ঢাকা | বঙ্গাব্দ

পাবনা গণপূর্তে স্বৈরাচার প্রকৌশলীর নির্বিচার লুটপাট!

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Apr 22, 2026 ইং
পাবনা গণপূর্তে স্বৈরাচার প্রকৌশলীর নির্বিচার লুটপাট! ছবির ক্যাপশন: ৬০/৭০ কোটি টাকার অগ্রিম বিল॥ উচ্চমূল্যে কার্যাদেশ॥ বালিশকান্ড হোতাদের দখলে রূপপুর গ্রীণসিটির প্রায় সকল কাজ
ad728
জয়নাল আবেদীন যশোরী:
 নির্বিচার বা অদম্য লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে পাবনা গণপূর্ত বিভাগের বিরুদ্ধে। এই অপকর্মে নেতৃত্ব দিচ্ছেন ডিভিশনটির নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ রাশেদ কবীর। তিনি গণপূর্ত প্রশাসনে আ’লীগের প্রেতাত্মা, ফ্যাসিবাদের দোসর ও স্বৈরাচার প্রকৌশলী হিসাবে ব্যাপক পরিচিত। তথ্য সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্রের।
এক অভিযোগে জানা যায়, প্রকৌশলী রাশেদ কবীর আ’লীগ সরকারের আমলে রাজারবাগ ও ধানমন্ডি গণপূর্ত উপবিভাগে এসডিই (উপবিভাগীয় প্রকৌশলী) পদে কর্মরত থাকাসহ ঘুরেফিরে ঢাকায় ছিলেন বেশীরভাগ সময়ে। ফ্যাসিবাদকে ভালোবেসে সুদাসদন ও ধানমন্ডি ৩২নম্বরে আ’লীগের সেবা করেছেন প্রায় ৪ বছর। এর প্রতিদান হিসাবে সল্প ব্যবধানে পদোন্নতি নিয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী পদে তাকে নিজজেলা পাবনায় বসানো হয় ২০২৪ সালের মে মাসে। ওই বছর জুন ক্লোজিংয়ে  রূপপুর প্রকল্পে শতাধিক কোটি টাকা অ্যাডভান্স বিল প্রদানসহ ভূয়া ভাউচারের মাধ্যমে লোপাট করেন কয়েক কোটি টাকা। এর পর আর তাকে পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। অদম্য লুটপাটের অগ্রযাত্রা চালিয়েছেন দোর্দন্ড প্রতাপে। ২৪ এর জুলাই আন্দোলনের পরে তিনি মহামান্য রাষ্ট্রপতির ছেলে আরশাদ আদনান রনিকে নিজের ঘনিষ্ট বন্ধু পরিচয় দিয়ে ডিভিশনটিতে সকল অপকর্মের সর্বসেবায় পরিণত হন এই দুর্নীতিবাজ লুটেরা প্রকৌশলী। ছড়ি ঘোরাতে থাকেন গণপূর্তের ঊর্দ্ধতন প্রশাসনে। অন্তরবর্তী সরকারের পুরো সময়ে নামে-বেনামে রাষ্ট্রপতির ছেলে রনির নামে ওয়ার্কঅর্ডার দেখানো হলেও বাস্তবে ওই সকল কাজের নামে নির্বাহী প্রকৌশলী নিজেই করেছেন বেনামী ঠিকাদারী ব্যবসা। একচেটিয়া ক্ষমতার প্রভাবে দ্বন্দ্বে জড়িয়েছেন স্থানীয় ঠিকাদার ও ডিভিশন-সার্কেল এমনকি জোনের অন্যান্য প্রকৌশলীদের সাথে। সে প্রভাবে আবারও পছন্দের ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে ২০২৫ এর জুনে ৬০/৭০ কোটি টাকার অগ্রিম বিল দিয়েছেন নগদ ৫% ঘুষের বিনিময়ে। কোন কোন গণমাধ্যম কর্মী তথ্য অধিকার আইনে ওই বিষয়ে তথ্য চাইলে আট/দশ মাস ঘুরিয়েও কোন তথ্য দেয়নি বলে জানা গেছে।   
২০২৪-২৫ অর্থবছরে জুন মাসে প্রকৌশলী রাশেদ কবির সাজিন কনস্ট্রাকশনের মালিক রূপপুর কেলেঙ্কারীর হোতা শাহাদাত হোসেনকে ৬০-৭০ কোটি টাকার কাজ না করিয়ে অগ্রিম বিল দিয়েছেন। প্রদত্ত অগ্রিম বিলের কাজ এখনও বাস্তবায়ন করা হয়নি বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কতিপয় কর্মকর্তা জানিয়েছেন।  
একই অর্থবছরে পাবনা গণপূর্ত বিভাগের জুন মাসে পাবনা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল স্থাপন প্রকল্পের বিলসহ উন্নয়ন প্রকল্পের পরিশোধিত বিলের কপির সাথে  বাস্তবে কাজের বাস্তাবয়ন যাচাই করলে এর প্রমাণ পাওয়া যাবে। কারণ ৬০-৭০ কোটির অগ্রিম বিলের কাজ আট মাসের আগে বাস্তবায়ন করা কোনভাবেই সম্ভব নয়। এ বিষয়ে বুয়েটের প্রফেসর এ কে এম আক্তার হোসেন বলেন ৬০-৭০ কোটি টাকার ভবন নির্মাণ কাজের অগ্রিম পরিশোধিত বিল প্রদান করলে সেই কাজ সমতা করতে আট মাসের আগে কোনভাবেই একটি জেলা শহরের পক্ষে সম্ভব নয়। এ বিষয়ে জুলাই মাসে পাবনা সার্কেলের দায়িত্ব থাকা তত্তাবধায়ক প্রকৌশলী মোঃ আফছার উদ্দিন বলেন-এই রকম কথা আমিও শুনেছি, বিষয়টি তদন্ত করা প্রয়োজন। 
রাষ্ট্রপতির ছেলে রনির প্রভাবে প্রভাবশালী এই প্রকৌশলী রাশেদ কবির অগ্রিম বিল দিয়েই খ্যান্ত হননি। তিনি পাবনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের রিমেইনিং কাজের নামে পাঁচ কোটি টাকার দরপত্র আহবান করে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ভাগাভাগি ্করার জন্য দরপত্র আহবান করেছেন যার দরপত্র আইডি নম্বরঃ ১২১৭৬১২। পাবনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল স্থাপন প্রকল্পে মোঃ রাশেদ কবিরের নামে দরপত্রে অনিয়ম ও নিম্নমাণের সামাগ্রী দিয়ে কাজ করিয়ে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বড় কমিশন নেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। একই প্রকল্পে স্যুয়ারেজ ট্টিটমেন্ট প্ল্যান্ট কাজে সর্বনিম্ন দরদাতাকে কাজ না দেওয়ার অভিযোগ আছে। এজন্য দরপত্র মার্চ মাস থেকে অদ্যাবধি ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। এর দরপত্র আইডি নম্বরঃ ১২৩১৭৯০। 
প্রকৌশলী রাশেদের পছন্দ আওয়ামী/স্বৈরাচার ঠিকাদার: এক অভিযোগে জানা যায়, ফ্যাসিবাদ স্বৈরাচার লালন-পালন ও ভালোবাসার কারণে আওয়ামী ঠিকাদারদেরই তিনি কাজ পাইয়ে দিচ্ছেন শুরু থেকেই। সে ধারা বর্তমান বিএনপি সরকারের সময়েও বহাল আছে। রূপপুর গ্রীণসিটির উন্নয়ন প্রকল্প থেকে শুরু করে এপিপি’র মেরামত রক্ষণাবেক্ষণের ৯০% কাজগুলো করছে আ’লীগ ছাত্রলীগের কথিত ঠিকাদার গ্রুপ। গোপালগঞ্জের অধিবাসী সাবেক ছাত্রলীগ নেতা দ্বীন ইসলামের এসএ এন্টারপ্রাইজ, আ’লীগের বাবর এসোসিয়েটস্, আওয়ামী পকেটের ঠিকাদার শাহাদাৎ হোসেনের সাজিন কনস্ট্রাকশন লিঃ, কুষ্টিয়ার আ’লীগ নেতার প্রতিষ্ঠান গ্যালাক্সি এসোসিয়েটস্ স্থানীয় আরো ৩/৪টি প্রতিষ্ঠান একচেটিয়া কাজ করছে ডিভিশনটিতে। আগেভাগে রেটকোড জানিয়ে দেওয়াসহ ওই সিন্ডিকেটের কাজ পাওয়ার সকল মেকানিজম প্রকৌশলী রাশেদ কবিরের হাতে। 
অনুসন্ধানে আরো জানা যায়, বর্তমান প্রেসিডেন্ট চেয়ারে বসার পরে এই পূর্ত প্রকৌশলী ব্যাপক ক্ষমতাবান হয়ে উঠেন। মহামান্যের নাম বিক্রি করে ধরাকে সরাজ্ঞান করে পূর্ত প্রশাসনের ওপরে ছড়ি ঘুরিয়ে আসছেন তিনি। ক্ষমতার প্রভাবে ঊর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের আদেশ-নির্দেশকেও থোরাই কেয়ার করছেন। বাহাদুরি দেখিয়েছেন নিজ সার্কেলের ঊর্দ্ধতন কর্মকর্তা দুই তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর (এসই) সাথেও। অভিযোগ করে ও মন্ত্রণালয়ে মোটা অংকের অর্থ খরচ করে একজন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীকে ইতোপূর্বে বদলী করিয়েছেন। সুবিধাভোগী ঠিকাদারদের লেলিয়ে দিয়েছেন সাবেক ওই এসই’র বিরুদ্ধে। তাদেরকে প্রলোভনে ফেলে উসকে দিয়ে এসই’র বিরুদ্ধে কথিত মানববন্ধনসহ বিভিন্ন প্রতিবাদ করিয়েছেন এই প্রকৌশলী। এতে সার্কেল ও ডিভিশনের কর্ম পরিবেশ বিঘিœত হয়েছে এখনও হচ্ছে। ভেঙ্গে পড়ছে চেইন অব কমান্ড। শোষিত বঞ্চিত বেশীরভাগ স্থানীয় ঠিকাদার বলছেন, পাবনা গণপূর্ত বিভাগে চলছে একজনের স্বৈরশাসন। আ’লীগের সময়েও এমন দেখা যায়নি। কিন্তু তার বিরুদ্ধেই টেন্ডার জালিয়াতির বিষয়ে স্থানীয় পত্র-পত্রিকায় ইতোপূর্বে বহু সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। তাতে বলা হয়, নীতিমালা উপেক্ষা করে সোনেক্স ইন্টারন্যাশনাল ও ড্যাফোডিল ইলেকট্রিক কোম্পানিকে কাজ দিয়েছেন পাবনা গণপূর্ত অফিসের নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদ কবির ও সহকারী প্রকৌশলী (ষ্টাফ অফিসার) আশরাফ চৌধুরী। এমন জোড়ালো অভিযোগ করেছে ভুক্তভোগী প্রতারিত বঞ্চিত ঠিকাদার মহল। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ২ জন ঠিকাদাররা জানান, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র্রের আবাসিক ভবনের ৪৪টি লিফট যন্ত্রাংশ সরবরাহ ও মেরামতসহ অন্যান্য কাজের ২টি প্যাকেজে দরপত্র আহবান করে পাবনা গণপূর্ত অফিসের নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদ কবির। তারা জানান, সোনেক্স ইন্টারন্যাশনাল ও ড্যাফোডিল ইলেকট্রিক কোম্পানি সাথে যোগসাজশ করে পিপিআর-২০০৮ এর আইন নীতিমালা উপেক্ষা করে সরবরাহের ক্ষেত্রে এঙঙউঝ এর পরির্বতে ডঙজকঝ পদ্ধতিতে দরপত্র আহবান করে এবং দরপত্রের গোপণ মূল্য বা ‘রেট শিডিউল’ তথ্য ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রকাশ করে। যা পুরোপুরি অনিয়ম। তারা আরো জানান, পাবনা গণপূর্ত অফিসের নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদ কবির, সহকারী প্রকৌশলী (ষ্টাফ অফিসার) আশরাফ চৌধুরী এর মাধ্যমে সোনেক্স ইন্টারন্যাশনাল ও ড্যাফোডিল ইলেকট্রিক কোম্পানি কাছ থেকে মোটা অংকের কমিশন নিয়ে তাদেরকেই কাজ পাইয়ে দিযেছেন এই প্রকৌশলী
ওই সময়ে দরপত্র বিজ্ঞপ্তি পর্যালোচনা ও ঠিকাদারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০২৫ সালের ০৭ এবং ০৮ সেপ্টেম্বর ইজিপির মাধ্যমে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের আবাসিক ভবনের ৪৪টি লিফট যন্ত্রাংশ সরবরাহ ও মেরামতসহ অন্যান্য কাজের ২টি প্যাকেজে দরপত্র বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। ওই দরপত্র আহ্বান করেন কমিটির প্রধান নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদ কবির। ই-জিপির (ইলেকট্রনিক গভর্নমেন্ট প্রকিউরমেন্ট) মাধ্যমে আহ্বান করা দরপত্র বিক্রির শেষ তারিখ, দাখিল ও খোলার তারিখ ছিল গত ২১ ও ২২ সেপ্টেম্বর।
এমন অবস্থায় স্থানীয়রা বলেন গণপূর্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর এখানে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন হয় সেক্ষেত্রে, নির্দিষ্ট নিয়মের মাঝে কাজ করতে হবে। তা না হলে হয়তে অনিয়মটাই নিয়মে পরিনত হবে। যার পরিস্থিতি হবে ভয়াবহ। আমরা এ থেকে প্রতিকার চাই।
তথ্যানুসন্ধানে আরো জানা যায়, ২০২৪ সালের মে মাসে ডিভিশনটির দায়িত্বে এসে প্রকৌশলী রাশেদ কবির গ্রীণ সিটিসহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের প্রায় সোয়া ৪শ’ কোটি টাকার ওয়ার্কঅর্ডার সাইন করেছেন। এ ক্ষেত্রে নির্বাহী প্রকৌশলী ১% হিসেবে প্রায় সোয়া ৪কোটি টাকা ঘুৃষ পেয়েছেন বলে নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়। এ সময়ে তিনি উন্নয়ন প্রকল্পের বিল দিয়েছেন প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা। এক্ষেত্রেও ১% হিসেবে প্রায় ১০ কোটি টাকা এব্ং অ্যাডভান্স বিলের ক্ষেত্রে প্রায় ৫শ’ কোটি টাকার বিলে তিনি ২% করে আরো প্রায় ১০ কোটি টাকা বাগিয়ে নিয়েছেন তিনি। দুই জুন ক্লোজিংয়ে ভূয়া বিল-ভাউচারসহ পিসি বাবদ আরো কয়েক কোটি টাকা পকেটস্থ করেছেন এই দুর্নীতিবাজ প্রকৌশলী। 
তবে বিষয়হুলো নিয়ে পাবনা গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদ কবির ও সহকারী প্রকৌশলী (ষ্টাফ অফিসার) আশরাফ চৌধুরীর সাথে ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও তাদের কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি। (ক্রমশঃ)




শেয়ার করুন:
কমেন্ট বক্স
আবারও হরমুজ প্রণালি বন্ধ ঘোষণা ইরানের

আবারও হরমুজ প্রণালি বন্ধ ঘোষণা ইরানের