ঢাকা | বঙ্গাব্দ

গণপূর্ত’র শীর্ষ পদে নিয়মিত হওয়ার চেষ্টায় বালিশ কেলেঙ্কারীর মূলহোতা!

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Aug 16, 2026 ইং
গণপূর্ত’র শীর্ষ পদে নিয়মিত হওয়ার চেষ্টায় বালিশ কেলেঙ্কারীর মূলহোতা! ছবির ক্যাপশন: খালেকুজ্জামান চৌধুরীর বিরুদ্ধে ইতোপূর্বে পোস্টিং বাণিজ্য, ভাই-ভাগিনাদের দিয়ে ঠিকাদারী ব্যবসা, ডেভেলপার ব্যবসা, সন্ধ্যার পরে ও ছুটির দিনগুলোতে একটি গোপণ আস্তানায় অফিস করা, আওয়ামী কানেকশন, স্টাফ অফিসার কেলেঙ্কারীসহ বিভিন্ন অনিয়ম ও লাগাতার দুর্নীতির অভিযোগ
ad728
জয়নাল আবেদীন যশোরী ও আসাদ মাহমুদ:
 রুপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রর গ্রীণসিটির নির্মাণ কাজে বালিশ কেলেঙ্কারী নিয়ে দেশব্যাপী তোলপাড় হয় ২০১৯ সালে। সাড়া জাগানো বালিশ কান্ডের সময়ে রাজশাগী গণপূর্ত জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ছিলেন খালেকুজ্জামান চৌধরী। এর আগে প্রকল্পের শুরুতে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে এই কর্মকর্তার হাত দিয়েই গ্রীণসিটির টেন্ডার প্রত্রিয়া শুরু হয়। বালিশ কান্ডের পরিকল্পনা সে সময়েই রচিত হয়। বালিশকান্ডে উপসহকারী প্রকৌশলীরা ফেঁসে গেলেও মুলহোতা খালেকুজ্জামান চৌধুরী রয়ে গেছেন ধরাছোয়ার বাইরে। বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক জার্সি ত্যাগ করে সময়-সুযোগে ঝোপ বুঁঝে কোপ মেরে তিনিই এখন অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী। আর এই পদে বর্তমানে নিয়মিসত হওয়ার জন্য জোড় প্রচষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।   
বালিশ কান্ড নিয়ে প্রধান মন্ত্রীর বক্তব্য: রুপপুরের বালিশ কান্ড নিয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গত ১২ মে সোমবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময়ের সময় ১৭ বছরের স্বৈরাচারী আমলের দুর্নীতি ও বিদেশে অর্থ পাচার নিয়ে কথা বলার সময় তিনি বলেন, একটি প্রকল্পের বালিশ কেনা হয়েছে ৮০ হাজার টাকা করে। ৮০ হাজার টাকায় একটি বালিশ, সেই বালিশে ঘুম হবে কী-না এটা একটা চিন্তার বিষয়। এর আগে গত  মে সিএজি’র উত্থাপিত অডিট রিপোর্টের প্রতিবেদনে প্রতিটি বালিশের অবিশ্বাস্য দাম দেখে প্রধানমন্ত্রী সিএজিকে বলেন, এই দামি বালিশগুলোর একটি জাদুঘরে রাখা উচিত।
খালেদা জিয়ার বাড়ি ভাঙ্গার ঠিকাদারকে প্রতিষ্ঠিত করে নিজে প্রতিষ্ঠিত খালেকুজ্জামান: ঢাকা সেনানীবাসে খালেদা জিয়ার বাড়ি ভাঙ্গার ঠিকাদার মজিদ সন্স কনস্ট্রাকশনকে রূপপুরে বড় বড় কাজ পাইয়ে দেওয়া কর্মকর্তা বর্তমানে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী। অবাক করার মতো বিষয় হলেও বর্তমানে এটাই বাস্তব ও চিরসত্য। বিএনপি’র ঊদ্ধর্তন পর্যায়ের বেশীরভাগ নেতৃবৃন্দ বিষয়টিকে মনেপ্রাণে না মানতে পারলেও কোন এক বিশেষ আশীর্বাদে অদৃশ্য রাহুর প্রভাবে খালেকুজ্জামান চৌধুরী গণপূর্ত অধিদপ্তরের শীর্ষ পদে বহালতবিয়তে আছেন। 
খালেকুজ্জামান চৌধুরী ২০১৪’র শেষদিক থেকে শুরু করে ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ছিলেন পাবনা গণপূর্ত ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী। সে সময়ে পাবনার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের গ্রীণসিটি প্রকল্পের বহুতল বিশিষ্ট ভবনগুলোর নির্মাণের টেন্ডার হয়। প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান ওই দপ্তরে থাকতেই বহুতল বিশিষ্ট ভবন নির্মাণ কাজগুলোর কার্যাদেশ দেওয়া হয়। আপোষহীন নেত্রী সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বাড়ি ভাঙ্গার পুরুষ্কার হিসাবে মজিদ সন্স কনস্ট্রাকশন লিঃ নামক প্রতিষ্ঠানটির নেতৃত্বে সাজিন ও তমা কনস্ট্রাকশনকে নিয়ে একটি লুটেরা সিন্ডিকেট তৈরী করে নামে-বেনামে প্রায় সবগুলো কাজ পাইয়ে দেওয়া হয় রূপপুর গ্রীণ সিটিতে। এর নেপথ্য কারিগর ছিলেন তখনকার নির্বাহী প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরী। বিনিময়ে হাতিয়ে নিয়েছেন শতাধিক কোটি টাকা। ২০১৯ সালে রূপপুরে বালিশ কেলেঙ্কারীর ঘটনা প্রকাশের সময়েও তিনিই রাজশাহী গণপূর্ত জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্বে থেকে শুধুমাত্র নিজের ব্যাচমেট ও প্রতিদ্বন্দ্বী প্রকৌশলী জিল্লুর রহমান ছাড়া নীরিহ উপসহকারী প্রকৌশলীদের বলির পাঠা বানিয়ে তিনি নিজেসহ ঊর্দ্ধতন প্রকৌশলীদের বাঁচিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করেছেন। কালের বিবর্তনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন নির্বাচিত সরকারের সময়ে তিনিই এখন গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী পদে থাকায় বিএনপি’র বেশীরভাগ ঊর্দ্ধতন নেতারা বিষ্ময় ও উষ্মা প্রকাশ করেছেনূ। পদে বসে ফ্যাসিবাদের রক্ষকবচ হিসাবে কাজ করা, স্বৈরাচারের তোষণ, নারী কেলেঙ্কারী ও বদকর্মে চ্যাম্পিয়ন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী বদরুলকে অবৈধ কালেকশনের ক্যাশিয়ারের দায়িত্ব দেওয়া, নিয়োগ টেন্ডার পোষ্টিং পদোন্নতি বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণে ওই প্রকৌশলীসহ পাঁচ/ছয়জনকে নিয়ে ঘুষ বাণিজ্যের সিন্ডিকেট গঠন, পিএইচডি ডিগ্রী জালিয়াতি লিয়েনের শর্ত ভঙ্গ অস্ট্রেলিয়ার নাগরিকত্ব গ্রহণ ঘুষের মাধ্যমে অর্জিত অর্থ অস্ট্রেলিযায় পাঁচার, বেইলীরোডে ভয়াবহ অগ্নি দুর্ঘটনায় বহুলোকের প্রাণ কেড়ে নেওয়া গ্রীণ কোজি কটেজ রেষ্টুরেন্টের নকশা অনুমোদনসহ বহুগুণে গুণান্বিত প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরী। তবুও স্বৈরাচারের একনিষ্ঠ দোসর এই রকম একজন ফ্যাসিস্ট গুণধর কর্মকর্তা গণপূর্ত প্রধান প্রকৌশলীর সেবায় ধন্য হতে চলেছে বিএনপি ও এর অঙ্গ সংগঠনের একশ্রেণীর লোকেরা। জাতীয়তাবাদী সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার ও উন্নয়নের এজেন্ডা বাস্তবায়ন হতে চলেছে বিতর্কিত ও ফ্যাসিস্ট গুণধর এই প্রকৌশলীর হাত দিয়ে। তথ্য সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্রের। 
যেভাবে গণপূর্তর শীর্ষ পদে খালেকুজ্জামান:  ২০২৫ এর ২৮ অক্টোবর সকালে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব তাসনিম ফারহানা স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপণে মোহাম্মদ শামীম আখতারকে তখনকার প্রধান প্রকৌশলীর চলতি দায়িত্ব থেকে সরিয়ে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (রিজার্ভ) পদে পদায়ন করা হয়। একই প্রজ্ঞাপনে মো. খালেকুজ্জামন চৌধুরীকে প্রধান প্রকৌশলীর রুটিন দায়িত্ব দেয়া হয়। অখচ ওই সময়ে গ্রেডেশন তালিকা অনুযায়ী খালেকুজ্জামান চৌধুরীর চেয়ে সিনিয়র ছিলেন মো. আশরাফুল আলম, ড. মো. মঈনুল ইসলাম, মো. শামছুদ্দোহা ও মো. আবুল খায়ের। একদিন পরে আরেকটি প্রজ্ঞাপণে তাকে চলতি দায়িত্বে প্রধান প্রকৌশলী পদে দায়িত্ব দেওয়া হয়। পূর্ত প্রকৌশলীদের মধ্যে জোড়ালো গুঞ্জন রয়েছে ওই দায়িত্ব প্রদানে শত কোটি টাকার গোপণ লেনদেন হয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী বদরুল আলমের মাধ্যমে সদ্য সাবেক জামায়াতপন্থী সচিবের ভাই আমিনুর রহমানের হাত দিয়ে এই টাকা লেনদেন হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের পূর্বে প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান ও বদরুল ধরে নিয়েছিলেন জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় আসছে। সে অনুযায়ী জামায়াতের নায়েবে আমীর ও কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম থেকে নির্বাচনে অংশ নেওয়া (পরাজিত প্রার্থী) তাহেরকে গত ১০ ফেব্রুয়ারী প্রধান প্রকৌশলীর পক্ষ থেকে প্রকৌশলী বদরুল আলম ১ কোটি টাকা নির্বাচনী খরচ পাঠিয়ে দেন। ওইদিন সন্ধ্যার পরে পূর্ত ভবনের জোন বিল্ডিং থেকে সাভার সার্কেলের লাল গাড়িতে করে ওই টাকা নির্দিষ্ট গন্তব্যে পাঠিয়ে দেওয়া হয় বলে নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়। 
প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান ছাত্র জীবনে কুয়েট থেকে লেখাপড়া করছেন এবং কুয়েট ছাত্রলীগের নেতা ছিলেন। প্রধান প্রকৌশলী হওয়ার পর তিনি এখন গণপূর্তের কুয়েট, চুয়েট ও রুয়েট নিয়ে ঐক্যবদ্ধ হয়ে বিভেদ সৃষ্টি করে গণপূর্ত অধিদপ্তরে একটি নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি তৈরী করেছেন। ৩/৪টি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন গণপূর্ত প্রকৌশলীরা। এ কারণে ভেঙ্গে পড়েছে চেইন অব কমান্ড। ফুঁসে উঠছে শোষিত বঞ্চিত প্রকৌশলীরা। 
আরো  জানা যায়, ফ্যাসিবাদের অন্যতম দোসর সাবেক পূর্ত সচিব শহীদুল্লাহ খন্দকারের আশীর্বাদপ্রাপ্ত গণপূর্ত অধিদপ্তরের ১৫তম ব্যাচের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরী ২০১৪ সালে পিএইচডি ডিগ্রি জলিয়াতে ধরা পড়ে শাস্তির বদলে পেয়েছেন পাবনা জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী হিসাবে প্রাইজ পোস্টিং। সেখানে গ্রীণসিটি প্রকল্পের টেন্ডারে মজিদ সন্স ও সাজিন কনস্ট্রাকশনকে ব্যাপক সুবিধা পাইয়ে দিয়ে শতাধিক কোটি টাকা লেনদেনের অভিযোগে ২০১৬ সালে ওই সময়ের প্রধান প্রকৌশলী টিপু মুন্সী তাকে চুয়াডাঙ্গায় বদলী করেন। এর পরে নতুন করে কথিত লিয়েন কাটিয়ে পিএইচডি ডিগ্রী জালিয়াতি করে ধরা খেয়েও সচিব শহীদুল্লাহ খন্দকারের মাধ্যমে দন্ড মওকুফ করিয়ে নিয়ে ২০১৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও সল্প ব্যবধানে পুনরায় পদোন্নতি বাগিয়ে নিয়ে রাজশাহীতে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্বে থেকে বালিশ কান্ডে উপসহকারী প্রকৌশলীদের ফাঁসিয়ে দিয়ে নিজেসহ উর্দ্ধতনদের রক্ষা করার ব্যবস্থা করেন তিনি। পরবর্তীতে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী হিসাবে খুলনার দায়িত্বে থেকে শেখ হেলালের পদ লেহন করে আওয়ামী এজেন্ডার সুপরিকল্পিত ও সুষ্ঠু বাস্তবায়ন করায় শেখ হাসিনার নির্দেশে তাকে গোপালগঞ্জে নিয়ে আসা হয় ২০২৪ সালে। গত বছরের ২৪ জুন গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের এক আদেশে তাকে ‘ঢাকা মেট্রোপলিটন জোনের’ অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব দিয়ে আবারও প্রাইজ পোস্টিং বাগিয়ে নেন জামায়াতের ঊর্দ্ধতন নেতাদের তদবীরে। গণপূর্ত মেট্টোপলিটন জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী হওয়ার পর তাকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। তখন থেকেই ঠিকাদার ও ঢাকা শহরে একাধিক ওয়ার্কিং ডিভিশনে নির্বাহী প্রকৌশলীর মাধ্যমে শত কোটি টাকা কালেকশন করে জামায়াতকে ম্যানেজ করে তখনকার প্রধান প্রকৌশলী শামীম আখতারের আরো ২মাস চাকরি থাকা সত্ত্বেও ল্যাং মেরে ফেলে দিয়ে প্রধান প্রকৌশলীর চেয়ার দখল করেন। গণপূর্ত সংশ্লিষ্ট একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
আরো জানা যায়, চাকরি জীবনে খালেকুজ্জামান চৌধুরীর বড় সময় কেটেছে অস্ট্রেলিয়ায়। স্ত্রী-সন্তান অস্ট্রেলিয়ায় থাকায় সেখানে তিনি বহুবার যাতায়াত করেন। শিক্ষা ছুটি নিয়ে অস্ট্রেলিয়া যান, পিএইচডি এর নাম করে দফায় দফায় ছুটি বাড়িয়েছেন তিনি। অনুমোদনবিহীন ছুটি নিয়ে অস্ট্রেলিয়াতে চাকুরিও করেছেন। ফিরে এলে তার বিরুদ্ধে ডিজারশনের মামলা হবার কথা। 
অপরদিকে, রাজধানীর বেইলি রোডে ২০২৪ সালের শুরুতে ভয়াবহ আগুনে পুড়ে কঙ্কালসার হয়ে যায় গ্রিন কোজি কটেজ। সাততলার এই বাণিজ্যিক ভবনে ওই বছর প্রাণ হারিয়েছিল ৪৬ জন; দগ্ধ ও আহত হয় আরও ১৩ জন। ঘটনার রেশ কাটার আগেই রাজধানীজুড়ে হোটেল রেস্তোরাঁগুলোয় সাঁড়াশি অভিযান চালায় পুলিশ, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ও সিটি করপোরেশন। গ্রেপ্তার করা হয় আট শতাধিক মানুষকে। জনমনে প্রশ্ন ওঠে, গ্রিন কোজি কটেজে থাকা রেস্তোরাঁগুলোতে প্রতিদিন যেখানে অসংখ্য মানুষ ভিড় করত, সেই ভবনের নকশার এমন করুণ দশা কেন? ভবনটিতে কোনো জরুরি বহির্গমন ব্যবস্থা ছিল না কেন? ভবনে চলাচলের সিঁড়িটাই-বা এত সরু কেন? জরুরি নির্গমন পথ থাকলে বা সিঁড়িটা প্রশস্ত হলে তো এত প্রাণহানি হতো না। পত্রপত্রিকা মারফত খবর আসে, গ্রিন কোজি কটেজের নকশার অনুমোদন দিয়েছিলেন তৎকালীন রাজউক অথোরাইজড অফিসার প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরী। ২০১১ সালে রাজউকের অথরাইজড অফিসার হিসেবে দায়িত্বে থাকা অবস্থায় তিনি ভবনটির অনুমোদন দেন। সে সময় খালেকুজ্জামান চৌধুরীকে নিয়ে ব্যাপক শোরগোল চললেও গোপালগঞ্জ সিন্ডিকেটের ম্যাজিকে একপর্যায়ে তা থেমে যায়।
রাজউক সূত্রে জানা যায়, গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী থাকাকালে ২০১১ সালে খালেকুজ্জামান অথরাইজড অফিসার প্রেষণে রাজউকে আসেন। সে সময় বেইলি রোডে গ্রিন কোজি কটেজ ভবনের নকশার অনুমোদন দেন তিনি। জরুরি বহির্গমন ব্যবস্থা না থাকা, সরু একটিমাত্র সিঁড়িসহ নানা অনিয়মে পূর্ণ ছিল নকশাটি। গোপালগঞ্জপন্থী ও গণভবনের আশীর্বাদপুষ্ট এই কর্মকর্তা চাকুরি বিধিমালাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে পরিস্থিতি অনুমানে ঝোঁপ বুঝে কোপ মেরে বার বার শাস্তির বদলে পেয়েছেন পুরস্কার। অথচ এখন তিনি সবচেয়ে বড় ছাত্রদল (সাবেক) নেতা সেজেছেন। সুযোগ বুঝে ভোল পাল্টানো এই কর্মকর্তা ইতোমধ্যে ঠিকাদার অফিসারদের নিয়ে একটি লগ্নিকারী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। এই সিন্ডিকেটটির সাথে তার গোপণ সমঝোতা হয়েছিলো প্রধান প্রকৌশলী হওয়ার পরে বদলী টেন্ডার বাণিজ্যের সিন্ডিকেট তাদের হাতেই থাকবে। গত নভেম্বর থেকে ওই সিন্ডিকেটই অধিদপ্তরের যাবতীয় পোষ্টিং পদোন্নতি টেন্ডারসহ গণপূর্তের সকল কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করছে। প্রধান প্রকৌশলীর পদে বসেই এক সপ্তাহে অর্ধশতাধিক বদলী অর্ডার করেন মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে। গোপণীয় ঘুষ বাণিজ্যের অংশ হিসাবে মার্চ মাসে একই দিনে ৫৭ প্রকৌশলীকে বদলী করা হয়। পরবর্তীতে মন্ত্রীর হস্তক্ষেপে গত ১০ মার্চ ভিন্ন ভিন্ন প্রজ্ঞাপনে তা বাতিল করতে বাধ্য হন প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান। এতো নাটকীয়তা সত্ত্বেও চিহ্নিত অভিযুক্ত মার্কামারা দুর্নীতিবাজ কয়েকজন নির্বাহী প্রকৌশলীকে ইতোপূর্বে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলায় পোষ্টিং দিয়ে ফ্যাসিবাদকে উসকে দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে কয়েকজন মহিলা প্রকৌশলীকে সাথে নিয়ে বিদেশ ট্যুরের নামে প্রমোদ ভ্রমন করে এসেছেন বলে নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়। এ নিয়ে রসালো গুঞ্জন রয়েছে গোটা গণপূর্ত অধিদপ্তর জুড়ে। এ বিষয়ে আমাদের তথ্যানুসন্ধান অব্যাহত আছে। 
প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান ও স্টাফ অফিসার ফারিবা হালিম অরিন

স্টাফ অফিসার কেলেঙ্কারী: গণপূর্ত’র ইতিহাসে অতীতে কোন প্রধান প্রকৌশলী নারী স্টাফ অফিসার রাখেননি। বর্তমানে চলতি দায়িত্বে নিয়োজিত প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরী চেয়ারে বসার একদিন পরেই একজন মহিলা এসডিইকে (উপবিভাগীয় প্রকৌশলী ফারিবা হালিম অরিণ) স্টাফ অফিসার হিসাবে নিয়ে আসেন। অথচ এই পদটি নির্বাহী প্রকৌশলী পদমর্যাদার। ওই নারী এসডিইকে দুই মাস পরে নির্বাহী প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি দেয়া হয়। প্রধান প্রকৌশলী বেশীরভাগ দাপ্তরিক কাজ এই নারী স্টাফ অফিসারের মাধ্যমেই হয়ে থাকে। আলোচিত স্টাফ অফিসার ও বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী দু’জনেই লিয়েনে অস্ট্রেলিয়ায় ছিলেন। সেখানেই তাদের জানাশোনা। ভালো বোঝাপড়ার কারণে তাকেই স্টাফ অফিসার হিসাবে নিয়ে এসেছেন প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান। তবে বিষয়টি নিয়ে রসালো আলোচনা সমালোচনা চলছে গণপূর্ত প্রকৌশলীদের মধ্যে। 
 
বদলী পদোন্নতি ও টেন্ডার নিয়ে ৫/৬ জনের সিন্ডিকেট: ডিপার্টমেন্টের বদলী পদোন্নতি টেন্ডারসহ সামগ্রীক বিষয় নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রধান প্রকৌশলীর নেতৃত্বে রয়েছে পাঁচজনের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান ছাড়া অন্য চারজন হচ্ছেন-তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (ঢাকা গণপূর্ত সার্কেল-১) বদরুল আলম খান (তিনি বদকর্ম ও নারী কেলেংকারীতে চ্যাম্পিয়ন হিসেবে পরিচিত), সংস্থাপণ শাখার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সারোয়ার জাহান, সার্কেল-২ এর স্মার্ট দুর্নীতিবাজ হিসেবে পরিচিত তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবু নাসের চৌধুরী, প্রধান প্রকৌশলীার ওই নারী স্টাফ অফিসার ও ই/এম এর একজন নির্বাহী প্রকৌশলী পদের নারী কর্মকর্তা। 
 খালেকুজ্জামানের ভাই ও ভাগিনা 
প্রধান প্রকৌশলীর আত্মীয়-স্বজনদের দিয়ে ঠিকাদারী: খালেকুজ্জামান প্রধান প্রকৌশলী হওয়ার পরে গোটা গণপূর্ত দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন ভাগিনা জগলু। সে এখন গণপূূর্ত প্রকৌশলীদের গণ ভাগ্নে। ভাই পরিচয়ে জনৈক ডলার কাজ নিয়েছেন এবং নিচ্ছেন গণপূর্ত’র প্রতিটি ডিভিশনের। প্রধান প্রকৌশলীর চাচাতো মামাতো ভাই ভাতিজাও আছেন এ্ই তালিকায়। সাথে আরো আছেন সদ্য সাবেক গৃহায়ন গণপূর্ত সচিব নজরুল ইসলামের আপন ছোট ভাই আমিনুল ইসলাম। এই আমিনুল ইসলামই সচিবের সাথে যাবতীয় অনৈতিক লেনদেনের বাহক হিসাবে এতাদিন কাজ করেছে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে। 
ডেভেলপার ব্যবাসা: প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান আগে থেকেই নিজের ভাই ও ভাগিনা নিয়ে ডেভেলপার ব্যবসায় জড়িত। রাজধানীর ফার্মগেইট এলাকার রয়েছে ওই ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের অফিস। প্রতিষ্ঠানটি ঢাকার অভিযাত এলাকা গুলশান ও বনানীতে অসংখ্য ভবন বানিয়ে ফ্ল্যাট ব্্যবসা করছে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়। বিষয়টি আমাদের অনুসন্ধানী টিমের পর্যাবেক্ষণে রয়েছে।  
জালিয়াতিতে শস্তিপ্রাপ্ত খালেকুজ্জামান: 
ভুয়া পিএইচডি সনদ দেখিয়ে উচ্চতর শিক্ষা ছুটিতে প্রেষণ ভোগের ঘটনায় বিভাগীয় মামলা হয় গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরীর বিরুদ্ধে। বিভাগীয় তদন্তে জালিয়াতি ও অসদাচরণের বিষয়টি প্রমাণিত হলে তিনি দোষ স্বীকার করেন। তবে বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডীর সদস্য সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর সঙ্গে ‘ফুপু-ভাতিজা’ সম্পর্কের সুবাদে তাকে দেওয়া হয় লঘুদন্ড। মাত্র এক বছরের জন্য বন্ধ রাখা হয় বেতন বৃদ্ধি।
এই শাস্তির তিন বছরের মধ্যেই ফুপুর প্রভাবে তিনি হন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী। মাত্র পাঁচ মাসের মধ্যে পদোন্নতি পান অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী পদে। এরপর দায়িত্ব পালন করেন গোপালগঞ্জ গণপূর্ত জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে।
জুলাই অভ্যুত্থানের পর তিনি খোঁজেন নতুন রাজনৈতিক পরিচয়। জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের স্ত্রী ডা. হাবিবা আক্তার চৌধুরীকে (সুইটি) ‘ফুপু’ হিসেবে পরিচয় দেন। জামায়াতপন্থি তৎকালীন গণপূর্ত সচিব নজরুল ইসলামের তদবিরে তখন পাঁচজন জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলীকে ডিঙিয়ে বসেন প্রধান প্রকৌশলীর (রুটিন দায়িত্ব) চেয়ারে। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তার বিরুদ্ধে টেন্ডার ও বদলি বাণিজ্যের অভিযোগ ওঠে।
খালেকুজ্জামানকে জালিয়াতির দায়ে দেওয়া শাস্তির অনুলিপি

বর্তমানে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্বে) হিসেবে আছেন মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরী। এই পদ স্থায়ী বা নিয়মিত করতে ব্যাপক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। ইতিমধ্যেই জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলীদের ডিঙিয়ে পদোন্নতির সংক্ষিপ্ত তালিকার শীর্ষে নিজের নাম বসাতে সমর্থ হয়েছেন। বাকি জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলীদের বাদ দিতে তাদের বিরুদ্ধে জুলাই গণহত্যার সাজানো মামলার তথ্য জমা দেওয়া হয়েছে সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ডে (এসএসবি)। গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং অধিদপ্তরের দালিলিক নথিপত্র পর্যালোচনায় এসব তথ্য উঠে এসেছে।
রাজনৈতিক আত্মীয়তায় জ্যেষ্ঠতা ডিঙ্গিয়ে পদোন্নতি:  গণপূর্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তা তালিকা ও পার্সোনাল ডাটা শিট (পিডিএস) পর্যালোচনায় দেখা যায়, খালেকুজ্জামান চৌধুরী ক্ষমতার পালাবদলের সুযোগ বারবার কাজে লাগিয়েছেন। ১৯৮৯ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত চাকরিজীবনে সরকারি প্রেষণ ও ছুটির সুযোগে তিনি প্রায ১১ বছর অস্ট্রেলিয়ায় ছিলেন। পদোন্নতির সুযোগ তৈরি হলেই দেশে ফিরে এসেছেন।
পোস্টের হাতে আসা নথি অনুযায়ী, প্রেষণে যেতে তিনি ভুয়া অফার লেটার ও জাল কাগজপত্র তৈরি করেছিলেন। এতে বিদেশে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয়। এ ঘটনায় ২০১৬ সালের ২৩ আগস্ট তৎকালীন গণপূর্ত সচিব মো. শহীদ উল্লা খন্দকার তার এক বছরের বেতন বৃদ্ধি স্থগিত করেন। আওয়ামী লীগ নেত্রী সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর সুপারিশে গুরুদন্ড এড়িয়ে সে যাত্রায় এই লঘুদন্ড পান তিনি।
বিভাগীয় মামলার তিন বছরের মধ্যেই এই আওয়ামী লীগ নেত্রীর লিখিত সুপারিশে খালেকুজ্জামান একই বছরে দুই দফা পদোন্নতি পান। তখন সাজেদা চৌধুরীকে ‘ফুপু’ ডাকতেন তিনি।
সরকারি চাকরির সার্ভিস রেকর্ড বলছে, ২০১৯ সালের ২২ জুলাই খালেকুজ্জামান চৌধুরী নিয়মিত পদোন্নতি পান তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদে। এর কয়েক মাসের মাথায় ১৫ ডিসেম্বর পদোন্নতি পান অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে। রীতি ভেঙে তখন এই পদোন্নতি দেওয়া হয় তাকে।
জুলাই অভ্যুত্থানের পর বদলে যায় খালেকুজ্জামান চৌধুরীর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অবস্থান। আওয়ামী লীগের বদলে এবার জামায়াত ঘনিষ্ঠ বনে যান তিনি।
জামায়াতপন্থি সাবেক সচিব নজরুল ইসলাম এবং জামায়াত নেতা ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের তদবিরে ২০২৫ সালের ২৭ অক্টোবর পাঁচজন জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলীকে ডিঙিয়ে বসেন প্রধান প্রকৌশলীর (চলতি) চেয়ারে। এর আগে তাকে গোপালগঞ্জ থেকে দেওয়া হয়েছিল ঢাকা মেট্রো জোনের দায়িত্ব।
খালেকুজ্জামানের বাড়ি ফরিদপুর জেলার নগরকান্দা উপজেলার তালমা গ্রামে। একই উপজেলার ফুলসুতি গ্রামে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের শ্বশুরবাড়ি।
ডা. তাহেরের শ্বশুর আহম্মদ উল্লাহ চৌধুরী এবং খালেকুজ্জামানের বাবা বদিউজ্জামান চৌধুরী সম্পর্কে চাচা-ভাতিজা। এই সূত্রে জামাযাত নেতার স্ত্রী ডা. হাবিবা আক্তার চৌধুরীকে (সুইটি) তিনি ডাকেন ‘ফুপু’। এই আত্মীয়তার সুবাদে গত অন্তর্র্বতী সরকারের সময় ডা. তাহেরের প্রভাবে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে পদোন্নতি পান তিনি।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় এলে আবারও নিজের রাজনৈতিক রূপ বদলে ফেলেন এই কর্মকর্তা। বর্তমানে নিজেকে পরিচয় দেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামের ঘনিষ্ঠ ও আত্মীয় হিসেবে।
জ্যেষ্ঠদের বাদ দিতে সাজানো মামলার তালিকা ঃ প্রধান প্রকৌশলী পদ স্থায়ী করতে সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ডের (এসএসবি) বৈঠকের জন্য গত ৬ জুলাই গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয় পাঁচজন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর তালিকা। এই তালিকায় প্রশাসনিক জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে।
প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জানের বিরুদ্ধে দুদকে দেওয়া অভিযোগ ও থানায় দায়েরকৃত সাধারণ ডায়েরির অনুলিপি

বর্তমানে অধিদপ্তরের দাপ্তরিক জ্যেষ্ঠতার তালিকায় শীর্ষে আছেন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আবুল খায়ের (ঢাকা জোন) ও উৎফল কুমার দে (রিজার্ভ)। জ্যেষ্ঠতার হিসেবে তিন নম্বরে থাকা খালেকুজ্জামান চৌধুরী নিজেকে তালিকার এক নম্বরে বসাতে সমর্থ হয়েছেন।
তালিকায় আরও আছেন মো. শহিদুল আলম (স্বাস্থ্য উইং) এবং ড. মোহাম্মদ গিয়াসউদ্দিন হায়দার (প্রেষণে মহাপরিচালক, এইচবিআরআই)।
নথিপত্র বলছে, তালিকা থেকে সিনিয়রদের স্থায়ীভাবে বাদ দিতে জুলাই অভ্যুত্থানের পর রামপুরা থানার একটি মামলার আসামির তালিকায় কৌশলে এসব জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাসহ মোট ৪৭ জন প্রকৌশলীর নাম ঢোকানো হয়। এই মামলার নথি এসএসবি কমিটিতে জমা দিয়ে তাদের অবস্থান দুর্বল করার চেষ্টা করা হয়, যাতে জ্যেষ্ঠতার তালিকায় তিন নম্বরে থাকা খালেকুজ্জামান চৌধুরীর শীর্ষ পদ পাওয়ার পথে কোনো বাধা না থাকে। 
বদলি বাণিজ্য
২০২৫ সালের ২৭ অক্টোবর দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই অধিদপ্তরে বদলি বাণিজ্যের অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। বিভিন্ন পর্যায়ের ৬৫ জন প্রকৌশলী ও কর্মকর্তাকে পছন্দের কর্মস্থলে পদায়নের জন্য ১০ লাখ থেকে শুরু করে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে। এসব লেনদেনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগপন্থি হিসেবে পরিচিত কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে পুনর্বাসনের অভিযোগ রয়েছে।
চলতি বছরের ৩ মার্চ পৃথক প্রজ্ঞাপনে একদিনে অর্ধশতাধিক নির্বাহী প্রকৌশলী, উপবিভাগীয় প্রকৌশলী ও উপসহকারী প্রকৌশলীকে গণবদলির নির্দেশ দেওয়া হয়। মন্ত্রণালয়কে না জানিয়ে এতো বড় রদবদল করায় গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী প্রধান প্রকৌশলীকে তলব করে ব্যাখ্যা চান।
সন্তোষজনক জবাব দিতে না পারায় ৫ ও ৮ মার্চ পৃথক আদেশে বাতিল করা হয অধিকাংশ বদলি। এরপরও পর্দার আালে ছোট পরিসরে আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে বদলি কার্যক্রম চালুর খবর পাওয়া গেছে।
এক ঘটনায় দেখা যায, দুর্নীতির দায়ে বরখাস্ত হওয়া প্রকৌশলী মো. সাইফুজ্জামানকে পুনর্বাসনের সুযোগ দিতে পুরোনো তারিখে জারি করা হয বদলির আদেশ। সাইফুজ্জামান ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের গণপূর্তমন্ত্রী শরিফ আহমেদের ঘনিষ্ঠ ছিলেন।
গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় গত ৩ ফেব্রুয়ারি এক আদেশে দুর্নীতির দায়ে সাইফুজ্জামানকে বরখাস্ত করে। ওই আদেশে তাকে উল্লেখ করা হয় লালমনিরহাটের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে। কিন্তু গণপূর্ত অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে ১৫ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত আরেক আদেশে দেখা যায়, বরখাস্তের এক দিন আগে অর্থ্যাৎ ২ ফেব্রুয়ারি তাকে ঢাকায় রিজার্ভে বদলি করা হয়েছে। ৩ তারিখে বরখাস্ত হওয়া একজন কর্মকর্তা কীভাবে ২ তারিখে ঢাকায় বদলি হন, আর তা প্রকাশিত হয় ১৫ তারিখে। এমন অসামঞ্জস্যপূর্ণ নথিকে জালিয়াতির ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন দপ্তর সংশ্লিষ্টরা।
কমিশন না পাওয়ায় টেন্ডার বাতিল
বদলি বাণিজ্যের পাশাপাশি বড় প্রকল্পের টেন্ডার পুনর্মূল্যায়নের নামে কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে প্রধান প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে। ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-১, বিভাগ-৩ এবং শেরেবাংলা নগর গণপূর্ত বিভাগ-২-এর অধীনে বড় অঙ্কের পাঁচটি দরপত্র কমিশনসংক্রান্ত অসন্তোষের কারণে পুনর্মূল্যায়নের জন্য ফেরত পাঠানো হয়।
পিপিআর ২০২৫ (পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস)-এর ত্রুটির অজুহাত দেখানো হলেও সূত্র বলছে, নতুন পিপিআর চালুর পর সব প্রকৌশলীকে যথেষ্ট প্রশিক্ষণ দেওযা হয়। প্রকৃতপক্ষে নির্ধারিত কমিশন না পাওয়ায় পুনর্মূল্যায়নের অজুহাতে এসব টেন্ডার আটকে রাখা হয়েছিল।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অধিদপ্তরের একাধিক প্রকৌশলী ও ঠিকাদার জানান, সাবেক প্রধান প্রকৌশলী শামীম আখতারকে সরানোর পরও দুর্নীতি থামেনি। বরং খালেকুজ্জামান চৌধুরীর নেতৃত্বে গড়ে উঠেছে নতুন একটি সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেটকে আর্থিক সুবিধা দিতে পারা কর্মকর্তারাই সুবিধাজনক পদে বহাল রয়েছেন।
খালেকুজ্জামান চৌধুরীর দুর্নীতি, নথি জালিয়াতি, জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন এবং দেশে-বিদেশে অবৈধ সম্পদ অর্জনসংক্রান্ত তথ্যপ্রমাণসহ দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) জমা পড়েছে লিখিত অভিযোগ। একাধিক ভূক্তভোগী কর্মকর্তা ও ঠিকাদার দুদকে সরাসরি হাজির হয়ে জমা দিয়েছেন দালিলিক প্রমাণ।
‘ক্ষমতা বদলালেই তৈরি হয় নতুন আত্মীয়তা’
সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর ছেলে সাজেদ আকবর বলেন, ‘একই নির্বাচনি আসনে বাড়ি হওয়ায় তখন আম্মার কাছে অনেকে আসতেন। তারা নিজেকে ক্ষমতার কাছাকাছি রাখতে কোনো না কোনো আত্মীয়তার সম্পর্ক তৈরি করতেন। ক্ষমতা চলে যাওয়ার পরে তাদের ফের নতুন ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে আত্মীয়তার সম্পর্ক তৈরি হয়। তবে আমি তাকে (খালেকুজ্জামান চৌধুরী) চিনি না, আম্মার সঙ্গে পরিচয় ছিল না কি না জানা নেই।’ পরবর্তীতে সাবেক মৎস্য ও প্রাণীসম্পদ মন্ত্রী ও আ’লীগের যুগ্মসাধারণ সম্পাদক আবুর রহমানবে নিকটাত্মীয় পরিচয়ে ছড়ি ঘুরিয়েছেন গণপূর্ত কর্মকর্তাওে ওপরে।।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সভাপতি নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘জালিযাতি ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত প্রমাণিত কোনো কর্মকর্তাকে কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবে বসানো দেশ ও সংস্থার জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বাংলাদেশে একশ্রেণির দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা প্রতিটি আমলে নতুন নতুন পরিচয় তৈরি করে সুবিধা বাগিয়ে নেয। এর ফলে প্রকৃত সৎ, যোগ্য ও নিষ্ঠবান কর্মকর্তারা পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হয়ে উপেক্ষিত থেকে যান।’
তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক ছত্রছায়া ও অনৈতিক উপায়ে পদপদবি বাগানোর এই সংস্কৃতি গ্রহণযোগ্য নয়। দুর্নীতি দমনে সরকারের যে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি রয়েছে, তার প্রতিফলন ঘটাতে প্রতিটি পদায়নের আগে ব্যাকগ্রাউন্ড গভীরভাবে তদন্ত করা উচিত। পাশাপাশি, দুদকের মতো সংস্থাগুলোর মাধ্যমে জালিয়াতির অভিযোগ আমলে নিয়ে যোগ্যদের মূল দায়িত্বে আনা জরুরি।’
এসব বিষয়ে প্রধান প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরীর বক্তব্য জানতে মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) তার দপ্তরে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। পরে মোবাইল ফোনে কল করে ও খুদে বার্তা পাঠিয়েও সাড়া মেলেনি। এর পূর্বেও বিষয়টি নিয়ে মতামত জানার জন্য তাকে একাধিকবার ক্ষুদে বার্তা পাঠানো হয়েছে হোয়াটস্আ্যাপে। সে সময়ে অধিদপ্তরের এক কর্মচারীকে দিয়ে সংবাদটি প্রকাশ না করার জন্য অনুরোধ করেছিলেন এই প্রতিবেদককে। (ক্রমশঃ)



শেয়ার করুন:
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
ভারতে এআই সম্মেলনে এবার মোদী-বিরোধী বিক্ষোভ

ভারতে এআই সম্মেলনে এবার মোদী-বিরোধী বিক্ষোভ