বরিশাল ঘুরে এসে আসাদ মাহমুদ:
বরিশাল শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ইইডি) নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলে মানববন্ধন করেছেন স্থানীয় ছাত্রদল ও ছাত্র ফেডারেশনের নেতাকর্মীরা।
গত ২২ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার দুপুরে ওই প্রকৌশলীকে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ‘আওয়ামী লীগের দোসর’ আখ্যা দিয়ে অধিদপ্তরের সামনে এ কর্মসূচি পালন করা হয়। তবে কর্মসূচির একপর্যায়ে বিএনপিপন্থী একদল ঠিকাদার হামলা চালিয়ে মানববন্ধন পন্ড করে দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। সাংবাদিকদের সংবাদ সংগ্রহে বাঁধা দেন বিএনপি’র এক ঠিকাদার। পরে তোপের মুখে স্থান ত্যাগ করে চলে যান সুবিধা ভোগী ওই ঠিকাদার নামধারী বিএনপি নেতা।
মানববন্ধনে উপস্থিত জেলা ছাত্র ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক রাইদুল ইসলাম সাকিবের অভিযোগ, শহিদুল ইসলাম বরিশাল বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের ৯ নম্বর সদস্য। তিনি দীর্ঘদিন ধরে আ’লীগের লোকজনকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার মাধ্যমে পৃষ্ঠপোষকতা করে আসছেন। সম্প্রতি ১০ নম্বর ওয়ার্ডে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আ’লীগের ‘গুপ্ত মিছিলেও’ তিনি অর্থায়ন করেছেন। নির্বাহী প্রকৌশলী অধিকাংশ ঠিকাদারি কাজ মোমেন সিকদারকে দিয়ে করান বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারীদের দাবি, শহিদুল ইসলাম সব ঠিকাদারি কাজে ৫% হারে কমিশন নেন এবং গভীর রাত পর্যন্ত অফিসে বসে কমিশন ভাগ-বাটোয়ারা করেন। একাধিকবার সতর্ক করার পরও তিনি বেপরোয়া হয়ে নিজস্ব বলয়ের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দিতে সহায়তা করছেন।
ছাত্র সংগঠনগুলোর অভিযোগ, নির্বাহী প্রকৌশলীর অনুসারী যুবদলের সাবেক নির্বাহী সদস্য মোমেন সিকদার, ছাত্রদল নেতা সানমুন, প্রকৌশলীর গাড়িচালক ইব্রাহিম ও অফিস সহকারী তন্ময় এসে মানববন্ধনের ব্যানার কেড়ে নেন এবং অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন। এ ঘটনার একটি ভিডিও ইতিমধ্যে ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওতে দেখা যায়, মানববন্ধন চলাকালে বাধা দিয়ে মোমেন সিকদার চিৎকার করে বলছেন, ‘এই ছবি দেখিয়ে ব্ল্যাকমেল করবেন, চাঁদাবাজি করবেন, সেটা হবে না।’ পরে গণমাধ্যমকর্মীদের উপস্থিতি দেখে তিনি ও তাঁর অনুসারীরা সেখান থেকে সরে যান।
অভিযোগের বিষয়ে ঠিকাদার ও যুবদল নেতা মোমেন সিকদার জানান, তিনি শিক্ষা প্রকৌশল দপ্তরে যাওয়ার সময় ব্যানার নিয়ে কিছু লোককে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেন। ব্যানারে নির্বাহী প্রকৌশলীর ছবি দেখে তিনি কেবল কারণ জানতে চেয়েছেন, মানববন্ধনে বাঁধা দেওয়ার অভিযোগ সত্য নয়।
মোমেন সিকদার বিএনপি’র কেউ না: বিএনপির পরিচয় ব্যবহার করে মোমেন সিকদার একজন চিহ্নিত দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার পক্ষে অবস্থান ও মানববন্ধনে বাঁধা দেযার ঘটনায় চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বরিশাল জেলা বিএনপির সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট আবুল কালাম শাহিন। ঘটনার পর তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে এক স্ট্যাটাসে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে লিখেছেন-"মোমেন শিকদার বিএনপির কোন স্তরের নেতা? বিএনপির নাম ব্যবহার করে এই বাঁধা দানের অধিকার তার নাই। দুর্নীতিবাজ প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে তদন্তপূর্বক শাস্তির ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।"
সচেতন নাগরিক সমাজ ও সাধারণ অংশগ্রহণকারীরা জানিয়েছেন, বিগত সরকারের দোসর দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা শহিদুল ইসলামের অপকর্ম ঢাকতে বিএনপির নাম ব্যবহার করে বিশ্রঙ্খলা সৃষ্টি করা হয়েছে। তারা অবিলম্বে নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদুলের দুর্নীতির সুষ্ঠু তদন্ত করে তাকে বরখাস্তসহ আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। একইসাথে বিএনপির পরিচয় ভাঙিয়ে অপকর্ম করা ঠিকাদার মোমেন সিকদারের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হয়েছে।

মোমেন সিকদারের নেতৃত্বে প্রতিবাদ সভা ভন্ডুলের চেষ্টা
অফিস ফাঁকি দিয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদুলের নেতৃত্বে প্রমোদ ভ্রমন: সরকারি কর্মদিবসে বরিশাল ইইডি’র ১৪ প্রকৌশলী অনুপস্থিত থেকে সিলেট ভ্রমণে যাওয়ার অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে দপ্তরের হাজিরা খাতা পর্যালোচনা করা হলে একই সময়ে একাধিক প্রকৌশলীর অনুপস্থিত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, গত ৯ সেপ্টেম্বর দুপুরের পর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শহিদুল ইসলাম, সহকারী প্রকৌশলী আবির হাসান, উপসহকারী প্রকৌশলী আশিকুর রহমান ও সাদিয়া সুলতানা জেবা দপ্তর থেকে বের হয়ে যান। পরদিনও তাঁরা কর্মস্থলে উপস্থিত ছিলেন না বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এছাড়া সহকারী প্রকৌশলী মো. আক্তারুজ্জামান ৮ সেপ্টেম্বর থেকে এবং সহকারী প্রকৌশলী (বিদ্যুৎ) আফজাল হোসেন ৭ সেপ্টেম্বর থেকে অফিসে অনুপস্থিত ছিলেন বলে হাজিরা খাতায় উল্লেখ রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
একাধিক সূত্রের দাবি, ৯ সেপ্টেম্বর দুপুরের পর নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদুল ইসলামের নেতৃত্বে দপ্তরের কয়েকজন প্রকৌশলী এবং বিভিন্ন উপজেলার উপসহকারী প্রকৌশলীরা বরিশাল থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন। পরে তাঁরা ঢাকা থেকে বিমানে সিলেট যান। সেখান থেকে তাঁদের হবিগঞ্জের বাহুবলে যাওয়ার কথা জানা যায়।
সূত্রগুলোর আরও দাবি, প্রকৌশলীদের একটি দল বাহুবল উপজেলার পুটিজুরী এলাকার একটি বিলাসবহুল রিসোর্টে কয়েক দিন অবস্থান করে। তবে এই ভ্রমণের ব্যয়, সরকারি অনুমোদন এবং সফরের উদ্দেশ্য সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা দাবি করেন, একজন ঠিকাদারের অর্থায়নে নির্বাহী প্রকৌশলীসহ কয়েকজন প্রকৌশলী ওই সফরে যান। তবে এ দাবিরও স্বাধীন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
প্রকৌশলী শহিদুলের বিরুদ্ধে মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ ঠিকাদারকে গালিগালাজ: এর আগে বরিশাল ইইডির নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে ঘুষ, দুর্নীতি, ভূয়া বিল উত্তোলন, টেন্ডারবাজি ও ঠিকাদারদের হয়রানির অভিযোগ তুলে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিবের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন ২৪ জন ঠিকাদার। লিখিত অভিযোগে ঠিকাদারেরা দাবি করেন, নির্বাহী প্রকৌশলীর চাহিদা অনুযায়ী নির্দিষ্ট হারে কমিশন না দিলে কাজ শতভাগ শেষ হওয়ার পরও বিল পরিশোধে জটিলতা তৈরি করা হয়। মাঠপর্যায়ে কাজের দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকলেও কাগজে-কলমে অগ্রগতি দেখিয়ে বিলের কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার অভিযোগও করেন তাঁরা। এ ছাড়া কাজের জামানতের টাকা ফেরত পেতেও অতিরিক্ত অর্থ দিতে হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
ঠিকাদারদের আরও অভিযোগ, নির্বাহী প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে কথা বললে বিল আটকে দেওয়া কিংবা কাজের সাইটে বিভিন্ন ধরনের জটিলতা তৈরির আশঙ্কা থাকে। এ কারণে অনেকেই প্রকাশ্যে অভিযোগ করতে চান না বলে তাঁরা দাবি করেন।
লিখিত অভিযোগে প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহারের বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে। গত বছরের ২৯ নভেম্বর ফারুক হোসেন নামের এক ঠিকাদারকে ফোনে গালিগালাজ ও হুমকি দেওয়ার অভিযোগ ওঠে নির্বাহী প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় পরদিন ৩০ নভেম্বর বরিশাল কোতোয়ালি মডেল থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন ওই ঠিকাদার। জিডির নম্বর ২০৭৬।
এছাড়া দপ্তরের সরকারি রেস্ট হাউস ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহারের অভিযোগও লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
প্রকৌশলী শহিদুলের টেন্ডার সিন্ডিকেট: ২০২৩ এর আগস্ট মাসে প্রকৌশলী শহিদুল ইসলাম দপ্তরটির দায়িত্ব নিয়ে গড়ে তুলেন একটি লুটেরা টেন্ডার সিন্ডিকেট।এই দুর্নীতিবাজ প্রকৌশলরি নেতৃত্বে বিএনপির নাম ভাঙ্গিয়ে সিন্ডিকেটটির সমন্বয় করেন মেসার্স মোমেন সিকদার নামক ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের মালিক মোমেন সিকদার। জুলাই আন্দোলনের আগে থেকেই এই ঠিকাদার এলটিএম ও ওটিএম উভয় পদ্ধতিতেই সর্বোচ্চ সংখ্যক কাজ পেয়েছেন দপ্তরটিতে। নির্বাহী প্রকৌশলীর সহায়তায় তিনি শতাধিক কোটি টাকার লাভজনক কাজ বাগিয়ে নিয়েছেন বরিশাল ইইডি’র। মোমেন সিকদারের সাথে আরো আছে মেসার্স এইচ. এম. হেলাল এন্ড কোম্পানী লিমিটেড, মেসার্স শাহিনুর এন্টারপ্রাইজ, মেসার্স দ্বীপ এন্টারপ্রাইজ, মেসার্স আক্কাস এন্টারপ্রাইজ, মেসার্স রুনা এন্টারপ্রাইজ, হাওলাদার এন্টারপ্রাইজ ও মেসার্স রফিক ট্রেডার্সসহ আরো কয়েকটি প্রতিষ্ঠান।

ইজিপি’তে ম্যাপিং প্রত্রিয়ায় ১টি মাত্র সিডিউল বিক্রয় জমা ও রেসপন্স দেখিয়ে হাওলাদার এন্টারপ্রাইজকে কাজ পাইয়ে দেওয়া হয়। অথচ সুষ্ঠুভাবে টেন্ডার করলে এই টেন্ডার আইডিতে অর্ধশতাধিক সিডিউল বিক্রি হতো।
এলটিএম জালিয়াতি: দপ্তরটির নির্বাহী প্রকৌশলী শীহদুল ইসলাম এলটিএম জালিয়াতি করেও পছন্দের ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিচ্ছেন। এ রকম ভূড়ি ভূড়ি প্রমাণ ‘বাঙালি সংবাদ’ এর হাতে রয়েছে। ২০২৩ এর আগস্ট থেকে শুরু করে অদ্যাবধি অসংখ্য এলটিএম টেন্ডারে ১/২টি করে সিডিউল ফেলিয়ে ম্যাপিং প্রক্রিয়ায় কাজ পাইয়ে দিচ্ছেন তিনি। এছাড়া পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দিতে অসংখ্য ঠিকাদরকে নন-রেসপন্সিভ দেখিয়ে ২/৩টি বা ১টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে লটারি করে ঠিকাদার নির্বাচনের অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে। মেসার্স হাওলাদার এন্টারপ্রাইজ, মেসার্স মোমেন সিকদার ও মেসার্স আক্কাস এন্টারপ্রাইজকে এভাবে এলটিএম টেন্ডারে অসংখ্য কাজ পাইয়ে দিয়েছেন তিনি।
রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের আশঙ্কা: বরিশাল শিক্ষা প্রকৌশলের টেন্ডার ও কাজ বন্টন নিয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের আশঙ্কা করছেন স্থানীয় ভূক্তভোগী সাধারণ ঠিকাদাররা। নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদুলের বেপরোয়া লুটপাট ও দুর্নীতির কারণে ওই সকল ভূক্তভোগী ঠিকাদারের হাতে যে কোন সময় লঞ্ছিত হতে পারেন বলেও হুসিয়ারী ব্যক্ত করেছেন। এমনকি এই লুটেরা নির্বাহী প্রকৌশলীকে অবিলম্বে প্রত্যাহার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা না করলে ভবিষ্যতে ঝাড়– ও মশাল মিছিলের ন্যায় কঠোর কর্মসূচী পালন করতে পারেন তারা, এমন তথ্য জানিয়েছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুই ঠিকাদার।
এদিকে নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদুল ইসলামের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি টেক্সট করে পরিচয় জানতে চান। তবে মেসেজে পরিচয় পাঠানোর পর তিনি আর ফোন ধরেননি। এর আগে সাংবাদিকদের তিনি জানান, তাঁর কার্যালয়ের সামনে কারা মানববন্ধন করেছেন, তা তিনি জানেন না এবং এ বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেবেন। (ক্রমশ:)