ঢাকা | বঙ্গাব্দ

পাবনা গণপূর্তে বালিশ কান্ডের পরে পাথর কান্ড!

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Aug 19, 2026 ইং
পাবনা গণপূর্তে বালিশ কান্ডের পরে পাথর কান্ড! ছবির ক্যাপশন: পাবনা গণপূর্ত নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদ কবীরের বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম দুর্নীতি জালিয়াতির অভিযোগ
ad728
পাবনা ঘুরে এসে জয়নাল আবেদীন যশোরী: 
একের পর এক বিতর্কিত কান্ড ঘটিয়ে চলছে পাবনা গণপূর্ত। যার কেন্দ্রবিন্দুতে আছেন ডিভিশনটির বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদ কবীর। চাকরি জীবনে এভাবে অনৈতিক কর্মান্ডের মাধ্যমে উত্তরায় বিলাশবহুল স্টুডিও এপার্টমেন্ট, পাবনা শহরে বাড়ি ও ভাঙ্গুরায় কয়েকশ’ বিঘা জমিসহ নামে-বেনামে শতাধিক কোটি টাকার মালিক হয়েছেন ফ্যাসিস্ট দোসর এই গণপূর্ত কর্মকর্তা। তথ্য সংশ্লিষ্ট ািনর্ভরযোগ্য সূত্রের।
অনুসন্ধানে জানা যায়, পাবনা গণপূর্তের অধীনে নির্মাণাধীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে ৫০০ শয্যায় উন্নীতকরণ প্রকল্পে ১০ তলা মূলভবনের বেজমেইন্ট পিলার নির্মাণে পাথরের পরিবর্তে ব্রিকচিপস (ইটের খোয়া) ব্যবহার করা হয়েছে। এ নিয়ে স্থানীয় পত্রিকায় তথ্যবহুল সংবাদ প্রকাশিত হলেও কোন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি প্রকৌশলী রাশেদ কবির বা ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের সাজিন কনস্ট্রকাশনের বিরুদ্ধে। বিষয়টি জেনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ব্যক্তিগত ফটোগ্রাফার খালেদ হোসেন পরাগ পাবনা গণপূর্তের নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রতিবাদে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা জাসাস এর পাবনা জেলার পক্ষ থেকে মানব বন্ধন করার ঘোষণা দেন তার ফেসবুক প্রোফাইলে। গত ২৩ জুলাই তিনি ওই পোষ্ট দিলেও পরবর্তীতে রহস্যজনক কারণে তা উধাও হয়ে যায়। 
উত্তরার বাড়ী নং ১৮, রোড নং ১২, সেক্টর-১২ এর এই ভবনের ৩য় তলায় স্বপরিবারে থাকেন প্রকৌশলী রাশেদ কবীর। 

এছাড়া স্থানীয় গণমাধ্যমে ক্যামেরার সামনে নিজের বঞ্চিত হওয়ার সাক্ষাৎকার দেওয়া এবং রাজশাহী জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর নিকট রাশেদ কবীরের সর্বগ্রাসী অনিয়ম দুর্নীতির বিরুদ্ধে একটি চিঠি লেখার অপরাধে স্থানীয় প্রবীণ ঠিকাদার মিনহাজ উদ্দিনকে একদল অপরিচিত লোক বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায়। তাকে পাবনার বিভিন্ন স্থানে ঘুরিয়ে এক পর্যায়ে গণপূর্ত অফিসে নকল প্যাড বানিয়ে ওই চিঠির বিরুদ্ধে লিখে নেন আরেকটি চিঠি। আবার মোবাইলে ধারন করেন ভিডিও স্বীকারোক্তি। গণমাধ্যমের নিকট সাক্ষাৎকার দেওয়ার পরিনতি নিয়ে এখনও ভীত সন্ত্রস্ত ঠিকাদার মিনহাজ। তিনি নিজের নিরাপত্তা ও পরিবারের ভবিষ্যত নিয়ে শঙ্কিত। এভাবে প্রতিবাদকারীদের বিরুদ্ধে অত্যাচার নির্যাতনের স্টীমম রোলার চালিয়ে আসছেন গণপূর্তের এই কর্মকর্তা। 
প্রকৌশলী রাশেদের চরমপন্থী কানেকশনের কারণে স্থানীয় সাংবাদিকেরাও তার বিরুদ্ধে কিছু লেখার সাহস দেখান না। তার সাক্ষাৎকার নিতে গেলেও গণমাধ্যম কর্মীদের সন্ত্রাসী হুমকি মামলা-হামলার ভয় দেখানো হয়। সন্ত্রাসী কানেকশন, স্থানীয় ক্ষমতা ও অবৈধ অর্থের প্রভাবে পাবনা গণপূর্ত বিভাগে অনেকটা যা খুশি তাই করছেন এই দুর্নীতিবাজ লুটেরা প্রকৌশলী।  
নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদ কবির স্বৈরাচার সরকারের আমলে ২০২৪ সালে প্রথমদিকে চাকরি বিধি ভঙ্গ করে নিজজেলা পাবনায় পোস্টিং বাগিয়ে নিয়ে অনিয়ম দুর্নীতি গোপণ টেন্ডার বাণিজ্যসহ সর্বগ্রাসী লুটপাটে হয়ে উঠেন অপ্রতিরোধ্য। পরবর্তীতে অন্তরবর্তী সরকারের আমলে সাবেক রাষ্ট্রপতি শাহাবুদ্দিনের ছেলের বন্ধু পরিচয়ে রুপপুর গ্রীণসিটি পাবনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে ৫শ’ শয্যায় উন্নীতকরণ প্রকল্পসহ সকল ধরণের কাজে হরিলুট চালিয়েছেন তিনি। এমনকি পিপিআর এর বিধি লংঘন করে পাবনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নির্মাণাধীন ভবনে কাজ শেষ না হলেও ৯ তলার ওপরে গ্লাস টাওয়ার নির্মাণ কাজের নামে প্রায় ৫ কোটি টাকা উঠিয়ে ভাগ-বাটোয়ারা করার অভিযোগ উঠেছে।
পাবনা গণপূর্তের আহ্বান করা টেন্ডারে (আইডি নং ১২১৭৬৫০) হাসপাতাল ভবনের ‘এ’ ব্লক সংলগ্ন খোলা ছাদে কাচের কাজ নির্মাণের কথা বলা হয়েছে। কাজটি টুঙ্গিপাড়ার বাসিন্দা যুবলীগ নেতা ও আ’লীগ আমলে নগর গণপূর্ত ঠিকাদার সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক দ্বীন ইসলামের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান এসএ এন্টারপ্রাইজকে পাইয়ে দেওয়া হয়েছে। ৪ কোটি ৯৬ লাখ ৮৮ হাজার ৯৫৫ টাকার এই কাজের বিল ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে পরিশোধ করা হয়েছে। অথচ এ কাজের বাস্তব কোনো অস্তিত্ব নেই। দ্বীন ইসলাম নিজেও গণমাধ্যমের কাছে স্বীকার করেছেন, শাহাদাত হোসেনকে তার লাইসেন্স ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছিলেন। কিন্তু কাজের অবস্থা কী- তা জানেন না। এভাবে হাসপাতালটির মূলকাজ শেষ না হলেও রিমেইনিং ওয়ার্কস এর নামে ৬ গ্রুপে দরপত্র আহ্বান করে পছন্দমতো ৬টি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে কাজ পাইয়ে দিয়ে ২৭ কোটি ৪৫ লাখ টাকা লোপাটের অভিযোগ নিয়ে গণমাধ্যমে তথ্যবহুল সংবাদ প্রকাশিত হয়। এমনকি পিপিআর বহির্ভূতভাবে ওই টেন্ডারের প্যাকেজ অনুমোদনে সাবেক প্রধান প্রকৌশলী শামীম আখতারের স্বাক্ষর জাল করা হয়। ওই ধরণের জালিয়াতি করেও বহালতবিয়তে আছেন প্রকৌশলী রাশেদ কবীর। 
যন্ত্রপাতি কান্ড
‘বালিশ কান্ড’র পর এবার পাবনা রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের আবাসন প্রকল্পে নতুন এক অনিয়মের চিত্র ফুটে উঠেছে মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি) কার্যালয়ের প্রতিবেদনে। আবাসিক এলাকা ‘গ্রিন সিটি’র ১১টি ভবনের বৈদ্যুতিক উপকেন্দ্রের যন্ত্রপাতি ও জেনারেটর ক্রয়ে সরকারি মূল্যের তুলনায় প্রায় আটগুণ বেশি অর্থ পরিশোধের প্রমাণ পেয়েছেন নিরীক্ষকরা।
নিরীক্ষা প্রতিবেদন বলছে, যেসব যন্ত্রপাতির সরকারি মূল্য ছিল প্রায় ২৭ কোটি টাকা, সেগুলো কিনতে ব্যয় করা হয়েছে ২১৩ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। অর্থ্যাৎ, অতিরিক্ত খরচ হয়েছে প্রায় ১৮৬ কোটি ৮৯ লাখ টাকা, যা দেশের মানুষের ট্যাক্স ও রাষ্ট্রীয় কোষাগারের জন্য বাড়তি আর্থিক চাপ।
সিএজি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্ধারিত দর ও দাপ্তরিক প্রাক্কলনের তুলনায় অস্বাভাবিক দামে এই যন্ত্রপাতি কেনায় সরকারের ব্যাপক আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। এর আগে বালিশ, আসবাব ও নির্মাণসামগ্রী ক্রয়েও অনিয়মের অভিযোগ উঠলেও এবার বিদ্যুৎ সরঞ্জাম কেনার পুরো প্রক্রিয়ায় দরপত্র প্রণয়ন, মূল্যায়ন, কাজের আদেশ, বিল অনুমোদন ও অর্থ পরিশোধ প্রতিটি ধাপে প্রশ্ন তুলেছে নিরীক্ষা সংস্থা।
গোপনীয়তার শর্তে সিএজির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে বলেন, ‘নিরীক্ষায় কয়েকটি পণ্যের দাম সরকারি দরের তুলনায় অস্বাভাবিক বেশি পাওয়া গেছে। সামগ্রিক দর প্রাক্কলনের কাছাকাছি রাখলেও নির্দিষ্ট পণ্যের ক্ষেত্রে দাম বাড়ানো হয় কয়েক গুণ। দর যাচাই, মূল্যায়ন কমিটি গঠন ও নিয়ম না মানায় সরকারের বিপুল অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে।’ তিনি আরও জানান, এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি আপত্তিকৃত অর্থ ফেরত আনার সুপারিশ করা হয়েছে।
দাম বাড়ানোর ফন্দি-ফিকির  
প্রকল্পটিতে ১ হাজার ৬০০ কেভিএ উপকেন্দ্র, জেনারেটর, লিফট ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন স্থাপনা অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ঠিকাদাররা কৌশলগতভাবে এসি বা অন্যান্য পণ্যের দাম কম দেখিয়ে বৈদ্যুতিক উপকেন্দ্র ও জেনারেটরের দাম অস্বাভাবিক বাড়িয়ে রেখেছেন। ফলে দরপত্রের মোট মূল্য প্রাক্কলনের কাছাকাছি থাকলেও, গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের দাম কয়েক গুণ বেশি ধরায় আর্থিক অনিয়ম হয়েছে।
একটি ভবনেই লুটপাট ১৮ কোটি
সাত নম্বর ভবনের উদাহরণটিই রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়ের ধরন ফুটিয়ে তোলে: উচ্চ ভোল্টেজ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রপাতিঃ গণপূর্তের নির্ধারিত মূল্য মাত্র ১০ লাখ ৩২ হাজার টাকা অথচ এ বাবদ বিল ৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা।
একটি ডিস্ট্রিবিউশন ট্রান্সফরমারঃ নির্ধারিত মূল্য ৪০ লাখ ৪০ হাজার টাকা অথচ বিল ৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা।
 নিম্ন ভোল্টেজের নিয়ন্ত্রণ সরঞ্জামঃ নির্ধারিত মূল্য প্রায় ১৬ লাখ ৩১ হাজার টাকা অথচ বিল ধরা হয় ৩ কোটি ২ লাখ টাকা।
পাওয়ার ফ্যাক্টর করেকশন প্যানেলঃ সরকারি মূল্য ১০ লাখের কম অথচ বিল ২ কোটি টাকা।
দুটি জেনারেটরঃ  সরকারি দর ১ কোটি ৬৮ লাখ টাকা অথচ বিল ৫ কোটি ৬৮ লাখ টাকা।
শুধু এই পাঁচ ধরনের যন্ত্রপাতির জন্য ওই একটি ভবনে বিল করা হয় ১৯ কোটি ৬০ লাখ টাকা, যদিও সরকারি মূল্য ছিল ১ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। অর্থ্যাৎ, একটিমাত্র ভবনে অতিরিক্ত খরচ হয়েছে ১৭ কোটি ৭৬ লাখ টাকা।
তিন ঠিকাদার পেয়েছে ১৮৭ কোটি টাকা বেশি
অনুসন্ধানে নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, মজিদ সন্স কনস্ট্রাকশন লিমিটেড ৫টি ভবনে পেয়েছে প্রায় ৯২ কোটি টাকা, যেখানে সরকারি দর ছিল ১২ কোটি ২৭ লাখ টাকা; অতিরিক্ত প্রায় ৭৯ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। সাজিন কনস্ট্রাকশেনর আরেকটি প্রতিষ্ঠান সাজিন এন্টারপ্রাইজ ৪টি ভবনে পেয়েছে ৮২ কোটি ৪৯ লাখ টাকা, সরকারি দর ৯ কোটি ৮২ লাখ টাকা; অতিরিক্ত ৭২ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। এমএসসিএল-জিকেবিপিএল যৌথ উদ্যোগ ২টি ভবনে পেয়েছে ৩৯ কোটি ৩৯ লাখ টাকা, সরকারি দর ৪ কোটি ৯১ লাখ টাকা; অতিরিক্ত ৩৪ কোটি ৪৮ লাখ টাকা।
মোট তিন ঠিকাদারকে দেওয়া হয় ২১৩ কোটি ৮৯ লাখ টাকা, অথচ একই যন্ত্রপাতির সরকারি মূল্য ছিল মাত্র ২৬ কোটি ৯৯ লাখ টাকা।
অর্থ ফেরত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার সুপারিশ
পাবনার ঈশ্বরদীতে নির্মাণাধীন রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুটি ইউনিটের প্রতিটির ক্ষমতা ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট মোট ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট। ২০১৭ সালের নভেম্বরে প্রথম ইউনিটের কাজ শুরু হয়, দ্বিতীয়টির কাজ শুরু হয় পরের বছর। প্রকল্পের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসন ‘গ্রিন সিটি’র ১১টি ভবনের বিদ্যুৎ সরঞ্জাম ক্রয়েই ধরা পড়েছে প্রায় ১৮৭ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম। নিরীক্ষা প্রতিবেদনে দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি ও বিল সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি আপত্তিকৃত ১৮৬ কোটি ৮৯ লাখ টাকা উদ্ধার করে সরকারি তহবিলে ফেরত দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলার জন্য প্রকৌশলী রাশেদ কবীরের মোবাইলে একাধিকবার যোগাযোগ করে কোন রেসপন্স না পাওয়ায় মতামত নেওয়া সম্ভব হয়নি। (ক্রমশ:) 




শেয়ার করুন:
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
ফেরদৌস-শাওনসহ ২৮ তারকার নামে ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ

ফেরদৌস-শাওনসহ ২৮ তারকার নামে ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ