৃথকভাবে উত্তরা এলাকায়ও ভাইদের দিয়ে ডেভেলপার ব্যবসা শুরু করেছেন। সেখানে গণপূর্তের অনেক নির্বাহী ও উপবিভাগীয় প্রকৌশলীরাও বিনিয়োগ করেছেন বলে নির্ভরযোগ্য ওই সূত্র জানায়।
সরেজমিনে অনুসন্ধানে দেখা যায়, ডালাস ডেভলপারস্ এর নামে সাভার নবীনগর ডিওএইচএস এর রোড নং-৬, প্লট নং ১১৯ ও ১২০ নং প্লটের ভবন দুটো ইতোমধ্যে কাজ শেষ করে রেডিফø্যাট আকারে বিক্রি শেষ করেছেন। ১১৯ নং ভবনে উল্লেখিত ৫ জনের বিলাশবহুল স্টুডিও এপার্টমেন্ট আছে, যেখানে তারা স্বপরিবারে বসবাস করছেন। এছাড়াা একই এলাকার ৩নং রোডে ১টি ও ৯নং রোডে ২৬৯, ২৭০ ও ২৭১নং প্লটে ভবনের কাজ চলমান আছে এবং ডালাস ডেভেলপারস এন্ড প্রোপার্টিজ এর নামে ফ্ল্যাট বিক্রির প্রচারনা চালানো হচ্ছে। বিজ্ঞাপনে প্রতিষ্ঠানটির করপোরেট অফিসের ঠিকানা দেওয়া আছে বাড়ি-৯৬৯ (২য় তলা), রোড নং-১৫, এভিনিউ-২, মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা-১২১৬।

অভিযোগে আর্ োজানা যায়, উপসহকারী প্রকৌশলী আনোয়ার খান আনু চাকরির শুরু থেকে প্রায় ১২বছর ঘুরেফিরে সাভারেই আছেন। মিজানুর রহমান মিজান প্রায় ১০বছর সাভার স্মৃতিসৌধ এলাকার দায়িত্বে ছিলেন। এ দুই উপসহকারী প্রকৌশলী ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের উত্তরা থেকে উত্তরা-আশুলিয়া-বাইপাইল হয়ে সাভার ইপিজেড অংশের ক্ষতিপূরণের ভ্যালুৃয়েশন কাজে জড়িত থেকে শতাধিক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। ওই রোডের আশুলিয়া ও বাইপাইল এলাকার গার্মেন্টসসহ বিভিন্ন ধরণের বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান ক্ষতিপূরণের টাকা বাড়িয়ে নিতে বা বিভিন্ন জাল-জালিয়াতির আশ্রয় নিতে বস্তায় বস্তায় টাকা নিয়ে এই দুই উপসহকারী প্রকৌশলীর অফিসে ঘুরেছেন সে সময়ে। জানা যায়, ওই সময়ে সাভার জামগড়া এলাকায় ব্যক্তিগত অফিস খুলে সন্ধ্যার পড়ে সেখানে অবস্থান করে শিল্প মালিকদের সাথে বড় অংকের টাকার লেনদেন নিয়ে দেনদরবার করতেন এই দুই উপসহকারী প্রকৌশলী। জামগড়া এলাকার একটি শিল্প প্রতিষ্ঠানের ভবনে ক্ষতিপূরণ ৩ কোটির জায়গায় বিভিন্ন স্থাপণা ভারি মেশিনারিজ দেখিয়ে ১৬ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ নির্ণয় করিয়ে সেখান থেকে ৮ কোটি টাকা ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ রয়েছে এ দুই উপসহকারী প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে। এভাবে শতাধিক কোটি টাকার ঘুষ বাণিজ্য করেছেন এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কাজে ক্ষতিগ্রস্থ ভবন ও শিল্প মালিকদের কাছ থেকে। ভ্যালুয়েশন কাজে জড়িত থেকে উপসহকারী প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেন আনু ও মিজান প্রত্যেকেই কম করে হলেও অর্ধশতাধিক কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন। উপসহকারী প্রকৌশলী মিজান পরোক্ষভাবে ঠিকাদারী ব্যবসার সাথেও জড়িত। আব্দুস সালাম (ওয়াহিদ কনস্ট্রাকশনের নামে বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ করতো) নামক জনৈক ঠিকাদারের কাজে কয়েক কোটি টাকার বিনিয়োগ আছে এই ডিপ্লোমা প্রকৌশলীর। গণপূর্তের সাভার শেরেবাংলা নগর মতিঝিল আজিমপুরসহ বিভিন্ন ডিভিশনে আওয়ামী আমলে অসংখ্য কাজ করেছে সালামের ওই প্রতিষ্ঠান। একাধিক পাসপোর্ট ব্যবহার করার অভিযোগও আছে মিজানের বিরুদ্ধে। বছরের বিভিন্ন সময়ে কারণে অকারণে পাশ^বর্র্তী ইন্ডিয়াসহ থাইল্যান্ড মালয়েশিয়া সিঙ্গাপুর আমেরিকা কানাডাসহ বিভিন্ন দেশে ট্যুর করেন এই মাফিয়া উপসহকারী প্রকৌশলী মিজান। তবে ধুরন্ধর এই উপসহকারী প্রকৌশলী চলাফেরা করেন অত্যন্ত সাদামাটাভাবে। তাকে সাধারণভাবে দেখলে কেউ কল্পনাও করতে পারবে না তিনি অর্ধশতাধিক কোটি টাকার মালিক। তার কথায় নির্বাহী প্রকৌশলী থেকে শুরু করে উর্দ্ধতন কর্মকর্তারা ওঠবস্ করেন- দম্ভ করে এমন মন্তব্য করেন সহকর্মীদের সাথে। উপসহকারী প্রকৌশলী মিজানের বিরুদ্ধে রয়েছে আরো বিভিন্ন ধরণের অনিয়ম দুর্নীতি আর অসামাজিক কর্মকান্ডের অভিযোগ। ক্যারিশমাটিক প্রক্রিয়ায় এই উপসহকারী প্রকৌশলী নিজেকে লটারীর আওতামুক্ত রেখে বহালতবিয়তে আছেন শেরে বাংলা নগর ১নং গণপূর্ত বিভাগে। তিনি সেখানে ইস্টিমেটর (প্রাক্কলনিক) এর দায়িত্বে আছেন। এই পদটি কোন কেপিআই পোস্ট নয় বা গুরুত্বপূর্ণ কিছুই না। লটারীর আওতামুক্ত থাকার কারণে মিজানের বিরুদ্ধে ফুঁসে সহকর্মী উপসহকারী প্রকৌশলীরা। ফলে দুর্নীতিবাজ মাল্টি হান্ড্রেড বিলিওনিয়ার এই ডিপ্লোমা প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে আশু ভবিষ্যতে মশাল বা ঝাড়– মিছিল সহকারে শোষিত বিঞ্চতদেও হামলায় রক্তাক্ত হলে, তার দায়ভার বর্তমান পূর্ত প্রশাসনকে বহন করতে হবে বলে হুশিয়ারী ব্যক্ত করেছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কতিপয় উপসহকারী প্রকৌশলী।

শুধু তাই নয়, মাফিয়া উপসহকারী প্রকৌশলী মিজান ভাইয়ের নামে ফিউচার ড্রিম বিল্ডার্স লিঃ (এফডিবিএল) নামক একটি ডেভেলপার কোম্পানী খুলে উত্তরা এলাকায় চুটিয়ে ব্যবসা করছেন। কানাডার বেগমপাড়ায় এই গুণধর ডিপ্লোমা প্রকৌশলীর বাড়ি আছে বলেও সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়।
সহকারী প্রকৌশলী আবুল বাসার ইতোপূর্বে প্রায় ৫বছর সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধের দায়িত্বে থেকে বিভিন্ন অনিয়ম দুর্নীতিতে জড়িয়ে হাতিয়ে নিয়েছেন কয়েক কোটি টাকা। ওই সময়ে সাভারে জিন ব্যাংক বিপিএটিসি হেলথ ম্যানেজমেন্ট ইনস্টিটিউট সহ কয়েকশ’ কোটি টাকার কাজের বাস্তবায়ন হয়েছে। ওইসব কাজের দায়িত্বে থেকে উর্দ্ধতনদের যোগসাজশে হাতিয়ে নিয়েছেন বড় অংকের টাকা। এর পূর্বে গাজীপুরে থাকতেও বেনামী ঠিকাদারী ব্যবসাসহ বিভিন্ন জাল-জালিয়াতিতে জড়িয়ে পরেন এই ডিপ্লোমা প্রকৌশলী। তার স্ত্রী গোলনাহার চাকরীজীবনের বেশীরভাগ সময়ে ঘুরেফিরে ঢাকাতেই আছেন। ইতোপূর্বে গণপূর্ত ই/এম সার্কেল -৩ এর সহকারী প্রকৌশলী পদে কর্মরত আছেন তিনি। কথিত লটারীর মাধ্যমে তার পোস্টিং হয়েছে ই/এম সার্কেল-২ এ। গোলনাহারের স্বামী আবুল বাসারের বদলি হয়েছে ই/এম ৬ থেকে ই/এম ১নং ডিভিশনে। স্বামী-স্ত্রী এই ডিপ্লোমা প্রকৌশলী দম্পতির ঢাকা থেকে ঢাকায় বদলীকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ধরণের আলোচনা সমালোচনা গণপূর্ত ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের মধ্যে চাউর হয়ে উঠেছে। এই দম্পতি পদ ও পদবীকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে অবৈধ পথে উপার্জিত অর্থে ওই ডেভলপার ব্যবসার পাশাপাশি সাভার রেডিও কলোনীর পাশে ছয়তলা বাড়ি নির্মাণসহ গাজীপুর সাভার ও ধামরাইয়ে নামে-বেনামে অর্ধশতাধিক কোটি টাকার সহায়-সম্পদের মালিক হয়েছেন। মাটির ব্যবসা ড্রেজার বিপনীবিতান গার্মেন্টসসহ বিভিন্ন ব্যবসায় তাদের আরো কয়েক কোটি টাকার বিনিয়োগের তথ্য প্রমাণাদি পাওয়া গেছে।
আমাদের অনুসন্ধানী দলের একটি টিম সাভার ডিওএইচএস এলাকায় ২ সপ্তাহ অনুসন্ধান চালিয়ে অভিযোগের সত্যতা পেয়েছে। এমনকি ৪টি ফø্যাট কেনার আগ্রহ দেখিয়ে ক্রেতা সেজে তাদের সাথে বিভিন্ন সময়ে ফোনে কথা বলেও এই ব্যবসায় অভিযুক্তদের জড়িত থাকার স্বীকারোক্তি আদায় করে নিয়েছে। এ সম্পর্কিত প্রমাণাদি এই প্রতিনিধি দলের কাছে সংরক্ষিত আছে। (ক্রমশঃ)