ঢাকা | বঙ্গাব্দ

দস্যুরানী হাবিবার কবলে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ তথ্য দপ্তর!

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Jul 18, 2026 ইং
দস্যুরানী হাবিবার কবলে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ তথ্য দপ্তর! ছবির ক্যাপশন:
ad728
আসাদ মাহমুদ:
এক দস্যু রানীর কবলে পড়েছে মৎস্য ও প্রানী সম্পদ তথ্য দপ্তর। তিনি পদ ও পদবীকে হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করে দপ্তরটির প্রচার ও প্রকাশনা কাজে চালিয়ে আসছেন এক ধরণের নীরব লুটপাটের অভিযান। অভিযুক্ত এই দস্যুরানী হচেজ্ছন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ তথ্য দফতরের উপপরিচালক (ডিডি) উপসচিব উম্মে হাবিবা। স্বৈরাচারের প্রেতাত্মা এই জনপ্রশাসন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে টেন্ডারে নানা অনিয়মের মাধ্যমে সরকারের লাখ লাখ টাকা লোপাট করার অভিযোগ রয়েছে। এমনকি অধীনস্থ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে আর্থিক অনিয়মের কাজে বাধ্য করারও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে তাকে বস্ত্র অধিদফতরের পরিচালক পদে বদলি করা হলেও প্রভাব বিস্তার করে অবৈধ অর্থের লোভে তিনি বর্তমান পদে রয়ে গেছেন বহালতবিয়তে। তথ্য সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্রের।
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, ডিডি উম্মে হাবিবাকে গত ১৬ জুন বস্ত্র অধিদফতরের পরিচালক হিসেবে বদলি করা হয়। বদলির প্রজ্ঞাপনে তাকে ২২ জুনের মধ্যে দায়িত্ব হস্তান্তরের নির্দেশ দেওয়া হয়। এই সময়ের মধ্যে তিনি দায়িত্ব হস্তান্তর না করলে এদিন অপরাহ্ন থেকে তাৎক্ষণিকভাবে অবমুক্ত গণ্য হবেন বলে বদলির আদেশে উল্লেখ করা ছিলো। কিন্তু স্ট্যান্ড রিলিজ বা তাৎক্ষণিক অবমুক্তির কোনো তোয়াক্কাই করছেন না এই ফ্যাসিবাদেে দোসর লুটপাটের কারণে ‘দস্যুরানী’ হিসাবে পরিচিতি পাওয়া এই নারী কর্মকর্তা। এ রিপোর্ট তৈরি করা পর্যন্ত তিনি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ তথ্য দফতরেই প্রভাবে সহিত বহাল-তবিয়তে রয়েছেন। কায়েম করছেন লুটপাটের রাজ্য। এমনকি ওই বদলির আদেশ বাতিলের জন্য মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন প্রভাবশালী মহলে কাড়ি কাড়ি টাকা নিয়ে তদবির করছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
উপসচিব উম্মে হাবিবা স্বৈরাচার আওয়ামী দোসর কর্মকর্তা হিসেবে ব্যাপক পরিচিত। এই দফতরে যোগদান করার আগে আওয়ামী সরকারের আমলে দীর্ঘ সময় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে ছিলেন তিনি। তৎকালীন স্বাস্থ্য সচিব জাহাঙ্গীর আলমের নানা দুর্নীতি লুটপাট ও সকল ধরণের দুষ্কর্র্মের একনিষ্ঠ দোসর হিসেবে তাকে আখ্যায়িত করা হতো। উম্মে হাবিবার সেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে তখনকার মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা সোচ্চার হয়ে ওঠেছিল। তার বিরুদ্ধে আন্দোলন হয়েছিল ওই সময়ে। কিন্তু প্রভাবশালী সচিব জাহাঙ্গীর আলমের দুর্নীতি-অনিয়মের সহযোগী হওয়ায় সচিবের কল্যাণে লীগ আমলে তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যায়নি। আওয়ামী ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর তাকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়। কিন্তু পরবর্তীতে অনেকটা রহস্যজনকভাবে ফ্যাসিস্ট সরকারের দোসর এই কর্মকর্তাকে শাস্তির পরিবর্তে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ তথ্য দফতরের ডিডি পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। এই পদে থেকে তিনি দফতরের সকল টেন্ডার, কেনাকাটা ও প্রচার-প্রকাশনার কাজ গোপণ কোটেশন করে নানা রকমের কারসাজির মাধ্যমে নিজস্ব লোকদের মধ্যে বিলিবণ্টনের ব্যবস্থা করেন। এ কাজে তিনি একটা শক্তিশালী লুটেরা সিন্ডিকেটও গড়ে তুলেছেন। তাঁর এই সিন্ডিকেটের বাইরে অন্য কোনো ঠিকাদারের এই দপ্তরে কাজ পাওয়ার সুযোগ নেই। এদের মাধ্যমে তিনি অনেক ক্ষেত্রেই কাজ না করে বা সামান্য কাজ করে ভূযা বিল-ভাউচারের মাধ্যমে বরাদ্দের টাকা তুলে সিংহভাগ ভাগ-বাটোয়ারা করে আসছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রিন্টিং এবং এ সংক্রান্ত প্রচার-প্রকাশনার কাজগুলো বেশিরভাগই দেওয়া হয় রায়আন প্রিন্টার্স নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে। টিভিসি বা ভিডিও বিজ্ঞাপনের কাজগুলো করেন জনৈক রবিন। টেন্ডার বা কোটেশনে নানা কারসাজির মাধ্যমে এদের কাজ পাইয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন দস্যুরানী ডিডি উম্মে হাবিবা। 
প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যাচ্ছে, পিপিআর অনুযায়ী সব নিয়মকানুন অনুসরণ করে সর্বনিম্ন দরদাতা হওয়া সত্ত্বেও অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে কাজ না দিয়ে সিন্ডিকেটের প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হচ্ছে। এমনকি বেশি মূল্যে কার্যাদেশ দেওয়া হচ্ছে। ডিডির এরকম স্বেচ্ছাচারী ও বেপরোয়া দুর্নীতির কারণে প্রতিটি কেনাকাটায় সরকারের বড় অংকের অর্থ গচ্ছা যাচ্ছে প্রতিনিয়ত।
পিপিআর অনুযায়ী প্রাক্কলিত দরের ২০% পর্যন্ত নিম্নেদর দাখিল করার সুযোগ আছে। সে হিসেবে আইডি নং ১২৩৯৭৭৩ টেন্ডারে প্রথম সর্বনিম্ন দরদাতা তিথি প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং। এই প্রতিষ্ঠানটির প্রস্তাবিত দর ছিল ৯ লাখ ৫৬ হাজার ৫শ’ ৪৪ টাকা। কিন্তু এই প্রতিষ্ঠানটির পরিবর্তে ৫ম সর্বনিম্ন দরদাতা রায়আন ট্রেডার্সকে কার্যাদেশ পাইয়ে দেন দস্যুরাণী হাবিবা। রায়আন ট্রেডার্সের দাখিলকৃত দর ছিল ১০ লাখ ৭৪ হাজার ৬শ’ ৬১ টাকা।
আইডি নং ১২৩৯৭৩৪ টেন্ডারে প্রথম সর্বনিম্ন দরদাতা একুশে মিডিয়া নামে একটি প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানটির দর ছিল ৮ লাখ ৬৯ হাজার ৯শ’ ৯২ টাকা। কিন্তু কাজটি পাইয়ে দেওয়া হয়েছে ৪র্থ সর্বনিম্ন দরদাতা রায়আন ট্রেডার্সকে। এই প্রতিষ্ঠানটির দর ছিল ৮ লাখ ৯৯ হাজার ১শ’ ২ টাকা।
আইডি নং ১১৮৮৩৫৯ টেন্ডারে প্রথম সর্বনিম্ন দরদাতা খন্দকার এন্টারপ্রাইজ। এই প্রতিষ্ঠানটির প্রস্তাবিত দর ছিল ৯ লাখ ৭৯ হাজার ৪শ’ টাকা। এখানেও প্রথম সর্বনিম্ন দরদাতার পরিবর্তে কারসাজি করে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতা রায়আন ট্রেডার্সের অনুকূলে কার্যাদেশ পাইয়ে দেওয়া হয়।
শুধু এ ধরনের অনিয়ম বা কারসাজিই নয়, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে যথাযথভাবে সরবরাহকৃত মালামাল বুঝে না নিয়ে বিল প্রদানেরও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে দুর্নীতির রানী ডিডি উম্মে হাবিবার বিরুদ্ধে। মাঠ পর্যায়ে কোনো কাজ না করেই জালিয়াতির মাধ্যমে ভুয়া বিল প্রস্তুত করে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করারও অভিযোগ রয়েছে।
অনুসন্ধানে আরো জানা যায়, ঢাকার প্রধান কার্যালয়সহ দেশের চারটি আঞ্চলিক অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিজের একক ইচ্ছা অনুযায়ী অবৈধ কাজ করতে বাধ্য করেন এই উপসচিব। কেউ তার অনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করলে তাকে চাকরিচ্যুত করার হুমকি, বেতন বন্ধের ভয় দেখানো এবং দুর্ব্যবহারের শিকার হতে হয় লুটের রানী উম্মে হাবিবার হাতে। ইতোমধ্যে তার এই অপকর্মের প্রতিবাদ করায় দু’জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে নিয়মবহির্ভূতভাবে শান্তিমূলক বদলি করা হয়েছে। 
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, উম্মে হাবিবা নিজেকে অত্যন্ত প্রভাবশালী কর্মকর্তা হিসেবে দাবি করেন। উর্দ্ধতন বিভিন্ন মহলে প্রভাবশালীদের নাম ভাঙিয়ে চলেন। এমনকি নিজের অবস্থান টিকিয়ে রাখতে তিনি অর্থ লেনদেনের মতো অনৈতিক সুবিধা দেয়ার গল্পও ছড়িয়ে বেড়ান প্রতিষ্ঠানটিতে। যাতে সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ভয়ে মুখ খুলতে সাহস না পায়। 
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ভুক্তভোগী কতিপয় কর্মকর্তা-কর্মচারী জানান, বর্তমান সময়ে যেখানে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতকে এগিয়ে নিতে একটি গতিশীল ও স্বচ্ছ প্রচার দফতর প্রয়োজন, সেখানে একজন বিতর্কিত কর্মকর্তার কারণে পুরো দফতরের চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়েছে। প্রজাতন্ত্রের এমন গুরুত্বপূর্ণ পদে স্বৈরাচারের দোসর এবং দুর্নীতিবাজ লুটেরা কর্মকর্তা বহাল থাকলে সংস্কার কার্যক্রম ব্যাহত হবে। মৎস্য ও প্রাণী সম্পদ খাত ঝিমিয়ে পড়ে সামনের দিকে না এগিয়ে ক্ষতিগ্রস্থ হবে।
জানা গেছে, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ তথ্য দফতরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পক্ষ থেকে সম্প্রতি জনপ্রশাসন সচিব বরাবর একটি অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। তাতে ডিডি উম্মে হাবিবার নানা অনিয়ম-অপকর্মের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পক্ষে জনৈক রাকিবুল আলম খান স্বাক্ষরিত ওই অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ তথ্য দফতরে ডিডি হিসেবে উম্মে হাবিবা যোগদানের পর থেকেই প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘদিনের সুনাম ক্ষুন্ন ও স্বাভাবিক কাজকর্ম স্থবির হয়ে পড়েছে। তিনি কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে একক সিদ্ধান্তে স্বৈরাচারী কৌশলে দফতর পরিচালনা করছেন।
অভিযোগ রয়েছে, দস্যুরানী ডিডি উম্মে হাবিবা অন্তর্র্বতী সরকারের আমলে উপদেষ্টার দফতরের একজন কর্মকর্তাকে নিয়মিত মাসোহারা দিতেন। এভাবেই তিনি মন্ত্রণালয়কে ম্যানেজ রাখতেন। এয়াড়াও তার বিরুদ্ধে রয়েছে অসামাজিক কর্মকান্ডসহ আরো বিভিন্ন গুরুতর অভিযোগ  (ক্রমশঃ)




শেয়ার করুন:
কমেন্ট বক্স