- নিজস্ব প্রতিবেদক:
কক্সবাজারে পাহাড়ধস স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করেছে। ২৪ ঘণ্টার ভারী বর্ষণে পৃথক চারটি পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। এতে রোহিঙ্গা নারী-শিশু এবং স্থানীয়সহ ৯ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এ ঘটনার পর থেকে রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও পাহাড়ি এলাকায় বাস করা লাখো মানুষ আতঙ্কে দিন পার করছেন।
অতিভারী বর্ষণে প্লাবিত হচ্ছে জেলা ও রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নিম্নাঞ্চল-সমতলও। বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় থাকা লাখো মানুষ উৎকণ্ঠায় রয়েছে। ঘর তৈরি ও মাটি ভরাটের জন্য নির্বিচারে পাহাড় কাটা ও জ্বালানির চাহিদা পূরণে বনের গাছ সাবাড়ের ফলে ক্ষয়ে যাওয়া বনভূমি অতিবর্ষণে ধসের এ ঝুঁকি তৈরি করেছে।প্রতিবছরই পাহাড়ধসে প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে। তবুও শুষ্ক মৌসুমে নিরাপদ আশ্রয় গড়ার তাগিদ থাকে না বাসিন্দাদের। ঝুঁকিতে প্রাণহানি এড়াতে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার পরামর্শ জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের।
সূত্রমতে, কক্সবাজারে একরাতের ভারীবর্ষণে সোমবার (৬ জুলাই) দিনগত রাত ও ভোরের পৃথক চারটি পাহাড়ধসের ঘটনায় নারী-শিশুসহ ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। এদের মাঝে উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পৃথক তিনটি পাহাড়ধসের ঘটনায় রোহিঙ্গা নারী-শিশুসহ আটজন মারা গেছেন। অপর পাহাড়ধস ও নিহতের ঘটনাটি ‘সমতলে জায়গা পাইনি, তাই পাহাড়ে ঘর করেছি। পাহাড়ের ওপরেও ঘর, নিচেও ঘর। কোন সময় ধসে পড়ে ভয়ে থাকি। বৃষ্টি হলেই পাহাড়ধসে আশঙ্কায় সময় কাটে’ উখিয়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশন কর্মকর্তা ডলার ত্রিপুরা জানান, উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের ১৫ নম্বর জামতলী ক্যাম্পের ডি/৬ ব্লকে বসতঘরের ওপর পাহাড়ধসে কামাল হোসাইনের বাসা চাপা পড়ে। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা উদ্ধার তৎপরতা চালান। এসময় একইরাত ২টার দিকে রাজাপালং ইউনিয়নের কুতুপালং ৭ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ডি/৭ ব্লকে পাহাড়ি ঢলে আসা মাটিচাপায় একরাম (৭) নামের এক রোহিঙ্গা শিশুর মৃত্যু হয়।এ বিষয়ে উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পান্না আক্তার বলেন, ভারী বর্ষণে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পৃথক পাহাড়ধসের ঘটনায় আটজন মারা যাওয়ার খবর পেয়েছি। বৃষ্টি চলমান থাকায় পাহাড়ধসের আরও আশঙ্কা রয়েছে। তাই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অবস্থানকারীদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত মাইকিং করা হচ্ছে। সবাইকে প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানান ইউএনও। ‘ভূমিধসের উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা এলাকাগুলো বিশেষ নজরদারিতে রয়েছে। ঝুঁকিতে থাকাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কার্যক্রম চলছে। গতবছর এ কার্যক্রম সফলভাবে বাস্তবায়ন হয়েছে। এবারও এর ব্যতিক্রম হবে না’ অন্যদিকে, সোমবার ভোরে কক্সবাজার সদরের পৌরসভার ১২ নম্বর ওয়ার্ডের ছাত্তার ঘোনা এলাকায় পাহাড়ধসে আলী আকবর নামে একজনের মৃত্যু হয়। এসময় পাহাড়ধসে চাপা পড়েন একই পরিবারের তিনজন। এদের মধ্যে একজনের মৃত্যু হয়। আবহাওয়া অধিদপ্তর কক্সবাজারের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আব্দুল হান্নান জানান, রোববার দুপুর ১২টা থেকে সোমবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ২৬৭ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত সুস্পষ্ট লঘুচাপ ও সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে এ বৃষ্টিপাত হচ্ছে। সমুদ্রবন্দরগুলোতে ৩ নম্বর সতর্কতা সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে। আরও দুদিন ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকতে পারে।সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, উখিয়া-টেকনাফের ৩৩টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মাঝে অন্তত আটটি পাহাড়ধসের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। পাহাড়ের পাদদেশ ও ঢালজুড়ে গড়ে ওঠা অসংখ্য বসতিতে বাস করছেন লক্ষাধিক রোহিঙ্গা। টানা ভারী বর্ষণ হলেই বাড়ছে ধসের উদ্বেগ। ফলে রোহিঙ্গাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে। ঝুঁকিতে থাকা ক্যাম্প-৯ এর বাসিন্দা মাবিয়া খাতুন বলেন, ‘সমতলে জায়গা পাইনি, তাই পাহাড়ে ঘর করেছি। পাহাড়ের ওপরেও ঘর, নিচেও ঘর। কোন সময় ধসে পড়ে ভয়ে থাকি। বৃষ্টি হলেই পাহাড়ধসে আশঙ্কায় সময় কাটে।’ ‘উখিয়া-টেকনাফের ৩৩টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মাঝে অন্তত আটটি পাহাড়ধসের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। পাহাড়ের পাদদেশ ও ঢালজুড়ে গড়ে ওঠা অসংখ্য বসতিতে বাস করছেন লক্ষাধিক রোহিঙ্গা। টানা ভারী বর্ষণ হলেই বাড়ছে ধসের উদ্বেগ। ফলে রোহিঙ্গাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে’ ক্যাম্প-১০ এর সি ব্লকের বাসিন্দা মুহাম্মদ ইব্রাহিম। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিতে বাস করতে হচ্ছে। বৃষ্টির কারণে প্রতিবছরই পাহাড়ধসে মানুষের মৃত্যু হয়। ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এগুলো দেখে খুবই ভয় হয়। তবে অন্য কোথাও যাওয়ার সুযোগ নেই আমাদের।’ ভূমিধসের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে বলে জানান কক্সবাজার শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান। তিনি বলেন, ভূমিধসের উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা এলাকাগুলো বিশেষ নজরদারিতে রয়েছে। ঝুঁকিতে থাকাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কার্যক্রম চলছে। গতবছর এ কার্যক্রম সফলভাবে বাস্তবায়ন হয়েছে। এবারও এর ব্যতিক্রম হবে না।এদিকে, কক্সবাজারের ঈদগাঁও বাজার, ফসলি জমি, মানুষের ঘরবাড়ি, পোকখালী, চৌফলদন্ডী, পেকুয়া, চকরিয়া, রামু, কক্সবাজার শহরের বিজিবি ক্যাম্প, আলীরজাহাল, এসএমপাড়া, কুতুবদিয়াপাড়া, সমিতিপাড়া, পর্যটনজোন, মহেশখালীর নিম্নাঞ্চল বৃষ্টি ও জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হচ্ছে। অনেক বাসাবাড়িতে পানি ঢুকে সৃষ্টি করেছে দুর্ভোগ। জেলার অন্য পাহাড়ি এলাকাতেও একইভাবে ঝুঁকিতে বাস করছেন হাজার হাজার মানুষ।কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক এম এ মান্নান বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসকারীদের নিরাপদে সরে যেতে মাইকিং অব্যাহত রয়েছে। ভারী বর্ষণ আরও কয়েকদিন অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। সব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে সতর্কতার সঙ্গে পরিস্থিতি পর্যবক্ষণ করতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কক্সবাজারের পরিস্থিতি মন্ত্রণালয়েও জানানো হয়েছে।