ঢাকা | বঙ্গাব্দ

‘নগদ’কে ঘিরে শত কোটির ব্যবসা পোস্টাল এডিজির!

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Sep 6, 2026 ইং
‘নগদ’কে ঘিরে শত কোটির ব্যবসা পোস্টাল এডিজির! ছবির ক্যাপশন: ডাক অধিদপ্তরের অতিঃ মহাপরিচালক জাকির হোসেন নূরের বিরুদ্ধে অনিয়ম দুর্নীতির অভিযোগ
ad728
আসাদ মাহমুদ:
 ডিজিটাল আর্থিক লেনদেন প্লাটফর্ম নগদকে নিয়ে ব্যবসা পেতেছেন ডাক বিভাগের এক অতিরিক্ত মহাপরিচালক (এডিজি)। ডিপার্টমেন্টকে উৎস বানিয়ে এবং পদ পদবীকে হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করে তিনি বাগিয়ে নিচ্ছেন শত কোটি টাকার আর্থিক সুবিধা। ডাক অধিদপ্তরের অভিযুক্ত এই কর্মকর্তার নাম জাকির হাসান নূর। তিনি ডাকসেবা বিভাগের দায়িত্বে আছেন।
সরকারি এই কর্মকর্তা নগদ-সংক্রান্ত দাপ্তরিক দায়িত্ব পালন করার পাশাপাশি আড়ালে থেকে মামাতো ভাইয়ের নামে চালিয়ে যাচ্ছেন নগদের ‘মানি ডিস্ট্রিবিউটর’ ব্যবসা। এই ব্যবসায় মাসিক লেনদেন ২০০ কোটি টাকারও বেশি।
মোবাইল আর্থিক সেবা (এমএফএস) প্রতিষ্ঠান নগদ শুরু থেকেই ডাক বিভাগের সেবা হিসেবে পরিচিত হয়ে আসছে। কিন্তু নগদের মূল মালিকানায় আছে থার্ড ওয়েভ টেকনোলজিস লিমিটেড নামক একটি প্রতিষ্ঠান। এই থার্ড ওয়েভকে ডাক বিভাগের পরিচয়ে এমএফএস ব্যবসায়ে আনার অন্যতম মাস্টারমাইন্ড ছিলেন এডিজি জাকির। আর নগদের ডিস্ট্রিবিউটর ব্যবসায় নিজের মামাতো ভাইকে বসিয়ে নেপথ্যে থেকে ব্যবসা করে আসছেন তিনি।
জানা যায়, ২০১৮ সালের ১ অক্টোবর পাঁচটি ডিস্ট্রিবিউটর প্রতিষ্ঠান নিয়ে পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু করে নগদ। এর একটি ‘এম আর কর্পোরেশন’। প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার মোহাম্মদ তারিকুজ্জামান। বাঙালি সংবাদের কাছে আসা তাঁর জীবনবৃত্তান্ত বলছে, ক্যারিয়ারে কখনো কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না তিনি। তবুও নগদের মাত্র পাঁচ ডিস্ট্রিবিউটর প্রতিষ্ঠানের একটি পেয়ে যান তিনি। এর রহস্য খুঁজতে গিয়ে বেড়িয়ে আসে তাঁর পারিবারিক সম্পর্ক। ডাক অধিদপ্তরের তৎকালীন ডেপুটি পোস্টমাস্টার জেনারেল (ডিপিএমজি) জাকির হাসান নূরের আপন মামাতো ভাই হলেন তারিকুজ্জামান।
জাকিরের পদোন্নতি ও ব্যবসা বেড়েছে তারিকের
সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ইতোমধ্যে ক্যারিয়ারে দুইদফা পদোন্নতি পেয়েছেন জাকির। পাশাপাশি বেড়েছে তারিকুজ্জামানের ব্যবসা। বর্তমানে নগদের বৃহত্তর ঢাকা উত্তর অঞ্চলে তিনটি ডিস্ট্রিবিউটর প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার মামাতো ভাই তারিকুজ্জামান। জুলাই অভ্যুত্থানের পর নগদ পরিচালনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের বসানো প্রশাসক ও ব্যবস্থাপনা কমিটির তদন্তে উঠে আসে, এম আর কর্পোরেশনের তিনটি ডিস্ট্রিবিউটরশিপ থেকে মাসিক ২০০ কোটি টাকারও বেশি লেনদেনের ঘটনা। এ থেকে শুধু কমিশন বাবদ মাসে ২৫ লাখ এবং সব খরচ বাদে মাসে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত আয় হয়েছে তারিক তথা জাকিরের।
২০১৭ থেকে ২০২৩ সালের ৪ অক্টোবর পর্যন্ত জাকির কখনো নগদ-সংক্রান্ত কাজে দরপত্র আহ্বান ও মূল্যায়ন, চুক্তি স্বাক্ষরে যুক্ত ছিলেন। আবার কখনো ডাক বিভাগের প্রতিনিধি হিসেবে সরাসরি নগদে দায়িত্ব পালন করেছেন। কিন্তু কখনো তারিকুজ্জামানের সঙ্গে নিজের সম্পর্কের কথা প্রকাশ করেননি, যা স্পষ্টতই কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট বা স্বার্থের সংঘাতের মধ্যে পড়ে।
ছিনতাইয়ের ঘটনায় স্পষ্ট হয় জাকিরের মালিকানা:
২০২৫ সালের ১৪ জুন ঈদুল আজহার সরকারি ছুটি শেষ হওয়ার আগের দিন সকালে উত্তরার ১৩ নম্বর সেক্টরের ১২ নম্বর সড়কে নগদের এক এজেন্টের এক কোটি আট লাখ টাকা ছিনতাই হয়। সেই এজেন্টের ডিস্ট্রিবিউটর ছিলেন তারিকুজ্জামান। ছিনতাই হওয়া অর্থও তাঁর ব্যবসার।
ঘটনার পর পুলিশের কাছে প্রথমে নিজেকে নগদের ডিস্ট্রিবিউটরের মালিক পরিচয় দেন জনৈক আব্দুল খালেক নয়ন। উত্তরা পশ্চিম থানায় জিডি ও মামলা দায়ের করেন আব্দুর রহমান (৩২) নামের আরেকজন। তিনি নিজেকে ‘মানি ডিস্ট্রিবিউটর হিসেবে কর্মরত’ বলে পরিচয় দেন। জিডি ও মামলার নথি অনুযায়ী, আব্দুর রহমানের ঠিকানা ১৩ নম্বর সেক্টরের ১২ নম্বর সড়কের ২৯ নম্বর বাসা। ছয়তলা এই ভবনটির মালিক ২০তম বিসিএসের ডাক ক্যাডারের কর্মকর্তা জাকির ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা। নামফলক অনুযায়ী ভবনটির নাম নূরজাহান ভিলা। মালিক মো. আব্দুল মজিদ। আমাদের হাতে আসা জাকিরের পাসপোর্ট অনুযায়ী, এটিই তাঁর ঠিকানা। তাঁর বাবার নাম আব্দুল মজিদ, মায়ের নাম নূরজাহান বেগম। মামলায় নগদের কার্যালয় দেখানো হয়েছে জাকিরের বাড়ি থেকে সামান্য দূরত্বে অবস্থিত একই সড়কের ৩৭ নম্বর বাসা।
অনুসন্ধান বলছে, তারিকুজ্জামানকে সামনে রেখে ডিস্ট্রিবিউটরের এই ব্যবসা মূলত পরিচালনা করেন জাকির নিজেই। সে কারণে ছিনতাইয়ের ঘটনায়ও মামাতো ভাইকে সামনে আনেননি তিনি। ব্যবসায়ে নিজের সম্পৃক্ততা ফাঁস হয়ে যাওয়ার ভয়ে ছিনতাই-সংক্রান্ত সব আইনি প্রক্রিয়া থেকে তারিককে আড়ালে রাখেন।
তারিকুজ্জামানের আবেদনে গড়মিল
তারিকুজ্জামানের ডিস্ট্রিবিউটরশিপ পাওয়ার প্রক্রিয়ায়ও রযেছে নানা অসামঞ্জস্য। ২০১৮ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর তারিকুজ্জামানের এম আর কর্পোরেশন আবেদন করে, মাত্র একদিন পরেই অনুমোদন মেলে। পরে আরও দুটি ডিস্ট্রিবিউটরশিপ নেন তিনি। এগুলো হচ্ছে, এম আর কর্পোরেশন দক্ষিণখান এবং এম আর কর্পোরেশন তুরাগ। ২০১৯ সালের ২৭ নভেম্বর দক্ষিণখানের এবং ২০২৪ সালের ২৭ মে আবেদন করে সেদিনই তুরাগের ডিস্ট্রিবিউটর হন তিনি।
আবেদন ফর্ম বিশ্লেষণে ধরা পড়ে একাধিক অসঙ্গতি। তিনটি প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা একই। রাজধানীর কাফরুল এলাকার জনতা হাউজিং, ৫ নম্বর সড়কের ২৫ নম্বর বাড়ি। কিন্তু তিন ফর্মে তিন রকম পোস্ট কোড ও ডাকঘরের নাম। প্রথম ফর্মে পোস্টকোড ১২০৭ (কাফরুলের সঠিক কোড ১২০৬) এবং ডাকঘরের নাম নেই। দ্বিতীয় ফর্মে ডাকঘর দেখানো হয়েছে মোহাম্মদপুর, যদিও কাফরুল এলাকা মিরপুর ও ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট ডাকঘরের আওতায়। তৃতীয় ফর্মে পোস্টকোড ১২০৬। অথচ মোহাম্মদপুরের পোস্টকোড ১২০৭।
এর বাইরে তিনটি প্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইসেন্স নম্বর আলাদা হলেও ই-টিন নম্বর একই (৩৮০৪২৯)। অর্থাৎ একটি টিন নম্বরে একবার আয়কর দিয়ে বাকি দুটি প্রতিষ্ঠানের কর ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এছাড়া অফিসের ঠিকানা কাফরুলে হলেও তারিকুজ্জামানকে দেওয়া হয়েছে ঢাকার উত্তরা ও তুরাগ অঞ্চলের ডিস্ট্রিবিউটরশিপ।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞগণ বলেন, ‘ওই সরকারি কর্মকর্তা (জাকির) তার মামাতো ভাইয়ের ব্যবসা থেকে লাভবান হয়েছেন কিনা বা নিজের পদ ব্যবহার করে ব্যবসায়িক কোনো সুবিধা দিয়েছেন কিনা; সেটি তদন্তের দাবি রাখে। কর্তৃপক্ষের উচিত বিষয়টি তদন্ত করে দেখা। একই সঙ্গে ওই কর্মকর্তার বাসার ঠিকানার সঙ্গে ডিস্ট্রিবিউটর ব্যবসায়ীর ঠিকানা মিলে যায়। এটা কিভাবে হলো? কর্মকর্তা কি ব্যবসায়ীকে সেটি ভাড়া দিয়েছেন? এসব প্রশ্নের উত্তর জানা জরুরি।’
বিষয়গুলো নিয়ে ফোনে কথা বলার জন্য এডিজি জাকির হোসেন নূরের ব্যবহৃত মোবাইলে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও কোন রেসপন্স না করায় মতামত নেওয়া সম্ভব হয়নি। (ক্রমশঃ)




শেয়ার করুন:
কমেন্ট বক্স
ডেঙ্গু নিয়ে উদ্বিগ্ন না হয়ে সচেতন হওয়ার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের

ডেঙ্গু নিয়ে উদ্বিগ্ন না হয়ে সচেতন হওয়ার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের