বিশেষ প্রতিবেদক:
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরে চাকরিকে হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করে স্ত্রী ও নিজের নামে ঢাকা রংপুর ও কুড়িগ্রামে গড়ে তুলেছেন একাধিক বাড়ি, ফ্ল্যাট, প্লট, গাড়িসহ বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। চারটি ব্যাংকে মিলেছে কয়েক কোটি টাকার লেনদেন। অভিযুক্ত এই গুণধর সরকারি কর্মকর্তার নাম হচ্ছে মনিরুজ্জামান সরকার। তিনি বর্তমানে রংপুর মিঠাপুকুর উপজেলার প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা বা পিআইও। বর্তমানে চাকরি করছেন আষ্টম গ্রেডে।
অভিযোগ মতে. ২০১১ সালের ৭ জুলাই ঠাকুরগাঁওয়ের বোদাগঞ্জ উপজেলায় প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) হিসেবে অ্যাডহক ভিত্তিতে যোগদান করেন আলোচিত মনিরুজ্জামান সরকার। যোগদানের ছয় মাস পর স্থায়ীভাবে পিআইও পদে নিয়োগ পেয়ে দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলায় বদলি হন। কাহারোলে দায়িত্ব পালনের সময় থেকেই পদ পদবীকে ব্যবহার করে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির সাথে জড়িয়ে পড়েন। অবৈধ আয়ের ক্ষেত্রে এরপর আর তাকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। মাত্র ১৫ বছরের চাকরি জীবনে তার বৈধ আয় প্রায় ৯০ লাখ টাকা হলেও, অনুসন্ধানে উঠে এসেছে দুর্নীতির মাধ্যমে তিনি নামে-বেনামে প্রায় শতকোটি টাকার সহায়-সম্পদের মালিক হয়েছেন।

পিআইও মনিরুজ্জামান সরকারের যত সম্পদ
২০২৫ সালে ডিসেম্বর মাসে অ্যাসোসিয়েটেড বিল্ডার্স করপোরেশন লিমিটেডের কাছ থেকে মিরপুর রুপনগর মিল্কভিটা রোডে ২৮ (এবিসি হোমস ) ৬ষ্ঠ তলার উত্তর পূর্বদিকের ১৪৫০ বর্গফুট আয়তনের ফ্ল্যাট ও নিচতলার ১২০ বর্গফুটের একটি কারপার্কিংসহ ফ্ল্যাট কিনেছেন মনিরুজ্জামান। যার দলিল নম্বর- ১১৬১২ ও বাজারমূল্য ২ কোটি টাকা।
রংপুর নগরীর রাধাবল্লভ এলাকায় ৭ নাম্বার রোডে ‘জান্নাত’ নামে ৫২ নম্বর তিনতলা আলিশান বাড়ি করেছেন তিনি। যার বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় ৫ কোটি টাকা।
রংপুর সদরের কলেজ রোডে মুনিবা ছাত্রাবাস নামে ৩তলা একটি আবাসিক হোস্টেল রয়েছে মনিরুজ্জামানের। এর বাজারমূল্য প্রায় ৩ কোটি টাকা।
রংপুর মহানগর সার্কেল বিনোদপুর মৌজায় ৪ দশমিক ৫ শতাংশ জমি রয়েছে। যার খতিযান নম্বর ৯০১, দলিল নং ৩৭১১, বাজারমূল্য প্রায় ৬০ লাখ টাকা।
রংপুর মহানগর সার্কেল আলমনগর মৌজায় ৬ শতাংশের একটি প্লট আছে। যার খতিয়ান নম্বর- ১৬১০০, দলিল নং ৩৭১২/২০১৮। এ সম্পদের বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ১ কোটি টাকা।
কুড়িগ্রামের চিলমারীতে মাচাবান্দ মৌজায় দুই দাগে ১৮ ও ৪৬ শতাংশ করে সর্বমোট ৬২ শতাংশ জমি আছে। এর খতিয়ান নম্বর-২২৪৩ দলিল নং-৫৩০, ৫৪৫, ১১৮২ । এ জমির বাজারমূল্য প্রায় ৩০ লাখ টাকা।
কুড়িগ্রাম উলিপুর উপজেলায় উলিপুর মৌজায় ৩ শতাংশ জমি রয়েছে। যার খতিয়ান নম্বর-১২৩৮ দলিল নং-১৬০১, ২৬৫৩, বাজার মূল্য প্রায় ১০ লাখ টাকা।
স্ত্রী আরফাতুন নাহারের নামে কুড়িগ্রাম উলিপুর উপজেলায় সিদ্ধান্ত মালতী বাড়ির মৌজায় ১৩ শতাংশ জমি আছে। খতিয়ান নাম্বার-২০২৬-১০০০০৭ দলিল নং-৪০৮১/২৫। যার বাজারমূল্য প্রায় ৩০ লাখ টাকা।
স্ত্রী আরফাতুন নাহার এর নামে রংপুর বিনোদপুর মৌজায় ৭ শতাংশ একটি প্লট রয়েছে। যার খতিয়ান নম্বর- ১০৭১। যার বাজারমূল্য প্রায় ৫০ লাখ টাকা।
নিজ এলাকায় আদর্শ গ্রাম ৩নং থানাহাট ইউনিয়ন, মাচাবান্দা, চিলমারী কুড়িগ্রামে দোতলা বাড়ি করেছেন তিনি।
এছাড়াও কুড়িগ্রাম শাপলা চত্বরে বাবর টাওয়ারের নিচ তলায় মনিরুজ্জামান কোটি টাকা ব্যয়ে একটি বিশাল ফার্মেসি প্রতিষ্ঠা করেছেন। এর বাইরেও কিনেছেন ৬টি মাইক্রোবাস যেগুলো বিভিন্ন রেন্ট-এ-কারের মাধ্যমে ভাড়ায় চলে। নিজে ব্যবহার করেন অর্ধকোটি টাকার গাড়ি।
সূত্র মতে, সম্প্রতি তেলের পাম্প ব্যবসায় বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করেছেন পিআইও মনিরুজ্জামান। এছাড়াও স্ত্রী আরফাতুন নাহারের বড় ভাই রায়হানের নামে বাড়ি করে দিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এর বাইরেও নামে-বেনামে ঢাকা রংপুর ও কুড়িগ্রামে আরো বেশ কিছু সম্পদ আছে তারা। এ বিষয়ে আমাদের অনুসন্ধান চলমান।
অনুসন্ধানে জানা যায়, মনিরুজ্জামান সরকার কাহারোল উপজেলায় যোগদানের পর বিভিন্ন দুর্নীতি ও অনিয়মে জড়িয়ে পরেন। দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ ভাগাভাগি নিয়ে বিগত সরকারের এমপি মনোরঞ্জনশীল গোপালের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন। পরবর্তীতে ওই এমপি নিজের সুপারিশের মাধ্যমে তাকে দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলায় বদলি করা হয়।
নবাবগঞ্জ উপজেলায় ২০১৪-১৬ সালে ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে ১০ কোটি টাকার টিআর ও কাবিখার বিশেষ প্রকল্প নিয়ে আসেন। যার অধিকাংশ অর্থই তিনি আত্মসাৎ করেন। তবে বিষয়টি জানাজানি হলে প্রকল্পের কিছু কাজ তিনি সম্পন্ন করেন। সেই সময়ে এসব দুর্নীতির বিষয়ে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় বগুড়ার দুদকের এক কর্মকর্তাকে। দুদকের সেই কর্মকর্তাকেও ম্যানেজ কওে লুটপাটের বিষয়টি ধামাচাঁপা দেন ধুরন্ধর মনিরুজ্জামান।
বিগত লীগ সরকারের ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরি মায়ার সুপারিশে ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে প্রবেশ করেন অঘটন পটিয়সী মনিরুজ্জামান। এরপর তৎকালীন ডিজির সঙ্গে সখ্য গড়ে ওঠে তার। ডিজির যোগসাজশে পিআইওদের বদলি বাণিজ্যে একটি দুর্নীতিবাজ লুটেরা সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন তিনি। বদলী প্রত্যাশীদেও কাছ থেকে লক্ষ লক্ষ টাকা ঘুষ আদায় করে দুর্নীতিবাজ পিআইওদের নিয়ে বদলি বাণিজ্য করে ওই সময়ে প্রায় অর্ধশত কোটি টাকা হাতিয়ে নেন ধূর্ত মনিরুজ্জামান সরকার।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে শুকুরেরহাট ডিগ্রি কলেজের উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল টিআরের ৩ লাখ টাকা। প্রকল্পের চেয়ারম্যান ছিলেন সহকারী অধ্যাপক শওকত হোসেন। তাকে দুই দফায় ৩ লাখ টাকার কাগজে স্বাক্ষর নিয়ে ১ লাখ ১০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছিল। বিষয়টি বিভিন্ন গণমাধ্যমে নিশ্চিত করেছিলেন শওকত হোসেন। শুকুরেরহাট ইসলামিয়া আলিম মাদরাসায়ও উন্নয়নের জন্য টিআরের ৩ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এ প্রকল্পেও দুই দফায় ১ লাখ ৫ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। সেটিও স্থানীয় বিভিন্ন গণমাধ্যমে নিশ্চিত করেছেন ওই প্রকল্পের চেয়ারম্যান সহকারী শিক্ষক আবদুল কাইয়ূম।
ঠাকুরবাড়ি বাজার হতে পূর্ব জামে মসজিদের মাঠে মাটি ভরাটের জন্য ৪ লাখ ৬২ হাজার টাকা, দুর্গাপুর কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মাঠে মাটি ভরাট ও উন্নয়নের জন্য কাবিখা ও কাবিটার তিন দফায় ২০ টন ১৭৪ কেজি গম এবং ২ লাখ টাকা, বড়বালা ইউনিয়নের তাজুলের বাড়ি হতে খালেকের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা সংস্কারের জন্য ৩ লাখ ৫ হাজার, রানীপুকুরের বুজরুক নূরপুর বাড়ি হতে মনজুর বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা ভরাটের জন্য ৩ লাখ, ইমাদপুর ইউনিয়নে মসজিদপাড়া পাকা রাস্তা হতে চড়পাড়াগামী রাস্তা সংস্কারের জন্য ৫ লাখ, বড়বালা ইউনিয়নের রতনের বাড়ি হতে মাঝিপাড়া ঘাট পর্যন্ত রাস্তা সংস্কারের জন্য ৫ লাখ, উপজেলা পরিষদ রাস্তা নির্মাণের জন্য ৪ লাখ টাকা এবং উপজেলা পরিষদ মাঠে মাটি ভরাটের জন্য ১৩ টন গম বরাদ্দসহ অন্তত আরও ৩০টি প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে ভুয়া বিল ভাউচার করে অর্থ হরিলুট করেছিলেন পিআইও মনিরুজ্জামান।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, মনিরুজ্জামান তৎকালীন নিজ অফিস খরচের কথা বলে সাবেক এমপির কাছ থেকে টিআর ও কাবিটার ১৪ লাখ টাকা এবং কাবিখার ১৩ টন গম বরাদ্দ নেন। যার কাজ দেখানো হয়েছে উপজেলা পরিষদের সংলগ্ন রাস্তা নির্মাণ ৪ লাখ টাকা, ইমাদপুর ইউনিয়নের মসজিদপাড়া পাকা রাস্তা হতে চড়পাড়াগামী রাস্তা সংস্কার ৫ লাখ, বড়বালা ইউনিয়নের রতনের বাড়ি হতে মাঝিপাড়া ঘাট পর্যন্ত রাস্তা সংস্কার ৫ লাখ এবং উপজেলা পরিষদ মাঠে মাটি ভরাট ১৩ টন গম। এসব প্রকল্পের চেয়ারম্যান করা হয় সংশ্লিষ্ট ইউপি চেয়ারম্যান এবং ইউপি সদস্যদের। তবে এসব কাজ না করে চেয়ারম্যান মেম্বারদের মাধ্যমে প্রকল্পের টাকা তুলে নিয়েছিলেন পিআইও। যদিও জনপ্রতিনিধিদের দাবি ছিল, তারা প্রকল্পের টাকা ব্যাংক থেকে তোলার বিষয়ে কিছুই জানতেন না।
২০২২-২৩ অর্থবছরে পিআইওর কার্যালয়ে উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল ৩ লাখ ২২ হাজার এবং গেল অর্থবছরে একই কাজের জন্য তিন দফায় বরাদ্দ বাড়িয়ে হয় ৭ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। তৎকালীন সময়ে অফিসের একজন স্টাফ (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) জানিয়ে বলেছিলেন, অফিসে পিআইও তিন দফায় প্রায় ১১ লাখ টাকা বরাদ্দ নিয়েও কোনো কাজেই করেননি। ওই স্টাফ আরও জানিয়েছিল, পিআইও টিআর প্রকল্প থেকে দুই দফায় কম্পিউটারসেট কেনার জন্য ১ লাখ ৯৬ হাজার ৪৯৭ টাকা বরাদ্দ নিয়ে আত্মসাৎ করেছিলেন মনিরুজ্জামান। তবে এর এক মাস আগে মন্ত্রণালয় থেকে কম্পিউটার সেট কেনার জন্য ১ লাখ টাকা বরাদ্দ নিয়ে এসেছিলেন, তবে সেটাও ছিল অদৃশ্য।
এছাড়াও অভিযোগ, ব্রিজ নির্মাণ, টিআর ও কাবিটা প্রকল্পের কাজ কাগজে-কলমে শতভাগ দেখিয়ে বিল পাস করে ট্রেজারি অফিসের মাধ্যমে পিআইও মনিরুজ্জামান সরকার নিজের ব্যক্তিগত ব্যাংক অ্যাকাউন্ট এনআরবিসি ব্যাংকের মিঠাপুকুর শাখায় প্রায় ৩ কোটি টাকা রেখেছিলেন। সেই ঘটনায় তৎকালীন সময়ে রংপুরসহ সারা দেশের তোলপাড় সৃষ্টি হয়। তুমুল বিতর্কের পরে ব্যাংক থেকে টাকা তুলে চেয়ারম্যানদের দেওয়া হয়েছিল। তবে সেই প্রকল্পের ১০ থেকে ২০ শতাংশ কাজ বাস্তবায়ন না করে টাকা ছাড় দিয়েছিলেন কোন এক অজানা কারণে।
বিগত স্বৈরাচার লীগ সরকারের আমলে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ও জেলার ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোতাহার হোসেনের সঙ্গে মিলেমিশে ভাগবাঁটোয়ারা করে খেতেন প্রকল্পের বিভিন্ন অর্থ। মনিরুজ্জামান সরকারের বিরুদ্ধে অধিকাংশ অভিযোগ সামাল দিতেন ওই মোতাহার হোসেন।
এছাড়াও অভিযোগ রয়েছে, পিআইও মনিরুজ্জামান দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের বন্যা আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের এপিডি’র দায়িত্ব পালনকালে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা কামিয়েছেন।
আর এসব অবৈধ সম্পদ বৈধ করার জন্য নামমাত্র লোন নিয়েছে ব্যাংক থেকে। মনিরুজ্জামান সরকার ও স্ত্রীর আরফাতুন নাহার নামে বেশ কয়েকটি ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট রয়েছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য এনআরবি ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, সোনালী ব্যাংক।
এছাড়াও মনিরুজ্জামান এসব বিপুল অবৈধ অর্থের বিনিময়ে ঢাকা শহরের বোটক্লাব বিভিন্ন ক্লাবের মেম্বার হয়েছেন।
এসব বিষয়ে জানতে ফোনকল করা হলে মনিরুজ্জামান বলেন, আমার সম্পদসহ সকল বিষয়ে আমার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আমি অবগত করেছি। এ বিষযে নতুন করে কিছু বলতে চাচ্ছি না। (ক্রমশঃ)