ঢাকা | বঙ্গাব্দ

১ কোটি ৩১ লাখ টিআইএনধারীর মধ্যে রিটার্ন জমা মাত্র ৪৯ লাখ

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Aug 6, 2026 ইং
১ কোটি ৩১ লাখ টিআইএনধারীর মধ্যে রিটার্ন জমা মাত্র ৪৯ লাখ ছবির ক্যাপশন:
ad728
নিজস্ব প্রতিবেদক:

করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) নেওয়ার সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বাড়লেও আয়কর রিটার্ন দাখিলের ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি। ২০২৫-২৬ করবর্ষে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে প্রায় ১ কোটি ৩১ লাখ টিআইএনধারীর বিপরীতে রিটার্ন জমা দিয়েছেন প্রায় ৪৯ লাখ ৫৫ হাজার করদাতা। অর্থাৎ মোট নিবন্ধিত করদাতার মাত্র ৩৮ শতাংশ রিটার্ন দাখিল করেছেন। দফায় দফায় সময় বাড়ানো, অনলাইনে রিটার্ন বাধ্যতামূলক করা এবং বিভিন্ন প্রণোদনা দেওয়ার পরও কর পরিপালনের এই চিত্র সামনে এসেছে।

বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিদায়ী করবর্ষে স্বাভাবিক নিয়মে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত রিটার্ন দাখিলের সুযোগ ছিল। পরে বিশেষ বিবেচনায় কয়েক দফা সময় বাড়িয়ে মার্চ পর্যন্ত নেওয়া হয়। পাশাপাশি ৩১ মার্চের মধ্যে আবেদন করলে অতিরিক্ত ৯০ দিন পর্যন্ত জরিমানা ছাড়াই রিটার্ন জমার সুযোগ পান করদাতারা। ফলে কার্যত প্রায় পুরো করবর্ষজুড়েই রিটার্ন দাখিলের সুযোগ ছিল।

তবে সময় বাড়ানোর পরও প্রত্যাশিত হারে রিটার্ন জমা পড়েনি। এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৪৭ লাখ ব্যক্তি করদাতা ই-রিটার্ন ব্যবস্থার মাধ্যমে অনলাইনে রিটার্ন দাখিল করেছেন, যা অনলাইন সেবা ব্যবহারে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এনবিআরের কর জরিপ ও পরিদর্শন বিভাগের সদস্য মো. রফিকুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, "রিটার্ন কমছে না, বরং প্রতিবছরই বাড়ছে। গত অর্থবছরেই টিআইএনধারী ১৩ লাখের বেশি বেড়েছে, রিটার্নও কয়েক লাখ বেড়েছে। তবে এই সময়ে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়েছে, কর্মসংস্থান কমেছে। ফলে টিআইএন বৃদ্ধির তুলনায় রিটার্ন দাখিলের হার সেই অনুপাতে বাড়েনি।"

তিনি আরও বলেন, টিআইএনধারীদের বড় একটি অংশ শুধু ব্যাংক ঋণ, ক্রেডিট কার্ড বা বিভিন্ন সেবা গ্রহণের জন্য টিআইএন নিয়েছেন। অনেকের করযোগ্য আয় নেই, আবার অনেক টিআইএন মৃত ব্যক্তি বা নিষ্ক্রিয় ব্যবসার নামে রয়েছে। এসব কারণও রিটার্ন জমার হারকে প্রভাবিত করছে।

কর বিশেষজ্ঞদের মতে, টিআইএনধারী বাড়লেও কর পরিপালনের স্থায়ী ব্যবধানের পেছনে রয়েছে পুরোনো ও হালনাগাদ না হওয়া তথ্যভাণ্ডার এবং আইনের দুর্বল প্রয়োগ। মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি কামরান টি রহমান বলেন, জমি কেনা, সম্পত্তি নিবন্ধন, ব্যাংক হিসাব খোলা, ঋণ নেওয়া কিংবা ক্রেডিট কার্ডের মতো বিভিন্ন সেবার জন্য অনেকেই টিআইএন নিয়েছেন। কিন্তু তাদের মধ্যে অনেকেই এখন নিষ্ক্রিয় অথবা করযোগ্য আয়ের আওতায় নেই। তাই সক্রিয় ও নিষ্ক্রিয় টিআইএন আলাদা করে তথ্যভাণ্ডার হালনাগাদ করা প্রয়োজন।

কর গবেষক স্নেহাশীষ বড়ুয়ার মতে, শুধু তথ্যভাণ্ডার পরিশোধন করলেই হবে না, আয়কর আইনের বাধ্যতামূলক রিটার্ন দাখিলসংক্রান্ত বিধান কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন, ব্যাংক ঋণ, ঋণপত্র (এলসি) খোলা এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সদস্যপদ গ্রহণের ক্ষেত্রে রিটার্ন দাখিলের প্রমাণপত্র নিশ্চিত করা গেলে কর পরিপালন বাড়বে।

করপোরেট খাতেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার করপোরেট টিআইএনধারীর মধ্যে মাত্র ৪২ হাজার প্রতিষ্ঠান রিটার্ন জমা দিয়েছে। আগের অর্থবছরে এ সংখ্যা ছিল ৩৯ হাজার ৬৫৯।

রিটার্ন দাখিলের হার কম হলেও আয়কর আদায়ে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আয়কর আদায় হয়েছে ১ লাখ ৪৬ হাজার কোটি টাকা, যা আগের অর্থবছরের ১ লাখ ২৯ হাজার কোটি টাকার তুলনায় ১৩ দশমিক ২ শতাংশ বেশি। একই সময়ে এনবিআরের মোট রাজস্ব আদায় দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ১৫ হাজার ৪৭৩ কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় ১২ দশমিক ৩ শতাংশ বেশি। তবে ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকার সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ৮৮ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি রয়েছে।

বিদায়ী অর্থবছরে আমদানি ও রপ্তানি শুল্ক থেকে আদায় হয়েছে ১ লাখ ১২ হাজার ১১৯ কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় ১১ দশমিক ৯০ শতাংশ বেশি। আর ভ্যাট খাত থেকে আদায় হয়েছে ১ লাখ ৫৭ হাজার ৭৩৪ কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় ১১ দশমিক ৮০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি।

কর পরিপালন বাড়াতে চলতি ২০২৬-২৭ করবর্ষে নতুন প্রণোদনা চালু করেছে এনবিআর। নতুন বিধান অনুযায়ী, ১ জুলাই থেকে ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে রিটার্ন দাখিল করলে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতারা করের ৫ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় পাবেন, যার সর্বোচ্চ সীমা ২৫ হাজার টাকা। ১ অক্টোবর থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত রিটার্ন দাখিলে কোনো ছাড় থাকবে না। আর ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত রিটার্ন জমা দিলে করের ২ শতাংশ, সর্বোচ্চ ৩ হাজার টাকা অতিরিক্ত অর্থ দিতে হবে। ১ এপ্রিল থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত রিটার্ন দাখিল করলে জরিমানা হবে করের ৫ শতাংশ, সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা।

এনবিআরের সদস্য মো. রফিকুল ইসলাম চৌধুরী আশা প্রকাশ করে বলেন, "দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এসেছে। ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণে সরকার নানা উদ্যোগ নিয়েছে এবং করদাতাদের জন্যও বিভিন্ন প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে। এসব কারণে চলতি করবর্ষে রিটার্ন দাখিলের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে বলে আমরা আশা করছি।" 




শেয়ার করুন:
কমেন্ট বক্স
জুলাইয়ের ১৮ দিনে রেমিট্যান্স এলো ১৮০ কোটি ডলার

জুলাইয়ের ১৮ দিনে রেমিট্যান্স এলো ১৮০ কোটি ডলার