অর্থনৈতিক প্রতিবেদক:
ব্যাংকিং খাতের দস্যুরানী হিসেবে পরিচিত প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ওয়াহিদা বেগমের বিরুদ্ধে একের পর এক অন্তহীন অনিয়ম, কর্মজীবনে ব্যাপক অনৈতিক কর্মকান্ড, নিয়োগের বৈধতা নিয়ে উচ্চ আদালতের রুল, সাবেক কর্মস্থলে আদালত অবমাননার ঘটনায় দন্ড, নিয়োগের সময় মামলার তথ্য গোপণ করা, রাকাবে দায়িত্ব পালনকালে কোটি কোটি টাকার লোকসান, প্রশিক্ষণ সেমিনার কেনাকাটাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভূয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে অর্থ লোপাট, পদোন্নতি ও বদলি নিয়ে ঘুষ বাণিজ্য, আর্থিক অনিয়ম এবং আওয়ামীপন্থি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পুনর্বাসনসহ বহুবিধ দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এ ধরণের অনিয়ম দুর্নীতির কারণে রাকাব ও প্রবাসী কল্যান ব্যাংকে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠেছে তাঁর দায়িত্বকাল। তদুপরি পাহাড় সমান অভিযোগের ফুলঝুড়ি মাথায় নিয়েও বাগিয়ে নিয়েছেন সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত প্রবাসী কল্যান ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের মত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। তথ্য সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্রের।
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, তিনি ১৯৯৮ সালে রূপালী ব্যাংক লিমিটেডে সিনিয়র অফিসার (প্রবেশনারি) হিসেবে তাঁর ব্যাংকিং কর্মজীবন শুরু করেন। দীর্ঘ ও বিতর্কিত কর্মজীবনে তিনি রূপালী ব্যাংকের জোনাল ম্যানেজার, বিভাগীয় প্রধান এবং রূপালী সিকিউরিটিজ লিমিটেডের সিইওসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। এ সকল পদের প্রতিটিতেই তিনি চরম অদক্ষতা অনিয়ম দুর্নীতির স্বাক্ষর রেখেছেন। গত ১ মার্চ ২০২৫ তারিখে ব্যাংকের ইতিহাসে প্রথম নারী এমডি হিসেবে রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব)-এ দায়িত্ব বাগিয়ে নেন। রাকাব-এ যোগদানের পূর্বে তিনি অগ্রণী ব্যাংক পিএলসি এবং আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংকের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ওই দুই ব্যাংকেই তাকে নিয়ে অনিয়ম দুর্নীতি বিষয়ক বিভিন্ন তথ্যবহুল সংবাদ প্রকাশিত হয়। উপরোক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোতে দায়িত্ব পালনকালে পরতে পরতে উঠেছে অনৈতিক কর্মকান্ড এবং অবৈধ ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ। সবচেয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে তার এমডি পদে নিয়োগ নিয়ে। ২০২৫ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারির নিয়োগপত্রের মাধ্যমে ওয়াহিদা বেগমকে রাকাবের এমডি করা হয়। পরে তাঁর নিয়োগ চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতে একটি দায়ের করা হয়। আদালত জানতে চান, বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বা প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নিয়োগসংক্রান্ত নীতিমালা অনুসরণ না করে এই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং নিয়োগটি আইনগতভাবে বিধি বহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না কেন- এই মর্মে জবাব চেয়ে রুল জারি করেন।
অগ্রণী ব্যাংকে দায়িত্ব পালনের সময় ওয়াহিদা বেগমসহ চার কর্মকর্তাকে আদালতের আদেশ অমান্যের দায়ে ২০২৪ সালের ২৩ জানুয়ারি তিন মাসের কারাদন্ড দেওয়ার তথ্য গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। এরপর রাকাবের এমডি পদে তাঁর নিয়োগের সময় ওই তথ্য গোপণ রেখে অবৈধ লেনদেনের বিনিময়ে নিয়োগ বাগিয়ে নেন তিনি । তবে গণমাধ্যমে ওয়াহিদা বেগম দাবি করেছেন, সংশ্লিষ্ট মামলাটি তাঁর ব্যক্তিগত নয় এবং তিনি কোনো তথ্য গোপণ করেননি।
অনুসন্ধানে জানা যায়, রাকাবের আর্থিক পরিস্থিতি ও তাঁর দায়িত্বকাল নিয়ে নতুনভাবে প্রশ্ন তৈরি করেছে। গত অর্থবছরে ব্যাংকটির প্রায় ১৩২ কোটি টাকা লোকসান হয় । এই লোকসানের সঙ্গে ব্যবস্থাপনা দুর্বলতা, প্রশাসনিক অনিয়ম দুর্নীতি এবং পরিচালনা পর্ষদকে পাশ কাটিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভিযোগ সামনে উঠে এসেছে। এমনকি এমডির কাছে ব্যাংক চেয়ারম্যানের পক্ষ থেকে কৈফিয়ত চাওয়ার তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন একটি বিশেষায়িত ব্যাংকের শীর্ষ ব্যবস্থাপনায় থাকা অবস্থায় এত বড় লোকসানের কারণ কী? এ প্রশ্নের উত্তর কেবল অভ্যন্তরীণ ব্যাখ্যায় নয়, প্রয়োজন নথিভিত্তিক আর্থিক অডিট ও স্বাধীন তদন্ত।
ওয়াহিদা বেগমের বিরুদ্ধে পদোন্নতি ও বদলি বাণিজ্যের অভিযোগও প্রকাশিত হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ সূত্রের বরাতে দাবি করা হয়েছে, একটি পদোন্নতি প্রক্রিয়ায় প্রায় ৪০কর্মকর্তার কাছ থেকে অর্থ নেওয়া হয়েছিল। অভিযোগের সঙ্গে চেকের কপি, মোবাইল আর্থিক লেনদেনের তথ্য এবং অডিও থাকার দাবিও করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব নথি সত্য হলে তা শুধু প্রশাসনিক অনিয়ম নয়, সম্ভাব্য আর্থিক দুর্নীতির গুরুতর প্রমাণ হতে পারে। তবে প্রকাশিত এসব দাবির স্বাধীন ফরেনসিক যাচাই প্রয়োজন। এমডির বিরুদ্ধে করপোরেট গ্যারান্টি ছাড়া ঋণ অনুমোদন, রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে নিয়োগ ও পদোন্নতি এবং একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ব্যাংকের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত প্রভাবিত করার অভিযোগও এসেছে। এ ধরনের অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে ঋণ অনুমোদনের ফাইল, বোর্ডের সিদ্ধান্ত, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নোটশিট এবং আর্থিক লেনদেন পরীক্ষা করা অতীব জরুরি।
অভিযোগ রয়েছে, পছন্দের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সুবিধাজনক স্থানে পদায়ন এবং মতের অমিল থাকা কর্মকর্তাদের দূরে সরিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে প্রশাসনের ভেতরে একটি বিশেষ বলয় তৈরি করা হয়েছিল। এতে বদলি ও পদায়ন যদি ব্যক্তিগত আনুগত্যের ভিত্তিতে হয়ে থাকে, তাহলে ব্যাংকের প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা ও প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা দুটোই প্রশ্নের মুখে পড়ে। এ কারণে সংশ্লিষ্ট সময়ের বদলি-পদায়নের আদেশগুলো পর্যালোচনা করলেই অভিযোগের বাস্তব চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে। ওয়াহিদা বেগমের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক পুনর্বাসনের অভিযোগও রয়েছে।
প্রকাশিত অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, আগের সরকারের আমলে সুবিধাভোগী হিসেবে পরিচিত একটি অংশকে রাকাবে পুনরায় সংগঠিত ও গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে বসানোর চেষ্টা করা হয়েছে। এছাড়া আগের কর্মস্থলে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ও প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগও প্রতিবেদনে উঠে আসে। তবে এসব রাজনৈতিক অভিযোগের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত রাজনৈতিক পরিচয় নয়, বরং নিয়োগ, পদায়ন, বদলি ও সিদ্ধান্তের নথিই হওয়া উচিত মূল তদন্তে ভিত্তি। একজন শীর্ষ ব্যাংকারের বিরুদ্ধে যদি নিয়োগে তথ্য গোপণ, আদালত-সংক্রান্ত জটিলতা, পদোন্নতি-বদলি বাণিজ্য, ঋণ অনুমোদনে অনিয়ম, রাজনৈতিক প্রভাব এবং ব্যাংকের বড় অঙ্কের লোকসানের মতো একাধিক অভিযোগ ওঠে, তাহলে বিষয়টি আর ব্যক্তিগত বিতর্কে সীমাবদ্ধ থাকে না।
সংশ্লিষ্টদের মতে, নিয়োগের আগে তাঁর যোগ্যতা ও মামলা-সংক্রান্ত তথ্য যথাযথভাবে যাচাই করা হয়েছিল কি না; পদোন্নতি ও বদলিতে কোনো আর্থিক লেনদেন হয়েছিল কি না; ঋণ অনুমোদনে নিয়ম ভাঙা হয়েছিল কি না; ব্যাংকের লোকসানের প্রকৃত কারণ কী এবং রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে কোনো কর্মকর্তা সুবিধা পেয়েছেন কি না। এসব প্রশ্নের উত্তর বের করতে প্রয়োজন নিয়োগপত্র থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত ঘোষণাপত্র, আদালতের নথি, বোর্ডের সভার কার্যবিবরণী, পদোন্নতি ও বদলির আদেশ, ঋণ অনুমোদনের ফাইল এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেনের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত।
অভিযোগ সত্য হলে রাষ্ট্রীয় অর্থ ও একটি বিশেষায়িত ব্যাংকের প্রশাসন ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার দায় নির্ধারণ করতে হবে। আর অভিযোগ প্রমাণিত না হলে একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ছড়ানো অভিযোগেরও অবসান ঘটাতে হবে। রাকাবের স্বার্থে এখন প্রয়োজন রাজনৈতিক পরিচয় নয়, নথি খুলে সত্য বের করা এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা। ওয়াহিদা বেগমের বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগের বিষয়ে জানার জন্য একাধিকবার তার ব্যক্তিগত ফোনে এবং অফিসের ল্যান্ড ফোনে যোগাযোগ করা হলেও তার সাক্ষাৎ পাওয়া যায়নি। (ক্রমশঃ)