আসাদ মাহমুদ ও আলমগীর হোসেন:
পালিয়ে যাওয়ার আপেক্ষায় আছেন পাবনা গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ রাশেদ কবির। স্বৈরাচারের অন্যতম দোসর এই প্রকৌশলী ধানমন্ডি গণপূর্ত উপবিভাগের এসডিই (উপবিভাগীয় প্রকৌশলী) ও পরবর্তীতে পাবনা গণপূর্ত’র নির্বাহী প্রকৌশলীর দায়িত্ব পালনের সুবাদে কয়েকশ’ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ আছে। এমনকি ফ্যাসিবাদী শাসন পরবর্তীতে অন্তরবর্তী সরকারের সময়ে সদ্য সাবেক রাস্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর ছেলের প্রভাবে বিশেষ ক্ষমতা দেখিয়ে ডিভিশনটিতে সর্বগ্রাসী লুটপাট চালিয়েছেন গত দুই অর্থবছরে। ভবিষ্যতে দুর্নীতি বিরোধী অভিযোাগ বা অভিযানের মুখে গ্রেফতারের ভয়ে প্রকৌশলী রাশেদ কবীর যে কোন সময়ে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে পারেন বলে আশংকা ব্যক্ত করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এক অভিযোগে জানা যায়, ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের আমলে প্রকৌশলী রাশেদ কবীর ধানমন্ডিতে এসডিই থাকতে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে শতাধিক কোটি টাকার ভূয়া বিল প্রদান করেছেন ঠিকাদার পিয়ারু সর্দারের নামে। ডিভিশনটির ওই সময়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ শাহ আলম ফারুক চৌধুরী ইতিমধ্যে পালিয়ে দেশত্যাগ করে কানডায় অবস্থান করছেন। তার অন্যতম সহযোগী তখনকার এসডিই রাশেদ কবির বহাল তবিয়তে থেকে বর্তমানে পাবনা গণপূর্ত বিভাগকে সর্বগ্রাসী লুটপাট ও দুর্নীতির স্বর্গরাজ্যে পরিনত করেছেন। লাগাতার অনিয়ম দুর্নীতির কারণে পাবনার গ্রীণসিটি নিয়ে প্রতিবছরই বাড়ছে অডিট আপত্তি। দুর্নীতি দমনসহ সরকারের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থায় এই প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড় জমছে। অভিযোগগুলো তদন্তের মুখোমুখি হওয়ার পূর্বেই শহ আালম ফারুক চৌধুরীর ন্যায় তিনিও যে কোন সময়ে দেশত্যাগ করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আরো জানা যায়, এক চাকরিচ্যুত উপ-সহকারী প্রকৌশলীকে প্রায় ১৯ লাখ ট্যাকা বকেয়া বেতন-ভাতা পরিশোধ করায় বিপাকে পড়েছেন তিনি। পরে টাকা ফেরত চেয়ে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের চিঠির ভিত্তিতে ওই টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দিতে সংশ্লিষ্ট উপ-সহকারী প্রকৌশলীকে চিঠি দেন অর্থ ছাড় করা এই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা রাশেদ কবীর। সংশ্লিষ্ট নথিতে দেখা যায়, পাবনা গণপূর্ত বিভাগের উপ-সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) মো. শাহীন উদ্দিন ও মো. ফজলে হক অসদাচরণের অভিযোগে দীর্ঘদিন সাময়িক বরখাস্ত ছিলেন। পরে ২০২৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় পৃথক আদেশে তাদের বাধ্যতামূলক অবসর দেয়। এর পর শাহীন উদ্দিন বকেয়া বেতন-ভাতার আবেদন করলে পাবনা গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাশেদ কবির তা সুপারিশসহ জেলা অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড ফিন্যান্স অফিসে পাঠান। ওই সুপারিশের ভিত্তিতে ২০২৫ সালের ২ নভেম্বর শাহীন উদ্দিনকে ১৮ লাখ ৮১ হাজার ৪২ টাকা পরিশোধ করা হয়।
এখানেই শেষ নয়, পাবনা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল স্থাপন প্রকল্পে রিমেইনিং ওয়ার্কে দরপত্র আহবান করে সরকারের কয়েক কোটি টাকা আর্থিক অপচয় করেছেন অভিযুক্ত প্রকৌশলী। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পাবনা গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদ কবির ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে জুন মাসে ৬০-৭০ কোটি টাকার কাজ না করিয়ে অগ্রিম বিল দিয়েছেন। এ বিষয়ে তথ্যাধিকার আইনে কতিপয় গণমাধ্যম কর্মী রাশেদ কবিরের কাছে তথ্য চাইলে তিনি নানা তালবাহানা করে তথ্য প্রদানে বিরত থাকেন। জানা যায়, শাহাদত নামের ঠিকাদারকে ৬০-৭০ কোটি টাকার কাজ বাস্তবায়ন না করে অগ্রিম বিল পরিশোধ করে জুন মাসে ৫% কমিশন নিয়েছেন ফ্যাসিস্ট হাসিনার দোসর ও মাফিয়াখ্যাত নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদ কবির। এই ঘটনা পাবনা গণপূর্ত বিভাগের রূপপুর প্রকল্পের বালিশ কান্ডকে হার মানিয়ে দিয়েছেন বলে গণপূর্ত অধিদপ্তরের একাধিক প্রকৌশলী এই প্রতিবেদক জানান।
অপরদিকে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রধান প্রকৌশলীর প্রজ্ঞাপণ অমান্য করে মেরামত ও রক্ষণাাবেক্ষণ কাজ এলটিএম পদ্ধতির পরিবর্তে ওটিএম পদ্ধতিতে দরপত্র আহবান করে পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দিয়ে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন তিনি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ওটিএম পদ্ধতিতে আহবান করা টেন্ডার আইডি নম্বরঃ ১২৯৭০৭৪, ১৩৯৬৬৫৮, ১২৯৫৪৭৩, ১২৯৫৩০৯, ১২৮৬৮৪৪, ১২৮৩৭৬৭, ১২৮৬২৪০। উক্ত কাজগুলো জুন মাসের ১৭ ও ১৪ তারিখ ওপেনিং দেখিয়ে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে কী-ভাবে ২৩ জুন ২০২৬ইং তারিখের মধ্যে বিল দিয়েছেন, সেটা প্রশ্ন সাপেক্ষ বিষয়। ৫/৭ দিনের মধ্যে কয়েক কোটি টাকার কাজের দরপত্র মূল্যায়ন কার্যাদেশ প্রদান ও কাজ সমাপ্ত করে বিল দেওয়ার বিষয়টিকে রহস্যজনক বলে মনে করছেন টিআইবি’র গবেষকগণ। পাবনা নার্সিং ট্রেনিং ইনস্টিটিউট এর সমাপ্ত কাজে রিমেইনিং ওয়ার্কের নামে সরকারের কোটি টাকা লোপাট করেছেন। একই অর্থবছরে পিপিআর ২০২৫ ও প্রধান প্রকৌশলীর প্রজ্ঞাপণকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজে ওটিএম টেন্ডার আইডি নং ১২৮২৭৪৫, ১২৭০৬৮৫, ১২৭১০৫০, ১২৭০৯৭১, ১২৭১০৩৮, ১২৭১০৩৫, ১২৫৪৮২৬, ১২৩২৪২৫, ১২৩৩৬০১, ১২২২৩৮০, ১২১৬১৯৪, ১১৮০৫৩০, ১১৭৬৬৯৬, ১১৮০৫০৫, ১১৭৬৬৯৮নং ওটিএম টেন্ডার আইডি ব্যবহার করে নিজের পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দিয়েছেন প্রকৌশলী রাশেদ কবীর। ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরেও এভাবে আসংখ্য ওটিএম করে অনিয়ম দুর্নীতি আর লুটপাটের আশ্রয় নিয়েছেন তিনি।
এছাড়াও রূপপুর গ্রীণসিটি ও পাবনা মডিকেল কলেজ হাসপাতাল ৫শ’ শয্যায় উন্নীতকরণ প্রকল্পে অভ্যন্তরীণ সড়ক, ল্যান্ড স্কেপিং, এসটিপি, স্যুয়ারেজ লাইন, ড্রেন, ডিপটিউবওয়েল, সীমান প্রাচীর, টিউবওয়েল, স্যানিটারি পাইপ ফিটিংস, বিভিন্ন ধরণের বৈদ্যুতিক মোটর ও পানির পাম্প, আরসিসি ড্রেন, রেইন ওয়াটার হার্ভেষ্টিং, খেলার মাঠ, পুকুর, ঘাটলা, ওয়ার্কওয়ে, আন্ডারগ্রাউন্ড ওয়াটার রিজার্ভার, মেডিকেল বর্জ্য সংরক্ষণাগার, লিফট ও লিফট যন্ত্রাংশ, এসকেলটর, সাবষ্টেশন ইক্যুইপমেন্টস্, বিভিন্ন পরিমাপের বৈদ্যুতিক সাবষ্টেশন ও জেনারেটর, পাওয়ার ফ্যাক্টর কারেকশন প্যানেল, বিভিন্ন মাপের ট্রান্সফরমার, এসি, ভিআরএফ, গার্ডেন ও সিকিউরিটি লাইট, ফায়ার প্রটেকশন ও ডিটেকশন সিস্টেম, ফায়ার ফাইটিং ইক্যুইপমেন্ট, এক্সেস কন্ট্রোল সিষ্টেম, কিচেন কেবিনেট, সিসিটিভি সিস্টেম, সেন্ট্রাল এসি, এক্সটারনাল ও ইন্টারনাল ইলেকট্রিফিকেশন, ওভারহেড ও আন্ডারগ্রাউন্ড বৈদ্যুতিক লাইন নির্মাণ, সোলার প্যানেল, পিএবিএক্স ও নেটওয়ার্কিং সিষ্টেম, স্টেজ লাইট, ভার্টিকেল ব্লাইন্ড বিভিন্ন ধরণের বৈদ্যুতিক লাইটসহ বৈদ্যুতিক ফির্টিং ফিক্সারস্ এক্সটারনাল ও ইন্টারন্যাল ইলেকট্রিফিকেশন কাজগুলো নিয়ে নি¤œমাণের মালামাল ব্যবহার করে কয়েক কোটি টাকা লোপাট করেন এই নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদ কবীর। গ্রীণসিটিতে চালু করা ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল এ সকল সাজ-সরঞ্জাম নিয়ে বিগত দুই অর্থবছরে সবচেয়ে বেশী অডিট আপত্তি উত্থাপিত হয়েছে নি¤œমাণের ও সিডিউল বহির্ভূত মালামাল ব্যবহারের কারণে।
এমনকি রূপপুর গ্রীণসিটির ভবনগুলোর নির্মাণ কাজ শেষ না হলেও এরই মধ্যে বিভিন্ন ধরণের বৈদ্যুতিক-যান্ত্রিক কাজে রিপেয়ারিং দেখিয়েও প্রায় ৫ কোটি টাকা লোপাট করেন প্রকৌশলী রাশেদ কবীর। (ক্রমশঃ)