ঢাকা | বঙ্গাব্দ

গণপূর্তের চাকরিকে ঢাল বানিয়ে ডিপ্লোমা পাঁচ উপসহকারী প্রকৌশলীর ডেভেলপার ব্যবসা!

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Aug 3, 2026 ইং
গণপূর্তের চাকরিকে ঢাল বানিয়ে ডিপ্লোমা পাঁচ উপসহকারী প্রকৌশলীর ডেভেলপার ব্যবসা! ছবির ক্যাপশন:
ad728
জয়নাল আবেদীন যশোরী ও নাসির হোসেন : 
গণপূর্ত অধিদপ্তরের ডিপ্লোমা উপসহকারী পাঁচ প্রকৌশলী নিজেদেরকে আড়ালে রেখে দেদারসে চালিয়ে যাচ্ছে ডেভেলপার ব্যবসা। সরজমিনে অনুসন্ধানে উঠে আসে এর বিস্তারিত। সরকারি কর্মচারি শৃঙ্খলাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তাদের এই ব্যবসা চলছে রাজধানী ঢাকার উত্তরা, সাভার, নবীনগর ডিওএইচএস, মোহাম্মদপুর, বসিলা এলাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায়। প্রথম যে ডেভেলপার কোম্পানী দিয়ে শুরু হয় তার পরিচয় ডালাস ডেভেলপার এন্ড প্রপাটিজ লিমিটেড। কিন্তু এই ডালাস ডেভেলপার মুলত গণপুর্ত এর ঠিকাদার। আর সেই সুবাদে গণপুর্তর উপসহকারী প্রকৌশলী মিজানুর রহমান, আনোয়ার খান আনু, আবুল বাশার, মোহাম্মদ আব্দুর রউফ ও সহকারী প্রকৌশলী গুলনাহার মিলে জমির মালিকদের সাথে চুক্তি করে ডালাস ডেভেলপার এন্ড প্রপাটিজ লিমিটেডকে দিয়ে ভবন নির্মাণ করে তা ফ্ল্যাট ও এপার্টমেন্ট আকারে বিক্রি করছে দেদারসে। তবে সরেজমিনে অনুসন্ধানে  দেখা যায় আরও একটি ডেভেলপার কোম্পানী নাজমুল এস ড্রিম হ্যাভেন নামে একটি ভবন নির্মাণ করে যার প্লট নং ১১৮,রোড নং ৬ সাভার ডিওএইচএস ঢাকা। এই দশ তলা  ভবনে কতিপয় উপসহকারী নিজেদের বসবাস ফ্যামিলিসহ। তবে মুলহোতা গণপুর্তের ডিপ্লোমা উপ সহকারী প্রকৌশলী মিজানুর রহমান থাকেন মিরপুর ডিওএইচএস। আলিশান ফ্ল্যাটে যার ইন্টোরিয়র ডেকোরেশন করা হয়েছে দুই থেকে আড়াই কোটি টাকা খরচ করে। 
নির্মাণাধীন সাইটে কাজ দেখাশুনা করছে উপসহকারী প্রকৌশলী মাফিয়া মিজানের ভাই জুয়েল


সরেজমিনে অনুসন্ধানে, এর পাশে ১১৯নং প্লট এর ভবনে কর্মরত একজনের কাছে জানতে চাই, এই ভবন নির্মাণ করছেন কারা?  নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছা ব্যক্ত করে তিনি বলেন, সাইনবোর্ড আছে দেখেন। পরে অনুসন্ধানী টিম কৌশলে তার কাছে ফ্ল্যাট কেনার আগ্রহ প্রকাশ করলে এবং কিছু কমিশন দিতে চাইলে বেরিয়ে আসে থলের আসল কালো বিড়াল। তিনি জানান, মিজান স্যার, আনোয়ার স্যার ও জুয়েল স্যার এই মাত্র বাসায় চলে গেছেন। তখন আমরা জানতে চাই স্যারদের বাসা কোথায়। তিনি দেখিয়ে দেন ১১৮নং প্লটের ভবন এই খানে পরিবারসহ থাকেন। এর পর তিনি আরও বলেন, আমাদের স্যারদের ৯নং রোডে ২৬৯,২৭০,২৭১ নং প্লট আছে। কিছুক্ষণ আগে এক পার্টিকে ফ্ল্যাট দেখিয়েছেন। তখন আমরা দাম জানতে চাইলে তিনি বলেন. স্যারেরা কইতে পারবে। তবে আমি স্যারের নাম্বার দেবো। আমার কথা কইবেন না। আর আমারে ঠকাবেন না। মোবাইল নম্বর আমাদের হাতে আসার পরে, আমরা নেমে যাই আরও গভীরে। ক্রেতা হিসেবে প্রথম ফোনে যোগাযোগ করি গণপুর্ত সহকারী প্রকৌশলী বাশারের সাথে। তখন তিনি বিভিন্ন প্রশ্ন করেন।  প্রথম প্রশ্ন আমার নাম্বার পেলেন কোথায়?  আমরাও কৌশলে বলতে থাকি আনু সাহেব ও মিজান সাহেব আপনার নাম্বারটা দিয়েছেন। জুয়েল সাহেব বল্লেন আমার বড় ভাই আপনি কথা বলেন।  তার পর শুরু হয় চারটা ফ্ল্যাট এর দরদাম। বাশার সাহেব বলেন ১৩৫০ স্কয়ার ফিট ৮০ লক্ষ টাক।া  আপনি আমাদের অফিসে আসেন ভাই আমরা ওখানে কথা বলবো। তখন তিনি আরও বলেন আমাদের অন্যান্য প্লট আছে। সেখানে ফ্ল্যাট পাবেন। তবে চারটি একসাথে হবে না। আলাদা করে নিতে হবে। তখন আমরা আরও গভীরে যেতে শুরু করলাম। 
জমির মালিকের সাথে চুক্তি সম্পাদন অনুষ্ঠানে উপসহকারী প্রকৌশলী আনোয়ার খান আনু

এবার চলুন আইন কি বলে? 
সরকারি কর্মচারী সরকারি কাজের ব্যাঘাত না করে অবৈতনিক ভাবে ধর্মীয়, সামাজিক বা দাতব্য প্রকৃতির কাজে, শিল্প ও সাহিত্য, এবং এক বা একাধিক শিল্প ও সাহিত্যেধর্মী প্রকাশনায় অংশগ্রহণ করতে পারবেন।
গ) সরকারি কর্মচারী সরকারের পূর্ব অনুমোদন ছাড়া তার পরিবারের কোন সদস্যকে তার এখতিয়ারাধীন এলাকায় কোন ব্যবসায় জড়িত হওয়ার অনুমতি দিতে পারবেন না।
কোম্পানি স্থাপন ও ব্যবস্থাপনা
বিধি ১৬ অনুসারে কোন সরকারি কর্মচারী কোন ব্যাংক বা অন্য কোন কোম্পানি স্থাপন, নিবন্ধীকরণ বা ব্যবস্থাপনায় অংশগ্রহণ করতে পারবেন না। তবে সমবায় সমিতি স্থাপণ, নিবন্ধন ও ব্যবস্থাপনায অংশগ্রহণ করতে পারবেন।
সংবাদপত্র বা সাময়িকীর ব্যবস্থাপনা
বিধি ২১ অনুসারে কোন সরকারি কর্মচারী সরকারের পূর্ব অনুমোদন ছাড়া কোন সংবাদপত্র বা সাময়িকীর সম্পূর্ণ বা আংশিক মালিক বা পরিচালনা বা সম্পাদনা বা ব্যবস্থাপনায় অংশগ্রহণ করতে পারবেন না।
ভবন, এপার্টমেন্ট বা ফ্ল্যাট নির্মাণ বা ক্রয়
বিধি ১২ অনুসারে কোন সরকারি কর্মচারী নির্মাণ ব্যয বা ক্রয়ে প্রয়োজনীয় অর্থের উৎসের উল্লেখ করে আবেদনের মাধ্যমে সরকারের পূর্ব অনুমোদন গ্রহণ ছাড়া ব্যবসায়ীক বা আবাসিক ব্যবহারের উদ্দেশ্যে নিজে বা ডেভলপারের দ্বারা কোন ভবন এপার্টমেন্ট বা ফ্লাট নির্মাণ বা ক্রয় করতে পারবেন না।
শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ
বিধি ১৫ অনুসারে কোন সরকারি কর্মচারী ফটকা কারবারে বিনিযোগে ফটকাবাজি করতে পারবেন না। যে বিনিয়োগের ফলে সরকারি কর্মচারী সরকারি কাজ সম্পাদনে প্রভাবান্বিত হতে পারে বা সরকারি কর্তব্য সম্পাদনে বিব্রতকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে পারে। সরকারি কর্মচারী বা তার পরিবারের কোন সদস্য ওই ধরনের বিনিয়োগ করতে পারবেন না। সরকারি কর্মচারী ওই ধরনের বিনিয়োগ করতে পারবেন না যা সরকারি কর্মচারী হিসেবে তিনি ওই বিনিয়োগের মূল্যের পরিবর্তন জানেন যা সাধারণ জনগণ জানে না।
পরিবারের সদস্যরা জড়িত যেখানে
বিধি ২৭বি অনুসারে কোন সরকারি কর্মচারী দায়িত্ব পালনের সময় যদি দেখতে পান যে কোন কোম্পানি বা ফার্ম বা অন্য কোন ব্যক্তির সাথে কোন চুক্তি সম্পর্কিত যে কোন বিষযে তার পরিবারের কোন সদস্য বা কোন নিকটাত্মীয়ের স্বার্থ জড়িত আছে এমন কোন বিষয় তার বিবেচনায় আছে বা ওই কোম্পানি বা ফার্ম বা ব্যক্তির অধীনে তার পরিবারের কোন সদস্য বা নিকটাত্মীয় কর্মরত আছেন, তাহলে ওই সরকারি কর্মচারী তা নিজে বিবেচনা না করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট সিদ্ধান্তের জন্য প্রেরণ করবেন।
বিধির লংঘন হলে শাস্তি
উক্ত বিধিমালার ৩২ বিধি অনুসারে কোন কর্মচারী বর্ণিত আইন লংঘন করলে তা অসদাচরণ হিসেবে গণ্য হবে এবং তিনি বিভাগীয় শাস্তির মুখোমুখি হতে পারেন। 
সরকারের এ সকল আইন বিধি উপেক্ষা করে গণপূর্ত ই/এম সহকারী প্রকৌশলী বাশার সাহেব দিলেন সেলন্স অফিসের ঠিকানা। তাদের সাব অফিস সাভার ডিওএইচএস, যার হোল্ডিং ১৯০। এখানে ফ্ল্যাট বিক্রি করেন এই গণপুর্ত উপসহকারী প্রকৌশলীরা। এর পর আমরা যোগাযোগ করি ফিউচার ড্রিম বিল্ডার্সের সাথে। গণপুর্ত উপসহকারী প্রকৌশলী মিজানুর রহমান এর মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করলে তিনি অস্বীকার করেন। কিন্তু অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে আরো চাঞ্চল্যকর ঘটনা। এই ডেভেলপার কোম্পানি চলে তার মুলধন দিয়ে এবং তার ছোটো ভাই জুয়েলকে দিয়ে বিজ্ঞাপন দেওয়া হয় ফেসবুকে। 
শুধু তাই নয়, গণপূর্তের মাফিয়াডন খ্যাত এই দুর্নীতিবাজ উপসহকারী প্রকৌশলী ডেভেলপার কোম্পানির মুল নায়ক ফিউচার ড্রিম বিল্ডার্সের উদ্ভোধন করেন বিশাল আয়োজন করে যার ভিডিও ফুটেজ আমাদের হাতে আছে। 
এবার চলুন জানা যাক, ফিউচার ড্রিম বিল্ডার্সের হেড অফিসসহ বিভিন্ন শাখার ঠিকানা। ফিউচার ড্রিম বিল্ডার্সের হেড অফিস বসিলা ব্রীজ মোহাম্মদ পুর ঢাকা। শাখা অফিস উত্তরা দক্ষিণ মেট্রোরেল স্টেশনের পাসে। আরেক অফিস মিরপুর এক নাম্বারে। এসব ঠিকানায় গিয়ে অনেক কিছুই দেখা যায় সরেজমিনে।  তবে এই পাঁচজনের মুলে আছেন গণপুর্ত উপসহকারী প্রকৌশলী মিজানুর রহমান ও আনোয়ার খান আনু। এদের দুই ভাই আছেন ডেভলপ সম্পর্কিত সকল কাজের দেখভালের দায়িত্বে । জমি মালিক ম্যানেজ, ইট, বালি, সিমেন্ট, রড, লেবার,  ফ্ল্যাট সেল সহ সব কাজে তারা সার্বক্ষনিক দায়িত্ব পালন করে আসছে।।
এবার চলুন এই ভবন নির্মাণ করতে নকশা, ইঞ্জিনিয়ার, সাইড ইঞ্জিনিয়ার এরা সবাই গণপুর্ত ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার উপসহকারী পদে বর্তমানে রানিং চাকরিতে আছেন। কিন্তু সরকারি চাকরির নীতি ও আইনকে বৃদ্ধা আঙ্গুল দেখিয়ে চালিয়ে যাচ্ছে ডেভেলপার ব্যবসা। 
পরবর্তী পর্বে থাকছে আরও বিস্তারিত। সাড়া জাগানো অনুসন্ধানী সংবাদ জানতে ও পড়তে ‘বাঙালি সংবাদ’ এর সাথে থাকুন



শেয়ার করুন:
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
দুবাইয়ে গ্রেফতার বেনজীর, দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া চল

দুবাইয়ে গ্রেফতার বেনজীর, দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া চল