ঢাকা | বঙ্গাব্দ

বিআইডব্লিউটিএ’র ড্রেজিংয়ে লুটপাটের মহোৎসব

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Jul 3, 2026 ইং
বিআইডব্লিউটিএ’র ড্রেজিংয়ে লুটপাটের মহোৎসব ছবির ক্যাপশন: নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন উর রশিদ সিন্ডিকেটে জিম্মি নৌপথ
ad728
নিজস্ব প্রতিবেদক॥ দেশের নদ-নদীর নাব্যতা রক্ষা এবং নৌপথ সচল রাখার গুরুদায়িত্ব যাদের ওপর, সেই বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ বা বিআইডব্লিউটিএ’র ড্রেজিং বিভাগ এখন দুর্নীতির অতল গহ্বরে নিমজ্জিত। নদী খননের নামে প্রতিবছর শত শত কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করা হলেও বাস্তবে এর সুফল মিলছে না। 
অভিযোগ উঠেছে, ড্রেজিং প্রকল্পের সিংহভাগ অর্থই চলে যাচ্ছে এক শক্তিশালী সিন্ডিকেটের পকেটে, যার নেপথ্যে কলকাঠি নাড়ছেন ড্রেজিং বিভাগের নির্বাহী  প্রকৌশলী মামুন উর রশিদ। বিশেষ করে ভোলা লাহারা বরগুন আমতলী পটুয়াখালী বরিশাল সদর নৌ-পথে ড্রেজিংয়ের নামে নজিরবিহীন অনিয়মের চিত্র ফুটে উঠেছে। ড্রেজার সচল না থাকলেও জ্বালানি তেলের বিল তোলা, খননকৃত বালু পুনরায় নদীতেই ফেলা এবং বেসরকারি ড্রেজার ভাড়ার নামে এক মহালুটপাট চলছে বিআইডব্লিউটিএ’র ড্রেজিং বিভাগে। এতে সরকারি কোষাগারের অর্থ যেমন অপচয় হচ্ছে, তেমনি নির্বাহী প্রকৌশলীর অদক্ষতা ও তদারকির অভাবে নৌপথগুলো অচিরেই ভরাট হয়ে নৌ-যোগাযোগ ব্যবস্থা ধ্বংসের মুখে পড়ছে। সংশ্লিষ্ট একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে এসব তথ্য। 
অনুসন্ধানে আরো জানা গেছে, বিআইডব্লিউটিএ’র ড্রেজিং বিভাগের দুর্নীতির সবচেয়ে বড় খাত হলো ‘জ্বালানি তেল চুরি’ এবং ‘বেসরকারি ড্রেজার ভাড়া’, যা নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন উর রশিদের লুটপাটের মহোৎসবে পরিণত হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী একটি ড্রেজার দিনে কত ঘণ্টা চলল এবং কতটুকু মাটি খনন করল তার সুনির্দিষ্ট লগবই থাকার কথা থাকলেও সেকশনে দেখা গেছে ড্রেজার বন্ধ রেখেও ভুয়া লগবইয়ের মাধ্যমে প্রতিদিন হাজার হাজার লিটার ডিজেল চুরির হিসাব দেখানো হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নির্বাহী প্রকৌশলী হিসাবে মামুন উর রশিদের চরম দুর্নীতি আর অদক্ষতার সুযোগ নিয়ে একটি অসাধু চক্র দীর্ঘকাল ধরে এই চুরির সিন্ডিকেট সক্রিয় রেখেছে। এছাড়া খননকৃত বালু বা পলি মাটি নদীর পাড় থেকে অন্তত ৫০০ মিটার দুরে ফেলার নিয়ম থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা মাঝ নদীতেই ফেলা হচ্ছে। নির্বাহী প্রকৌশলীর কারিগরি তদারকি না থাকায় জোয়ারের টানে সেই মাটি পুনরায় খননকৃত স্থানেই ফিরে আসছে, যা একই স্থানে বারবার ড্রেজিং দেখিয়ে বিল উত্তোলনের একটি অন্তহীন সুযোগ করে দিচ্ছে।
অভিযোগের তিলক পড়েছে বিআইডব্লিউটিএ’র নিজস্ব ড্রেজার বহর থাকার পরও রহস্যজনক কারণে বেসরকারি ড্রেজার ভাড়ার ওপর অধিক গুরুত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে। অভিযোগ আছে, ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা কিছু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এবং নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন উর রশিদের মধ্যে এক ধরণের অলিখিত কমিশন চুক্তি রয়েছে। সরকারি ড্রেজার সামান্য ত্রুটর অজুহাতে বছরের পর বছর অচল করে রাখা হয়, যাতে বেসরকারি ড্রেজার ভাড়ার পথ সুগম হয়। গত কয়েক বছরে বিভিন্ন নৌপথ খননে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে যে পরিমাণ অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে, তা দিয়ে একাধিক নতুন ড্রেজার কেনা সম্ভব ছিল। কিন্তু কমিশনের লোভে সেই পথে হাঁটছেন না সংশ্লিষ্টরা। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে বেসরকারি ড্রেজার বাস্তবে কাজ না করলেও ভূয়া ‘কিউবিক মিটার’ দেখিয়ে কোটি কোটি টাকার বিল পাস করিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এই সিন্ডিকেটের পেছনে প্রধান প্রকৌশলীসহ ড্রেজিং বিভাগের বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী প্রকৌশলীর নাম মুখে মুখে ফিরছে, যারা দীর্ঘদিন একই পদে থেকে এই দুর্নীতির সা¤্রাজ্য গড়ে তুলেছেন।
দুর্নীতির আরেকটি বড় ক্ষেত্র হলো ড্রেজার মেরামত। ড্রেজিং বহরে থাকা কোটি কোটি টাকা মূল্যের ড্রেজারগুলো নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন উর রশিওে চরম অনিয়ম উদাসীনতা ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে জং ধরছে। অথচ এই ড্রেজারগুলো মেরামতের নামে প্রতিবছর বরাদ্দ করা হচ্ছে বিপুল অর্থ। অভিযোগ উঠেছে, মেরামতের নামে যেসব যন্ত্রাংশ কেনা হয়, তার অধিকাংশের মান অত্যন্ত নিম্নমাণের অথবা পুরনো যন্ত্রাংশ রং করে নতুন হিসেবে চালানো হয়। অনেক ক্ষেত্রে কোনো যন্ত্রাংশ না কিনেই কেবল ভূয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে টাকা তুলে নেওয়া হচ্ছে। ড্রেজিং বিভাগের ভান্ডারে থাকা মূল্যবান তামা, পিতল ও ভারী যন্ত্রাংশ পাচার হওয়ার ঘটনাও নতুন নয়। নির্বাহী প্রকৌশলীর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে একটি ড্রেজার মেরামতে যেখানে কয়েক লাখ টাকা লাগার কথা, সেখানে প্রাক্কলন বাড়িয়ে কোটি টাকা ব্যয় দেখানো হচ্ছে। 
নৌপথ সংশ্লিষ্টদের মতে, বিআইডব্লিউটিএ’র ড্রেজিং বিভাগ যেন এখন এক ‘আলাদিনের চেরাগ’। ভুক্তভোগী লঞ্চ মালিক সমিতির এক নেতা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমরা প্রতিবছর নাব্যতা সংকটে কোটি কোটি টাকার ক্ষতির মুখে পড়ি। বিশেষ করে পদ্মা ও যমুনার সংযোগস্থলে জাহাজ আটকা পড়া নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। ড্রেজার চলে কিন্তু গভীরতা বাড়ে না-এ এক অলৌকিক রহস্য। সরকার হাজার কোটি টাকা দিচ্ছে কিন্তু নির্বাহী প্রকৌশলীর অদক্ষতায় নদীগুলো দিন দিন ভরাট হয়ে যাচ্ছে। বিআইডব্লিউটিএ’র ড্রেজিং বিভাগের একজন উপ-সহকারী প্রকৌশলী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এখানে দুর্নীতির একটি সুশৃঙ্খল চেইন রয়েছে। যদি কেউ প্রতিবাদ করতে চায়, তাকে দুর্গম এলাকায় বদলি করা হয় অথবা বিভাগীয় মামলার ভয় দেখানো হয়। জ্বালানি চুরির টাকা নিচ থেকে ওপর পর্যন্ত নির্বাহী প্রকৌশলীর দপ্তর পর্যন্ত বন্টন হয় বলে গুঞ্জন রয়েছে।
এ বিষয়ে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, ড্রেজিং প্রকল্পে অনিয়মের কিছু অভিযোগ আমাদের নজরে এসেছে। আমরা একটি অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটি গঠন করার প্রক্রিয়া চলছে। প্রধান প্রকৌশলীসহ দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অন্যদিকে, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, বিআইডব্লিউটিএ’র ড্রেজিং প্রকল্পের নথিপত্র তলব করার প্রক্রিয়া চলছে। মামুন উর রশিদসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অবৈধ সম্পদ অর্জনের বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
বিশিষ্ট নদী বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত বলেন, ড্রেজিং প্রকল্পটি এখন লুটপাটের প্রকল্পে পরিণত হয়েছে। প্রযুক্তিগত তদারকি ছাড়া নদী খনন কখনোই সফল হবে না। এখানে স্বচ্ছতা আনতে হলে ডিজিটাল ড্রেজিং মনিটরিং সিস্টেম চালু করা জরুরি। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিআইডব্লিউটিএ’র ড্রেজিং বিভাগে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে একটি স্বাধীন অডিট প্রয়োজন। বিআইডব্লিউটিএ’র এই ব্যাপক অনিয়ম ও বিশেষ করে নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন উর রশিদ  দুর্নীতি নিয়ে উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করা এখন সময়ের দাবি। নদী খননের নামে এই লুণ্ঠন বন্ধ না হলে অচিরেই দেশের মানচিত্র থেকে বিলীন হয়ে যাবে বহু নদী। ড্রেজিং বিভাগের যেসব কর্মকর্তা এই দুর্নীতির সাথে সরাসরি জড়িত, তাদের সম্পদের হিসাব নেওয়া এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে নৌপথের নাব্যতা রক্ষা করা কেবল দিবাস্বপ্নেই রয়ে যাবে। অন্যথায়, ড্রেজিং প্রকল্পের শত শত কোটি টাকা কেবল বালুর নিচেই চাপা পড়বে। (ক্রমশঃ)



শেয়ার করুন:
কমেন্ট বক্স