ঢাকা | বঙ্গাব্দ

দেশ বিরোধী কর্মকান্ডে অপ্রতিরোধ্য আওয়ামী দোসর শফিউল্লাহ আল মুনীর!

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Aug 8, 2026 ইং
দেশ বিরোধী কর্মকান্ডে অপ্রতিরোধ্য আওয়ামী দোসর শফিউল্লাহ আল মুনীর! ছবির ক্যাপশন: স্বৈরাচার আ’লীগের সাবেক দুই ফ্যাসিবাদী মন্ত্রীর সাথে প্রতারক শফিউল্লাহ আল মুনীর
ad728

জয়নাল আবেদীন যশোরী : 

ঢাকার অভিজাত গুলশানকেন্দ্র্রিক ব্যবসায়ী ও ক্রীড়া সংগঠক শফিউল্লাহ আল মুনির-কে ঘিরে একাধিক মামলা, অভিযোগ, তদন্ত প্রতিবেদন, আদালতের আদেশ এবং আর্থিক অনিয়মের বিবরণ মিলিয়ে একটি বিস্তৃৃত ও জটিল চিত্র সামনে এসেছে। প্রাপ্ত নথিপত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, তার বিরুদ্ধে প্রতারণা, অর্থ আত্মসাৎ, জালিয়াতি, ভূয়া প্রকল্প দেখিয়ে বিনিয়োগ সংগ্রহ, চাকরি ও লাইসেন্স পাইয়ে দেওয়ার নামে অর্থ গ্রহণ, ভয়ভীতি প্রদর্শন, এমনকি অতীতের অপরাধ সংশ্লিষ্ট ঘটনাও আলোচনায় এসেছে। 

শফিউল্লাহ আল মুনির বতর্মান পুলিশের আইজিপি মোঃ আলী হোসেন ফকিরের নাম বিক্রি করে চলে। সে যেখানে যায় সেখানেই বলে আমি আইজিপির লোক। অথচ আইজিপি মোঃ আলী হোসেন ফকিরের সাথে তার কোন যোগাযোগই নেই বলে গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে জানা গেছে। 

২০০৮ সালের ৫ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক সংবাদ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০০৮ সালের ৪ সেপ্টেম্বর রাতে রাজধানীর সেগুনবাগিচা এলাকায় র‍্যাব অভিযান চালিয়ে শফিউল্লাহ আল মুনিরকে আটক করে। অভিযানে ৪২/১/খ, বাকাউল অ্যাপার্টমেন্টের ৩য় ও ৪র্থ তলায় পরিচালিত স্টুডিও থেকে পর্নোগ্রাফি সংশ্লিষ্ট সামগ্রী উদ্ধার করা হয় বলে জানানো হয়। র‍্যাবের তথ্যমতে, সেখানে ৯টি ইয়াবা ট্যাবলেট, ৩৫ পুরিয়া গাঁজা এবং একাধিক পর্নো সিডি পাওয়া যায়। ওই সময় তার সঙ্গে টনু, তানভীরসহ সহযোগী এবং চারজন কথিত মডেলকেও আটক করা হয়।

পরবর্তীতে লীগ সরকোরের আমলে তিনি ব্যবসায়ী ও ক্রীড়া সংগঠক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। বিভিন্ন ক্রীড়া ফেডারেশনের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হন এবং প্রভাবশালী মহলে যোগাযোগ তৈরি করেন। তবে একইসঙ্গে তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে বিবিধ কৌশলে আর্থিক অনিয়ম ও প্রতারণার অভিযোগ জমা হতে থাকে। ২০২৫ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকার মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতে দুর্নীতি দমন কমিশনের সহকারী পরিচালক জনাব তাপস ভট্টাচার্য্য একটি আবেদন করেন, যার ভিত্তিতে আদালত শফিউল্লাহ আল মুনিরের বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। এই আবেদনের ভিত্তি ছিল দুদকের নথি নং-০০.০১.০০০০.৫০৫.০১.০৪১.২৪-৫০২৫৫(২), তারিখ ২৬ ডিসেম্বর ২০২৪ এবং মহাপরিচালক (বিশেষ তদন্ত) এর ই/আর নং-১৬৯/২৪, তারিখ ৩ নভেম্বর ২০২৪। আদালত তার আদেশে উল্লেখ করেন, অভিযুক্ত ব্যক্তি দেশত্যাগ করলে তদন্ত কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে। ফলে জনস্বার্থে তার বিদেশ যাওয়া বন্ধ রাখা প্রয়োজন।

দুদকের অনুসন্ধানে উঠে আসে তার সম্পদের অস্বাভাবিক উস্ফলন। অনুসন্ধান অনুযায়ী তার নামে ১১ কোটি ৪৪ লাখ ৯০ হাজার ১২৫ টাকার সম্পদ পাওয়া যায়, যার মধ্যে ১০ কোটি ৯৫ লাখ ১১ হাজার ৬৪৯ টাকার বৈধ উৎস পাওয়া যায়নি। অথচ তার ঘোষিত বৈধ আয় মাত্র ৪৯ লাখ ৭৮ হাজার ৪৭৬ টাকা।

তার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলোর মধ্যে ডিএমপি’র মিরপুর মডেল থানার এফআইআর নং-২০/২৩৩, তারিখ ১১ মে ২০২১ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এই মামলায় ধারা ৪০৬/৪২০ পেনাল কোড-১৮৬০ অনুযায়ী অভিযোগ করা হয়, তিনি কামরুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তির কাছ থেকে ১৬,০০,০০০ টাকা ধার নিয়ে তা আত্মসাৎ করেন। মামলার জি আর নং, তারিখ ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৩। তবে তদন্তে দেখা যায়, বাদী নিজেই দাবি করেন যে তিনি এই মামলা করেননি এবং এজাহারের তথ্য ভূয়া। তদন্ত শেষে ২৮ অক্টোবর ২০২১ তারিখে ফাইনাল রিপোর্ট (তথ্যগত ভুল) দাখিল করা হয় এবং অভিযুক্তকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়।

কাফরুল থানার এফআইআর নং-৬/৯৪, তারিখ ৫ এপ্রিল ২০২১, ধারা ৪২০/৪০৬/৫০৬ মামলায়ও একই ধরনের অভিযোগ ওঠে। যেখানে পরবর্তীতে ২৮ ডিসেম্বর ২০২১ তারিখে ফাইনাল রিপোর্ট নং-৭২ দাখিল করে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। শেরেবাংলা নগর থানার এফআইআর নং-৪৩/১৫১, তারিখ ২৪ মার্চ ২০২১ মামলায়ও ৮ আগস্ট ২০২১ তারিখে ফাইনাল রিপোর্ট নং-৪৬ দাখিল করে অভিযোগ মিথ্যা বলে উল্লেখ করা হয়।

অন্যদিকে বনানী থানার এফআইআর নং-৩৯/২৩৯, তারিখ ২৭ আগস্ট ২০২০ মামলায় চার্জশিট নং-২৫৪, তারিখ ২ নভেম্বর ২০২০-এ তাকে অভিযুক্ত করা হয়। গুলশান থানার এফআইআর নং-২৪, তারিখ ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২২ মামলায় চার্জশিট নং-২৭৬, তারিখ ১০ ডিসেম্বর ২০২৩-এ অভিযোগ গঠন করা হয়। এছাড়া গুলশান থানার এফআইআর নং-৪/২৮৯, তারিখ ২ অক্টোবর ২০২১ এবং এফআইআর নং-৪৭/৩৩২, তারিখ ২৬ অক্টোবর ২০২১ মামলাগুলোতেও চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে যথাক্রমে ৩১ মে ২০২২ তারিখে। প্রত্যেকটি মামলাতেই প্রভাব বিস্তার করে অবৈধ অর্থের জোরে চুড়ান্ত রিপোর্ট নিজের পক্ষে নেয় ধুর্ত শফিল্লাহ আল মুনির।  

মামলার বাইরে তার বিরুদ্ধে দেশ ও সমাজ বিরোধী গুরুতর অভিযোগের পরিধি আরও বিস্তৃত। ব্যবসায়িক অংশীদার করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আরেফিন সোহেল শিবলীর কাছ থেকে প্রায় ৪ কোটি টাকা, জাহাঙ্গীর সাহেবের কাছ থেকে ৪০ লাখ টাকা গ্রহণের অভিযোগ রয়েছে। রংধনু গ্রুপের এমডি অপু সাহেবের কাছ থেকে ১০ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে দুদকে তদবিরের নামে। বিদেশে পাঠানোর নামে সুধাংশু বাবুর কাছ থেকে ২৮ লাখ টাকা, এলপিজি ডিলার পাইয়ে দেওয়ার নামে আখি রানীর কাছ থেকে ৮ লাখ ৪০ হাজার টাকা, পাটোয়ারী ট্রাভেলসের মালিকের কাছ থেকে ৩০ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে এই প্রতারকের বিরুদ্ধে।

চাকরি দেওয়ার নামে প্রতারণার মধ্যে রয়েছে- মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরে চাকরি দেওয়ার নামে ৬ লাখ টাকা, ফায়ার সার্ভিসে চাকরি দেওয়ার নামে ৫ লাখ ও ২২ লাখ টাকা, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ঋণ পাইয়ে দেওয়ার নামে ১৫ লাখ টাকা গ্রহণ। এছাড়া পুলিশ কর্মকর্তাদের বদলি করিয়ে দেওয়ার নামেও ৩০ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে ডিজিটাল প্রতারক শফিউল্লাহ আল মুনিরের কিরুদ্ধে।

তার বিরুদ্ধে প্রকল্পভিত্তিক প্রতারণার অভিযোগও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। খাগড়াছড়িতে ইপিজেড প্রকল্প, ক্যাবল কার প্রকল্প, খুলনায় চিংড়ি ও ইথানল প্রকল্প, নদীতে সাব-জেটি নির্মাণ; এসব প্রকল্পের নামে বিভিন্ন লোকের কাছ থেকে বিপুল অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছে বলে অভিযোগে বলা হয়েছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে জমি ক্রয়, অফিস ব্যয়, স্টাফ বেতন, বিদেশ ভ্রমণসহ বিভিন্ন খাতে অর্থ ব্যয়ের বিবরণও রয়েছে ওই অভিযোগে। 

এছাড়া ব্যক্তিগত খরচের ক্ষেত্রেও অন্যের অর্থ ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। গুলশান অফিসের ভাড়া, ১৮ মাসের স্টাফ বেতন, ইফতার পার্টি, শীতবস্ত্র বিতরণ, সামাজিক অনুষ্ঠান, মাজারের ওরশ ইত্যাদি নামে খরচ দেখিয়েছে এই প্রতারক।

অভিযোগ রয়েছে, তিনি সৌদি আরব, দুবাই এবং ইংল্যান্ডে একাধিকবার ভ্রমণ করেছেন এবং এসব ভ্রমণের খরচ অন্যের কাছ থেকে নেওয়া অর্থ দিয়ে বহন করা হয়েছে।

তার বিরুদ্ধে ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগও রয়েছে। অস্ত্রধারী নিরাপত্তাকর্মী ব্যবহার করে ভূক্তভোগীদের ভয় দেখানো, টাকা চাইলে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠে এসেছে। কারাগারে থাকা অবস্থায়ও সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার নামে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

একটি ঘটনায় উরেøখ করা হয়, জামিনের প্রয়োজনে একটি রোলেক্স ঘড়ি জামানত হিসেবে দিয়ে ৭০ লাখ টাকা নেওয়ার পর তা ফেরত না দিয়ে উল্টো দাবি করা হয় যে ঘড়িটি জামানত ছিল না।

এছাড়া জমি ক্রয়ের নামে ৬৬ লাখ টাকার চেক দেওয়া হলেও তা ব্যাংকে ডিজঅনার হয়। গুলশানের একটি বাসার ভাড়া বাবদ ২৫ লাখ টাকা বকেয়া থাকার অভিযোগ রয়েছে।

সব মিলিয়ে দেখা যায়, শফিউল্লাহ আল মুনিরের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো বিচ্ছিন্ন নয়, বরং দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আর্থিক লেনদেনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা একটি বিস্তৃৃত অভিযোগের চিত্র। যদিও কিছু মামলায় তিনি অব্যাহতি পেয়েছেন, তবে একাধিক মামলায় চার্জশিট দাখিল এবং দুদকের তদন্ত চলমান থাকায় তার বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া এখনো শেষ হয়নি।

এসব পরিস্থিতি বিচার করে বলা যায়, অভিযোগ, মামলা, তদন্ত এবং আদালতের আদেশ সব মিলিয়ে তার কর্মকান্ড নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তা এখনো বিচারাধীন এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করছে আদালত ও তদন্ত সংস্থার ওপরে। এছাড়াও তার বিরুদ্ধে আলীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সেল্টার দিয়ে তাদেরকে সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলতে বড় ধরণের গোপণ প্রজেক্ট নিয়ে কাজ করার অভিযোগ করেছেন একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র। যাচাই-বাছাই স্বাপেক্ষে সে বিষয়ে একটি বিস্তারিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হবে পরবর্তীতে।  




শেয়ার করুন:
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
ফিটনেসবিহীন  যান দ্রুত অপসারণের কঠোর নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

ফিটনেসবিহীন যান দ্রুত অপসারণের কঠোর নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর