ঢাকা | বঙ্গাব্দ

নোয়াখালী মে. ক. হাসপাতাল নির্মাণে টেন্ডার জালিয়াতি!

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Mar 19, 2026 ইং
নোয়াখালী মে. ক. হাসপাতাল নির্মাণে টেন্ডার জালিয়াতি! ছবির ক্যাপশন: ৪র্থ পর্বঃ নাটেরগুরু সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী কামরুল
ad728
জয়নাল আবেদীন যশোরী॥ নারী কেলেঙ্কারীতে চ্যাম্পিয়ন নোয়াখালী গণপূর্ত বিভাগের সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী (বর্তমানে হবিগঞ্জ) কামরুপ (কামরুল) একের পর এক  জালিয়াতি অনিয়ম দুর্নীতির খবর বেড়িয়ে আসছে। নোয়াখালীতে থাকতে তিনি ৫০০ শয্যা বিশিষ্ট নোয়াখালী মেডিকেল কলেজ (মে. ক.) হাসপাতাল ভবন নির্মাণ কাজের দরপত্র/টেন্ডার নিয়ে স্বরণকালের ভয়াবহ জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছেন।  
অনুসন্ধানে জানা যায়, নোয়াখালী মেডিকেল কলেজের হাসপাতাল ভবনের নির্মাণ কাজের তৃতীয় দফা দরপত্র আহ্বান করা হয় গত ২৯ জুলাই ২০২৫ তারিখে। এর টেন্ডার আইডি ছিলো ১১৩০৯৭৯। কাজটির দাপ্তরিক প্রাক্কলিত মূল্য (অফিসিয়াল ইষ্টিমেটেড কষ্ট) ছিলো ২শ’ ৫৪ কোটি ১৯ লাখ টাকা। দরপত্র আহবানের ৭/৮ দিন পর এর ১ম সংশোধনী আনা হয়। এতে বলা হয় টিডিএস ও পিসিসি-এর অসঙ্গতি দূর করা হবে, যা ‘মৌলিক পরিবর্তন নয়। কিন্তু দরপত্রের বিওকিউ অংশে হাসপাতাল ভবনের নীচের তলার রড এর পরিমাণের সাথে নতুন করে যোগ করা হয় ৬০ টন রড (রিইনফোর্সমেন্ট স্টীল)। গণপূর্ত অধিদপ্তর এর চলতি দর তফসিল অনুযায়ী ৬০ টন রড এর প্রাক্কলিত মূল্য ৭২ লক্ষ টাকা। সেই হিসাবে, নতুন দাপ্তরিক প্রাক্কলিত মূল্য হওয়া উচিত ছিলো ২৫৪ কোটি ৯১ লক্ষ টাকা। কিন্তু বাস্তবে তা করা হয়েছে ২৫৪ কোটি ১২ লক্ষ টাকা। পরবর্তীতে দরপত্র দাখিলের সময় শেষ হওয়ায় মাত্র ৩ দিন আগে, নির্বাহী প্রকৌশলী কামরুল হাসান তার ইজিপি আইডি হ্যাকড হয়েছে এই অজুহাতে উদ্দেশ্যপ্রনোদিত হয়ে দরপত্রের ২য় সংশোধনী প্রকাশ করেন। দেখা যায়, ২য় সংশোধনীতে তিনি বিওকিউ অংশে কোনো আইটেমের পরিমাণ হ্রাস/বৃদ্ধি করেননি। কিন্তু নোয়াখালী গণপূর্ত এর বিশ্বস্থ সূত্রে জানা গেছে, নির্বাহী প্রকৌশলী দাপ্তরিক প্রাক্কলিত মূল্য প্রায় ২ কোটি টাকা কমিয়ে দিয়েছেন। সাধারণভাবে এটি নির্বাহী প্রকৌশলী বাদে অন্য কারো কোনো আইডি থেকে দেখা যায় না। দরপত্র দাখিলের শেষ সময়ের ঠিক আগে সংশোধনী দিয়ে প্রাক্কলিত মূল্য কমিয়ে নির্দিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এর জন্য ১০% থ্রেসহোল্ড “ফিট” করা এবং অসাধু কর্মকর্তা ও ঠিকাদারের যোগসাজশে একটি প্রতিযোগী দরদাতাকে (যেমন “হুদা কন্সট্রাকশন) বাদ দেওয়ার যে অপকৌশল নেয়া হয়েছে তা পিপিএ-২০০৬ সেকশন-৯, রুল-১৬, ৩১, ৩৩, ৯৮, ১০০ এর সমষ্টিগত লঙ্ঘণ এবং দুর্নীতি দমন কমিশন আইন অনুযায়ী ক্রিমিনাল মিসকনডাক্ট হিসেবে তদন্তযোগ্য।
নির্ভরযোগ্য সূত্র আরো জানায়, শুধুমাত্র আওয়ামী তোষণ করতে এই প্রাক্কলিত মূল্য কারসাজি করা হয়েছিল এবং ৫ আগস্ট পরবর্তী সরকারের সময় ফ্যাসিস্ট দোসরদের শত শত কোটি টাকার কাজ দিয়ে আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতা করে স্বৈরাচারের দোসর ঠিকাদারদের সাবলম্বী করা হয়েছে!
টেন্ডার জালিযাতির ঘটনায় যা হয়েছ
টেন্ডার আইডি ১১৩০৯৭৯-তে প্রাথমিক অফিসিয়াল ইস্টিমেটেড কষ্ট (প্রাক্কলিত মূল্য) ছিল ২৫৪.১৯ কোটি। পরে দরপত্র চলমান অবস্থায় ৭২ লক্ষ টাকা মূল্যের ৬০ টন রড/স্টিল নীচের তলার রডের পরিমানের/ কোয়ান্টিটির সাথে যুক্ত করা হয় এবং অফিসিয়াল ইস্টিমেট করা হয় ২৫৪.১২ কোটি। অথচ এটি হওয়ার কথা ২৫৪.১৯ + ০.৭২ = ২৫৪.৯১ কোটি। অর্থ্যাৎ ইচ্ছাকৃতভাবে প্রাক্কলিত মূল্য ৭৯ লক্ষ টাকা কমানো হয়েছে। এর পর দরপত্র দাখিল শেষের তিনদিন আগে একটি সংশোধনী দেয়া হয়েছে, যেখানে উল্লেখ করা হয়েছে ইজিপি আইডি হ্যাকড হওয়ার কারণে সংশোধনী প্রকাশ করা হয়েছে। কিন্তু এটা ছিলো নির্বাহী প্রকৌশলী কামরুলের ছল-চাতুরীর একটি অংশ। বস্তুুত এবার করা প্রাক্কলিত মূল্য হঠাৎ ২ কোটি টাকা কমিয়ে দেয়া হয়েছে। কোনো আইটেমের পরিমাণ না কমিয়ে প্রাক্কলিত মূল্য কমানো কোনোভাবেই সম্ভব নয়। বিশেষত: অনুমোদিত প্রাক্কলনের ভিত্তিতেই দরপত্র আহবান করতে হয়। আড়াইশ’ কোটি টাকার কাজের একটি প্রাক্কলন অনুমোদন এর ক্ষমতা সংশ্লিষ্ট জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর। অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী যখন একবার প্রাক্কলন ও প্রাক্কলিত মূল্য অনুমোদন করেন এর পর তার দুইধাপ নিচের একজন কর্মকর্তা অর্থ্যাৎ নির্বাহী প্রকৌশলী কোনভাবেই প্রাক্কলিত মূল্য ২ কোটি টাকা কমাতে পারেন না। এই আপরাধে তার বিরুদ্ধে তদন্ত সাপেক্ষে শাস্তি হওয়ার কথা। 
প্রাসঙ্গিক আইন ও বিধির কাঠামো পিপিএ-২০০৬, সেকশন ৯ —প্রিন্সিপাল অফ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট, এই ধারা অনুযায়ী সরকারি ক্রয়ে অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে-ট্রান্সপারেন্সি (স্বচ্ছতা), ফেয়ারনেস (ন্যায় সংগতা), ওপেন কমপিটিশন (মুক্ত প্রতিযোগিতা), ইকোয়াল ট্রিটমেন্ট অফ টেন্ডারারস। কিন্তু এই টেন্ডার আইডি’তে এগুলোর কোনটিই মেনে চলা হয়নি। 
আইনগত অবস্থান: দরপত্র দাখিলের শেষ সময়ের মাত্র ৩ দিন আগে কোনো আইটেমের পরিমাণ অপরিবর্তিত রেখে প্রাক্কলিত মূল্য প্রায় ২ কোটি টাকা কমানো দরদাতাদের সমান তথ্যভিত্তিক প্রতিযোগিতার সুযোগ নষ্ট করেছে এবং একটি নির্দিষ্ট পক্ষকে (নুরানী-জামাল জেভি) অগ্রিম সুবিধা পাইয়ে দিয়েছেন।
১। এটি সেকশন-৯ এর সরাসরি লঙ্ঘন।
২। এটি অফিসিয়াল কষ্ট ইস্টিমেট সংক্রান্ত বিধি লঙ্ঘন
৩। এটি পিপিআর-২০০৮, রুল-১৬(১)-প্রিপারেসন অফ কষ্ট ইস্টিমেট এর লংঘন। 
প্রকিউরিং এনটিটি দরপত্র আহ্বানের পূর্বে একটি বাস্তবসম্মত দাপ্তরিক প্রাক্কলিত মূল্য প্রস্তুত ও অনুমোদন করবে।
রুল ১৬(৭)- কনফিডেনসিয়ালিটি: দাপ্তরিক প্রাক্কলিত মূল্য গোপনীয় এবং দরপত্র মূল্যায়নের সময় রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহৃত হবে।
আইনগত বিশ্লেষণ:
আইটেম যোগ হলে প্রাক্কলিত মূল্য বাড়ার কথা, কমার নয়। এখানে ইচ্ছাকৃতভাবে গাণিতিক অসঙ্গতি সৃষ্টি করা হয়েছে, যা প্রমাণ করে যে অফিসিয়াল ইস্টিমেট ম্যানিপুলেশন করা হয়েছে। এটি রুল-১৬ এর গুরুতর লঙ্ঘন।
৩️। দরপত্র চলমান অবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন পিপিআর-২০০৮, রুল ৩১-টেন্ডার ডকুমেন্ট ফাইনালিটি দরপত্র দাখিলের সময়সীমা চলাকালে দরপত্র দলিলের মৌলিক শর্ত পরিবর্তন করা যাবে না।
আইনগত ব্যাখ্যা: অফিসিয়াল কষ্ট ইস্টিমেট পরিবর্তন মানে দরপত্র মূল্যায়নের ভিত্তি পরিবর্তন বা ১০% বিলো থ্রেসহোল্ড-এর হিসাব পরিবর্তন। এটি নিঃসন্দেহে “মৌলিক পরিবর্তন (মেটেরিয়াল চেইঞ্জ)”। “টিডিএস ও পিপিসি অসঙ্গতি দূর করা মৌলিক পরিবর্তন নয়” এই ব্যাখ্যা আইনগতভাবে টেকসই নয়, কারণ একই সংশোধনীতে নতুন আইটেম (রড) যোগ করা হয়েছে। আবার প্রাক্কলিত মূল্য কমানো হয়েছে এটি রুল-৩১ এর সরাসরি লঙ্ঘন।

৪️। ১০% নিচের দর ও দরপত্র গ্রহণের কারচুপি 
পিপিআর-২০০৮, রুল ৩৩-রিজেকশন অফ টেন্ডারস দরপত্র প্রাক্কলিত মূল্যের তুলনায় অস্বাভাবিক কম হলে তা বাতিলযোগ্য।
এই ঘটনায় ১০% নিচের প্রহণযোগ্য দর হওয়া উচিত ছিল ≈ ২২৮.৭০ কোটি। কিন্তু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নুরানী-জামাল জেভি দর দিয়েছে ২২৮.৬০ কোটি। অর্থ্যাৎ ১০% বিলো থ্রেসহোল্ড এর চেয়ে ১০ লক্ষ টাকা কম, যা নিয়ম অনুযায়ী নন-রেসপনসিভ হওয়ার কথা। তবু ই-জিপি সিস্টেমে এটি রেসপনসিভ হয়েছে। কে ১০% থ্রেসহোল্ড-এর হিসাব বদলালো? কীভাবে সিস্টেম অযোগ্য দর গ্রহণ করলো?
এটি রুল-৩৩ ও রুল-১০০ (ইভ্যালুয়েশন ক্রাইটেরিয়া) উভয়ের লঙ্ঘণ। নিগোসিয়েশন ও কলিউশন পিপিআর-২০০৮, রুল-৯৮- প্রোহিবিশন অফ নিগোসিয়েশন ওপেন টেন্ডারিং-এ কোনো দরদাতার সাথে মূল্য বা শর্ত নিয়ে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ দরকষাকষি নিষিদ্ধ। প্রাক্কলিত মূল্য কৌশলে কমিয়ে নির্দিষ্ট ঠিকাদার-কে লোয়েষ্ট রেসপনসিভ বানানো-ইনডাইরেক্ট নিগোসিয়েশন, কোলিউসিভ প্রাকটিস। এটি রুল-৯৮ এর চরম লঙ্ঘন। 
দুর্নীতির উপাদান (করাপসন ইন্ডিকেটরস্) 
পিপিএ-২০০৬ ও পিপিআর-২০০৮ এর আলোকে এই ঘটনায় নিম্নোক্ত দুর্নীতির ক্লাসিক উপাদান বিদ্যমান (১) আইটেম যোগ করেও প্রাক্কলিত মূল্য কমানো, (২) দরপত্র দাখিলের শেষ সময়ের ঠিক আগে সংশোধনী দিয়ে প্রাক্কলিত মূল্য কমিয়ে নির্দিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এর জন্য ১০% থ্রেসহোল্ড “ফিট” করা, (৩) অসাধু কর্মকর্তা ও ঠিকাদারের যোগসাজশে একটি প্রতিযোগী দরদাতাকে (যেমন “হুদা কন্সট্রাকশন”) বাদ দেওয়ার চেষ্টা বা অপকৌশল।
এগুলো পিপিএ-২০০৬ সেকশন-৯, রুল-১৬, ৩১. ৩৩, ৯৮. ১০০ এর সমষ্টিগত লঙ্ঘন এবং দুর্নীতি দমন কমিশন আইন অনুযায়ী ক্রিমিনাল মিসকনডাক্ট হিসেবে তদন্তযোগ্য।
চূড়ান্ত আইনগত সিদ্ধান্ত
“ টেন্ডার আইডি ১১৩০৯৭৯-এ দরপত্র আহ্বানের পর দাপ্তরিক প্রাক্কলিত মূল্য গোপণে ও উদ্দেশ্যমূলকভাবে কমানো, আইটেম যোগ করেও মূল্য হ্রাস করা, এবং গ্রহণযোগ্য সীমার নিচের দরকে রেসপনসিভ হিসেবে গ্রহণ করা- পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অ্যাক্ট-২০০৬ এর সেকশন-৯ এবং পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস-২০০৮ এর রুল-১৬, ৩১, ৩৩, ৯৮ ও ১০০  এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। উক্ত কার্যক্রম আইনগতভাবে অবৈধ, প্রক্রিয়াগত জালিয়াতি ও সংঘবদ্ধ দুর্নীতির শামিল।”
ইচ্ছেকৃত এই টেন্ডার জালিয়াতি ও কারসাজির এ বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলার জন্য নির্বাহী প্রকৌশলী কামরুল হাসানের সাথে মোবাইলে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার কোন রেসপন্স পাওয়া যায়নি।




শেয়ার করুন:
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ