আসাদ মাহমুদ: আদালতের স্থিতাবস্থা আদেশ ও একনেকের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে আজিমপুর সরকারি কলোনির জোন-সি প্রকল্পে ৪১৮টি সরকারি চাকরিজীবী পরিবারকে পুনর্বাসন ছাড়াই উচ্ছেদের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় আজিমপুর গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়সাল হালিমের বিরুদ্ধে টেন্ডার কারসাজি, কমিশন বাণিজ্য, ভুয়া মাস্টাররোল, অর্থ আত্মসাৎ ও বিদেশে অর্থ পাচারের গুরুতর অভিযোগে দুদকে লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে। অভিযোগের প্রেক্ষিতে দুদক ও গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় পৃথকভাবে তদন্ত শুরু করেছে।
চলতি অর্থবছরে উন্নয়নের নামে ব্যাপক লুটপাট, বিধি বহির্ভূত টেন্ডার বাণিজ্য, ভুয়া মাস্টাররোলে অর্থ আত্মসাৎ এবং প্রায় ২৮ কোটি টাকা বিদেশে পাচারের গুরুতর অভিযোগে এই প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) সুনির্দিষ্ট অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে। দুদকের প্রধান কার্যালয়ে চেয়ারম্যানের নিকট জমা পড়া এই অভিযোগের ভিত্তিতে ইতিমধ্যেই নড়েচড়ে বসেছে সংস্থাটি। একই সাথে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ও এই প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন শাখা-৭ থেকে জারি করা এক অফিস আদেশে (স্মারক নং-২৫.০০.০০০০.১৩০.২৭.০১৭.১৭-৪১৬)। জানা গেছে, আজিমপুর সরকারি কোয়ার্টার (দক্ষিণাঞ্চল) কল্যাণ সমিতির সভাপতি মোসাঃ কোহিনুর আক্তার শ্যামলীর আবেদনের প্রেক্ষিতে নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়সাল হালিমের বিরুদ্ধে আনীত দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ তদন্তে এই কমিটি গঠন করা হয়েছে। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উপসচিব তাসমিন ফারহানা স্বাক্ষরিত ওই আদেশে প্রধান প্রকৌশলীকে আগামী ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে সরেজমিনে তদন্তপূর্বক বিধি মোতাবেক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে মন্ত্রণালয়কে অবহিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দুদকে দাখিলকৃত অভিযোগপত্র ও অনুসন্ধানে জানা যায়, পকেটস্থ টেন্ডার ও ‘১০ শতাংশ’ কমিশন বাণিজ্যের অভিনব কৌশলে ২০২৫-২৬ অর্থ বছরে এপিপি বরাদ্দের ১১০টি দরপত্র এলটিএম পদ্ধতিতে আহ্বান করেন ফয়সাল হালিম। গণপূর্ত অধিদপ্তরের অন্যান্য বিভাগে এলটিএম পদ্ধতির দরপত্রে সাধারণত ১০০ জনেরও বেশি ঠিকাদার অংশগ্রহণ করলেও আজিমপুরে চিত্র ছিল সম্পূর্ণ উল্টো। ফয়সাল হালিম তার নিজস্ব সিন্ডিকেটের পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দিতে প্রতিটি দরপত্রে মাত্র ৩ থেকে ৪ জনকে অংশগ্রহণ করানোর কৃত্রিম কৌশল তৈরি করেন। যারা তাকে আগাম কমিশন দিতে রাজি হয়েছেন, কেবল তাদেরই এই সিন্ডিকেটে রাখা হয়েছে।

ফয়সাল হালিম আজিমপুর বিভাগে যোগদানের পর পূর্ববর্তী প্রকৌশলীদের ৫ শতাংশ কমিশনের রেকর্ড ভেঙে একলাফে তা ১০ শতাংশে উন্নীত করেছেন। অভিযোগ রয়েছে, প্রাক্কলন (এস্টিমেট) তৈরিকালে একবার, টেন্ডার চুক্তির (এগ্রিমেন্ট) সময়ে একবার এবং চূড়ান্ত বিল পরিশোধকালে একবার-এই তিন ধাপে তিনি মোট ১০ শতাংশ কমিশন বা ঘুষ বাধ্যবাধকতা হিসেবে আদায় করেন। যেসব ঠিকাদার এই কমিশন দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন, তাদের ফাইলে স্বাক্ষর না করার ভয় দেখিয়ে দরপত্রে অংশ নিতে সরাসরি নিরুৎসাহিত ও কোণঠাসা করা হয়েছে। এছাড়াও, ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ অর্থ বছরে আরএফকিউ-এর মাধ্যমে বিধি লঙ্ঘন করে মোট ৪০ লাখ টাকা কোনো কাজ না করেই ভুয়া ভাউচারের মাধ্যমে আত্মসাত করার সুনির্দিষ্ট বিবরণ দুদকের অভিযোগপত্রে উল্লেখ রয়েছে।
একই সাথে, বিভাগে বাস্তব কোনো অস্তিত্ব ছাড়াই কেবল কাগজ-কলমে ‘মাস্টাররোল’ শ্রমিকদের ভুয়া তালিকা দেখিয়ে প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা সরকারি তহবিল থেকে উত্তোলন করে পকেটস্থ করছে এই সিন্ডিকেট। আজিমপুর কলোনির নতুন ভবন নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় পুরাতন ভবনগুলোর সার্ভে রিপোর্ট তৈরির ক্ষেত্রেও ভয়াবহ জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছেন ফয়সাল হালিম। নিজস্ব সিন্ডিকেটের ঠিকাদারদের পানির দরে নিলাম পাইয়ে দিতে সরকারি খাতায় নামমাত্র মূল্য দেখিয়ে কোটি কোটি টাকার রাষ্ট্রীয় রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হয়েছে এবং বিনিময়ে বিপুল অঙ্কের অনৈতিক সুবিধা হাতিয়ে নেয়া হয়েছে। শত কোটি টাকার এই আবাসন প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৭৭৪ কোটি ৫৯ লাখ টাকা।
আরও পড়তে পারেন: স্বৈরাচারের প্রেতাত্মা গণপূর্ত প্রকৌশলী ফয়সাল হালিম লুটপাটে অপ্রতিরোধ্য!
আরও পড়তে পারেন: আজিমপুর গণপূর্তে প্রকৌশলী ফ. হালিমের ফ্যাসিবাদী লুটপাট!
এই মেগা প্রকল্পকে ঘিরে সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী (বর্তমানে সিলেটে কর্মরত তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী) ইলিয়াস আহমেদ এবং বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়সাল হালিম মিলে একটি শক্তিশালী চক্র গড়ে তুলেছেন। ইলিয়াস আহমেদ বদলি হয়ে গেলেও ঢাকার আজিমপুর প্রকল্পের মূল ‘রিমোট কন্ট্রোল’ এখনো তার হাতেই রয়েছে এবং ফয়সাল হালিম তার আজ্ঞাবহ হিসেবে মাঠপর্যায়ে পিপিআর-২০০৮ (চচজ-২০০৮) বিধিমালাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে প্রতিটি ফাইলের কমিশন নিশ্চিত করছেন। এই সিন্ডিকেট প্রকল্পের শুরু থেকেই লিফট, জেনারেটর এবং ফায়ার ফাইটিং সিস্টেম আমদানির নামে প্রায় ১২০ কোটি টাকার একটি বিশেষ ‘কালো ফান্ড’ তৈরি করেছে। নির্দিষ্ট কিছু ব্র্যান্ডের মালামাল ক্রয়ের বাধ্যবাধকতা তৈরি করে বাজারদরের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ দাম প্রাক্কলন ধরা হয়েছে। অন্যদিকে, প্রকল্পের ৮৩৬টি ফ্ল্যাটের ফিনিশিং কাজের জন্য চরম নিম্নমানের টাইলস ও স্যানিটারি সামগ্রী ব্যবহার করে সরকারের কোটি কোটি টাকা সাশ্রয় করার নামে তা সরাসরি সিন্ডিকেটের পকেটে ভরা হয়েছে। এই ভয়ংকর দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলায় গত এক মাসে দুজন উপ-সহকারী প্রকৌশলীকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছে এবং তাদের ডেস্ক থেকে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নথিপত্র গায়েব করে দেওয়া হয়েছে। পুনর্বাসনহীন উচ্ছেদ ও মানবিক সংকট একনেকের সিদ্ধান্ত অমান্য করে জোন-সি প্রকল্পের কাজ শুরু করার পূর্বে সেখানে বসবাসরত ৪১৮টি পরিবারকে আজিমপুরেরই ‘জোন-বি’ এলাকার খালিকৃত ফ্ল্যাটগুলোতে পুনর্বাসন করার স্পষ্ট আইনি বাধ্যবাধকতা ছিল। কিন্তু জোন-বি তে পর্যাপ্ত ফ্ল্যাট খালি না থাকার অজুহাতে এবং একনেকের সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ লঙ্ঘন করে বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়সাল হালিম ঠিকাদারদের সঙ্গে গোপন আঁতাতের মাধ্যমে গত ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে তড়িঘড়ি করে ৩১টি ভবন ভাঙার নিলাম ও নতুন ভবন নির্মাণের টেন্ডার আহ্বান করেন। ভুক্তভোগী সরকারি কর্মচারীরা জানান, তারা কেউ অবৈধ দখলদার নন। তারা সচিবালয়, সুপ্রিম কোর্ট-সহ রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে কর্মরত। তাদের সন্তানরা ভিকারুননিসা নূন স্কুল, বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ, উদয়ন স্কুল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বুয়েটসহ স্থানীয় নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করছে।
পুনর্বাসন ছাড়া হঠাৎ উচ্ছেদ করা হলে এই ৪১৮টি পরিবারের সন্তানদের শিক্ষাজীবন সম্পূর্ণ ধ্বংসের মুখে পড়বে। এই মানবিক সংকটের কারণে কলোনির অধিবাসীরা হাইকোর্টে রীট পিটিশন (নং-১৮৪৪/২০২৬) দায়ের করলে মহামান্য আদালত আজিমপুর এলাকায় পুনর্বাসনের ৩টি বিকল্প প্রস্তাব নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত উচ্ছেদ কার্যক্রম ও বাসা দখল হস্তান্তরের ওপর সুনির্দিষ্ট স্থিতাবস্থা ও রুল জারি করেন। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়সাল হালিম আদালতের সেই আদেশকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ঠিকাদারি চক্রকে সুবিধা দিতে বাসিন্দাদের ওপর নানাভাবে চাপ সৃষ্টি করে চলেছেন। এমনকি কলোনির বাসিন্দাদের সুদূর মিরপুর বা নারায়ণগঞ্জের আলীগঞ্জে চলে যাওয়ার জন্য মৌখিক ও লিখিত চাপ দেওয়া হচ্ছে, যা আদালতের আদেশের চরম অবমাননা।
প্রকৌশলী ফয়সাল হালিমের বিরুদ্ধে বিগত সরকারের প্রভাবশালীদের ঘনিষ্ঠ হওয়া এবং শেখ রেহানার গুলশানের বাড়ির ডিজাইনার হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিয়ে নানা সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ক্ষমতার পটপরিবর্তনে তিনি প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তরে মব সৃষ্টি করার মতো গুরুতর শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হন, যা গণপূর্তের সাধারণ কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
এই বিষয়ে আজিমপুর সরকারি কোয়ার্টার (দঃ) কল্যাণ সমিতির সভাপতি মোসাঃ কোহিনুর আক্তার শ্যামলী বলেন, আমরা একনেকের সিদ্ধান্ত ও পরিকল্পনা কমিশনের নির্দেশনার আলোকেই আজিমপুর এলাকায় দুই ধাপে প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে আসছি। কিন্তু নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়সাল হালিম আমাদের কোনো যুক্তিসঙ্গত প্রস্তাব আমলে না নিয়ে কোটি কোটি টাকার টেন্ডার ও কমিশন লোপাটের উদ্দেশ্যে তড়িঘড়ি করে আমাদের উচ্ছেদ করতে চান। আমরা নিরুপায় হয়ে মন্ত্রণালয় ও দুদকের দ্বারস্থ হয়েছি। সংশ্লিষ্ট ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলী মিঠুন এই প্রকল্প সমন্বয় প্রসঙ্গে জানান, গণপূর্ত অধিদপ্তর আমাদের সঙ্গে এই প্রকল্পের ড্রেনেজ ও মাস্টারপ্ল্যান নিয়ে প্রাথমিক কিছু আলোচনা করলেও স্থানীয় বাসিন্দাদের পুনর্বাসন না করে এভাবে উচ্ছেদ করলে সামাজিক ও নাগরিক শৃঙ্খলায় বড় বিঘ্ন ঘটবে। উন্নয়ন কাজ অবশ্যই হবে, তবে হাইকোর্টের নির্দেশনা ও সরকারের পূর্ব সিদ্ধান্ত মেনে নাগরিকদের দুর্ভোগ না বাড়িয়েই তা করা উচিত। দুর্নীতির ভয়াবহ চিত্র ও দুদকের তদন্ত প্রসঙ্গে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরী সাংবাদিকদের জানান, কারও বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অনিয়ম বা দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হলে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়ার পাশাপাশি সামগ্রিক বিষয়টি খতিয়ে দেখে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য দুদককে হস্তান্তর করা হবে।
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. নজরুল ইসলাম জানান, অনিয়ম ও রাষ্ট্রীয় অর্থ লোপাটের বিষয়ে সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি বহাল আছে। আমরা ইতিমধ্যে আজিমপুর প্রকল্পের সকল ব্যয়ের অডিট রিপোর্ট তলব করেছি। পিপিআর লঙ্ঘন করে পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার প্রমাণ মিললে সেই টেন্ডার তাৎক্ষণিকভাবে বাতিল করা হবে। এদিকে অভিযোগকারীরা দুদকের কাছে জোর দাবি জানিয়েছেন, নতুন তদন্ত কমিশন পূর্ণাঙ্গ কাজ শুরু করার আগেই যেন ফয়সাল হালিম ও ইলিয়াস আহমেদ সিন্ডিকেটের ব্যাংক হিসাব জরুরি ভিত্তিতে জব্দ করা হয়। ইতিমধ্যেই তারা অন্তত ৩০ কোটি টাকা বিদেশে পাচারের চূড়ান্ত উদ্যোগ নিয়েছে। এই হরিলুট ও রাষ্ট্রীয় অর্থ পাচার এখনই থামানো না গেলে তা কেবল একটি আবাসন প্রকল্পের ব্যর্থতা হবে না, চলমান রাষ্ট্র সংস্কারের পথে একটি বড় কলঙ্ক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। অভিযোগের বিষয়ে আজিমপুর গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়সাল হালিমের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। এমনকি তার হোয়াটসঅ্যাপে সুনির্দিষ্ট প্রশ্নসহ ক্ষুদে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি কোনো জবাব দেননি।