ঢাকা | বঙ্গাব্দ

পাবনা মেডিকেলের দুর্নীতি তদন্ত কমিটিতে প্রকৌশলী রাশেদের বান্ধবী!

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Sep 27, 2026 ইং
পাবনা মেডিকেলের দুর্নীতি তদন্ত কমিটিতে প্রকৌশলী রাশেদের বান্ধবী! ছবির ক্যাপশন: বন্ধুকে বাঁচাতে ফাতেমার ‘কোটি টাকার মিশন’
ad728
বিশেষ প্রতিনিধি: 
পাবনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল নির্মাণ প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম দুর্নীতির বিষয়ে গঠিত তদন্ত কমিটি নিয়ে প্যাকেজ নাটক জমে উঠেছে। ওই তদন্ত কমিটির সদস্য সচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে অভিযুক্ত নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদ কবীরের ব্যাচমেট বান্ধবী ফাতেমা বিনতে মামুনকে। বান্ধবী বন্ধুকে বাঁচাতে কোটি টাকার মিশন নিয়ে মাঠে নেমেছে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে। 
পাবনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে ৫০০ শয্যায় উন্নীতকরণ প্রকল্পের প্রায় ৩০০ কোটি টাকার মূল নির্মাণ কাজের পর ‘রিমেইনিং ওয়ার্কস’ দেখিয়ে ছয়টি গ্রুপে নতুন করে দরপত্র আহ্বানের অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি নিয়ে ইতোপূর্বে বেশ কয়েকটি পত্রিকায় তথ্যবহুল সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, মূল টেন্ডারের আওতাভূক্ত কাজকে নতুন প্যাকেজে ভাগ করে প্রায় ২৭ কোটি ৪৫ লাখ টাকার কাজ দেওয়া হয়। অভিযোগের সঙ্গে রাশেদ কবীর ও তৎকালীন পাবনা গণপূর্ত সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী দেওয়ান মাউদুদুর রহমানের নামও এসেছে। 
আরও গুরুতর অভিযোগ হলো, এসব কাজের কিছু অংশের বাস্তব অস্তিত্ব নেই। একটি প্রতিবেদনে হাসপাতালের ‘এ’ ব্লকের পাশে খোলা ছাদে কাচের কাজের জন্য ৪ কোটি ৯৬ লাখ ৮৮ হাজার ৯৫৫ টাকা ব্যয়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থবছর শেষ হওয়ার আগেই এ কাজের বিল পরিশোধ করা হলেও সরেজমিনে কাজটির অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।
প্রশ্ন উঠেছে দরপত্রের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও। সংশ্লিষ্ট সূত্রের অভিযোগ, মূল নির্মাণ কাজের অংশ থাকা সত্ত্বেও ‘অবশিষ্ট কাজ’ দেখিয়ে নতুন প্যাকেজ তৈরি করা হয়েছে। একটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, মূল প্রকল্পের অনুমোদন প্রক্রিয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্য না রেখে পরবর্তী দরপত্রগুলোর প্রাক্কলন ও অনুমোদন করা হয়। এ ক্ষেত্রে সরকারি ক্রয়বিধি বা পিপিআরের সংশ্লিষ্ট বিধান অনুসরণ করা হয়নি। আবার স্বাক্ষর জালিয়াতি করে টেন্ডার বিভাজন করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন অবসরে যাওয়া প্রধান প্রকৌশলী শামীম আখতার।
এর আগে ‘বাঙালি সংবাদ’ সহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে পাবনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রকল্পের নির্মাণ কাজের মান নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। বিশেষ করে ভবনের বেজমেন্টের পিলার নির্মাণে পাথরের পরিবর্তে ব্রিকচিপস ব্যবহারের অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছে। এসব অভিযোগের পরও সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী বা ঠিকাদারের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নিয়ে গণপূর্তের চলতি দায়িত্বে প্রধান প্রকৌশলী পাবনা গণপূর্তকে টাকা বানানোর মেশিন হিসেবে ব্যবহার করছেন। আর এ কারনেই এসব বিষয়ে কোন পদক্ষেপ নিচ্ছেন না তিনি।
তদন্ত কমিটি গঠনের পর এখন মূল প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে কমিটি কি শুধু নথিপত্র পর্যালোচনা করবে, নাকি প্রকল্পের প্রতিটি কাজ সরেজমিনে যাচাই করবে? ২৭ কোটি ৪৫ লাখ টাকার কথিত ‘রিমেইনিং ওয়ার্কস’-এর প্রতিটি প্যাকেজের অনুমোদন, প্রাক্কলন, দরপত্র আহ্বান, দরপত্র মূল্যায়ন, কার্যাদেশ, কাজের পরিমাণ, পরিমাপ বই এবং পরিশোধিত বিল যাচাই করা হলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।
প্রশ্ন উঠেছে তদন্ত কমিটির সদস্য নির্বাচনের বিষয়টি। কমিটির সদস্য ফাতেমা বিনতে মামুন পাবনা গণপূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদ কবীরের একই ব্যাচের কর্মকর্তা। তারা বিপিএটিসি’তে প্রশিক্ষণকালে উভয়ের মধ্যে বিশেষ সম্পর্কের গুঞ্জন ছড়িয়েছিল। প্রথমে তদন্ত কমিটির সদস্য সচিব করা হয়েছিল জনসংখ্যা প্রকল্প কোষ (পিপিসি) ইউনিটের নির্বাহী প্রকৌশলী বীনা দাসকে। পরে রাশেদ কবীরের ইচ্ছায় পরিবর্তন করে ফাতেমাকে এই দায়িত্ব দেয়া হয়। ফাতেমার বিরুদ্ধে অভিযুক্ত কর্মকর্তাকে রক্ষার জন্য তদন্তের গতিপথ প্রভাবিত করার অভিযোগ উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, তদন্তের সময় রাশেদ কবীরের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর পরিবর্তে কিছু প্রশাসনিক ও প্রক্রিয়াগত বিষয়কে সামনে এনে মূল আর্থিক অনিয়ম আড়াল করার চেষ্টা চলছে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে কাজের বাস্তব অস্তিত্ব, অর্থ পরিশোধের বৈধতা এবং পিপিআর অনুসরণের বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে উল্লেখ না থাকে, তাহলে তদন্তের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।
এদিকে পাবনা গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদ কবীরকে ঘিরে এর আগেও বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। পাবনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের টেন্ডার ছাড়াও রূপপুর গ্রিন সিটি প্রকল্পের বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম কেনাকাটায় বড় অঙ্কের আর্থিক অনিয়মের তথ্য মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের (সিএজি) নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ওই প্রতিবেদনে প্রায় ২৬ কোটি ৯৯ লাখ টাকা সরকারি মূল্যের সরঞ্জাম কিনতে ২১৩ কোটি ৮৯ লাখ টাকা পরিশোধের কথা বলা হয়েছে এবং প্রায় ১৮৬ কোটি ৮৯ লাখ টাকা অতিরিক্ত ব্যয়ের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।
পাবনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ২৭ কোটি ৪৫ লাখ টাকার অভিযোগের ক্ষেত্রে তাই শুধু ‘টেন্ডার হয়েছে কি না’ এটি তদন্তের জন্য যথেষ্ট নয়। কাজের প্রয়োজনীয়তা ছিল কি না, মূল চুক্তির মধ্যে কাজগুলো আগে থেকেই অন্তর্ভুক্ত ছিল কি না, নতুন করে প্যাকেজ করার আইনগত ভিত্তি কী, কাজ বাস্তবে হয়েছে কি না এবং হয়ে থাকলে তার পরিমাণ ও মান কতটুকু প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর নথি ও সরেজমিন যাচাইয়ের মাধ্যমে বের করা জরুরি।
অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তে তাঁরই ঘনিষ্ঠ বান্ধবীকে কেন কমিটিতে থাকবেন এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে কমিটি থেকে প্রত্যাহার করে নিরপেক্ষ সদস্য-সচিব অন্তর্ভুক্ত করার দাবি উঠেছে। সরকারের ২৭ কোটি ৪৫ লাখ টাকা লোপাটের অভিযোগের তদন্ত শুধু একটি দাপ্তরিক প্রক্রিয়া নয়; এর সঙ্গে রাষ্ট্রীয় অর্থের সঠিক ব্যবহার এবং সরকারি ক্রয়ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্নও জড়িত।
উত্তরার বাড়ী নং ১৮, রোড নং ১২, সেক্টর-১২ এর এই ভবনের ৩য় তলায় স্বপরিবারে থাকেন প্রকৌশলী রাশেদ কবীর। 
এ বিষয়ে গণপূর্তের প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তিনি কোন উত্তর দেননি। তাঁর বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তাধীন রয়েছে। ৫ জনকে ডিঙ্গিয়ে প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব পাওয়া খালেকুজ্জামান চৌধুরী নিজ পদে বহাল থাকবেন কি-না সেটাও একটি বড় প্রশ্ন।
 বাস্তবে অস্তিত্ব নেই-এমন কাজ দেখিয়ে এবং মূল কাজের অংশ নতুন করে ভাগ করে প্রায় ২৭ কোটি ৪৫ লাখ টাকার দরপত্র ও বিল পরিশোধের অভিযোগ উঠেছে গণপূর্ত বিভাগের পাবনা ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাশেদ কবীরের বিরুদ্ধে। বলা হচ্ছে, বিশেষ সুবিধা নিয়ে ব্যাচমেট বন্ধুকে বাঁচিয়ে দিতে উঠেপড়ে লেগেছেনে ‘বিশেষ বিসিএস’-এ নিয়োগপ্রাপ্ত সুন্দরী ফাতেমা।
অভিযোগ রয়েছে, তদন্ত শুরুর পর থেকেই কমিটির ওই সদস্য রাশেদ কবীরকে দায়মুক্ত করার চেষ্টা করছেন তিনি। অভিযোগের বিষয়ে প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহ, কাজের বাস্তব অস্তিত্ব যাচাই এবং সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য নেওয়ার বদলে তদন্তের গতিপথ ভিন্ন দিকে নেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে বলেও সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র দাবি করেছে।  মূল অভিযোগ তদন্ত না করে তদন্ত সংশ্লিষ্ট নয় এমন সব বিষয়ে চিঠি-পত্র পাঠিয়ে অবসরে যাওয়ার কর্মকর্তাদেরও বিব্রত করছেন তিনি। (ক্রমশঃ) 



শেয়ার করুন:
কমেন্ট বক্স
ভারতে এআই সম্মেলনে এবার মোদী-বিরোধী বিক্ষোভ

ভারতে এআই সম্মেলনে এবার মোদী-বিরোধী বিক্ষোভ