ঢাকা | বঙ্গাব্দ

বেতার ডিজি’র বদলি বাণিজ্য নিলাম ছাড়াই সম্পদ বিক্রি

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Feb 28, 2026 ইং
বেতার ডিজি’র বদলি বাণিজ্য নিলাম ছাড়াই সম্পদ বিক্রি ছবির ক্যাপশন: বেতার ডিজি এএসএম জাহীদ
ad728
নিজস্ব প্রতিবেদক॥ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ বেতারকে ঘিরে অনিয়ম দুর্নীতির মহোৎসব। সরকারি সম্পদ বিক্রি থেকে টেন্ডার বাণিজ্য, বদলি বাণিজ্য, অর্থ আত্মসাৎ এমনকি রাষ্ট্রীয় ঐতিহ্য ধ্বংসের অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন বর্তমান মহাপরিচালক (ডিজি, চলত দায়িত্ব) এএসএম জাহীদ।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অভিযোগগুলো শুধু ব্যক্তিগত অনিয়মেরই নয়; বরং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতিরও চিত্র। অভিযোগ বিষয়ে দুদকের চিঠির প্রেক্ষিতে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে দুই সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। তবে অতীত অভিজ্ঞতায় ‘আইওয়াশ’ তদন্তের নজির থাকায় এই অনুসন্ধান কতটা কার্যকর হবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
পুরনো অভিযোগ: নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেতারের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, এখানে ওপরের স্তরে সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বচ্ছতা নেই। বদলি, পদায়ন, প্রকল্প সবকিছুতেই রয়েছে একচেটিয়া প্রভাব। এছাড়া সম্প্রতি আগারগাঁওস্থ বাংলাদেশ বেতারের সদর দপ্তরে নিলাম ছাড়াই সরকারি সম্পদ বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। 
জানা যায়, ২০২৫ সালের এপ্রিলে বাংলাদেশ বেতারের একাধিক মূল্যবান যন্ত্রাংশ, দুটি গাড়ি, জেনারেটর, সম্প্রচার টাওয়ারের অংশ এবং বেতারের সামনে স্থাপিত মুক্তিযোদ্ধাদের (সেক্টর কমান্ডার) ব্রোঞ্জ নির্মিত ম্যুরালের অংশবিশেষ প্রকাশ্য নিলাম ছাড়াই নির্দিষ্ট এক ব্যক্তির কাছে হস্তান্তরে উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রায় অর্ধকোটি টাকার সরকারি সম্পদ এভাবে গোপণে বিক্রির চেষ্টায় গত বছর ৯ এপ্রিল অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। দরদাম নিয়ে শুরু হয় হট্টগোল। আগারগাঁওস্থ স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারাও ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। পরে আনুষ্ঠানিকভাবে বিক্রি স্থগিত ঘোষণা করা হলেও অভিযোগ রয়েছে, এর আগেই কিছু মালামাল ট্রাকে সরিয়ে ফেলা হয়। পরবর্তীতে অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটি গঠন হলেও সেটি ছিল ‘আ্ইওয়াস’। পরে ব্যাকডেটে নথি তৈরি করে পুরো প্রক্রিয়াকে বৈধতা দেওয়া হয়। 
এছাড়াও গত বছর কোরবানি ঈদের আগে সাভার রেডিও কলোনি অধিকতর কেপিআই এলাকা হওয়া সত্ত্বেও দেড় কোটি টাকায় পশুর হাট ইজারা দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের অনুমতি নেওয়া হয়নি।
দরপত্র বাণিজ্য ও ‘নিজস্ব ঠিকাদার সিন্ডিকেট: অভিযোগ উঠেছে, বর্তমান ডিজি দায়িত্ব নেওয়ার পর বেতার সদর দপ্তরের বিভিন্ন কক্ষ সংস্কার, আসবাব ক্রয়, এসি স্থাপন ও সভাকক্ষ আধুনিকায়নের নামে একের পর এক প্রকল্প নেওয়া হয়। কিন্তু এসব কাজের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। বরং একটি নির্দিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান-প্যানাসিয়া অ্যাসোসিয়েট বিডি বারবার কাজ পায়। এসব প্রকল্পে লাখ লাখ টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। কিন্তু বাজারদরের সঙ্গে তুলনা করলে ব্যয়ের অস্বাভাবিকতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
গাছ কাটা যানবাহন বিক্রি ও ম্যুরাল অপসারণ: সম্প্রতি আগারগাঁও বেতার চত্বরে একটি ব্যাডমিন্টন কোর্ট নির্মাণের জন্য সরকারি ছুটির দিনে একাধিক পুরনো গাছ কাটা হয়েছে, যা পরিবেশ আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন। একই সঙ্গে বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় পাওয়া মোটরসাইকেল ও প্রাইভেট কার কনডেম ঘোষণা ছাড়াই বিক্রি করা হয়। গভীর রাতে এসব যানবাহন বেতার চত্বর থেকে বের করে নেওয়া হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেতারের একাধিক কর্মকর্তা এ ঘটনার প্রমাণ হিসেবে সিসিটিভি ফুটেজ যাচাইয়ের দাবি তুলেছেন। বর্তমান ডিজির বিরুদ্ধে শেখ মুজিবুর রহমানের ব্রোঞ্জ নির্মিত ম্যুরালের অংশবিশেষ বিক্রির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতেরও অভিযোগ রয়েছে।
বদলি বাণিজ্য ও ক্ষমতার অপব্যবহার: বেতারে ডিজি পদে যোগদানের পর অল্প সময়ের মধ্যেই কোনো কারণ ছাড়াই প্রায় ১৫০ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বদলি করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, এসব বদলির পেছনে মোটা অঙ্কের লেনদেন হয়েছে। এছাড়া গুরুত্বপূর্ণ পদে ‘নিজস্ব লোক’ বসিয়ে আর্থিক সুবিধাও নেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের সচিব বর্তমান ডিজির ব্যাচমেট হওয়ায় বেতার সংশ্ষ্টি সকল কাজেই তিনি ক্ষমতার প্রভাব বিস্তার করে থাকেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডিজির ক্ষমতা এতোই ব্যাপক যে, কোনো অনুমোদন ছাড়াই বেতারের বিভিন্ন আঞ্চলিক কেন্দ্র্র থেকে গাড়ি এনে ঢাকায় নিজের লোকজন দিয়ে চালানো হচ্ছে। প্রাধিকার না থাকা সত্ত্বেও এসব গাড়ি ডিজির পছন্দের কর্মকর্তাদের নামে ব্যবহারের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে, যা সরকারি যানবাহন ব্যবস্থাপনা বিধিমালার সুস্পষ্ট লংঘন।
তদন্ত কমিটির আইনি সীমাবদ্ধতা নিয়েও সংশয়: ডিজির বিরুদ্ধে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক অতিরিক্ত সচিব মো. ইয়াসীন এবং সদস্য প্রধান তথ্য অফিসার মো. নিজামুল কবীর দু’জনই একই মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা। আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুদক আইনের ধারা-১৯ অনুযায়ী, দুদক প্রয়োজনে যে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নথি তলব ও জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারে। কিন্তু একটি অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক এই কমিটির জবানবন্দি গ্রহণ, ব্যাংক হিসাব বিশ্লেষণ বা সম্পদ যাচাইয়ের কোনো আইনগত ক্ষমতা নেই। ফলে মূল তদন্ত শেষ পর্যন্ত দুদকের ওপরই নির্ভর করবে।
এ বিষয়ে প্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক আমলা ড. আব্দুস সবুর বলেন, ‘বাংলাদেশ বেতার রাষ্ট্রের কণ্ঠ। সেই কণ্ঠ যদি দুর্নীতির সঙ্গে আপস করে, তবে ক্ষতিটা শুধু প্রতিষ্ঠানের নয়, রাষ্ট্রেরও। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন, দুদকের সিদ্ধান্ত এবং আইনি পদক্ষেপÑ এই তিন ধাপই নির্ধারণ করবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতির বিরুদ্ধে আইন আদৌ কার্যকর কি না।’ তিনি আরও বলেন, ‘এই তদন্ত যদি কেবল ফাইলবন্দি প্রতিবেদনে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে আইনের উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হবে।’
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডিজির বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলো কেবল প্রশাসনিক অনিয়ম নয়; বরং ফৌজদারি অপরাধ। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, উত্থাপিত অভিযোগের প্রতিটিই আলাদা করে অনুসন্ধানযোগ্য এবং সম্মিলিতভাবে তা একটি প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির চিত্র।




শেয়ার করুন:
কমেন্ট বক্স
রাজধানীতে কালবৈশাখীর তাণ্ডব: ঈদের দিনেও ঝোড়ো বৃষ্টির পূর্বাভ

রাজধানীতে কালবৈশাখীর তাণ্ডব: ঈদের দিনেও ঝোড়ো বৃষ্টির পূর্বাভ