ঢাকা | বঙ্গাব্দ

অব্যবহৃত জলাশয় তরুণদের মধ্যে বণ্টন করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে: প্রধানমন্ত্রী

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Aug 16, 2026 ইং
অব্যবহৃত জলাশয় তরুণদের মধ্যে বণ্টন করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে: প্রধানমন্ত্রী ছবির ক্যাপশন: ছবি: সংগ্রহীত
ad728
নিজস্ব প্রতিবেদক:

দেশের অব্যবহৃত পুকুর, হাওর, বিল ও অন্যান্য জলাশয় সংস্কার করে মাছের পোনা অবমুক্ত করার পাশাপাশি সেগুলো স্থানীয় তরুণদের মধ্যে বণ্টনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তাঁর মতে, এতে তরুণদের কর্মসংস্থান তৈরি হওয়ার পাশাপাশি মাছের উৎপাদনও বাড়বে।

রোববার (১৬ আগস্ট) দুপুর ২টার দিকে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীর আচমিতা জর্জ ইন্সটিটিউশন মাঠে জাতীয় মৎস্য পক্ষ-২০২৬-এর উদ্বোধন ও জাতীয় মৎস্য পদক বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, নদীমাতৃক বাংলাদেশে পুকুর, বিল, হাওর-বাঁওড়সহ অসংখ্য জলাশয় রয়েছে। অল্প জমি ব্যবহার করে এসব জলাশয়ে মাছ চাষের মাধ্যমে মানুষের স্বাবলম্বী হওয়ার বড় সুযোগ আছে। তাই দেশের যেসব পুকুর, হাওর, বিল ও অন্যান্য জলাশয় অব্যবহৃত পড়ে আছে, সেগুলো সংস্কার করে সেখানে মাছের পোনা অবমুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, যে এলাকার জলাশয় সংস্কার করা হবে, সেগুলো ওই এলাকার তরুণদের মধ্যে সুন্দরভাবে বণ্টন করা হবে। এর মাধ্যমে তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে এবং মাছের উৎপাদনও বাড়বে। এ বিষয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকুকে ইতোমধ্যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

নতুন উদ্যোক্তা তৈরির প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তুলতে সরকার ৫০০ কোটি টাকার স্টার্টআপ ফান্ড গঠন করেছে। সম্ভাবনাময় নতুন উদ্যোক্তাদের এই তহবিল থেকে ৫ লাখ থেকে ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত অনুদান দেওয়া হবে। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, এই অর্থ ঋণ নয়, গ্রান্ট।

মৎস্য খাতের সম্ভাবনা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, চিংড়িসহ বিভিন্ন মাছ ও মৎস্যজাত পণ্য বিদেশে রপ্তানি করে বাংলাদেশ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিশ্বের প্রায় ৫২টি দেশে মাছ ও মৎস্যজাত পণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশ ৬ হাজার কোটি টাকার বেশি সমমূল্যের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করেছে।

তিনি জানান, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) গত জুনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জলজ প্রাণী উৎপাদনে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান পঞ্চম এবং অভ্যন্তরীণ জলাশয় থেকে মাছ আহরণে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, খুলনায় ৩০০টি ক্লাস্টার গঠনের মাধ্যমে চিংড়ির উৎপাদন দ্বিগুণ করা হয়েছে। পাশাপাশি কক্সবাজারের চকরিয়ায় ৭ হাজার একর জমিতে ‘শ্রিম্প সিটি মাস্টার প্ল্যান’ প্রণয়ন করা হয়েছে। দেশের মোট মৎস্য উৎপাদনে জিআই পণ্য ইলিশের অবদান প্রায় ১০ শতাংশ, যা জিডিপির ১ শতাংশেরও বেশি।

ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধির পেছনে ২০০৩-০৪ সালে বিএনপি সরকারের সময় নেওয়া ‘ইলসা ফিশারিজ ম্যানেজমেন্ট অ্যাকশন প্ল্যান’ ভূমিকা রেখেছে বলেও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।

মৎস্য খাতের সঙ্গে দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষের সম্পৃক্ততার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রায় ২ কোটি মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই খাতের ওপর নির্ভরশীল। মৎস্যচাষিদের কৃষক কার্ডের আওতায় আনা হচ্ছে। জেলেদের পরিচয়পত্র প্রদান ও নিবন্ধন কার্যক্রম চলছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রথমবারের মতো সুন্দরবন ও হাওর অঞ্চলে মাছ ধরা নিষিদ্ধকালীন জেলেদের ভিজিএফের আওতায় আনা হয়েছে।

নতুন বাজার তৈরির প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী জানান, গত জুনে প্রথমবারের মতো নাইজেরিয়ায় হ্যাচিং ডিম রপ্তানি করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, মৎস্য চাষ মানুষের পুষ্টির চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। মাছ চাষ, আহরণ, পরিবহন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিক্রিকে ঘিরে বিপুল মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। একই সঙ্গে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আয় বাড়াতেও মৎস্য খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

জলাশয় দূষণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানুষের ব্যবহৃত আবর্জনা, টিস্যু পেপার ও প্লাস্টিকের বোতলের কারণে জলাশয়ের পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। মাছকে বাঁচাতে হলে পরিবেশ রক্ষায় সবাইকে সচেতন হতে হবে। সুস্থ পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে আগামী প্রজন্ম ও প্রাণিসম্পদ রক্ষা করা সম্ভব হবে।

এদিকে একই সফরে পাকুন্দিয়া উপজেলার মির্জাপুর চেয়ারম্যান বাড়িঘাট এলাকায় পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদে মাছের পোনা অবমুক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে স্থানীয় মানুষের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়কালে নারীদের শিক্ষার বিষয়ে তিনি বলেন, সরকার নারীদের অনার্স পর্যন্ত শিক্ষা ফ্রি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং শিক্ষার সব খরচ সরকার বহন করবে।

তারেক রহমান বলেন, দেশের জনসংখ্যার অর্ধেক নারী। নারী সমাজকে পিছিয়ে রেখে দেশের অগ্রগতি সম্ভব নয়। ভালো ফলাফল করা মেয়েদের জন্য সরকারি উপবৃত্তির ব্যবস্থার কথাও জানান তিনি।

গ্রামগঞ্জের গরিব পরিবারের শিশুদের জন্য প্রতিবছর নতুন বইয়ের পাশাপাশি স্কুল ড্রেস ও স্কুল ব্যাগ দেওয়ার পরিকল্পনার কথাও বলেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ শিশুর হাতে স্কুল ব্যাগ পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

নারীদের স্বাবলম্বী করার প্রসঙ্গে তিনি ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির কথা তুলে ধরেন। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের চার কোটি পরিবারের মধ্যে যে নারী পরিবারের প্রধান ও সংসার পরিচালনা করেন, পর্যায়ক্রমে তাঁর হাতে ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দেওয়া হবে। আগামী পাঁচ বছরে দেশের প্রতিটি ঘরে এই কার্ড পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।

মাছের পোনা অবমুক্ত করার প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এসব মাছ বড় হয়ে ডিম পাড়বে এবং বিভিন্ন খাল-বিলে ছড়িয়ে পড়বে। এর সুফল বাংলাদেশের মানুষই পাবে।

পাকুন্দিয়ায় এক জনসমাবেশে বক্তব্য দেওয়ার সময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানুষের জীবনমান উন্নয়নে জনকল্যাণমুখী কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে সরকার বাংলাদেশকে একটি কল্যাণমূলক রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। ফ্যামিলি কার্ডসহ বিভিন্ন কর্মসূচির বাস্তবায়ন ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে বলেও জানান তিনি।

তিনি জনগণের উদ্দেশে বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে যে দলের ওপর মানুষ আস্থা রেখেছে, সেই আস্থা ধরে রাখতে হবে। বিএনপি জনগণের পাশে ছিল এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। দেশের ও জনগণের স্বার্থের বাইরে কোনো কাজ করবে না বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে আগের সরকারের অপরিকল্পিত বিভিন্ন পদক্ষেপের সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এসব পদক্ষেপ বর্তমান সংকট তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে। আগামী ২৭ আগস্ট জাতীয় সংসদের পরবর্তী অধিবেশন শুরু হবে। সেখানে আগামী ১০ বছরে দেশের বিদ্যুৎ সমস্যা সমাধানের পরিকল্পনা তুলে ধরা হবে বলে জানান তিনি।

রাজপথে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করা হচ্ছে দাবি করে প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান। তাঁর মতে, বিশৃঙ্খলার কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ মানুষ। এতে ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি ও জীবনযাত্রায় প্রভাব পড়ে।

এদিকে জাতীয় মৎস্য পক্ষ-২০২৬-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মৎস্য খাতে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ১৩টি ক্যাটাগরিতে নির্বাচিত ১৪ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে জাতীয় মৎস্য পদক (স্বর্ণপদক) দেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাদের হাতে পদক তুলে দেন।

অনুষ্ঠানে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতি ও বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, কিশোরগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. মাজহারুল ইসলাম, কিশোরগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মো. জালাল উদ্দিন, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ সচিব দেলোয়ার হোসেন এবং মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. খালেদ কনকসহ মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তা, স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তা, মৎস্যচাষি, জেলে, উদ্যোক্তা ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠানের আগে প্রধানমন্ত্রী কটিয়াদীর আচমিতা এলাকার কার্প হ্যাচারি কমপ্লেক্স পরিদর্শন করেন। পরে জাতীয় মৎস্য পক্ষের কর্মসূচির অংশ হিসেবে শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানে বৃক্ষরোপণ এবং কিশোরগঞ্জ স্টেডিয়ামে ফ্যামিলি কার্ড ও বিভিন্ন সহায়তা কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে তাঁর। দিনব্যাপী কিশোরগঞ্জ সফর শেষে সন্ধ্যায় সড়কপথে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর।

জাতীয় মৎস্য পক্ষ-২০২৬-এর এবারের প্রতিপাদ্য, ‘রুপালী মৎস্য স্বনির্ভর দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’। ১৬ থেকে ৩০ আগস্ট দেশজুড়ে এ পক্ষ পালিত হচ্ছে।




শেয়ার করুন:
কমেন্ট বক্স
সরকার সংবাদপত্রের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী: প্রধানমন্ত্রী

সরকার সংবাদপত্রের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী: প্রধানমন্ত্রী