ঢাকা | বঙ্গাব্দ

প্রতারণায় চ্যাম্পিয়ন আওয়ামী দোসর শফিউল্লাহ আল মুনির!

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Apr 12, 2026 ইং
প্রতারণায় চ্যাম্পিয়ন আওয়ামী দোসর শফিউল্লাহ আল মুনির! ছবির ক্যাপশন: সাবেক দুই প্রভাবশালী আওয়ামী নেতা সালমান এফ রহমান ও ওবায়দুল কাদেরের সাথে প্রতারক শফিউল্লাহ আল মুনির
ad728
নিজস্ব প্রতিবেদক:
বহুমুখী প্রতারনায় চ্যাস্পিয়ন হয়ে উঠেছেন গুলশানকেন্দ্রিক কথিত ব্যবসায়ী ও ক্রীড়া সংগঠক শফিউল্লাহ আল মুনির। তাকে ঘিরে একাধিক মামলা, বিভিন্ন গুরুতর অভিযোগ, তদন্ত প্রতিবেদন, আদালতের আদেশ, আর্থিক অনিয়মের বিবরণ, অপরাধ সা¤্রাজ্যে বিশাল ফিরিস্তি গণমাধ্যমের কাছে উপস্থাপিত হয়েছে। প্রাপ্ত নথিপত্রে তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, তার বিরুদ্ধে প্রতারণা, অর্থ আত্মসাৎ, জালিয়াতি, ভুয়া প্রকল্প দেখিয়ে বিনিয়োগ সংগ্রহ, চাকরি পাইয়ে দেওয়া, বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে লাইসেন্স করিয়ে দেওয়ার নামে অর্থ গ্রহণ, ভয়ভীতি প্রদর্শন, এমনকি অতীতের বিভিন্ন অপরাধ সংশ্লিষ্ট ঘটনাও আলোচনায় এসেছে।
জানা যায়, শফিউল্লাহ আল মুনির বতর্মান আইজিপি জনাব মোঃ আলী হোসেন ফকিরের নাম বিক্রি করে চলে। সে যেখানে যায় সেখানেই বলে আমি আইজিপির লোক। অথচ গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে জানা যায়, আইজিপি মোঃ আলী হোসেন ফকিরের সাথে তার কোন ধরণের যোগাযোগ নেই। কোন সম্পর্কও নেই। 
২০০৮ সালের ৫ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক সংবাদ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ওইদিন রাতে রাজধানীর সেগুনবাগিচা এলাকায় র‍্যাব অভিযান চালিয়ে শফিউল্লাহ আল মুনিরকে আটক করে। অভিযানে ৪২/১/খা, বাকাউল অ্যাপার্টমেন্টের ৩য় ও ৪র্থ তলায় পরিচালিত স্টুডিও থেকে পর্নোগ্রাফি সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন উপকরণ উদ্ধার করা হয়। র‍্যাবের তথ্যমতে, সেখানে ৯টি ইয়াবা ট্যাবলেট, ৩৫ পুরিয়া গাঁজা এবং একাধিক পর্নো সিডি পাওয়া যায়। ওই সময় তার সঙ্গে টনু, তানভীরসহ সহযোগী চারজন কথিত মডেলকেও আটক করা হয়।
প্রতারনার সুবিধার্থে পরবর্তীতে তিনি ব্যবসায়ী ও ক্রীড়া সংগঠক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। এমনকি বিভিন্ন ক্রীড়া ফেডারেশনের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হন। ওই পদ ও পবদী ব্যবহার করে যোগাযোগ বাড়িয়ে একটি নিজস্ব বলয় তৈরী করেন প্রভাবশালী মহলে। তবে একইসঙ্গে তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় নানা আর্থিক অনিয়ম ও প্রতারণার অভিযোগ জমা হতে থাকে।
২০২৫ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকার মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতে দুর্নীতি দমন কমিশনের সহকারী পরিচালক জনাব তাপস ভট্টাচার্য একটি আবেদন দাখিল করেন। এর ভিত্তিতে আদালত শফিউল্লাহ আল মুনিরের বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। এই আবেদনের ভিত্তি ছিল দুদকের নথি নং-০০.০১.০০০০.৫০৫.০১.০৪১.২৪-৫০২৫৫(২), তারিখ ২৬ ডিসেম্বর ২০২৪ এবং মহাপরিচালক (বিশেষ তদন্ত) এর ই/আর নং-১৬৯/২৪, তারিখ ৩ নভেম্বর ২০২৪। আদালতের আদেশে উল্লেখ করা হয়, অভিযুক্ত ব্যক্তি দেশত্যাগ করলে তদন্ত কার্যক্রম ব্যহত হতে পারে। ফলে জনস্বার্থে তার বিদেশ যাওয়া বন্ধ রাখা প্রয়োজন।
দুদকের অনুসন্ধান অনুযায়ী, তার নামে ১১ কোটি ৪৪ লাখ ৯০ হাজার ১২৫ টাকার সম্পদ পাওয়া যায়। এর মধ্যে ১০ কোটি ৯৫ লাখ ১১ হাজার ৬৪৯ টাকার বৈধ উৎস পাওয়া যায়নি। অথচ তার ঘোষিত বৈধ আয় মাত্র ৪৯ লাখ ৭৮ হাজার ৪৭৬ টাকা।
তার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলোর মধ্যে ডিএমপি’র মিরপুর মডেল থানার এফআইআর নং-২০/২৩৩, তারিখ ১১ মে ২০২১ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এই মামলায় ধারা ৪০৬/৪২০ পেনাল কোড-১৮৬০ অনুযায়ী অভিযোগ করা হয়, তিনি কামরুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তির কাছ থেকে ১৬,০০,০০০ (ষোল লক্ষ) টাকা ধার নিয়ে তা আত্মসাৎ করেন। মামলার জি আর নং, তারিখ ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৩। তবে তদন্তে দেখা যায়, বাদী নিজেই দাবি করেন যে তিনি এই মামলা করেননি এবং এজাহারের তথ্য ভূয়া। তদন্ত শেষে ২৮ অক্টোবর ২০২১ তারিখে ফাইনাল রিপোর্ট (তথ্যগত ভুল) দাখিল করা হয় এবং অভিযুক্তকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়। কাফরুল থানার এফআইআর নং-৬/৯৪, তারিখ ৫ এপ্রিল ২০২১, ধারা ৪২০/৪০৬/৫০৬ মামলায়ও একই ধরনের অভিযোগ ওঠে। যেখানে পরবর্তীতে ২৮ ডিসেম্বর ২০২১ তারিখে ফাইনাল রিপোর্ট নং-৭২ দাখিল করে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। শেরেবাংলা নগর থানার এফআইআর নং-৪৩/১৫১, তারিখ ২৪ মার্চ ২০২১ মামলায়ও ৮ আগস্ট ২০২১ তারিখে ফাইনাল রিপোর্ট নং-৪৬ দাখিল করে অভিযোগ মিথ্যা বলে উল্লেখ করা হয়।
অন্যদিকে বনানী থানার এফআইআর নং-৩৯/২৩৯, তারিখ ২৭ আগস্ট ২০২০ মামলায় চার্জশিট নং-২৫৪, তারিখ ২ নভেম্বর ২০২০-এ তাকে অভিযুক্ত করা হয়। গুলশান থানার এফআইআর নং-২৪, তারিখ ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২২ মামলায় চার্জশিট নং-২৭৬, তারিখ ১০ ডিসেম্বর ২০২৩-এ অভিযোগ গঠন করা হয়। এছাড়া গুলশান থানার এফআইআর নং-৪/২৮৯, তারিখ ২ অক্টোবর ২০২১ এবং এফআইআর নং-৪৭/৩৩২, তারিখ ২৬ অক্টোবর ২০২১ মামলাগুলোতেও চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে যথাক্রমে ৩১ মে ২০২২ তারিখে।
ওই সকল মামলার বাইরে তার বিরুদ্ধে অভিযোগের পরিধি আরও বিস্তৃৃত। ব্যবসায়িক অংশীদার করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আরেফিন সোহেল শিবলীর কাছ থেকে প্রায় ৪ কোটি টাকা, জাহাঙ্গীর সাহেবের কাছ থেকে ৪০ লাখ টাকা গ্রহণ, দুদককে ম্যানেজের নাম করে রংধনু গ্রুপের এমডি অপুর কাছ থেকে ১০ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। বিদেশে পাঠানোর কথা বলে সুধাংশু বাবুর কাছ থেকে ২৮ লাখ টাকা, এলপিজি ডিলারশীপ পাইয়ে দেওয়ার নামে আখি রানীর কাছ থেকে ৮ লাখ ৪০ হাজার টাকা, পাটোয়ারী ট্রাভেলসের মালিকের কাছ থেকে ৩০ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে প্রতারক শফিউল আল মুনিরের বিরুদ্ধে।
এছাড়াও চাকরি দেওয়ার নামে প্রতারণা করে অর্থ হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ আছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরে চাকরি দেওয়ার নামে ৬ লাখ টাকা, ফায়ার সার্ভিসে চাকরি দেওয়ার নামে ৫ লাখ ও ২২ লাখ টাকা, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ঋণ পাইয়ে দেওয়ার নামে ১৫ লাখ টাকা গ্রহণ, পুলিশ কর্মকর্তাদের বদলি করিয়ে দেওয়ার নামে ৩০ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
এর বাইরেও প্রকল্পভিত্তিক প্রতারণার অভিযোগ তার বিরুদ্ধে। খাগড়াছড়িতে ইপিজেড প্রকল্প, ক্যাবল কার প্রকল্প, খুলনায় চিংড়ি ও ইথানল প্রকল্প, নদীতে সাব-জেটি নির্মাণ সহ বিভিন্ন প্রকল্পের নামে বিপুল অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছে বলে অভিযোগে বলা হয়েছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে জমি ক্রয়, অফিস ব্যয়, স্টাফ বেতন, বিদেশ ভ্রমণসহ বিভিন্ন খাতে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অর্থ ব্যয়ের বিবরণও রয়েছে।
এছাড়াও ব্যক্তিগত খরচের ক্ষেত্রেও অন্যের অর্থ ব্যবহারের অভিযোগ আছে। গুলশান অফিসের ভাড়া, ১৮ মাসের স্টাফ বেতন, ইফতার পার্টি, শীতবস্ত্র বিতরণ, সামাজিক অনুষ্ঠান, মাজারের ওরশ ইত্যাদি নামে ভূয়া বিল-ভাউচার দেখিয়ে অর্থ লোপাট করে এই প্রতারক।
শুধু তাই নয়, আরো অভিযোগ রয়েছে তিনি সৌদি আরব, দুবাই এবং ইংল্যান্ডে একাধিকবার ভ্রমণ করেছেন। এসব ভ্রমণের খরচ অন্যের কাছ থেকে নেওয়া অর্থ দিয়ে মিটিয়েছেন। ভয়ভীতি প্রদর্শনেরও অভিযোগ রয়েছে এই প্রতারকের বিরুদ্ধে। অস্ত্রধারী নিরাপত্তাকর্মী ব্যবহার করে ভুক্তভোগীদের ভয় দেখানো, টাকা চাইলে হুমকি দেওয়া এসব অভিযোগ উঠে এসেছে। কারাগারে থাকা অবস্থায়ও সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার নামে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
একটি ঘটনায় উল্লেখ করা হয়, জামিনের প্রয়োজনে একটি রোলেক্স ঘড়ি জামানত হিসেবে দিয়ে ৭০ লাখ টাকা নেওয়ার পর তা ফেরত না দিয়ে উল্টো দাবি করা হয় যে ঘড়িটি জামানত ছিল না।
এছাড়া জমি ক্রয়ের নামে ৬৬ লাখ টাকার চেক দেওয়া হলেও তা ব্যাংকে ডিজঅনার হয়। গুলশানের একটি বাসার ভাড়া বাবদ ২৫ লাখ টাকা বকেয়া থাকার অভিযোগ রয়েছে।
সব মিলিয়ে দেখা যায়, শফিউল্লাহ আল মুনিরের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো বিচ্ছিন্ন নয়। বরং দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আর্থিক লেনদেনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা একটি পরিকল্পিত বিস্তৃৃত অভিযোগের চিত্র। যদিও কিছু মামলায় তিনি অব্যাহতি পেয়েছেন, তবে একাধিক মামলায় চার্জশিট দাখিল এবং দুদকের তদন্ত চলমান থাকায় তার বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া এখনো শেষ হয়নি।
এই সকল পরিস্থিতি বিচার করে বলা যায়, অভিযোগ, মামলা, তদন্ত এবং আদালতের আদেশ সব মিলিয়ে তার কর্মকান্ড নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তা এখনো বিচারাধীন এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করছে আদালত ও তদন্ত সংস্থার ওপর।
এ বিষয়ে বহুবার যোগাযোগ করেও অভিযুক্ত শফিউল্লাহ আল মুনিরের নাগাল পাওয়া যায়নি।




শেয়ার করুন:
কমেন্ট বক্স