জয়নাল আবেদীন যশোরী :
আউটসোর্সিং ড্রাইভারের মাসিক বেতন ১৭ হাজার। কিন্তু তার বাড়ি তিনটি, গাড়ি দুটি। আবার দুটি গাড়িই এলজিইডিতে ভাড়া দেওয়া। তার দুর্নীতির উৎস উপজেলা প্রকৌশলী, সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী, সহকারী প্রকৌশলী ও উপসহকারী প্রকৌশলীসহ কর্মচারীদের বদলীর তদবীর করা এবং প্রকল্প পরিচালক (পিডি) ও নির্বাহী প্রকৌশলীদের নিকট থেকে রুটিন মাফিক চাঁদা আদায়। তথধ্য সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্রের।
উল্লেখিত অভিযোগ স্থানীয় সরকার ও প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) এর প্রধান প্রকৌশলীর গাড়ী চালক রফিকুল ইমলাম এর বিরুদ্ধে। আউটসোর্সিংয়ে নিয়োগপ্রাপ্ত রফিকুল ইসলাম দীর্ঘদিন ধরে এলজিইডি’র প্রধান প্রকৌশলী মোঃ বেলাল হোসেনের গাড়ী চালক। বেলাল হোসেন যখন দুইবার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী প্রসাশন ছিলেন সেই সময় থেকে রফিকুল ইসলাম ব্যপক নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্য করে কয়েক কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন বলে অনুসন্ধানে জানা যায়। বেলাল হোসেন প্রধান প্রকৌশলী হলে তার ক্ষমতা/পাওয়ার আরও দিগুণ বেড়ে যায়। সূত্র জানায়, রফিকের বাড়ি ফরিদপুর হলেও বর্তমানে গাজীপুরে সেটেল্ড।
প্রধান প্রকৌশলী বেলাল হোসেনের ছত্রছায়ায় রফিকুল আউটসোর্সিং নিয়োাগ ও বদলি বাণিজ্যে কামাচ্ছেন লাখ লাখ টাকা। একজন আউটসোর্সিং ড্রাইভার হয়েও এলজিইডি কাঁপাচ্ছে এই ধ:ান্ধাবাজ ধুরন্ধর রফিক। স্ট্যান্ডবাই গাড়ি চালকদের ডিউটি বন্টন হয় তার নির্দেশে। তাকে ঘুষ দিলে ভাল ডিউটি আর না দিলে বসে মাসিক বেতনে চলবি। আউটসোর্সিংয়ে নিয়োগপ্রাপ্ত এই ড্রাইভার রফিক সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী উপজেলা প্রকৌশলীদের বদলি করছেন অহরহ।
সূত্র আরও জানায়, প্রায় একমাস পূর্বে নারায়ণগঞ্জ জেলার রুপগঞ্জ উপজেলার উপজেলা প্রকৌশলীর পোস্টিং দেয় এই রফিক। এ বাবদ ঘুষ নেয় আট লাখ টাকা। এলজিআরডি মন্ত্রী ওই আদেশ বাতিলের কথা বললেও প্রধান প্রকৌশলী মোঃ বেলাল হোসেন তা করেননি। এই ঘটনা থেকে বোঝা যায় ড্রাইভার রফিকের খুঁটির জোর কোথায়?
তবে সরকারি অফিসে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োজিত কোনো কর্মচারী ঘুষ বা দুর্নীতি করলে দেশের প্রচলিত ফৌজদারি আইন অনুযায়ী তিনি কোনো ছাড় পাবেন না এবং তার বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।
আইনগত অবস্থান ও শাস্তির বিধানগুলো নিচে বিশদভাবে আলোচনা করা হলো:
১. 'জনসেবক' বা পাবলিক সার্ভেন্ট হিসেবে গণ্য হওয়া
দন্ডবিধি, ১৮৬০-এর ২১ ধারা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ২ ধারা অনুযায়ী, সরকারি কোনো দায়িত্ব পালনের জন্য সরকার বা কোনো সরকারি কর্তৃপক্ষ থেকে যিনি পারিশ্যমিক বা ফি পান, তিনি আইনি দৃষ্টিতে একজন 'জনসেবক' (চঁনষরপ ঝবৎাধহঃ) হিসেবে গণ্য হবেন। সুতরাং, সরাসরি সরকারি কর্মচারী না হলেও, সরকারি অফিসে কাজ করার কারণে আউটসোর্সিং কর্মীরাও এই আইনের আওতাভূক্ত।
এই সব আইন তোয়াক্কা না করে প্রধান প্রকৌশলীর অবৈধ লেনদেনের অলিখিত ক্যাশিয়ার এই রফিক। আউটসোর্সিং নিয়োগ, উপজেলা প্রকৌশলী, সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী, সহকারী প্রকৌশলী ও উপসহকারী প্রকৌশলীদের বদলির বিষয় রফিকের সিদ্ধান্তই চুড়ান্ত। রফিকের চ্যানেলে গেলে তার বদলির আদেশ এক ঘন্টা থেকে কয়েক ঘন্টার মধ্যে অফিস আদেশ হয়ে যায়। রফিক পার্টি থেকে নগদ টাকা বুঝিয়া পাইয়া প্রধান প্রকৌশলীকে সিগনাল দিলে তিনি ইউডি শাখাকে নির্দেশ দেন আর স্বল্প সময়ের মধ্যেই অফিস আদেশ হয়ে যায়। সূত্র জানায় রফিক সন্ধ্যায় প্রধান প্রকৌশলীর বাসায় যেয়ে ঘুষের টাকা গুনে গুনে প্রধান প্রকৌশলী মোঃ বেলাল হোসেনকে বুঝিয়ে দেন।
বিশেষ সূত্রে আরো জানা যায়, ঈদের সময়সহ বিভিন্ন উপলক্ষে রুটিন মাফিক পিডিদের নিকট গিয়ে টাকা চায় ড্রাইভার রফিক। কোন পিডি তার চাহিদামত টাকা না দিলে প্রধান প্রকৌশলীকে দিয়ে তাকে সরানোর জন্য ফাইল রেডি করে। তখন ভয়ে ওই পিডি রফিকের সাথে যোগাযোগ করে এবং মোটা অংকের ঘুষ দিয়ে ম্যানেজ করলে তার বদলির ফাইল স্থগিত হয়ে যায়। এইভাবে সে কর্মকর্তাদের হয়রানি করে নিজের আখের গোছাতে ব্যস্ত আছে। এই রফিকুল ইসলাম
প্রধান প্রকৌশলীর সাথে বিভাগ ও জেলা পর্যায়ে ট্যুরে গেলে নির্বাহী প্রকৌশলীদের নিকট থেকে মোটা অংকের ঘুষ গ্রহণ করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। কোন নির্বাহী প্রকৌশলী রফিককে টাকা না দিলে হুমকি দেয় স্যারের মাধ্যমে তাকে বদলি করবে।
জানা যায়, প্রধান প্রকৌশলীর গাড়ীচালক রফিকুল ইসলাম এই ঘুষের টাকায় গাজিপুরে তিনটি বাড়ি করেছেন। একটি দশকাঠা জমির উপর। গাজীপুর সাফারি পার্কের নিকট রয়েছে ছয় তলা বাড়ি। তার পরিবার ওই বাড়িতেই বসবাস করে। সে নিজে দুটি গাড়ি কিনেছে, যা এলজিইডি’র অফিসে ভাড়া দিয়ে রেখেছে। গাড়ি ভাড়া থেকে মাসে আয় চল্লিশ হাজার টাকা। সূত্র আরো জানায়, রফিক সপ্তাহে ঘুষ বাবদ যা কামায় সপ্তাহ শেষে বৃহস্পতিবার রাতে গাজিপুর যায় এবং সেখানে রেখে আসে। গাজীপুর চৌরান্তায় আরও একটি টিনসেড বাড়ি আছে সেখান থেকে প্রতিমাসে ভাড়া আসে চল্লিশ হাজার টাকা। রফিকুল ইসলাম আউটসোর্সিং গাড়ী চালক হিসাবে মাসে বেতন পায় মাত্র ১৭ হাজার টাকা। সামান্য বেতনের এই কর্মচারীর কোটি কোটি টাকার সম্পদ কিভাবে হল তা তদন্ত করে দেখার দাবি সচেতন মহলের। এদিকে দেশের আইন বলছে এই সব অপরাধীদেকে নিকটস্থ থানায় গিয়ে সরাসরি ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে দন্ডবিধির ১৬১ ধারায় এজাহার দায়ের করতে পারেন।
২. প্রচলিত আইনি ধারা ও শান্তির মেয়াদ
আউটসোর্সিং কর্মচারী ঘুষ ও দুর্নীতি করলে তার বিরুদ্ধে মূলত দুটি আইনে মামলা ও বিচার হতে পারে:
দন্ডবিধি, ১৮৬০ (চবহধষ ঈড়ফব):
১৬১ ধারা (ঘুষ গ্রহণ): কোনো সরকারি কাজের বিনিময়ে আইনি পারিশ্রমিক ছাড়া অন্য কোনো আর্থিক বা বস্তুুগত সুবিধা (ঘুষ) দাবি বা গ্রহণ করলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
শাস্তি: দোষী প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ ৩ বছর পর্যন্ত কারাদন্ড, অর্থদন্ড বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হতে পারেন।
১৬২ ও ১৬৩ ধারা: সরকারি কর্মচারীকে প্রভাবিত করার জন্য অন্য কারও মাধ্যমে অর্থ লেনদেন করলেও শাস্তির বিধান রয়েছে।
দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭ (চৎবাবহঃরড়হ ড়ভ ঈড়ৎৎঁঢ়ঃরড়হ অপঃ):
৫(২) ধারা (অপেশাদার আচরণ ও অপরাধমূলক অসদাচরণ): দায়িত্ব পালনের সময় ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি বা অবৈধ আর্থিক সুবিধা নিলে এটি 'ঈৎরসরহধষ গরংপড়হফঁপঃ' বা অপরাধমূলক অসদাচরণ হিসেবে গণ্য হয়।
শাস্তি: এই ধারায় দোষী সাব্যস্ত হলে সর্বোচ্চ ৭ বছর পর্যন্ত কারাদন্ড, অর্থদন্ড এবং অপরাধের মাধ্যমে অর্জিত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার আইনগত বিধান রয়েছে।
৩. বিভাগীয় ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা
ফৌজদারি মামলার পাশাপাশি ওই কর্মচারীর বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া যায়:
চুক্তি বাতিল ও চাকরিচ্যুতি: আউটসোর্সিং নীতিমালার আলোকে ওই কর্মীকে সরবরাহকারী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে (ঠবহফড়ৎ অমবহপু) অবহিত করে তার চুক্তি বাতিল এবং চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা: দুর্নীতিতে যদি সরবরাহকারী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের গাফিলতি বা মদদ থাকে, তবে সরকারি দপ্তর ওই সংস্থাকে কালো তালিকাভুক্ত (ইষধপশষরংঃবফ) করতে পারে।
ভুক্তভোগী হিসেবে আপনার করণীয় কী?
কোনো আউটসোর্সিং কর্মচারী যদি আপনার কাছে ঘুষ দাবি করেন, তবে আপনি নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো নিতে পারেন:
উর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে অবহিতকরণ: সংশ্লিষ্ট অফিসের প্রধান বা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (যেমন: উইং প্রধান বা পরিচালক) কাছে লিখিত অভিযোগ দিতে পারেন।
দুদকে অভিযোগ: তথ্য-প্রমাণসহ দুদক বা দুর্নীতি দমন কমিশন (অঈঈ)-এর হটলাইন নম্বর ১০৬-এ কল করে সরাসরি অভিযোগ জানাতে পারেন।
থানায় মামলা: নিকটস্থ থানায় গিয়ে সরাসরি ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে দন্ডবিধির ১৬১ ধারায় এজাহার দায়ের করতে পারেন।
আউটসোর্সিং কর্মচারীরা সরকারি সুযোগ-সুবিধা সরাসরি না পেলেও সরকারি অফিসে বসে অপরাধ করলে সাধারণ নাগরিকদের মতোই তাদের কঠোর আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হয়। অনুসন্ধান কালে এলজিইডি ভবনে কানাঘুষা শোনা যায়, দপ্তর প্রধান কেন জিওবি ড্রাইভারকে বিশ্বাস করেন না। তার ভরসা আউটসোর্সিং ড্রাইভার রফিকের উপর।
এইসব অনিয়ম দূর্নীতি ও বদলি বানির্জ্যের বিষয় জানতে এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী বেলাল হোসেনের সাথে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করলে তিনি ফোন রিসিভ না করায় তার বক্তব্য পাওয়া যায় নি। তবে ড্রাইভার রফিকুল ইসলাম সাথে যোগাযোগ করলে তিনিও ফোন রিসিভ করেন নাই সে কারণে তার ওবক্তব্য পাওয়া যায়নি।