বিশেষ প্রতিবেদক:
প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের ‘সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা’ (১১তম গ্রেড) পদের নিয়োগ পরীক্ষা শেষ মুহূর্তে স্থগিত করা হয়েছে। গত ১০ অক্টোবর বেলা ১১টায় পরীক্ষা শুরুর ঠিক আগ মুহূর্তে স্থগিতের ওই সিদ্ধান্ত জানানো হয়। কর্তৃপক্ষের এমন সিদ্ধান্তে দুর্নীতির অভিযোগে রাজধানীর বিভিন্ন কেন্দ্রসহ সারাদেশে হাজার হাজার চাকরিপ্রার্থী চরম ক্ষোভ, হতাশা ও প্রতিবাদে ফেটে পড়েন। রাজধানীতে ওইদিন সড়ক অবরোধও হয়।
নিয়োগ পরীক্ষায় পাস করিয়ে দেওয়ার বিনিময়ে গড়ে জনপ্রতি ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ বাণিজ্যের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এই ঘুষ বাণিজ্য ও প্রশ্ন ফাঁসের দায়ে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হকের পদত্যাগের দাবি উঠেছে ওই বিক্ষোভ থেকে। কিন্তু প্রশ্নপত্র ফাঁসের নাটাই ঘুরিয়েছেন অধিদপ্তরেরই একজন কর্মকর্তা, এমনটি জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্র।
অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, ২৪২টি পদের বিপরীতে কমপক্ষে ৭০ কোটি টাকার নিয়োগ বাণিজ্য হয়েছে। এই টাকা ঢুকেছে একটি সিন্ডিকেটের পকেটে। জনপ্রতি ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়েছে। তবে দালালরা নিয়েছে ৩০-৩৫ লাখ টাকা পর্যন্ত। দালালদের এই হিসাব সামনে আনলে নিয়োগ বাণিজ্যের মোট টাকার অংক দাঁড়াবে আরও অনেক বেশি। নামেমাত্র এই নিয়োগ পরীক্ষার আয়োজনটা ছিল চাকরিপ্রার্থীদের জন্য প্রতারণা ও প্রহসন ছাড়া কিছুই নয়, বলছেন সংশ্লিষ্টরা।

ওইদিন সারাদেশ থেকে মোট ৩ লাখ ১৯ হাজার চাকরিপ্রার্থী ঢাকায় আসেন কথিত এই নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার জন্য। রাজধানীর ৯৫টি কেন্দ্রে পরীক্ষা আয়োজনের প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছিল। এদিন সকালে পরীক্ষা শুরুর আগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে যায়। ফলে মাইকে অনির্দিষ্টকালের জন্য পরীক্ষা স্থগিতের ঘোষণা দিতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। অবশ্য ওইদিনই পরে ঘোষণা দেওয়া হয়, স্থগিত হওয়া এই পরীক্ষা ১৬ অক্টোবর (শুক্রবার) বিকেল ৩টায় অনুষ্ঠিত হবে। কিন্তু নিয়োগ কমিটির কোনো পরিবর্তন করা হয়নি। প্রশ্ন ফাঁসের জন্য দায়ী আগের নিয়োগ কমিটির অধীনেই পরীক্ষাটি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ফলে এই নিয়োগ পরীক্ষাটি লাখ লাখ চাকরিপ্রার্থীদের সঙ্গে আসলেই যে প্রতারণা, এটা আবারও প্রমাণ করছে কর্তৃপক্ষ।
নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, এবার প্রশ্নপত্র ফাঁস নয়; খাতা বা রোল নম্বর পরিবর্তনসহ ভিন্ন পদ্ধতিতে পূর্ব নির্ধারিত প্রার্থীদের পাস করিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হবে। উল্লেখ্য, ১৬ অক্টোবরের নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র তৈরি ও ছাপার স্থান পরিবর্তন করা হয়েছে। পরীক্ষার আগের রাতে প্রশ্নপত্র তৈরি ও ছাপা হবে সচিবালয়ে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে। এর আগে ১০ অক্টোবরের পরীক্ষার প্রশ্নপত্র তৈরি ও ছাপা হয়েছিল মতিঝিলে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের কার্যালয়ে। তবে যেহেতু ভিন্ন পদ্ধতিতে জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে পূর্ব নির্ধারিত প্রার্থীদের পার করিয়ে আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে তাই এবার আর প্রশ্নফাঁসের প্রয়োজনও হবে না।

প্রশ্ন ফাঁসের অভিযুক্ত যুব আুন্নয়ন অধিদপ্তরের পরিচালক ৯প্রশ্সান) ডিএম আতিকুর রহমান
জানা গেছে, গত ১০ অক্টোবর রাজধানীর দিলকুশায় যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ের একটি নির্দিষ্ট কক্ষে অত্যন্ত কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে সারারাত প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও ছাপানোর কাজ চলে। কক্ষে নিয়োগ কমিটির ৫ জন সদস্য এবং ওএমআরডিএম (OMRDM) নামের ভেন্ডর প্রতিষ্ঠানের ২০ জন কর্মী উপস্থিত ছিলেন। কড়া নজরদারি, মোবাইল বাজেয়াপ্তকরণ এবং ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন রাখার পরও কীভাবে প্রশ্ন বাইরে গেল, তা নিয়ে বড় ধরনের জিজ্ঞাসা দেখা দিয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শিরা বলছেন, সেই কক্ষে মোবাইল ফোন বা অন্য কোনো ধরনের ডিভাইস নিয়ে ঢোকার অনুমতি ছিল না কারোই। কারো হাতে দেখাও যায়নি। কিন্তু অন্য কারো হাতে না থাকলেও যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন), নিয়োগ কমিটির সভাপতি ডিএম আতিকুর রহমানের হাতে সর্বক্ষণই মোবাইল ফোন ছিল। তিনি বেশ কয়েকবার প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও ছাপানোর কক্ষে প্রবেশ করেছেন এবং সেখান থেকে নিজের কক্ষেও গেছেন। তাই অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিশ্চিত যে, নিয়োগ কমিটির সভাপতি ডি এম আতিকুর রহমানই প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। অথচ তাকেই আবার এই নিয়োগ কমিটির প্রধান রাখা হয়েছে। অন্য কোনো সদস্যকেও পরিবর্তন করা হয়নি। অর্থাৎ প্রশ্নফাঁসের দায়ে অভিযুক্ত নিয়োগ কমিটি পুরোপুরি অক্ষতই রয়ে গেছে।
প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হকের বিরুদ্ধে নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ তুলে ইতিমধ্যেই তার পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ হয়েছে। প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক, নিয়োগ কমিটির সভাপতি ডি এম আতিকুর রহমান ছাড়াও জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের চেয়ারম্যানের পিএস মো. কবির খাঁনও এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রশাসন ক্যাডারের ২১ ব্যাচের কর্মকর্তা ডিএম আতিকুর রহমান একসময় স্থল বন্দর কর্তৃপক্ষে পরিচালক পদে কাজ করেছেন। কবির খাঁনেরও মূল চাকরি স্থল বন্দর কর্তৃপক্ষে। কবির খানকে প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক প্রেষণে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের চেয়ারম্যানের পিএস পদে এনেছেন। যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের এই নিয়োগকে কেন্দ্র করে বড় ধরনের নিয়োগ বাণিজ্যের পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নামে বিশেষ মহল আগে থেকেই। ডি এম আতিকুর রহমানকে অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) পদে পদায়নের ব্যবস্থা করা হয়। কবির খাঁন এবং আতিকুর রহমান যেহেতু স্থল বন্দর কর্তৃপক্ষে দীর্ঘদিন একসঙ্গে কাজ করেছেন তাই উভয়ের মধ্যে আগে থেকেই ভালো বোঝাপড়া ও জানাশুনা আছে।
সূত্রমতে, কবির খাঁনই এই নিয়োগ বাণিজ্যের যোগ্য লোক হিসেবে আতিকুর রহমানকে পছন্দ করেন। আতিকুর রহমানের গ্রামের বাড়ি বগুড়ার শিবগঞ্জে। পরিচালক (প্রশাসন) ডি এম আতিকুর রহমান, পিএস কবির খাঁন, প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক ছাড়াও এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িত রয়েছেন যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর কেন্দ্রীক একজন আওয়ামী ফ্যাসিস্ট ব্যবসায়ী এবং সরকারের অন্য একজন প্রভাবশালী প্রতিমন্ত্রী। আর এ কারণেই নিয়োগ বাণিজ্য বাবদ সংগ্রহ করা ৭০ কোটি টাকা জায়েজ করার জন্য অত্যন্ত বেপরোয়া হয়ে উঠেছে সংশ্লিষ্টরা। তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই নতুন করে পরীক্ষার আয়োজন করা হচ্ছে, নিয়োগ কমিটির কোনো পরিবর্তন করা হয়নি। এমনকি প্রশ্নফাঁসের বিষয়ে পাঁচ সদস্যের যে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে এই কমিটির কর্মকান্ড নিয়েও ইতোমধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। যেসব ঘটনা এবং যারা প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে জড়িত, তদন্ত কমিটি সেদিকে না গিয়ে অন্য নিরপরাধ ব্যক্তিদের ওপর দায় চাপানোর কৌশল নিতে যাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
উল্লেখ্য, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. মাহফুজুল আলম খানকে প্রধান করে গঠিত এই কমিটিকে ৩ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত কমিটি প্রতিবেদন দাখিল করেনি। (ক্রমশঃ)