ঢাকা | বঙ্গাব্দ

অবৈধ সম্পদের পাহাড়ে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের ডিজি নেয়াজুর!

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Apr 28, 2026 ইং
অবৈধ সম্পদের পাহাড়ে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের ডিজি নেয়াজুর! ছবির ক্যাপশন:
ad728
নিজস্ব প্রতিবেদক:
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাস্টমস অনুবিভাগের কমিশনার মোহাম্মদ নেয়াজুর রহমানের বিরুদ্ধে বেপরোয়া ঘুষ বাণিজ্য লন্ডনে বাড়ি ক্রয় এজেন্টের মাধ্যমে ডলার ও পাউন্ডে ঘুষ নেওয়া ব্রিটিশ পাসপোর্ট গ্রহণসহ বিভিন্ন ধরণের অসামাজিক ও বিতর্কিত কর্মকান্ডের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে ।
মোহাম্মদ নেয়াজুর রহমান এখন কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের (সিআইআইডি) মহাপরিচালক বা ডিজি। এর আগে তিনি ঢাকা উত্তর কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনার মংলা কাস্টমস হাউজ ও সিলেট কাস্টমস্ এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটে কর্মরত ছিলেন। চাকরিজীবনে তার প্রতিটি কর্মস্থলেই তিনি বিতর্কিত কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়েছেন। কয়েকটি স্থানে নারী কেলেংকারির মতো জঘণ্য কর্মকান্ডে জড়ানোর অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে।
নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, মোহাম্মদ নেয়াজুর রহমান একজন ব্রিটিশ পাসপোর্টধারী। তার স্ত্রী-সন্তান থাকেন লন্ডন তথা যুক্তরাজ্যে। সেখানে তিনটি বাড়ি সহ নেয়াজুর রহমান গড়েছেন অবৈধ সহায়-সম্পদের পাহাড়। টাকায় নয়, তিনি ঘুষ নেন ডলার ও পাউন্ডে। লেনদেন করেন যুক্তরাজ্য ও দুবাইয়ে বসে। কারণে অকারণে তিনি দুবাই যুক্তরাজ্য যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমন করেন একাধিক পাসপোর্ট ব্যবহার করে। 
সাবেক এনবিআর চেয়ারম্যান আবু হেনা রহমাতুল মুনিমের অবৈধ কালেকশনের ক্যাশিয়ার বা ‘খাস লোক’ হিসেবে পরিচিত মোহাম্মদ নেয়াজুর। কাস্টমস গোয়েন্দার অতিরিক্ত মহাপরিচালক ও মোংলা কাস্টম হাউসের কমিশনার থাকাবস্থায় কয়েকশ’ কোটি টাকা ঘুষ নিয়ে তিনি লন্ডনে পাঁচার করেছেন বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানাগেছে।
২০২৩ সালের ২০জুলাই মোংলা কাস্টম হাউস থেকে কাস্টমস এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট ঢাকা উত্তরে নেয়াজুরকে বদলি করা হয়। মূলত মোংলা কাস্টম হাউসে কয়েকশ’ কোটি টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ ওঠার পর তাকে বাঁচিয়ে দিতে উত্তর কমিশনারেটে বদলি করেন এনবিআরের তৎকালীন চেয়ারম্যান রহমাতুল মুনিম।
নেয়াজুর যেখানে বদলি হতেন, সেখানেই তার জুড়িডিকশনের মধ্যে বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকা করতেন। পরে তালিকা ধরে ওইসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কারণে-অকারণে যোগাযোগ রাখতেন। পণ্য আটক করেই শুরু করতেন ঘুষের লেনদেন। চাহিদামতো ঘুষ না দিলে শুরু হতো বিভিন্ন ধরণের বহুমাত্রিক হয়রানি। বিশেষ করে ভ্যাট কমিশনারেটে এই হয়রানি চলত চরম আকারে। আর কথায় মিললে তার কয়েকজন এজেন্টের নাম ও মোবাইল নম্বর দিতেন, যারা দুবাই বা লন্ডনে নেয়াজুরের পরিবারের কাছে ডলার পৌঁছে দিতেন।
নেয়াজুরকে ঘুষ নিতে সহযোগিতা করতেন কমিশনারেটের একজন ইউডি, কয়েকজন সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা, দুইজন রাজস্ব কর্মকর্তা ও তিনজন উপ-কমিশনার। ঘুষ বিষয়ক ‘এই কমিটির’ মিটিং হতো কখনও ঢাকার উত্তরার রেস্টুরেন্টে আবার কখনও গাজীপুরের বিভিন্ন রিসোর্টে। সেখানে আধুনিক মাদক সহ সুন্দরীদের রাখা হতো বিশেষ মনোরঞ্জনের জন্য।
মোংলা কাস্টম হাউসেও নেয়াজুরের ছিল অবৈধ ঘুষ বাণিজ্যের একটি গোপণ সিন্ডিকেট। সেই সিন্ডিকেটে কর্মকর্তা ছাড়াও কয়েকজন সিএন্ডএফ এজেন্ট ছিলেন ঘুষ কালেকশনের দায়িত্বে। কর্মকর্তা ও সিএন্ডএফের সদস্যরা কখনও ঢাকায়, কখনও লন্ডনে বিভিন্ন মাধ্যমে নেয়াজুরের পরিবারের কাছে ঘুষের টাকা পৌঁছে দিতেন।
মোংলা কাস্টমস্ হাউস থেকে কামানো ঘুষের টাকা দিয়ে লন্ডনে বাড়ি কিনতে ২০২৩ সালের ২২ সেপ্টেম্বর থেকে ১৩ অক্টোবর নেয়াজুর ছুটি নিয়ে লন্ডনে যান। বাড়ি কেনার ক্ষেত্রে তাকে সহযোগিতা করেছেন আয়কর বিভাগে তারই একজন ঘনিষ্ট দুর্নীতিবাজ, যার স্ত্রী ও সন্তানও লন্ডনে আছেন।
তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, ঘুষের টাকা নেয়াজুর রহমান দেশে রাখেননি। বিভিন্ন ব্যবসায়ীর মাধ্যমে তা লন্ডনে নিয়ে গেছেন। মূলত টাকা রাখার মেশিন হিসেবে ব্যবহার করতে সন্তানদের পড়ালেখার নামে লন্ডনে নিয়ে গেছেন নেয়াজুর। অবাধে ঘুষ খাওয়া নেয়াজুর কেবল কাস্টমসে ঘুষের টাকা দিয়ে লন্ডনে তিনটি বাড়ি করেছেন। এছাড়া লন্ডনের ব্যাংকে জমা হয়েছে তার বিপুল অর্থ।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর এতো কড়াকড়ির মধ্যেও অন্তত ১০টি বড় প্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় ৫কোটি টাকা ঘুষ নিয়েছেন তিনি। তবে ওই টাকা দুবাইতে ব্যবসায়ীরা পৌঁছে দিয়েছেন, যা লন্ডনে এরই মধ্যে পাঁচার হয়ে গেছে।
কমিশনার নেয়াজুরের ব্রিটিশ পাসপোর্ট আছে। সিলেট ভ্যাট কমিশনারেটে থাকাবস্থায় এক লন্ডন প্রবাসীর মাধ্যমে এই পাসপোর্ট নিয়েছেন নেয়াজুর। ওই প্রবাসীর আত্মীয়-স্বজনকে ভ্যাট ফাঁকিতে সুবিধা দিয়ে প্রবাসীর আস্থাভাজন হন তিনি। পরে কাস্টমস গোয়েন্দার অতিরিক্ত মহাপরিচালক (এডিজি) থাকাবস্থায় সিলেট বিমানবন্দর দিয়ে দুবাই ও লন্ডন থেকে স্বর্ণ চোরাচালানে প্রবাসী ও তাদের আত্মীয়দের সহযোগিতা করেছেন নেয়াজুর। চোরাচালানের সেই টাকা দেশে নয়, নেয়াজুরের সন্তান ও পরিবারের কাছে লন্ডনে পৌঁছে দিতেন ওই প্রবাসী। শুধু সিলেট নয়, চট্টগ্রাম ও ঢাকার দুই বিমানবন্দর দিয়েও চোরাচালানে সিন্ডিকেট ছিল তার। আর চোরাচালান থেকে পাওয়া টাকা নেয়াজুর দেশে নিতেন না। ডলার হিসেবে তার পরিবারের কাছে লন্ডনে পৌঁছে দেওয়া হতো।
ডলার ঘুষ নেন বিধায় নেয়াজুরকে ব্যবসায়ীরা ‘ডলার নেয়াজুর’ নামে চেনেন। স্বর্ণ চোরাচালান সিন্ডিকেট থেকে বাংলাদেশি টাকায় অন্তত ১০০ কোটি টাকা নিয়েছেন তিনি। সরকার পরিবর্তনের পর ডায়মন্ডওয়ার্ল্ডের মালিক দিলীপ আগারওয়ালকে গ্রেফতারের পর নেয়াজুর দেশ থেকে পালাতে চেয়েছিলেন। কারণ স্বর্ণ চোরাচালান সিন্ডিকেটের নাম ফাঁস করে দেবেন আগারওয়াল, সেই ভয়ে ছিলেন নেয়াজুর। সিন্ডিকেটের সুবিধাভোগী কারা, কে, কোন দেশে চোরাচালানের টাকা পাঠান, তা জানতেন আগারওয়াল। এতে নেয়াজুরের নাম চলে আসবে। সে জন্য তিনি ব্রিটিশ পাসপোর্ট ব্যবহার করে দেশ থেকে পালাতে চেয়েছিলেন। তবে সরকারের কড়াকড়ির কারণে পালাতে পারেননি। ২০২৪ সালের জুলাই মাসের শেষদিকে বাংলাদেশি পাসপোর্ট নবায়ন করেছেন তিনি।
সিলেট ভ্যাট কমিশনারেটে থাকাবস্থায় এলসি স্টেশন দিয়ে চোরাই পণ্যের বাজার খুলে বসেন নেয়াজুর। কোনো ধরনের শুল্ককর দেওয়া ছাড়াই কেবল ‘ডলার’ ঘুষের বিনিময়ে নেয়াজুরের অনুসারী কর্মকর্তারা চোরাই পণ্য ভারত থেকে বাংলাদেশে পার করে দিতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া পাথর বোঝাই প্রতি ট্রাক থেকে নেয়াজুরকে ঘুষ দিতে হতো। এলসি স্টেশন দিয়ে আমদানি হওয়া ফলের ওজন কারসাজি করে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ঘুষ নিতেন নেয়াজুর। এছাড়া জিরাসহ বেশকিছু পণ্য ভারত থেকে সিলেটের এলসি স্টেশন দিয়ে আমদানি হতো। কিন্তু নেয়াজুরকে ঘুষ না দিলে সেই জিরার ওপর বেশি করারোপ করা হতো। সিলেট শহরের বড় দোকান, শো-রুম থেকে প্রতিমাসে মোটা অংকের ঘুষ নিতেন তিনি। না দিলে ভ্যাট ফাঁকির বড় মামলা দিয়ে হয়রানি করা হতো। নেয়াজুর সিলেটে থাকাবস্থায় সিলেট বিমানবন্দরকে স্বর্ণ চোরাচালানের নিরাপদ রুট হিসেবে চোরাচালানীরা বেছে নেয়। ব্রিটিশ পাউন্ড ও ডলার ঘুষের বিনিময়ে তাদের সহযোগিতা করেন নেয়াজুর।
মোংলা কাস্টম হাউসে গাড়ি ও কসমেটিকস ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে শত কোটি টাকা নিয়েছেন বলে অভিযোগ আছে। মোংলা কাস্টম হাউসে সবচেয়ে বেশি নিলাম হয় গাড়ির। সবচেয়ে বেশি গাড়ি আমদানি হয় মোংলা দিয়ে। কয়েকজন অসাধু গাড়ি ব্যবসায়ী রয়েছেন, যারা নেয়াজুরের সঙ্গে হাত মিলিয়ে কোটি কোটি টাকার গাড়ি নামমাত্র মূল্যে নিলাম ডেকে নিয়েছেন। এতে লাভবান হয়েছেন নেয়াজুর। কয়েকজন কসমেটিকস আমদানিকারক মূল্য কম দেখিয়ে রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে বিপুল পরিমাণ কসমেটিকস ভর্তি কনটেইনার খালাস করে নিয়ে গেছেন। এতে নেয়াজুর তাদের কাছ থেকে পেয়েছেন কয়েক কোটি টাকা। প্রতিটি নিলামে নেয়াজুরকে টাকা না দিলে সেই নিলাম বাতিল করা হতো।
নিলাম নিয়ে নেয়াজুর মোংলা কাস্টম হাউসে একটি সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। শেষে এক প্রভাবশালী এমপি শেখ হাসিনার কাছে অভিযোগ দেওয়ার পর মোংলা থেকে তাকে সরিয়ে দেন তখনকার এনবিআর চেয়ারম্যান আবু হেনা রহমাতুল মুনিম। এছাড়া এনবিআরের প্রথম সচিব থাকাবস্থায় ২০১৬ সালের ২৬ জুলাই অতিরিক্ত কমিশনার হিসেবে পদোন্নতি নেন নেয়াজুর। দুর্নীতি ও ঘুষ নেওয়ার অভিযোগে যুগ্ম কমিশনার থাকাবস্থায় তাকে এনবিআরে বদলি করা হয়। পরে এনবিআরের এক প্রভাবশালী ও দুর্নীতিবাজ সদস্যের সহযোগিতায় মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে পার পেয়ে যান। সেই সদস্যের মাধ্যমে সে সময়ের চেয়ারম্যানকে ঘুষ দিয়েছেন নেয়াজুর। ২০২৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বর নেয়াজুর চলতি দায়িত্ব থেকে কমিশনার হিসেবে পদোন্নতি পান। উল্লেখ্য, মোহাম্মদ নেয়াজুর রহমান ১৯৭১ সালের ২০ ডিসেম্বর ফেনী জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি পড়ালেখা করেছেন বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে। ২০০৩ সালের ২৯ মে সহকারী কমিশনার (শুল্ক ও আবগারি) পদে যোগদান করেন নেয়াজুর রহমান। তিনি বিসিএস (শুল্ক ও আবগারি) ২১তম ব্যাচের কর্মকর্তা।
অভিযোগের বিষয়ে মোহাম্মদ নেয়াজুর রহমান এর বক্তব্য জানার জন্যে তার দপ্তরে কয়েক দফা যোগাযোগ ও তার টেলিফোনে সংযোগ স্থাপনের চেষ্টা করেও নাগাল পাওয়া যায়নি। (ক্রমশঃ)



শেয়ার করুন:
কমেন্ট বক্স
এপ্রিলের ২৬ দিনে দেশে এসেছে ২৭২ কোটি ডলারের রেমিট্যান্স

এপ্রিলের ২৬ দিনে দেশে এসেছে ২৭২ কোটি ডলারের রেমিট্যান্স