বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) ড্রাইভিং টেস্ট দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রহমান। বাংলাদেশে ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়ার প্রক্রিয়া, সড়কব্যবস্থার বাস্তবতা এবং আইন প্রয়োগ নিয়ে একাধিক প্রশ্ন তুলেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রহমান। সম্প্রতি বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের কার্যালয়ে গিয়ে ড্রাইভিং পরীক্ষা দেওয়ার অভিজ্ঞতা থেকেই এসব প্রশ্ন সামনে এনেছেন তিনি।
বুধবার (১২ আগস্ট) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের ভেরিফায়েড পেজে দেওয়া এক পোস্টে জাইমা রহমান জানান, এক দশকেরও বেশি আগে লন্ডনে প্রথম ড্রাইভিং পরীক্ষা দিয়েছিলেন তিনি। গত সপ্তাহে বাংলাদেশে গাড়ি চালানোর অনুমতির জন্য দ্বিতীয়বারের মতো পরীক্ষায় অংশ নেন। দুই পরীক্ষাতেই প্রথমবারে উত্তীর্ণ হয়েছেন তিনি।
তবে দুই দেশের ড্রাইভিং পরীক্ষার অভিজ্ঞতার পার্থক্য তাকে বাংলাদেশের সড়কব্যবস্থা নিয়ে ভাবিয়েছে বলে জানান জাইমা। তার মতে, শুধু ড্রাইভিং পরীক্ষা বা লাইসেন্সের বিষয় নয়, বরং সড়ক ব্যবহার এবং সড়ক নিয়ন্ত্রণের সামগ্রিক ব্যবস্থার সঙ্গেই নাগরিকদের সম্পর্কের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
জাইমা বলেন, বিশেষ করে ঢাকার তরুণদের মধ্যে এমন একটি হতাশা রয়েছে যে, তাদের কাছ থেকে নিয়ম মেনে চলার প্রত্যাশা করা হলেও সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থাটি সব সময় নিরাপদ কিংবা অনুমানযোগ্য মনে হয় না।
পথচারীদের ভোগান্তির কথাও তুলে ধরেন তিনি। পর্যাপ্ত পারাপারের ব্যবস্থা না থাকা, হঠাৎ শেষ হয়ে যাওয়া বা দখল হয়ে থাকা ফুটপাত এবং বাস, মোটরসাইকেল, রিকশা ও ব্যক্তিগত গাড়ির বিশৃঙ্খল চলাচলের কারণে সাধারণ মানুষকে প্রতিনিয়ত ঝুঁকি নিয়ে চলতে হয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
যাত্রীদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের অনিশ্চয়তা রয়েছে বলে মনে করেন জাইমা। কোনো বাস যাত্রী তুলতে অন্য বাসের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করবে কি না, হঠাৎ ব্রেক করবে কি না, গাড়িটির যান্ত্রিক সক্ষমতা ঠিক আছে কি না কিংবা চালক পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও বিশ্রাম পেয়েছেন কি না—এসব বিষয় যাত্রীর নিয়ন্ত্রণে থাকে না বলে উল্লেখ করেন তিনি।
নতুন চালকদের জন্য লাইসেন্স পাওয়ার প্রক্রিয়া নিয়েও একাধিক প্রশ্ন তুলেছেন জাইমা। তিনি জানতে চান, নিয়মগুলো আসলে কী এবং কেন সেগুলো একেকজনের জন্য একেক রকম মনে হয়। অনলাইন প্রক্রিয়া সব সময় যথেষ্ট না হওয়ার কারণ কী, দালালের মাধ্যমে কাজ দ্রুত হয় কেন এবং পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পরও প্রয়োজনীয় কাগজ পেতে কেন মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হয়—এসব প্রশ্নও তোলেন তিনি।
বিআরটিএর বিভিন্ন সেবা ডিজিটাল করার উদ্যোগকে ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে উল্লেখ করলেও জাইমা বলেন, ডিজিটাল ব্যবস্থা তখনই কার্যকর, যখন তা মানুষের জীবন সহজ করে। অনলাইনে শুরু হওয়া কোনো কাজের সমাধানের জন্য শেষ পর্যন্ত যদি অফিসে গিয়ে কথা বলতে হয়, তাহলে সেটিকে পুরোপুরি ডিজিটাল সেবা বলা যায় না।
তার মতে, অপ্রয়োজনীয় প্রতিটি সশরীর যোগাযোগই দেরি, পক্ষপাত কিংবা অনৈতিক লেনদেনের সুযোগ তৈরি করতে পারে। আর এই ব্যবস্থার দুর্বলতার সুযোগই নেয় দালালচক্র।
জাইমা মনে করেন, মানুষ সব সময় আইন ভাঙতে চায় বলেই দালালের দ্বারস্থ হয় না। অনেক সময় সরকারি প্রক্রিয়া এতটাই জটিল হয়ে ওঠে যে মধ্যস্থতাকারীই সবচেয়ে সহজ পথ হিসেবে সামনে আসে। এতে দুর্নীতি ব্যতিক্রম না থেকে কাজ আদায়ের স্বাভাবিক পদ্ধতিতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রেও সামঞ্জস্যের অভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। তার ভাষ্য, লাইসেন্স, গাড়ির ফিটনেস, চালকের প্রশিক্ষণ ও সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে যত ভালো নিয়মই করা হোক, সেগুলো যদি বেছে বেছে প্রয়োগ করা হয়, তাহলে মানুষের মধ্যে আইনের প্রতি শ্রদ্ধা কমে যায়।
সড়ক নিরাপত্তাকে শুধু গাড়ি, লাইসেন্স ও শাস্তির বিষয় হিসেবে না দেখে প্রতিদিনের সড়ক ব্যবহারকারীদের বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে দেখার আহ্বান জানান জাইমা। শিক্ষার্থী, নারী, খাদ্য সরবরাহকর্মী, বাসচালক, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি কিংবা রিকশাচালক—প্রত্যেকের কাছে একই সড়কের অভিজ্ঞতা ভিন্ন বলে উল্লেখ করেন তিনি।
২০১৮ সালের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের কথাও তুলে ধরেন জাইমা। সে সময় স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে যানবাহনের লাইসেন্স ও ফিটনেস পরীক্ষা এবং লাইসেন্সবিহীন চালকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছিল। আট বছর পরও সেই উদ্বেগগুলোর অনেকটাই রয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
জাইমার মতে, এখন প্রশ্ন হওয়া উচিত শুধু ‘সড়ক নিরাপদ নয় কেন’—এমন নয়। বরং দীর্ঘদিন ধরে চিহ্নিত সমস্যাগুলো এখনো সমাধান করা হয়নি কেন, সেটিই হওয়া উচিত মূল প্রশ্ন।
আইন প্রয়োগকে কীভাবে আরও ন্যায্য ও সামঞ্জস্যপূর্ণ করা যায়, অভিযোগ জানানোর প্রক্রিয়াকে কীভাবে নিরাপদ ও কার্যকর করা যায় এবং সড়ক এমনভাবে কীভাবে নকশা করা যায় যাতে সাধারণ একটি ভুলের কারণে কারও জীবনহানি না ঘটে এসব বিষয় নিয়ে নতুন করে ভাবার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
সবশেষে জাইমা রহমান বলেন, সংযোগ থাকুক বা না থাকুক, প্রত্যেক নাগরিক যেন একই সেবা পান—এটি নিশ্চিত করতে হবে। সড়ক নিরাপত্তায় সত্যিকারের পরিবর্তন আনতে হলে শুধু নিয়ম পরিবর্তন নয়, পুরো চিন্তার কাঠামোও নতুন করে সাজাতে হবে।