ঢাকা | বঙ্গাব্দ

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে গণবদলি: বাণিজ্য ও রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Apr 27, 2026 ইং
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে গণবদলি: বাণিজ্য ও রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ ছবির ক্যাপশন: স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের লোগো। ছবি: সংগৃহীত
ad728
নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশের স্বাস্থ্য খাতে সাম্প্রতিক সময়ে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ধারাবাহিক বদলি ও পদায়নকে কেন্দ্র করে। গত ২০ থেকে ২৪ এপ্রিল পর্যন্ত কয়েক দিনের ব্যবধানে একাধিক প্রজ্ঞাপন জারি করে বিভিন্ন পর্যায়ের চিকিৎসকদের বদলি করা হয়েছে।

অধিদপ্তর সূত্রে এসব বদলিকে নিয়মিত প্রশাসনিক কার্যক্রম বলা হলেও, একাধিক চিকিৎসক এর নেপথ্যে আর্থিক লেনদেন ও রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ তুলেছেন। চিকিৎসকদের একটি অংশের দাবি, বিশেষ করে এফসিপিএস (ট্রেইনি) চিকিৎসকদের বদলির ক্ষেত্রে বিদ্যমান নিয়ম অনুসরণ করা হয়নি। সাধারণত চার বছরের প্রশিক্ষণ চলাকালে ট্রেইনি চিকিৎসকদের বদলি করা হয় না। তবে সাম্প্রতিক প্রজ্ঞাপনে অনেককে মাঝপথে সরিয়ে দেওয়ায় তাদের প্রশিক্ষণ ও পরীক্ষায় অংশগ্রহণ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন চিকিৎসক জানান, এই বদলির ফলে তারা পেশাগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন এবং এটি ‘হয়রানি’ হিসেবে দেখছেন।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হাসপাতালে একাধিক চিকিৎসককে নতুন করে পদায়ন দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের রেজিস্ট্রার (স্কালবেস নিউরোসার্জারি) ডা. মো. হাবিবুল্লাহকে রাজশাহীর তানোর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সহকারী সার্জন হিসেবে বদলি করা হয়েছে। একইভাবে ইনডোর মেডিকেল অফিসার ডা. সাদী মাসুদ আল তুরাবকে কুমিল্লায় পাঠানো হয়েছে। অন্যদিকে, নোয়াখালী থেকে প্যাথলজিস্ট মো. ইমাম হোসেনকে ঢাকা মেডিকেলে রেজিস্ট্রার হিসেবে এবং ওএসডিতে থাকা ডা. দেবজ্যোতি মজুমদারকে ইনডোর মেডিকেল অফিসার হিসেবে পদায়ন দেওয়া হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন বিভাগে নতুন করে রেজিস্ট্রার ও সহকারী রেজিস্ট্রার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলায়ও বদলি হয়েছে একাধিক চিকিৎসকের। নওগাঁর লেকচারার মো. সোলায়মান আলীকে বগুড়ায়, ডা. নিলয় দাসকে মির্জাপুরে এবং ডা. রফিকুজ্জাহার রেজাকে সিরাজগঞ্জে পদায়ন করা হয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা পর্যায়েও পরিবর্তন এসেছে বিভিন্ন জেলায়। এদিকে, কিছু চিকিৎসক অভিযোগ করেছেন—পূর্ববর্তী সময়ে ঢাকার বাইরে বদলি হওয়া কয়েকজন চিকিৎসককে আবার গুরুত্বপূর্ণ পদে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে, আর অন্যদিকে সাম্প্রতিক সময়ে পোস্টিং পাওয়া কিছু চিকিৎসককে পুনরায় সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাদের মতে, এতে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে বৈষম্যের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরামের (এনডিএফ) একাধিক নেতা বদলির বিষয়টির সত্যতা স্বীকার করেন। তারা বলেন, আমরা জুলাই আন্দোলনে একসঙ্গে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন-সংগ্রাম করে এ দেশকে ফ্যাসিবাদমুক্ত করেছি। আমরা আশা করি, বদলি বা পদায়নের ক্ষেত্রে আমাদের প্রতি কোনো ধরনের অন্যায় বা বৈষম্য করা হবে না।

গণবদলির বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. জাহিদ রায়হান বলেন, ট্রেইনিদের বদলির বিষয়টি আজই (সোমবার) আমার দপ্তরে এসেছে। এসব অর্ডার দু-চারদিনের ভিতরে হয়েছে। আমরাই আদেশগুলোতে স্বাক্ষর করেছি। সমস্যা হলো, এগুলোর অধিকাংশই এফসিপিএস ট্রেইনি। এই পদে যোগদানকারীরা ওএসডি (বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) হিসেবে নয় বরং নিয়মিত হিসেবে করে। আদেশগুলো পুনর্বিবেচনার জন্য নথিতে তুলতে বলেছি। যাদের প্রশিক্ষণই সম্পন্ন হয়নি, তাদেরকে অন্যত্র দিয়ে দেওয়া কোনোভাবেই উচিত নয়। তিনি আরও বলেন, যেখানে ট্রেইনি বিবেচনা হবেনা এমন জায়গায় বদলি হলে সেটির বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। আর যেখানে হলে সমস্যা হবেনা সেখানে সেভাবেই থাকবে। আমি তো জেনেশুনে কারো ক্যারিয়ার নষ্ট করতে পারিনা। তবে রাজনৈতিক বদলির বিষয়টি তিনি অস্বীকার করেন। জাহিদ রায়হান বলেন, গুরুত্বপূর্ণ পদে হয়তো দু-একটি পদে বদলির ঘটনা ঘটেছে, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে কোনো বদলি হয়নি। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের ঘন ঘন বদলি স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রমে প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে বর্তমানে দেশে হামের প্রকোপ থাকায় টিকাদান ও চিকিৎসা কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা জরুরি।

এদিকে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের সকল ধরনের ছুটি বাতিল করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এমন অবস্থায় চিকিৎসকদের এক স্থান থেকে অন্য স্থানে বদলি করায় চিকিৎসাসেবায় বিঘ্ন সৃষ্টি হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, হামের মতো সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে যখন সরকারকে বাড়তি চাপ সামলাতে হচ্ছে, তখন চিকিৎসকদের স্থিতিশীলভাবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন। কিন্তু চলমান বদলি কার্যক্রমের কারণে মাঠপর্যায়ে চিকিৎসাসেবায় সমন্বয়হীনতা তৈরি হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সরকারের কিছু শুভাকাঙ্ক্ষী মনে করছেন, এমন সংবেদনশীল সময়ে বদলি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও প্রয়োজনীয়তা নিশ্চিত না হলে জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থায় আরও চাপ সৃষ্টি হতে পারে। পরিস্থিতি বিবেচনায় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে বদলি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন চিকিৎসকদের একটি অংশ।





শেয়ার করুন:
কমেন্ট বক্স
সমালোচনার মুখে মাইকেল জ্যাকসনের বায়োপিক

সমালোচনার মুখে মাইকেল জ্যাকসনের বায়োপিক